দিনযাপন | ১৪০৩২০১৫

মাঝে মাঝেই আমার মধ্যে একপ্রকার উইদড্রয়াল সিন্ড্রোম কাজ করে, আর তখন কোনো ধরণের কাজ করতে ইচ্ছে করে না। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই হোক না কেন, সেটা করার জন্য কোনো মোটিভেশন জাগ্রত হয় না! ইদানীং, এই বিষয়টা আবারো হচ্ছে। যেই কাজই করতে বসছি, খালি মনে হচ্ছে, ‘ ধুর, কি লাভ কাজ করে!’ … তারপরও কাজটা শুরু করছি জোর করে … কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবারো সেই একই চিন্তা, ‘ ধুর, কি লাভ!’ … অতঃপর, হয় মোবাইলে সদ্য ইন্সটল করা ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা শুরু করছি, নয়তো ল্যাপটপে কোনো একটা মুভি ছেড়ে দেখা শুরু করছি। আর, যদি এগুলাও করতে ইচ্ছা না করে, তাহলে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে ঘুম দিচ্ছি! …

যেমন, গত দুইদিন যাবৎ অফিসের একটা আর্টিকেল নিয়েও বসি নাই। আর্টিকেলগুলা পড়েছি, গুগল ডকে ওই আর্টিকেলের নামে ফাইল, ফোল্ডার সব খুলেছি, কিন্তু যখনই লিখতে শুরু করবো, তখনই ওই ‘ ধুর, কি লাভ’ চিন্তাটা লাফ দিয়ে এসে মাথার ওপর গেঁড়ে বসেছে। তার ফল স্বরূপ, গতকাল সারাটা সকাল ক্যান্ডি ক্রাশ খেলে কাটিয়েছি, আর আজকে দেখেছি মুভি। গতকালকে অবশ্য দুপুরের পর থেকে এমনিতেই কিছু দৌড়াদৌড়ি ছিলো। কিন্তু, সকালবেলাটা ঠিকমতো কাজ করে ফেললে আর সমস্যা হতো না। আজকে প্রচণ্ড মাথা ব্যথার কারণে ঘুম থেকে উঠতে উঠতেই প্রায় ১২টা। এর মধ্যে দুইবার ফোন এসেছে, আর ঘুম ঘুম অবস্থায় ফোন ধরতে গিয়ে মাথা ব্যথা আরও বেড়েছে। যাই হোক, তারপর কোনোরকমে উঠে চুলে শ্যাম্পু করে টরে তাও একটু শান্তি মিললো। তারপর যেই ভাবলাম, এইবার কাজটা নিয়ে বসি, তখনই দুনিয়ার আলসেমিতে পেয়ে বসলো আর শুয়ে শুয়ে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুভিটা দেখলাম। অনেকদিন ধরেই মুভিটা ল্যাপটপে রাখা, কিন্তু আমি কখনো দেখি নাই। আজকে আলসেমির কল্যাণে দেখা হয়ে গেলো…

