দিনযাপন | ১৬০৩২০১৫

মানুষ কি অদ্ভুত অদ্ভুত সব কমপ্লেক্স নিয়ে চলে! … গত কয়েকদিন ধরেই আশেপাশের কিছু মানুষের মধ্যে এই কমপ্লেক্স -এর বিষয়টা খুব বেশি করে চোখে পড়ছে। কি তাদের কথায়, কি তাদের আচরণে! … খুব মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি … সিনিয়ার-জুনিয়ার কমপ্লেক্স, এর বন্ধু- তার বান্ধবী কমপ্লেক্স, এই দল – ওই দল কমপ্লেক্স, আমি মেয়ে – তুমি ছেলে কমপ্লেক্স, এ কি পেলো – ও কি পেলো না কমপ্লেক্স, তুমি আমার – আমি তোমার কমপ্লেক্স … কতরকমের যে কমপ্লেক্স! … আমার নিজের মধ্যেও যে কোনো না কোনো কিছু নিয়ে কমপ্লেক্স নাই তা না … সেটা আবার কাউকে দেখাই, কাউকে দেখাই না! … আমরা মানুষ জাতটাই কেমন অদ্ভুত! কেমন জটিলতায় ভরা! … পশু-পাখি হতে পারলেই তো ভালো ছিলো! … কোনোরকম কমপ্লেক্স-এর বালাই নাই … পশু – পাখি হলে তো সব জায়গাতেই একরকম থাকা যায় … মানুষ হয়েই যত ঝামেলা ! … এটা বলা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এর সাথে মিশবো না, ওর সাথে কথা বলবো না, অমুকের জন্য সব মাপ, তমুকের পান থেকে চুনটাও খসে পড়তে পারবে না! … একদিন যদি এমন হতো যে মানুষের মন থেকে সব কমপ্লেক্স উঠে গেছে, তাহলে ক্যামন হতো মানুষের আচরণ? … আমার খুব ইচ্ছা হয় সেটা দেখতে! … কি লাভ এত রকমের কমপ্লেক্স মনের মধ্যে পুষে রেখে? … দিনশেষে তো ‘ অল উই আর জাস্ট ডাস্ট ইন দ্যা উইন্ড!’ … সেই যে ক্যানসাসের ‘ডাস্ট ইন দ্যা উইন্ড’ গানের কথাগুলো! প্রত্যেক মানুষের জীবনে তো সেগুলোই ধ্রুব সত্য! …

আচ্ছা, আমি যেভাবে প্রতিদিন খুল্লাম খুল্লা মনের সব কথা দিনযাপনে ঢেলে দিচ্ছি, সেভাবে যদি প্রতিদিন প্রতিটা মানুষ তাদের মনের কথা লিখতো কিংবা বলতো, এবং সবাই যদি সবার এই কথাগুলো পড়তো বা জানতো, তাহলে কি মানুষে মানুষে রেষারেষি, হানাহানি, কুটনামী, ভুল বোঝাবুঝি এইগুলা আরও বাড়তো? নাকি কমতো? … মানুষের মাথা তো মানুষই খায়! …

সেভেজ গার্ডেন-এর একটা গান আছে না, ‘ আই ওয়ান্ট টু লিভ লাইক অ্যানিম্যাল/ কেয়ারলেস অ্যান্ড ফ্রি লাইক অ্যানিম্যাল…’ …

কিন্তু হায়! এমন ধারা জনম আমার মানুষ হইয়া রে! …

আজকে আমাদের ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি নাটকটার শো ছিলো। এই নাটকটা আমার মন খারাপ করায় দেয়। কেমন ভারী হয়ে থাকে মন মেজাজ! কেমন জানি একটা মন খচখচ করা অনুভূতি! নাটকটার পরতে পরতে কেমন সব পরিচিত আবেগের গন্ধ! …

