দিনযাপন | ১১০৩২০১৫

আজকেও সকালে কেমন একটা এলেবেলে টাইপের স্বপ্ন দেখছিলাম। তবে আজকের স্বপ্নটা তাকে নিয়ে নয়। … দেখলাম কোথায় জানি গিয়েছি। একটা রিসোর্ট টাইপ জায়গা। কাউকে চিনি না, কিন্তু তার মধ্যেই আমি আর মা আছি। সেখানে গিয়ে দেখা হলো বড় ফুপা আর দাদীর সাথে। তখন মনে হলো যে মা বোধহয় আগে থেকেই জানতো যে তারা এখানে আসবে, তাই এসেছে, আর সাথে আমাকে পোটলা বেঁধেছে। কিছুক্ষণ পর আবার দেখলাম দোলা আপু। সে আসলেই দোলা আপু ছিলো কি না জানি না, কারণ সে বোরখা পরা ছিলো, আর তার চেহারা দেখা যাচ্ছিলো না। মা বললো দোলা আপু, তাই আমি ধরে নিলাম তাই। এইসবের মধ্যে আমার আবার একটা জায়গা দেখে বেশ ভালো লাগলো, মনে হলো ছবি তোলার জন্য খুব সুন্দর। সাথে সাথে আমার হাতে ক্যামেরা চলে আসলো আর আমিও চিনি না, জানি না একটা মেয়েকে মডেল বানায় ছবি তোলা শুরু করলাম! … এইসব হাবিজাবি দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

দোলা আপু, প্রসূন ভাইয়া এই মানুষগুলা এখন কেমন নাম ছাড়া আর কিছুই না! প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে এই মানুষগুলার সাথে আমার দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা নেই! ২০ বছর! সেই তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি! সেই সময় শেষ তাদের সাথে সরাসরি দেখা হয়েছে। এখন মাঝে মাঝে চারুর ফেসবুক প্রোফাইলে তাদের ছবি দেখি। গতবছর এক পলকের জন্য বড় ফুপা আর ফুপির সাথে দেখা হয়েছিলো। দিনটা মনে আছে আমার, ১২ ফেব্রুয়ারি! … বাসার জন্য টাইলস কিনতে গিয়ে দেখা হয়েছিলো। বড় ফুপিই ডাক দিয়ে দেখা করতে চেয়েছিলেন। আমি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলাম যে আমার কি করা উচিৎ? তাকে জড়ায় ধরা উচিৎ, নাকি কি করা উচিৎ! … কেমন বোকা বোকা ভাব নিয়ে হাসি হাসি একটা মুখ বানায় দাঁড়ায় ছিলাম! ২০ বছর আগে বড় ফুপির সাথে কি করতাম সেটাও তো ভুলে গেছি! …