এই মাসে টাকা-পয়সা নিয়ে আমি যারপরনাই প্রচণ্ড ডিপ্রেসড। এই উইদড্রয়াল সিন্ড্রোমের একটা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে এই ডিপ্রেশন আর ফ্রাস্ট্রেশন-এর অনুভূতি। ঘটনা যেটা হয়েছে, আমি তো ভেবেই রেখেছি যে মাস শুরু হলেই অফিসের ২২০০০ টাকা পাবো, সেখান থেকে একজন পাওনাদারকে ১০,০০০ টাকা দেবো, বাকি ১২,০০০ টাকার মধ্যে ৫,০০০ টাকা দিয়ে ভায়োলিন কিনবো, আর বাকি টাকা দিয়ে মাস চালাবো, একটা গ্রিক স্টাইল বেল্টওয়ালা জুতা কিনবো, ‘শিল্প কাহিনী’  বইটা কিনবো, শর্মা হাউজে পাস্তা খাবো, নদী’র কাছ থেকে তিনটা লকেট কিনবো ইত্যাদি ইত্যাদি – এইরকম পাক্কা প্ল্যান করে ফেলেছিলাম। সেই সাথে প্ল্যান ছিলো যে অন্য এক-দুইটা খুচরা কাজ এর থেকে সব মিলায় যে ১৫ হাজার টাকার মতো হবে, সেটা একদম আলাদা করে ব্যাংকে রাখবো, কারণ সামনে ইন্ডিয়া ঘুরতে যাবার একটা প্ল্যান হচ্ছে। তখন ওই টাকাটা লাগবে। কিন্তু হলো কি? জানতে পারলাম যে হিসাব অনুযায়ী আমি অফিসের কাজের আর একটা পাই পয়সাও পাবো না! পুরাই বাঁশ! আর যাই হোক, ধারের টাকাটা তো শোধ করতে হবে! সো, অন্য একটা কাজের চেক ভাঙ্গায় সেখান থেকে টাকা তুলে নিজের জন্য ১০০০ টাকা রেখে বাকি ৮,০০০ টাকা দিয়ে দিলাম পাওনাদারকে, কারণ তাকে আমি পাক্কা কথা দিয়েছিলাম যে তাকে এই মাসে কিছু টাকা দেবোই। ১০,০০০ টাকা দেয়ার কথা, ২০০০ টাকা অনেক বলে কয়ে শেষে মাপ পাইলাম আর কি! … আর, আরেকটা কাজের এখনো ইনভয়েজ-ই তৈরি হয়নি, ওইটার সাইন করা, তারপর চেক তৈরি হওয়া, তারপর টাকা তোলা – সব মিলায় তো মনে হয় এক মাস লেগে যাবে! তো, এখন আমার অবস্থা হচ্ছে যে পকেটে আছে মাত্র ৬০০ টাকা। এবং এইটা যখন তিন/চারদিন পর শেষ হয়ে যাবে, তখন আমি কিভাবে চলবো সেটা আমি জানি না! … টাকা- পয়সার কোনো ব্যাক-আপ নাই, সো আগামী মাস থেকে কিভাবে কি হবে তাও জানি না! …একজনের কাছে ৫০০০ টাকা পাই, আরেকজনের কাছে ১১০০। সেটাই আগামী মাসের সম্বল! …

আমার এখন ‘ আই নিড আ ব্রেক ফ্রম এভরিথিং, ইভেন লাইফ!’ টাইপ একটা মানসিক অবস্থা। এইরকম মানসিক অবস্থায় আমি আগেও পড়েছি, এবং আমার জন্য এই অবস্থাটা কখনোই সুখকর নয়, বিকজ, মোস্ট অব দ্যা টাইম আই এন্ড আপ এসকেপিং ফ্রম দ্যা সিচুয়েশন অ্যান্ড মেসিং আপ এভরিথিং উইথ দ্যা পিপল আই ওয়াজ ওয়ার্কিং’ … আমার এখনও খালি মনে হচ্ছে যে সবকিছু বাদ দিয়ে কোথাও ঘুরতে চলে যাই, একটু রিলিফ পাই সব ধরণের চাপ থেকে!  যেটা আসলে এই মুহুর্তে আমার জন্য একটা পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। কিন্তু সেটা আমি চাই না। … কাজগুলো শেষ করার জন্য একটা মোটিভেশন দরকার। সেটাই পাচ্ছি না। যা পাচ্ছি সবই নেগেটিভ ফোর্স! যেমন, অফিসে গিয়ে কাজ করবো? অফিস হচ্ছে সেই বাড্ডা! যেতে আসতে টাকার খরচের কথা বাদই দিলাম, শরীরের উপর দিয়ে প্রচণ্ড ধকল যায়। পেটে আর কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা করতে থাকে লম্বা সময় বসে থাকতে থাকতে। মাঝখানে ঠিক হলো অফিসের পেছনের যে স্টোরেজ কাম থাকার জায়গা আছে, সেখানে থাকবো, আর সেখান থেকে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসা করবো। কিন্তু, একে তো সেখানে নেট নাই, তারওপর একা একা থাকলেই আমার এখন প্রচণ্ড রকম মানসিক যন্ত্রণা হয়। পরে দেখা গেলো যে একা বাসায় আউট অব ডিপ্রেশন কোনো একটা সুইসাইডাল ইন্সিডেন্ট ঘটায় ফেলসি! ফলে, এক-দুই দিন থাকার পর সেই প্ল্যান বাদ দিলাম। … আর প্রতিদিন সব কষ্ট সহ্য করে অফিসে যদিও বা যাই-ও, সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে আমার ভালো লাগে না। ওয়ার্কিং এনভায়রনমেন্টটাই কেমন জানি বোরিং! আমার ওখানে গেলেই ক্যামন জানি নিজেকে বেমানান লাগে। এই সেম প্রব্লেম আমার হতো যাত্রা’র অফিসে গেলে। যাত্রায় তো সবাইকেই চিনতাম, তারপরও অফিসে গেলেই কেমন জানি মনে হতো যে ‘আমি এখানে মানাই না!’ … ঠিক একই অনুভূতি আমার এই অফিসে গেলে হয়। কেমন জানি সাফোকেটিং লাগে! ভীষণরকম কনজেস্টেড লাগতে থাকে। সানিডেল-এ যখন ছিলাম, সেখানে টিচার্স রুমে সারাদিন একা একা বসে থাকলেও খারাপ লাগতো না, প্রাচ্যনাটে গিয়ে একা একা এক কোণায় বসে থাকলেও সময় কেটে যায়। পরিবেশটাই কেমন জানি নিজের থেকেই এই জায়গাগুলোতে একটা ওয়েলকামিং মুড তৈরি করে। আর তখন কাজ করতেও ভালো লাগে। …