প্রায় দেড় বছর আগে প্রথম যখন এই নাটকটা পড়েছি, তখন আপ্লুত হয়েছি এর লেখকীতে, এর ভিজুয়ালাইজেশনে! নাটকটা পড়তে গেলে এক একটা ঘটনা যেন চোখের সামনেই ঘটে, একদম চলমান একটা সিনেমার মতো মনে হয়! তারপর যখন আস্তে আস্তে নাটকের কাজের সাথে ইনভল্ভড হলাম, তখন তো এর নির্দেশনার ভাবনা, একের পর এক দৃশ্যের বুনটের সাথে সাথে নাটকের আবেগের জায়গাগুলোর সাথে আরও বেশি করে সূত্রবন্ধন হলো … এই নাটকের এক একটা লাইনের ভেতরে আরও কত কত অদৃশ্য লাইন আবিষ্কার করলাম! এক একটা দৃশ্যকল্পের ভেতরে আরও কত কত দৃশ্যকল্প’র দেখা পেলাম! … কিন্তু, সেগুলো কৌশলগত সবকিছু ছাপিয়ে একটা পর্যায়ে এসে এই নাটকের তারাভান চরিত্রটার সাথে আমার বাস্তবিক কেমন একটা মানসিক যোগাযোগ তৈরি হয়ে গেলো! কীভাবে কীভাবে আমার জীবনের গত একবছরের বিভিন্ন আবেগীয় ঘটনাচক্র আমাকে তারাভানের আবেগের সমান্তরালে নিয়ে আসলো! এমনিতে দেখলে, তারাভান চরিত্রটার সাথে কোনোকিছুতেই আমার মিল নেই! সে গ্রামের মেয়ে, লেখাপড়া জানে না, বয়ঃসন্ধি পার হতে না হতেই বিয়ে হয়ে গেছে, তারপর ঘটনাচক্রে সে ঢাকা শহরে এসে গার্মেন্টসে কাজ করে নিজের জীবন চালাচ্ছে, প্রথম স্বামী পাগল, আর দ্বিতীয়বার বিয়ে হবার আগের দিনই সে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিটি ধসে পড়ার ঘটনায় মারা গেছে … একেবারেই জীবনযাপনে তার সাথে আমার জীবনযাপনের কোনোকিছুর সংযুক্তি নেই! কিন্তু তার যে আবেগ, আর তার আবেগের যে ধরণ, একটু সুখের জন্য তার যে আকুতি, তার যে স্বপ্ন দেখার ধরণ, যেভাবে সে এক একটা সুখ হাতের মুঠোয় পেয়েও আবার হারিয়ে ফেলে, তার যে শারীরিক তৃষ্ণা, তার যে মানসিক যন্ত্রণা, সেগুলোতে তার সাথে আমার কি গভীর অন্ত্যমিল! … আমি অনেক যুক্তি খণ্ডন করেছি নিজের মধ্যেই যে এটা হয়তো আমার একটু বেশিই ভাবা হয়ে যাচ্ছে –  সিমিলারিটির জায়গাটা আসলে অতো আহামরি না, যতটা আমি আত্মস্থ করছি! কিন্তু, যতই দিন গিয়েছে, যতই নাটকের বুননের সময় নির্দেশকের ব্যাখ্যা শুনেছি, নিজে নিজে ঘটনাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি ততই আমি আরও গভীরভাবে এই মিলগুলো খুঁজে পেয়েছি! … আমার তো মনে হয় যে আমি যদি ভালো অভিনয় করতাম, কিংবা যদি এই নাটকের চরিত্রের সাথে যাওয়ার মতো চেহারা, ফিগার এসব যদি আমার থাকতো, তাহলে হয়তো আমি এই তারাভান চরিত্রটা অনেক ভালো ফুটিয়ে তুলতে পারতাম! কারণ অন্তত এই চরিত্রের আবেগের জায়গাটা আমাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হতো না, সেটা আপনা থেকেই আসতো! …

এখন দলের যে দু’জন তারাভানের চরিত্রে অভিনয় করে, তাদের ব্যক্তিগত আবেগের অভিজ্ঞতা কেমন আমি বিস্তারিত জানি না, কিন্তু তারাভানের আবেগীয় অভিজ্ঞতার সাথে তাদের সেসব অভিজ্ঞতার তেমন মিল নেই বলেই মনে হয়। সে কারণেই তারাভান চরিত্রটা তাদের ধারণ করা, আত্মস্থ করা নয়। অভিনয়টা তাদের মগজ থেকে হয়, ভেতরের মোচড় দেয়া কোনো কষ্টের অনুভূতি থেকে নয়, কিংবা আবেগের কোনো অন্ত্যমিল থেকে নয় … তারাভানের জন্য তাদের সহমর্মিতা থাকতে পারে, কিন্তু সমবেদনা নয়। … নিজের জীবন থেকে যে চরিত্র ধারণ করা যায়, সে চরিত্রের উপস্থাপনা তখন অনেক বাস্তব হয় … তখন আর তাকে অভিনয় মনে হয় না … দুঃখের ডায়ালগ আছে বলেই অভিনয় ক্ষমতার গুণে দুঃখের গভীরতম এক্সপ্রেশন দিয়ে তো চোখ ছলছল করে ফেলাই যায় ;  কিন্তু সত্যি সত্যি যখন অভিনেতার ভেতর সেই দুঃখবোধ থাকে, তখন কি হয়? …

