দিনযাপন | ১৫০৩২০১৫

চোখ জ্বালা-পোড়া করতে করতেই আজকে সারাটা দিন গেলো। ঘটনার জন্য দায়ী একটা নতুন কাজল। গতকালকে মা কিনে এনেছে আমার জন্য। তো আজকে সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো একটা সুসংবাদ দেয়া ফোনে। খুব ফ্রেশ মাইন্ড নিয়ে উঠলাম। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, আজকে সকালবেলা অন্যদিনের মতো মাথা ব্যথাও ছিলো না। তো এইসব যাবতীয় আনন্দের ঘনঘটায় মনটাও ফুরফুরে একটা ভাব নিয়ে ফেললো। হাতমুখ ধুয়ে এসে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নিজেই ইম্প্রেসড হয়ে গেলাম। গত কয়েকদিন ধরেই আয়নায় তাকালেই নিজেকে খুব অসুস্থ লাগছিলো, অথচ আজকে কি ফ্রেশ লাগছে! … এইসব দেখে মনের আনন্দে ভাবলাম আজকে চোখে কাজল দিয়ে বের হই। যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু, নতুন কাজলটা চোখে দিতেই চোখ প্রচণ্ড রকম জ্বলতে শুরু করলো। বুঝলাম, এই কাজল আমার চোখে সুট করে নাই। কিন্তু সেই কাজল ধুয়ে – মুছেও শান্তি নাই। সেই চোখ জ্বলা বিষয়টা রয়েই গেলো। সারাটা দিন এভাবেই পার করলাম। ফলাফল, নাক ফ্যাচফ্যাচ আর মাথা ব্যথা! … এখন অবধি একই অবস্থা …

এই কাজল দেয়া না দেয়া নিয়ে তার সাথে আমার কত তর্কা-তর্কিই না হতো! তার দাবী ছিলো যে কাজল দিলে মেয়েদের সুন্দর দেখায় , তাই যখনই তার সাথে আমার দেখা হয় সে মনে মনে এক্সপেক্ট করতো যে আমি কাজল দিয়ে সুন্দর করে সেজেগুজে তাকে দেখা দিবো! আর আমার যুক্তি ছিলো যে আমি সারাদিন যেই অবস্থার মধ্যে থাকি কাজ-কর্মের দৌড়াদৌড়ি নিয়ে, তাতে পরিপাটি হয়ে থাকাটাই সম্ভব হয় না, আবার কাজল-টাজল দিয়ে চলাটা তো আরও কঠিন। সে আমাকে বলতো, ‘ আর মেয়েরা কাজে যায় না? তারা সাজে না? তারা কাজল দেয় না?’ … আমি সেই যুক্তি খণ্ডাতে পারতাম না। কিন্তু এটাও তাকে মানাতে পারতাম না যে আমার কাছে সারাক্ষণ অত সাজগোজ করে থাকা ভালো লাগে না, আর আমার ব্যক্তিত্বের সাথে বা কাজের প্যাটার্নের সাথেও সেটা যায় না। কাজল দিতে তো আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু তাই বলে প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়া মানেই কি একদম কাজল দিয়ে, টিপ পরে, চুল বেঁধে পুতুল সেজে বের হতে হবে? … তার বাস্তবতা তো আসলে ওটাই যে মেয়ে মানেই সাজগোজ করে থাকে, চোখে কাজল দেয়, টিপ দেয়, লিপস্টিক দেয়, সালোয়ার-কামিজ পরে, চুল বড় রাখে ইত্যাদি ইত্যাদি। তার পরিবারের মেয়েদেরকেও সে ওভাবেই দেখে অভ্যস্ত, আবার সে যেসব মেয়েদের সাথে আগে প্রেম-টেম করেছে, কিংবা সচরাচর মেশে, এমনকি তার যেই তথাকথিত ‘এক্স’ গার্লফ্রেন্ড, তারাও ওই রকমই। তাদের মধ্যে ‘মেয়েলীপনা’ যত বেশি, আমার মধ্যে হয়তো তার চাইতে অনেক কম। আমার সাথে তাই তার মিলতো না এসব নিয়ে। আমাকে সে মাঝে মাঝেই বলতোও যে ‘ একটু মেয়েদের মতো চলতে পারো না?’ …