যাই হোক, যেভাবেই হোক, কাজগুলো আমাকে আসলে শেষ করতেই হবে। তারপর ছুটি! … একটা লম্বা ছুটি নেবো … ঘুরতে যেতে চাই কোথাও! … কোথায় যাবো জানি না, কার সাথে যাবো জানি না, কিন্তু ঘুরতে যেতে চাই … গত সেপ্টেম্বর থেকে এই এখন পর্যন্ত একেকটা ঘটনা এমনভাবে মাথায়, মনে, জীবনযাপনে চেপে বসেছে যে আর বেশিদিন এভাবে চললে মনে হচ্ছে দম আটকেই মরে যাবো আমি! …

আমার খুব ইচ্ছা হয় যে এমন যদি করতে পারতাম যে দিগন্তহীন একটা খোলা মাঠে প্রচণ্ড চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে পারতাম! … কিংবা উঁচু একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে গলার সব জোর দিয়ে প্রচণ্ড চিৎকার করে এই দম আটকে আসা অনুভূতিগুলোকে বের করে দিতে পারতাম! … কিংবা সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের গর্জনের সাথে পাল্লা দিয়ে চিৎকার করতে পারতাম … গত কয়েকমাসে আমি অনেক কেঁদেছি, কিন্তু তার পুরোটাই বালিশ ভেজানো কান্না। … প্রচণ্ড চিৎকার করে কেঁদেছিলাম, ওই একটা দিন, একটু সময়ের জন্যই … অনেক অনেক জোরে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে পারতাম যদি, মনের সব ঝাল মিটিয়ে, ক্ষোভ মিটিয়ে, সব অনুতাপ মিটিয়ে … একদিন কোনো একদিন …

এই তো, গত বছরের শুরুর দিকেই আমি একপ্রকার আত্মবিশ্বাস নিয়েই নিজের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করেছিলাম যে ‘ যা কিছুই ঘটুক, আমি আসলে অনেক সুখী একজন মানুষ’ … তার কিছুদিনের মধ্যেই তার সাথে আমার সম্পর্কের শুরু … আমার ক্যামন একটা বিশ্বাস জন্মেছিলো যে আমার ‘সুখী’ জীবনের সুখ বাড়াতেই তার সাথে আমার এই যোগাযোগ! … মনে হচ্ছিলো, জীবনটা মনে হয় এবার সত্যিই স্বপ্নের মতো হয়ে গেলো! … সেজন্যই তার আগমন নিয়ে আমি দ্বিধা করিনি। কিন্তু, তার আগমন যে আমার জীবনে একটা জলজ্যান্ত ঝড় হয়ে আসবে, আর সেই ঝড় যে সবকিছু এভাবে তছনছ করে দিয়ে চলে যাবে, সেটা কি আর তখন কল্পনাও করেছি?! … এখন তার সাথে যোগাযোগের এক বছর আর প্রায় দুইমাস পার করে এসে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া ‘সুখী জীবন’ -টার স্মৃতি রোমন্থন করি! … এই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার আমি ঠিক কতদিনে সবকিছু রিবিল্ট করতে পারবো, আমি তা জানি না …

মনে হয় সুখ-এর মাত্রা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিলো … মনে হয় একটু বেশিই ভালো থাকতে শুরু করেছিলাম … এত ‘সুখ’ কি আর আমার কপালে সয়! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s