দিনযাপন | ০৯০৩২০১৫

সকালে ঘুম ভেঙ্গেই আনিস ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দিনের শুরু। উনি বেশ কয়েকদিন যাবৎ হাসপাতালে আইসিইউ-তে ছিলেন, উনাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা ছিলো, যে কোনো সময় শেষ সংবাদটা  পেতেই হবে জানা থাকার পরও কেমন জানি একটা অদ্ভুত মন খারাপ ভর করলো। ছবিমেলার সময় কোনো এক সন্ধ্যায় উনার সাথে পাঠশালার সামনে শেষ দেখা। বরাবরের মতোই হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ অ্যাই, কি অবস্থা?’ আমি বরাবরের মতোই হাসি দিয়ে বললাম, ‘ভালো’। … ফার্স্ট ইয়ারের ডার্করুমের ক্লাসগুলোর কথা মনে করছিলাম। সবাই এখন ফটোশপ, লাইটরুম এগুলা বোঝার ব্যস্ততায় আর নিজের হাতে কেমিক্যাল ঘেটে প্রিন্টের পদ্ধতি শেখার প্রতি খুব একটা উৎসাহী ছিলো না। কিন্তু ক্লাস করাতে উনার উৎসাহ কোনো অংশেই কম ছিলো না। গল্পের মতো করে উনার অভিজ্ঞতাগুলো বলতেন। একটা গল্প খুব মনে গেঁথে আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা ছবি কিভাবে বিশাল বড় প্রিন্ট করেছিলেন, সেইটার গল্প। দৃক-এর দুইতলায় দৃক নিউজ-এর অফিসের বাইরেই এস এম সুলতানের একটা বড় প্রিন্ট রাখা ছিলো অনেকদিন। ছবিমেলার সময় সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো। এখন আবার সেটা ঝুলেছে কি না জানি না। ছবিটা দেখলেই অবাক লাগতো। এত বড় প্রিন্ট, হাতে করা, অথচ কি সুন্দর! ছবি প্রিন্টের দক্ষতার বিচারে উনাকে প্রিন্টার না, শিল্পীই বলা যায়।… কথায় কথায় বলতেন, ‘Say, ধরি…’ । খুব মজা লাগতো শুনতে। … পাঠশালায় দেখা সহজ-সরল মানুষগুলার একজন চলে গেলেন।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিনের বাকি অংশের দিকে এগিয়ে চলা। অফিসে গেলাম। চেক পাবো এই আশায় বুক বেঁধে গিয়ে শুনলাম চেক এখনো তৈরি হয়নি কারণ এ মাস থেকে আমি কাজের সংখ্যার ভিত্তিতে টাকা পাবো। সেই হিসেবটা এখনো জমা পড়েনি, তাই চেকও ইস্যু করা যাচ্ছে না। এখানে আমার কিছু বলারও নেই। কন্ট্রাক্ট অলরেডি শেষ, রিনিউ করা হয়নি। সো এখন বাকি সময়ের জন্য যদি তারা এই বেসিসে টাকা দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমি কিই বা বলবো!আমার তো পাঁচ হাজার টাকাতেও মাস চলে যায়! সো এমনিতে কত টাকা পাবো তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নাই আমার। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেলো অন্য জায়গায়। একজনকে পাক্কা কথা দিয়ে রেখেছিলাম যে আগামীকাল টাকা দেবো। উনি অনেকগুলা টাকা পায়। প্রায় দশ হাজার টাকা! আবার আমার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে উনি আরেকজনকে দেবে। কালকে সকালে যদি উনাকে বলি যে টাকা তো পাইনি, সো আপনাকে আজকে দিতে পারবো না, তাহলে আমার প্রেস্টিজটা কই থাকবে, আর ক্যামনেই বা কি করবো সেটা ভাবতে গিয়েই মেজাজ খিঁচে গেলো। এমনিতেই উনাকে আমি তিন-চার মাস যাবৎ টাকা দিচ্ছি দেবো বলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গত মাসে কিছু টাকা দিয়েছি, আর এই মাসে আরও কিছু টাকা দেওয়ার কথা। … এর মধ্যে তো ডিসেম্বরে কোনো কাজ করা হয়নি বলে জানুয়ারি মাসে বেতনও নেইনি। সেই মাসেই আসলে আমার উনাকে টাকা দেয়ার কথা। কিন্তু আল্টেটিমেটলি সেটা হয়নি …