আজকে অনেকটা দিন পর হঠাৎ কেমন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে রাগ করলাম। আসলে এটা যে ঠিক রাগ, তাও বলা যায় না। ধরা যাক, কোনো একটা কিছু খারাপ লাগলো, সেটা নিয়ে বিরক্ত হলাম, তারপর সেটার পিঠে এমন সব ঘটনা ঘটতে লাগলো যে তখন প্রচণ্ড জিদ উঠতে শুরু করলো, আর জিদের প্রকাশটা হলো প্রচণ্ড রাগের মাধ্যমে। আজকে যেটা হলো যে, শিল্পকলায় নাটক দেখতে গিয়েছি। এমনিতেই পৌঁছিয়েছি নাটক শুরু হবার মাত্র দশ মিনিট আগে। রাস্তার প্রতিটা সিগন্যালে অন্তত পাঁচ মিনিট করে আটকে থাকলাম, রিকশাওয়ালাও বেশি দক্ষ না, গাড়ির চিপায় পড়লেই আর সহজে বের হয়ে যেতে পারে না … এসব করতে করতে অনেকক্ষণ সময় লেগে গেলো শিল্পকলায় পৌঁছাতে। দেরী হয়ে যাবে বলে বাসায় চা খেলাম না, ভাবলাম শিল্পকলায় গিয়েই খাবো। ওখানেও দেরী করে পৌঁছানোর কারণে বেশ বিরক্ত লাগছিলো। খিদেও লেগেছে তখন। কিন্তু এমন কম সময় হাতে, না পারবো আরাম করে চা খেতে, না আর কিছু খেতে! এর মধ্যে দেখলাম ফুয়াদ এক কাপ চা নিয়ে এসে নোবেল ভাইকে দেয়ার জন্য খুঁজছে। আমি সেই চায়ের কাপ দখল করার পাঁয়তারা করলাম। কারণ ওই মুহুর্তে নোবেল ভাই সামনে নাই। এর মধ্যে না হয় আরেক কাপ চা আসুক, সেটা নোবেল ভাই নেবে। যাই হোক, সেটা হলো না কারণ এর মধ্যে সে-ও চলে আসলো। আমি অগত্যা ফুয়াদকে বললাম আরেক কাপ চায়ের কথা বলতে। কারণ আমি চা চাইতে গেলে দশ মিনিট ধরে ডাকলেও চায়ের দোকানের মামা শুনবে না। তো ফুয়াদ তখন ফাজলামির মুডে আছে, তাই বললো যাবে না। এবার রানা-কে বললাম, সেও উল্টা ফুয়াদের সাথে ফাজলামি করে। আমার খুব মেজাজ খারপ হলো! আমি এক কাপ চায়ের কথা বলার জন্য বলতেসি, আর সেইটা নিয়ে তারা ফাজলামিই করে যাচ্ছে! এক কাপ চায়ের জন্য কি এখন আমি হাতে-পায়ে ধরবো! এতক্ষণ ধরে তো ওদেরই কেউ না কেউ ওই মামাকে গিয়ে চায়ের কথা বলেছে! বিরক্ত হয়ে আমি নিজেই গিয়ে চায়ের কথা বলতে গেলাম। তো, সেই ঘটনাই ঘটলো, কয়েকবার ডাকার পরও ওই মামা শোনেননা বলে যখন চিৎকার দিয়ে বললাম, ‘এই যে আপনাকে ডাকতেসি, শোনেন না? চা দেন !’ তখন তিনি মহা বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ততক্ষণে আমার মেজাজ আরও গরম। শেষে যখন চা আসলো তখন আর চা খাওয়ার মতোও মানসিক অবস্থা নাই। ভেতরে ভেতরে রীতিমতো ফুঁসছি! এক কাপ চা-এর জন্য এইরকম করতে হইলো! এর চেয়ে বাসায় বসেই আরাম করে চা খেয়ে আসতাম, তাই ভালো ছিলো! … চা খাবো না বলে দিলাম। ফুয়াদ তখন আবার সেই চা নিয়ে বলে, আচ্ছা, চলেন ভাগাভাগি করে খাই! … চায়ের কাপটা আরেকজনের হাতে ছিলো,  নাইমী না সন্ধি খেয়াল নেই। কাপটা নিয়ে পুরোটা চা ফেলে দিয়ে বললাম, ‘নে, এখন শেয়ার করে খা!’ … এত রাগ লাগতেসিলো তখন, ফুয়াদের গায়ের ওপর চা ঢেলে দিলেও মনে হয় আমি অবাক হতাম না! যাক, এতটুকু নিয়ন্ত্রণ নিজের ওপর ছিলো! …

তারপর অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই ওই রাগ চলে গেলো। কারণ।, ততক্ষণে এই আচরণের কারণটাও বুঝে গেছি। ইটস জাস্ট পিএমএস! … সেটারই কারণে এই ওভাররিঅ্যাকশন! … তখন হাসিই পেলো ! … কি রাগটাই না করলাম এক কাপ চা নিয়ে! …

সবসময়ই আমার খুব আশ্চর্য লাগে এইটা ভাবলে যে একটা মেয়ের শরীরে হরমোনের কত প্রভাব! সেটা কি আর কাউকে, বিশেষ করে একটা ছেলেকে বোঝানো সম্ভব? প্রতি মাসের তিন/চারটা দিন এই হরমোন ম্যাডাম যে আবেগ-অনুভুতির কি খেলাটা দেখায়! আমার শরীরে বোধহয় খেলাটা স্বাভাবিকের চাইতে একটু বেশিই হয়! … পেটের মধ্যে বিশাল জাম্বুরা সাইজের টিউমার নিয়ে ঘুরলে সেটা আর অস্বাভাবিক কি! … তার জন্যই তো হরমোনের অনেকটা বেশি খোরাকি লাগে!