এই নাটকের শো হলেই আমার ভেতরে কেমন উতলাভাব কাজ করে, কেমন জানি আনমনা হয়ে থাকি। রিহার্সাল হোক, কিংবা শো, পারফর্মারদের সাথে সাথে, বিশেষ করে তারাভানের সাথে সাথে আমিও মনে মনে ডায়ালগ আউরাই। কিন্তু, একটা পর্যায়ে এসে প্রচণ্ড আনমনা হয়ে যাই। একটা সময় পর আর আমার ডায়ালগ আওড়ানো হয় না, আমি তখন আনমনা হয়ে গিয়ে কিছু জিনিস নিয়ে ভাবতেই থাকি, ভাবতেই থাকি … আজকেও তো ভাবতে ভাবতে একটা প্যাঁচ লাগায় ফেললাম … প্রজেকশনে হেল্প করার জন্য জার্নাল ভাইয়ের পাশে বসে ছিলাম। ওই যেই সময় আনমনা হয়ে গেছি, তখনই জার্নাল ভাই কি জানি বললো, আমিও কি জানি কি উত্তর দিলাম, একটা ভিডিও-র কিউ আসার আগেই সেটা ছেড়ে দিলো জার্নাল ভাই। পরে বুঝলাম, জার্নাল ভাই জানতে চাচ্ছিলো যে ডায়ালগ কিউটা কি, আর আমি হঠাৎ অন্যমনস্কতা ভেঙ্গে কিছু বুঝে উঠবার আগেই বলে দিলাম যে ‘এই যে এইটাই’ … ব্যাস! ভিডিও-ও চালু হয়ে গেলো! মাঝখান দিয়ে পারুর আর তিন চার লাইন বলাই হলো না! … হায় রে! আমি যদি ভিডিও চালাই কখনো, তাহলে তো আনমনা থাকতে থাকতে ওই কিউ চলে যাবে, কিন্তু ভিডিও আর চালানোই হবে না বোধহয়! …

তবুও ভালো যে এখন আর আমার প্রথমদিকের মতো বুক ফেটে কান্না আসে না … একটা সময় পর্যন্ত রিহার্সালই হোক, আর শো-ই হোক, তারাভান চরিত্রের সাথে আবেগের অন্ত্যমিলের ওই জায়গাগুলা আসলেই আমার অনেক কান্না পেতো … রিহার্সালের সময় কাঁদতে পারতাম না, কিন্তু শো এর সময় অন্ধকারে বসে থাকার সুযোগ নিয়ে কাঁদতাম …

এখন কান্না সামলাতে পারি … কিন্তু মনের ভারী বোধটা সহজে যায় না … বড় বড় দীর্ঘশ্বাস পড়ে … দীর্ঘশ্বাস ! …

আচ্ছা, যে শব্দগুলো আমাদেরকে মানসিকভাবে বিরক্ত করে, দুঃখ উগরিয়ে দেয়, যা যা ভুলে থাকতে চাই তার সবকিছুই মনে করিয়ে দেয়, সেই শব্দগুলো কে মিউট করে দেবার কোনো ব্যবস্থা থাকলে কেমন হতো? … ধরা যাক, ‘লাল’ শব্দটা শুনলেই কারো জীবনের অনেক অনেক কিছু মনে পড়ে যায়, এবং এই শব্দটা তার কাছে রীতিমতো ত্রাস। সেকারণে, যখনই ‘লাল’ শব্দটা কোনো বাক্যে থাকে, সেখানে ওই শব্দটা মিউট হয়ে যায়। কিংবা, যেখানেই এই শব্দটা লেখা থাকে, সেই জায়গাটা ঝাপসা হয়ে যায়! … তাহলে ওই শব্দটাও তাকে দেখতে বা শুনতে হতো না, আর তার বুকের মধ্যে কষ্টগুলোও মোচড় দিয়ে উঠতো না …

মস্তিষ্কের যে অংশটায় স্মৃতি ধারণ করা থাকে, সেখানে বিশেষ অপারেশন করে কোনো নির্দিষ্ট কিছুর স্মৃতি নাশ করা যায় না কেন? … নাকি যায়? … আই উইশ যে এরকম করা যেতো! … তাহলে আমি কতকিছুই না ভুলে থাকতে পারতাম! …

Advertisements

One response to “দিনযাপন | ১৬০৩২০১৫

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s