আচ্ছা, মেয়েদের মতো চলা মানে কি? … তাকে এই প্রশ্ন করার ‘ধৃষ্টতা’ আমি কখনো দেখাই নি, কারণ তাহলে তার সাথে ‘ফেমিনিজম’ বনাম ‘মেল শভিনিজম’ এর গোলমাল বেঁধে যেতো! অন্তত নিজেকে ‘নারীবাদী’ হিসেবে তার কাছে উপস্থাপন করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিলো না। এমনিতেই যে কোনো কথার পাল্টা যুক্তি দিয়ে কিংবা প্রশ্ন করে আমাকে শুনতে হয়েছে বার বার যে আমি উগ্র, আমার ছাড় দেয়ার প্রবণতা কম কিংবা আমি মুখে মুখে তর্ক করি, আর এরকম উগ্র, তর্ক করা মেয়ে তো তার একদমই পছন্দ না! …

আমি তাকে কোনোদিন উল্টো উত্তর দেইনি যে ‘ এরকম অ্যারোগেন্ট ছেলেও আমার পছন্দ না’ , কারণ আসলে তো অন্যান্য অনেক কারণে তাকে আমার পছন্দই ছিলো। তার নেগেটিভিটিগুলোকেও আমি মানিয়ে নিয়ে চলতে চাইতাম, এবং অনেক বেশি চলতামও। কিন্তু, আর যাই হোক, কেউ বিশ্বাস ভঙ্গ করলে তা তো আমি কখনোই মেনে নিতে পারি না। সে যেই হোক না কেন, আমার যত ভালো লাগার, ভালোবাসার মানুষই হোক না কেন! … আর সেইটাই সে করলো! … আর ওই একটা বিশ্বাস ভঙ্গই এমন উঁচু এক দেয়াল তুলে ফেললো তার প্রতি যাবতীয় বিশ্বাসে, যে আর কখনো মনে হয় আমি তার কোনোকিছুই সত্য বলে সহজে মানতে পারবো না! …

যাই হোক, অ্যালং উইথ দ্যা চোখ জ্বালা-পোড়া, হঠাৎ করেই সেই ফুরফুরে ভাব উড়ে গিয়ে কেমন একটা মন খারাপ করা অনুভূতির দিকে ক্রমাগত ধাবিত হতে হতে দিন আগালো আজকে। ম্যুভিয়ানার মামুন ভাইকে একটা কাজ করে দেবো বলে কথা দিয়েছিলাম। সেটা অনেকটাই আগালাম আজকে। তাও সম্ভব হয়েছে তার শিল্পকলা অ্যাকাডেমির অফিসে গিয়ে কাজটা করার কারণে। বাসায় বসে করতে গেলে সেই উইদড্রয়াল সিন্ড্রোম পেয়ে বসতো আর তারপর কাজটা করাই হতো না। …