… আর যখন কারো টানা তিনমাস লাগাতার এরকম ব্লিডিং হতে থাকে, তখন তার শরীর আর মন কিভাবে সেটা সামলায়? … তিনমাস টানা ব্লিডিং! উফ! ওই তিনটা মাস! … কি যে ছিল ওই সময়টা! শরীরের সব রক্তই তো ততদিনে বের হয়ে যাবার কথা! একটা ছোট্ট জরায়ু এত রক্ত কোথা থেকে উৎপাদন করে যে টানা তিনমাস ব্লিডিং হতেই থাকে? … সেই তিনমাসের পর এখনো আবার প্রতিমাসে একই ধারায় কিভাবে ব্লিডিং হয়! … মানুষের শরীর সত্যিই অদ্ভুত! মেয়েদেরটা আরও বেশি …

ওই তিনমাসে আজকের মতো ‘অযৌক্তিক রাগ’টা নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিলো। হরমোনের অস্বাভাবিকতাটা আমি শরীরের রক্তপ্রবাহের মধ্যেই টের পেতাম, এমন মনে হতো!  তবে, সেই রাগটা কেবল তার প্রতিই প্রকাশিত হতো। কারণ কিছু হলেই আমার ওই অবস্থার কারণ হিসেবে আমি সবসময় তাকেই দায়ী করতাম। কোনোভাবেই এই শারীরিক অস্বাভাবিকতাটা মেনে নিতে পারছিলাম না। আর সেটার মানসিক প্রভাবের কথা তো না-ই বললাম। একদিকে অনুতাপ, একদিকে রাগ, একদিকে ক্ষোভ, একদিকে কাউকে কিছু বলতে না পারা, একদিকে তার অবহেলা, একদিকে তার না বোঝা, আর সেই সাথে শরীরের ভেতর একরকম হরমোনের খেলা বন্ধ হয়ে আরেকরকম হরমোনের খেলা শুরু … ওইসময়টায় তার যে কোনো কথায় বা আচরণে পান থেকে চুন খসারও প্রয়োজন হতো না। যে কোনো সময় চুন খসে পড়তে পারে সেটা মনে হলেই মাথার মধ্যে যেন আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ হতো! আরও খারাপ লাগতো যে আমার এই রাগগুলোতে সে যখন পালটা রাগ দেখাতো। তাকে আমি মাথা ঠাণ্ডা হবার পর বলতাম যে এগুলা হরমোনাল ইমব্যালেন্স-এর কারণে হচ্ছে, একটু সহ্য করে যাও, ব্লিডিংটা বন্ধ হলেই আস্তে আস্তে হরমোনের প্রভাবও কমে যাবে। ওইটুকু সময়ের জন্য সে বুঝতো। তারপর আবার যেই কে সেই! … শেষ পর্যন্ত তো হরমোনাল ইমব্যালেন্স -এর বিষয়টা তার কাছে একটা অজুহাত ছাড়া আর কিছুই ছিলো না! … তার ভাবটা ছিলো এমন যেন তার দোষ ধরা, কিংবা কথায় কথায় তার সাথে রাগ দেখানোই আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এবং কর্তব্য ছিলো!

একদিন আমাকে সে খুব রাগের মাথায় বললো, ছেলেদেরও হরমোনাল ইমব্যালেন্স হয়, সেটা কি বোঝো? এই যে আমার ফ্রাস্ট্রেশন, ডিপ্রেশন ডট ডট ডট… প্রচণ্ড মেজাজ খারাপের মধ্যেও আমার খুব হাসি পেয়েছিলো। … মেয়েদের শরীরে যে হরমোন, আর তার যেই খেলা, একটা ছেলের শরীরে কি তা হয়? … একটা ছেলের শরীরে কিছু পরিমাণ ইস্ট্রোজেন হরমোন ইঞ্জেক্ট করে দিলে কেমন হয়? সেই ছেলেটা কি তখন টের পাবে এই হরমোনটা কিভাবে কাজ করে একটা মেয়ের শরীরে? সেই ছেলেটার কি তখন পিরিয়ড হবে? সেই ছেলেটা কি পিরিয়ডের আগে থেকে যে প্রচণ্ড সেনসিটিভ সময় যায়, সেই সময়টা একটা মেয়ের কেমন লাগে সেটা বুঝতে পারবে? … ‘তার’ শরীরে এই হরমোন ইঞ্জেক্ট করে কি তাকে আমার সেই সময়ের শারীরিক, মানসিক অবস্থার কথা বোঝানো যেতো? … এত এত মেয়ের সাথে সে মেশে, এত এত মেয়ের সাথে সে এত বছর যাবৎ শারীরিক সম্পর্ক করেছে, অথচ একটা মেয়ের শরীর আর মন  কিভাবে হরমোনের নিয়ন্ত্রণে চলে, সেটা বোঝার চেষ্টা করেনি? … আমি নিজের শরীর সম্পর্কে যতটুকু জানি, তার তো আমার চাইতেও আরও অনেক বেশি জানার কথা। আমি তো কেবল আমার নিজের শরীর দেখি, আর তার তো একাধিক মেয়ের শরীর দেখা!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s