দিনযাপন | ১৮০৩২০১৫

কেউ দেখা হলে যদি বলে আপনার/ তোমার/ তোর দিনযাপনের লেখাগুলো পড়ছি। ভালো লাগছে পড়তে। … তখন আমারও অনেক ভালো লাগে। আমি তো নিতান্তই নিজের খেয়ালের বশেই লিখছি, তাও ৯৫ শতাংশই নিজের কথা, নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা, নিজের একান্ত দুঃখকষ্ট, হাসি-আনন্দের কথা … তারপরও কেউ যখন প্রতিদিন সেই লেখাগুলো পড়ে, আর পড়ে যদি তাদের ভালো লাগে, তাহলে আমার কি আর ভালো না লেগে উপায় আছে? … আমি তো খুশিতে গদগদ হয়ে যাই! …

গতকাল লেখা হয়নি। বাসায় ছিলাম না। …গতকালকের দিনযাপন বাদ পড়লো । পড়লোই বা! … কালকে অমন গান-বাজনা, আড্ডাবাজির মধ্যে কি আর দিনযাপন নিয়ে লিখতে বসতে ইচ্ছে করে? … না হয় একদিন না-ই লিখলাম!

আবারো একটা আড্ডাবাজির রাত গেলো … একটা অনেক সুন্দর রাত। মাতাল হয়ে মনের ভেতর জমে থাকা অনেক কথা উগড়ে দেবার রাত। … যখন কথাগুলো বলেছি, হাউমাউ করে কেঁদেছি, তখন সামনে কে ছিলো, কে শুনলো, কাকে বললাম সেসব কিছুই তখন মাথায় কাজ করেনি… নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে, মনকে হাল্কা করতে হবে, সেটাই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মনে হচ্ছিলো … জানি না, কে শুনলো, কে জানলো, কে কি-ই বা বুঝলো! … কিন্তু, এরকম একটা রাতের আসলেই আমার প্রয়োজন ছিলো …

গতকালকের বিশেষ ঘটনা বলতে কিছু আসলে নাই-ও। দলবেঁধে চাইনিজ একটা দলের নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। প্রতিটা কথার শেষে ‘মিয়াঁও’ টাইপ সংযুক্তি শুনতে শুনতে শেষের দিকে কেমন মনোটোনাস লাগতে থাকলো! এমনিতেই তো ‘চিং চাং’ ছাড়া আর কিছুই বুঝিনা, তাও প্রজেকশনে সাবটাইটেল দিয়ে দেবার কারণে কাহিনী বুঝলাম। কিন্তু ওই একই মিয়াঁও মিয়াঁও সুরের কথা আর কতক্ষণ শোনা যায়? … তবে, পারফর্মারদের সেট, প্রপস আর মিউজিকের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজেশন দেখে মুগ্ধ হলাম। …

আজকে রাতে শাহবাগ থেকে বাসায় ফেরার পথে এক মহা রোমান্টিক রিকশাওয়ালা পেলাম। তার ‘বিশেষ একজন’-এর জন্য সে অনেকগুলা গোলাপ কিনে রিকশার সিটে গুঁজে রেখেছে! …ভাষা ছিলো সাথে, ওর সাদা শাড়ি, সেখানে ফুলের দাগ লাগার ভয়। আবার ফুলের ওপরও তো বসা যাবে না…তাই, ফুল যাতে নষ্ট না হয়ে যায়, আবার কাপড়েও যাতে দাগ না লাগে, সেজন্য আসার সময় সেই ফুল আবার হাতে করে নিয়ে রাখলাম। ফুলের পাওনাদারের জন্যই কি না জানি না, রিকশাওয়ালা দেখলাম হেভি এক্সাইটেড! প্রায় ঝড়ের বেগে সে আমাদের শাহবাগ থেকে সেন্ট্রাল রোড পৌঁছে দিলো!

আজকের দিনের একটা ভালো লাগার ঘটনা সাউথ আফ্রিকার সেমি ফাইনালে ওঠা। এ যাবৎকাল পর্যন্ত তো ক্রিকেটে ওয়ার্ল্ড কাপ-এর নক আউট পর্ব মানেই সাউথ আফ্রিকার বাদ পড়া! … সেই ফাঁড়া এবার কাটলো … সেই যে ১৯৯২ সালে ১ বলে ২১ রানের ‘ হাসবো না কাঁদবো’ পরিস্থিতি দিয়ে এদের ফাঁড়া শুরু, সেই যে ১৯৯৯ -এ অস্ট্রেলিয়ার সাথে জেতা ম্যাচটা শেষ মুহুর্তে এসে টাই হয়ে কি সব ওলটপালট ঘটে যাওয়া! … কি ডাই হার্ড ফ্যান ছিলাম একসময় সাউথ আফ্রিকার। হান্সি ক্রোনিয়ে, শন পোলক, জন্টি রোডস, জ্যাক ক্যালিস, মার্ক বাউচার, ল্যান্স ক্লুজনার … সাউথ আফ্রিকা জিতলে এমন খুশি লাগতো যেন মনে হতো আমি নিজেই খেলেছি! তাই এই জয়ে এত আনন্দ! … আর হারলে তো মনে হতো যে আমার টিম হেরেছে, আমি জিততে পারিনি, তাই কাঁদতে কাঁদতে শেষ হয়ে যাচ্ছি! … কি বাঁধভাঙ্গা আবেগ ছিলো সবকিছুতেই! কি জেতায়, কি হারায়! … এখন এমনিতে খেলাই দেখা হয় না, কেউ জিতলো কি হারলো সে খবরও রাখা হয় না … বিশ্বকাপ হলে তাও একটু খোঁজখবর রাখা হয়, আর এবার বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, তাই বিশ্বকাপ নিয়ে মনোযোগটাও একটু বেশি পড়ছে। আজকে সাউথ আফ্রিকার খেলাও বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখা হলো অনেক অনেক বছর বাদে …