এর মধ্যেই দুপুরের পরেই ফেসবুকের কল্যাণে ‘তার’ তথাকথিত ‘এক্স’ এর কিছু ছবি দেখলাম। তার-ই ফটোগ্রাফার সার্কেলের এক বন্ধুর তোলা। সেখানে অবশ্য সে নিজেও ছিলো। হোলির আগের দিন তারা যে চারুকলায় গিয়েছিলো, সেদিনের তোলা আর কি। তো, ওটা তো আমি আগে থেকেই জানি, ওইদিনই দেখেছি তাদের এক বন্ধুর সেলফিতে যে সবার সাথে তারা দুইজনও আছে। … কিন্তু তা সত্ত্বেও মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো! … হতেই পারে তাদের পরস্পরের সাথে যোগাযোগ নেই, এভাবে যে তাদের দেখা হয়ে যায় সেটা আসলেই নিতান্তই ‘কাকতালীয়’ ! আবার হতেও পারে যে আসলে তাদের যোগাযোগ আছে, কিন্তু দুজনেই মিথ্যা বলে যে যোগাযোগ নেই। অন্তত ‘সে’ কিভাবে যোগাযোগ থাকা না থাকার বিষয় লুকায়, সেটা তো আমি নিজেকে দিয়েই জানি! বন্ধুদের কাছে কতরকমভাবে সবকিছু লুকিয়ে চলার বুদ্ধি করা হতো আমাদের! এখন একই কাজ যে সে আরেকজনের ক্ষেত্রে আমার সাথে করবে না, সেটা তো আমি অন্তত তার ব্যাপারে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারি না! …এখন যদি দেখা যায় যে মেয়েটাও মিথ্যা বলে, তাহলে তো বিষয়টা মেনে নেয়া খুব কষ্টকর হবে। কারণ, আমি তো নিজেই মেয়েটাকে তার কথা সব বলেছি! … তারপরও যদি দেখা যায় যে তার সাথে ওই মেয়ের সত্যি সত্যিই যোগাযোগ আছে, তাহলে আমি সম্ভবত সারাজীবনে আর কাউকে কখনোই বিশ্বাস করতে পারবো না! …

যাই হোক, আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো এটা ভেবেই যে , মেয়েটা তো আমাকে বলেছিলো যে সে ‘তার’ পরিচিত সবার সাথে কন্টাক্ট অফ করে দিচ্ছে, যাতে করে তার নিজের কষ্ট কম হয়। অথচ যে মানুষগুলোর সাথে ‘তার’ সারাক্ষণ মেলামেশা, তাদের সাথেই সেই মেয়ের শুধু কন্টাক্ট-ই নাই, এমনকি পহেলা ফাল্গুন হোক, কি হোলি, তাদের সাথে ঘোরাফেরা, আড্ডাবাজি, ছবি তোলাতেও সে উপস্থিত! … সেখানে এমন কি ‘যার’ জন্য সে কষ্ট পাচ্ছে, সেও উপস্থিত! … কি অদ্ভুত ! … এত বছর সাইকোলজি পড়েও এই সাইকোলজি আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে! … কোনটা যে বিশ্বাস করবো, আর কোনটা যে বিশ্বাস করবো না তাই বোঝা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে!

তো, শিল্পকলা অ্যাকাডেমি থেকে বের হলাম সোয়া পাঁচটার দিকে। দুপুরের ওই মেজাজ খারাপটা বিকেল বেলা একা একা রিকশায় জ্যামে বসে সাত- পাঁচ ভাবতে ভাবতে মেজাজ খারাপটা প্রচণ্ড মন খারাপে মোড় নিলো। প্রচণ্ড কান্নাও পাচ্ছিলো। গ্রুপের দিকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কান্না প্রায় গলায় ঠেকে ঠেকে অবস্থা। ভাবলাম গ্রুপে মানুষজনের সাথে গিয়ে গল্প করতে বসলেই মন ডাইভার্ট হয়ে যাবে। কিসের কি! গ্রুপে পৌঁছায় দেখি কেউ নাই, খালি গোপী রিহার্সাল ফ্লোরের এক কোণায় বেঘোরে ঘুমায়। কথা বলার মতো কেউ নেই দেখে মন খারাপের ষোলকলা পূর্ণ হলো। অন্ধকারে এক কোণায় বসে আবারো সেই চিন্তার রাজ্যে ডুব। খুব কান্নাও পেলো আবার। কাঁদলামও কিছুক্ষণ। … কতদিন পর কাঁদলাম! আমার তো মনে হচ্ছিলো আমি কাঁদতে ভুলে গেছি! নাহ, এখনো ভুলি নাই, চোখের পানিও শুকায় যায় নাই! …