জীবনে কখনো কি ভেবেছিলাম যে আমার হাজার হাজার টাকা দেনা থাকবে, আর সেই দেনা শোধ করতে গিয়ে আমি অকূল পাথারে হাবুডুবু খাবো! … তাও আবার সেই ধারের ৮০ শতাংশ হবে নিজের জন্য না, আরেকজনের জন্য … যে কিনা আমাকে আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক, মানসিকভাবে সর্বস্বান্ত করে উল্টো আমাকেই লাথি মারবে আর তারপর বলে বেড়াবে আমি তার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছি! …

যার জন্য চুরি করতে গিয়ে তার কাছেই চোর হয়েছি, সে অবশ্য অনেকবারই বলেছে মরার আগে সে সব টাকা দিয়ে যাবে।অবশ্য এমনও হতে পারে যে মরার আগে টাকা দেয়ার কথা বলতে সে আমার মরার কথা বুঝিয়েছে! তো, মাঝখানে আত্মহত্যার একটা ছোটোখাটো অ্যাটেম্পট নিতে গেলেও সেটা তো শেষ পর্যন্ত করা হয়নি, আর এখন আপাতত সহসা মরবার ইচ্ছাও আর নেই। ফলে, সে যদি এটা মিন করে থাকে যে আমার মৃত্যুর আগে সে সব টাকা দিয়ে দেবে, তাহলে তো টাকা পেতে দেরিই হবে! …  আমি অবশ্য নিতান্তই ভোঁদাই টাইপের ভালোমানুষ হবার কারণে তাকে বলেছি তোমাকে টাকা ফেরত দিতে হবে না। আসলেও আমি তার কাছে টাকা নিয়ে কোনো দাবী রাখিনি। সে যদি কখনো টাকা নাও দেয়, তাতেও আমার মন হবে না যে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিংবা আমিও তার কাছে চাইবো ও না। কিন্তু, মাঝে মাঝে যখন ধারের স্তূপের মধ্যে হাঁসফাঁস করি অথচ উঠে দাঁড়াবার জন্য দিশা পাইনা, তখন এত প্রচণ্ড জিদ উঠে মাঝে মাঝে যে মনে হয় সে টাকাগুলো দিয়েই যাক ! অন্তত ধারগুলো তো শোধ করে ফেলতে পারবো! … এই ধার-দেনার চাপ আমি আর নিতে পারছি না! কত মানুষ যে কত হাজার টাকা পায়! … কবে যে সবার টাকা দিয়ে শেষ করতে পারবো তা একমাত্র মনে হয় উপরওয়ালাই জানেন! …