সাউথ আফ্রিকার ‘নক আউট’ -এর ফাঁড়া কেটেছে, এটাই খুশির বিষয়। এবার সেমিফাইনাল-এর ফাঁড়াটা কাটলেই হয়। সাউথ আফ্রিকা ফাইনালে উঠতে পারলে আবারো বাঁধভাঙ্গা আনন্দ হবে নিশ্চিত! …

আজকে আরেকটা জিনিস নিয়ে এরকম একটা ভাবনা আসলো যে আমাদের চলা-ফেরা আর কাজকর্মের মধ্যে ইদানীং যে অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে তার প্রায় অনেকটাই আসলে এই শহরে ভয়াবহ রকমের বিশৃঙ্খল ট্রাফিক সিস্টেমের জন্য। এলিফ্যান্ট রোড থেকে মিরপুর যেতে কিংবা সেখান থেকে সেন্ট্রাল রোড ফিরতে যদি রাস্তাতেই দেড় ঘণ্টা করে সময় পার হয়ে যায়, বাসে করে শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাব আসতে যদি কারো প্রায় আধাঘণ্টার ওপর সময় পার হয়ে যায়, তাহলে কিভাবে কি! শাহবাগ থেকে হেঁটে আসলেও তো সায়েন্স ল্যাব পৌঁছতে বড়জোর পনেরো মিনিট লাগে। সেখানে বাসে চড়লে তো দুই মিনিট লাগার কথা। কিন্তু, এই শহরে বাস্তবতা ভিন্ন। এই শহরে রাস্তায় বেড় হওয়া মানে জীবন থেকে অযথাই কিছু সময় হারিয়ে ফেলা। এরকম যখন হয়, তখন মানুষ কি করে? অপেক্ষা করে! রাস্তা শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করে, সময় দ্রুত কেটে যাবার জন্য অপেক্ষা করে! উদ্দেশ্যহীন অপেক্ষা আর ব্যস্ততাহীন অপেক্ষার চেয়ে পেইনফুল তো আর কিছু হতে পারে না। আমাদের এই ঢাকা শহরে বেশিরভাগ মানুষকেই এভাবেই অপেক্ষা করতে হয়। কেউ রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে বসে কোথাও পৌঁছানোর অপেক্ষা করে, আবার কেউ রাস্তার পাশের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কারো পৌঁছানোর অপেক্ষা করে। কিন্তু দুইপক্ষের অপেক্ষা কিন্তু একটা বিন্দুতেই – ‘ এই যাত্রা কখন শেষ হবে?’ … যেমন, আজকে সায়েন্স ল্যাবে প্রায় মিনিট চল্লিশ-এর মতো আমাকে একজনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমি নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে বাসা থেকে বের হয়েও এই অপেক্ষার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পারি নাই। তো, দাঁড়ায় দাঁড়ায় সময় কাটানোর জন্য আমি ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম এগুলা দুই/তিনবার করে ঘেঁটে-ঘুঁটে একই জিনিস দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা শুরু করলাম। সেখানে একটা লেভেল পার হবার জন্য পর পর পাঁচটা লাইফও শেষ করে ফেললাম, তারপর আবার ইন্সটাগ্রামে একটা ‘মিনহোয়াইল’ সিরিজের ছবিও পোস্ট করলাম। সেটা পোস্ট করার আগের মিনিট পাঁচেক সেটার প্রসেসিং-এর পেছনেও দিলাম। তো এত সবকিছু করার পরও যখন অপেক্ষা শেষ হয় না, তখন দাঁড়ায় দাঁড়ায় রাস্তার মানুষ, বাস, গাড়ি, রিকশা, দোকানপাট দেখতে শুরু করলাম। … এই ঢাকা শহরে ট্র্যাফিক সিস্টেমটা যদি এমন বলিহারি না হতো তাহলে আমাদের জীবনটাও কত রিলাক্সিং থাকতো। ১০ মিনিটের একটা কাজের জন্য স্রেফ দাঁড়ায় থেকে জীবন থেকে ১টা ঘণ্টা চলে যেতো না … গাড়ি-রিকশা-মানুষে শহরটা এত গিজগিজ করতো না …

রাস্তায় বের হলেই এখন আমার কেমন জানি অস্থির লাগে … কেমন জানি খেই হারায় ফেলছি এমন মনে হয়! …

তবে, যত যাই হোক, শহরের এক উষ্ণতম দিনে আজকে একপশলা বৃষ্টি আবহাওয়া কেমন ঠাণ্ডা করে দিয়েছে … আহা বৃষ্টি! … আমি বৃষ্টি দেখেছি … বৃষ্টির ছবি এঁকেছি … কিন্তু কতকিছুই অমন করে ঘটে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি …

তবুও, আমার আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামে নি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s