ইদানীং আমার আইপডটা অনেক মিস করি। রাস্তায় বের হলেই গাড়ির এত শব্দ, আমার অস্থির লাগতে থাকে। … আইপডটা তো চুরিই হয়ে গেলো। চাঁদনী চক  মার্কেট থেকে ব্যাগ খুলে নিয়ে গেলো! মজার বিষয় হচ্ছে, যে চোর ব্যাগ খুলে আইপডটা নিয়েছে, সে মোবাইল মনে করেই নিশ্চয়ই সেটা নিয়েছে। ওটা দেখতে তো মোবাইলের মতোই ছিলো। আমার কত পছন্দের ছিলো আইপডটা। অ্যালেনের কাছ থেকে কিনেছিলাম প্রায় ৫ বছর আগে। ১২০ জিবি স্টোরেজ ছিলো ওটার! … কতরকমের গান যে শুনতাম! … তবে, হ্যাঁ, যেদিন আইপডটা চুরি হলো ওইদিন তবু একটা ব্যাপারে আমি অনেক ভাগ্যবান ছিলাম। তার জন্মদিনের উপহার হিসেবে কেনা ঘড়ির প্যাকেটটাও সেদিন আমার হাতেই ছিলো। কি মনে করে সেটা ব্যাগে রাখিনি। সেটা যদি আমি ব্যাগে রাখতাম, তাহলে তো সেটাও চুরি হয়ে যেতো! … ফসিল কোম্পানির ঘড়ি! কি যে সুন্দর একটা ঘড়ি! তার অনেক শখ ছিলো ঘড়িটার। জন্মদিনেরও প্রায় ৫ মাস আগে আবদার করেছিলো ঘড়িটা তার চাই … আমিও কথা দিয়েছিলাম, তাকে সেই ঘড়ি কিনে দেবো জন্মদিনে … ঠিক যেটা পছন্দ, সেটা পাই না পাই না, পরে এক জায়গায় পেলাম। কত কাহিনী করে অর্ডার দিয়ে ঘড়িটা আনিয়েছিলাম, আর সেই ঘড়ির টাকা জোগাড় করতে গিয়েও কত ধার-দেনা! … ঘড়িটা চুরি হয়ে গেলেই তো সব শেষ হয়ে যেতো! … ঘড়িটার দামও কি কম ছিলো নাকি! ষোলো হাজার টাকা! …

যাই হোক, ওসব এখন অতীত। এতদিনে সে নিজেও হয়তো ভুলেই গেছে এত কিছু! ঘড়িটা কে দিয়েছে সেটাও হয়তো ভুলে যাবে কয়েকদিন পর! সে তো সবই ভুলে যায়! … আমি যে কেন তার মতো সব কিছু ভুলে যেতে পারি না! … আমার স্মৃতিশক্তি যে কেন এত ভালো, বুঝি না! …

সে সব কথা বাদ! আপাতত, আমার জন্য এখন জরুরি হচ্ছে যে আমার একটা গান শোনার যন্ত্র দরকার! … কিন্তু চাইলেই কি আর তা পাওয়া যাবে? আচ্ছা, গান না হয় মোবাইলে নিলাম, কিন্তু, হেডফোন তো লাগবে! সেটাই বা পাবো কিভাবে? টাকা কই যে একটা ভালো হেডফোন কিনবো? … ধার করা ভায়োলিনটার বো ভেঙ্গে গেছে সেদিন, একটা বো কিনতে হবে – সেটাই কিনতে পারছি না, আবার হেডফোন! … দুইদিন পর বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা ভাড়াই দিতে পারবো কি না, সেটাই তো এখনো জানি না! …

টাকার একটা গাছ থাকলে কি হতো? … যখন খুশি নাড়া দিতাম আর টাকা ঝরে পড়তো! …

দিনযাপন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে! … দিনযাপনে একটু আনন্দ চাই … ভালো লাগা চাই … ভালোবাসা চাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s