তো, যাই হোক, বিকেল নাগাদ এই খিঁচে থাকা মেজাজ একদমই ভালো হয়ে গিয়ে ‘ কি আছে জীবনে! যা হবার হবে’ টাইপ মন বদল হয়ে গেলো বাংলাদেশের খেলা দেখতে গিয়ে। অফিস থেকে ফেরার পথে বিবিসি-র অফিসে গেলাম কিছুক্ষণের একটা কাজে, তারপর খেলার উত্তেজনায় বাংলাদেশের জয় পর্যন্ত দেখে বের হলাম। ওখানে কাজ সেরে বের হবো কি হবো না করতে করতে ইংল্যান্ডের ৭টা উইকেট পড়ে গেলো। তারপর কি আর বের হতে ইচ্ছে করে? মন তো পড়ে থাকবে খেলায়! সবার উত্তেজনায় আমিও উত্তেজিত হয়ে খেলা দেখতে বসে গেলাম। এমন একটা ভাব যে বাংলাদেশের জয় না দেখে কোথাও যাওয়া-যাওয়ি নাই! … বাংলাদেশের জয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেলো। কোয়ার্টার ফাইনাল ! শেষ আট! … তাও আবার নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে এক গ্রুপ থেকে। খেলবে সম্ভবত ইন্ডিয়ার সাথেই, যদি না নিউজিল্যান্ডের সাথে খুব বিশাল কোনো পার্থক্য ঘটিয়ে জিতে যায়! … ফেসবুকের হোমপেজ জুড়ে আজকে খালি বাংলাদেশের বন্দনা। দেখছি আর মজা পাচ্ছি। কি অদ্ভুত আমাদের আবেগ! আজকে যদি কোনো কারণে বাংলাদেশ হারতো, তাহলে পুরো ফেসবুক জুড়েই তানিমকে নিয়ে ট্রলের বন্যা বয়ে যেতো, রুবেল-হ্যাপি ইস্যু নিয়ে অনেক রকমের কটূক্তি হতো, আরও কতো কি! … কিন্তু এখন সবকিছু ভুলে আমাদের সবার মনে একটাই কথা, ‘সাবাস বাংলাদেশ! সাবাস বাঘের বাচ্চা!’ …

বছর তিনেক আগে প্রাচ্যনাট থেকে ‘দৌড়া! বাঘ আইলো’ নামে একটা ইম্প্রোভাইজেশন করা হয়েছিলো। বাংলাদেশেরই কোনো একটা খেলার সময়। কোন খেলা সেটা ভুলে গেছি। তবে ইম্প্রভাইজেশনটা খুব ফুর্তির হয়েছিলো। এক দিনের নোটিশে প্ল্যান হয়েছিলো সেটার। আজকে আমার বার বার মনে হচ্ছিলো আবারো যদি আমরা এই ইম্প্রোভাইজেশনটা নিয়ে পথে  নেমে যেতে পারতাম! ইটস কোয়ার্টার ফাইনাল ! কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ হারলে হারবে! আর জিতলে তো কথাই নেই! … কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে এটার সেলিব্রেশনই বা কম হবে কেন? … এরকম একটা মাইলফলক পার হয়ে কি চুপ থাকা যায়? … পার্টি হবে! পার্টি! …

আর সবকিছুর শেষে ঘুমাতে যাবার আগে এটা ভাবতেই মেজাজ খিঁচে যাচ্ছে যে অনেক অনেক কাজ, কিন্তু সেগুলো করার জন্য শারীরিক বা মানসিক সতেজতা আর উৎসাহ কোনোটাই কেন যেন কাজ করে না! … কাজ নিয়ে বসতে না বসতেই মাথা ভার হয়ে যায় আর মনে হয় যে আমার চেয়ে ক্লান্ত এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই! … নিজেকে এটা বলেও কনভিন্স করতে পারি না যে আমার মুখ চেয়ে মাসে মাসে এত্তগুলা টাকা কেউ দেবে না। আর এখন তো নতুন নিয়ম হলোই, যতগুলা আর্টিকেল ততগুলা টাকা ! কিন্তু আর্টিকেল যদি না- ই শেষ করি, তাহলে ওইটুকু টাকাও তো ভেসে ভেসে আসবে না ! … কি যে করবো ! জানি না! … আমার মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য তো আর অফিস বসে নাই। তাও তো কিছু না জেনেই গত তিন/চার মাসে অনেক কন্সিডার  করেছে। আর কত করবে! …অতএব আমারই আদা-জল খেয়ে নামতে হবে কাজগুলো শেষ করার জন্য। যা আছে কপালে! এই মাসেই তো শেষ! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s