দিনযাপন | ২০০৩২০১৫

আমার একটা সমস্যার কথা বলি। সমস্যাটা হতে পারে আমার পরিপক্বতার অভাবে, কিংবা পারিবারিক শিক্ষার কারণে, কিংবা ‘দুনিয়ার সব ভালো’ এরকম একটা ভোঁদাই টাইপের বুঝদারিত্বের কারণে … সমস্যাটা হচ্ছে এরকম যে সবসময়ই সবকিছুর ব্যাপারে আমার ইম্প্রেশন থাকে এমন যে ‘দুনিয়াতে সবকিছুই একদম একটা সরল নিয়মে চলে’। এই মনোভাবটা একদমই অবচেতনে কেমন যেন অটোমেটিকভাবেই মনের মধ্যে চলে আসে। যেমন ধরা যাক, রিকশা বা সিএনজি ঠিক করবো কোথাও যাবার জন্য। সাধারণভাবে এটাই হবার কথা যে যাত্রী যেখানে যেতে চায়, সেখানেই যে কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চালক যাত্রীকে নিয়ে যাবে। যাবে কি যাবে না – এই প্রশ্নের তো অবকাশই থাকার কথা না। কিন্তু আমাদের দেশে রিকশাওয়ালা/ সিএনজিওয়ালা এদের মর্জি মতোই আমাদের ভাগ্যে রিকশা বা সিএনজি মেলে। তাদেরকেই আমরা প্রশ্ন করি, ‘যাবেন?’, বলি না যে, ‘দাঁড়ান, অমুক জায়গায় চলেন’… তো, এটা তো প্রতিদিনের ঘটনা। তারপরও বাসা থেকে বের হয়ে যখনই রিকশা ডাকতে যাবো, মনের মধ্যে প্রথম ইম্প্রেশনটাই থাকবে যে ‘ যাত্রী যেখানে যেতে চায়, সেখানেই তো রিকশা/ সিএনজি নিয়ে যাবে! ‘যাবো না’ বলার অবকাশ তারা কিভাবে পায়!’

তো, যেটা হয় যে, আমার এইসব বিবেচনাবোধ অনেকটা পশু-পাখি স্তরের। … যেমন, কি হয়? সূর্য তো প্রতিদিনই পূর্বে ওঠে আর পশ্চিমে অস্ত যায়, গ্রহ- নক্ষত্র প্রতিমুহুর্তেই একদম নিয়ম মেনে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে, প্রকৃতির সবকিছুই কেমন একটা নিয়মের মধ্যে বাধা, সবকিছুই কেমন ‘অবভিয়াস’! … তো আমি সবসময়ই এটা ভুলে যাই যে এতরকম নিয়মতন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে নিয়মহীন হচ্ছি আমরা মানুষেরা! … নাহ! নিয়মহীন বলা ঠিক হলো না! আমাদের আসলে প্রত্যেকেরই একেকটা করে নিয়ম আছে  – আমার নিয়ম, তোমার নিয়ম, এর নিয়ম, তার নিয়ম … আর সেকারণেই কারো সাথে কারো নিয়মে মেলে না! সৃষ্টির সেরা হবার কারণে যে এইটুকু ‘হ্যাটমগিরি’ আমাদের মধ্যে তৈরি হতেই পারে এটাও আমি ভুলে যাই। …

যাই হোক, এই নিয়মমাফিক সবকিছু চলা না চলা নিয়েই আজকের দিনের হাইলাইট …

আজকে সন্ধ্যায় নাটক দেখতে গেলাম, ভারতীয় নাটক, ‘ দ্রোপদী’। টিকিটের রাশ হবে ধারণা করে আগে থেকেই ১৫ জনের জন্য টিকিট বুকিং করা ছিলো। টিকিট হাতে পেয়ে দেখলাম আমার আর সন্ধির দুই বন্ধুর টিকিট পড়েছে আলাদা সারিতে। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলাম যে দলছুট হয়ে যেতে হবে তিনজনকে। একবার ভাবলাম সন্ধির সাথে টিকিট পাল্টে নিয়ে ওদের তিনজনকে একসাথে দিয়ে দেই। পরে ভাবলাম যে ব্যাপারটা কেমন স্বার্থপরের মতো হয়ে যায়! তাই আর বললাম না। ও নিজে থেকে বললে না হয় একটা কথা ছিলো! … তো, যাই হোক, হলে ঢুকে দেখলাম যে আমরা শুধু দলছুটই হবো না, পাশের সারির একদম কোণায় গিয়ে বসতে হবে। দোষটা কিঞ্চিৎ হল ম্যানেজমেন্ট-এর ভলান্টিয়ারদের। সাধারণত যেটা হয়, মানে, প্রাচ্যনাটে আমরা যেটা করি যে, একটা সারির ভেতরের দিক থেকে দর্শক বসানো শুরু হয়, যাতে করে যারা লাইনে পরে থাকে তারা বাইরের দিকে বসার সুযোগ পায়। এতে করে কেউ যদি নাটকের মাঝখানেও আসে, তাকে আর পাহাড় বাইবার মতো করে সবার সামনে দিয়ে কষ্ট করে যেতে হয় না। এখানে দেখলাম যারা লাইনে আগে ছিলো তারা সবাই বাইরের দিকের সিটগুলোতে বসেছে আর যারা পরে আসছে তারা সেই পাহাড়-পর্বত বেয়ে ভেতরের দিকে যেতে হচ্ছে! … অথচ টিকিটের ওপরে কিন্তু সিট নাম্বারও দেয়া আছে, যেটা মেইনটেইন করা হচ্ছে না মোটেই। যেমন, আমাদের যে ১৫টা টিকিট, তার প্রথম ১২টা হচ্ছে এক সারিতে, আর বাকি তিনটা পাশের সারিতে। আগের সারিতে শেষ টিকিট হচ্ছে ৩২৮, আর আমাদের তিনজনেরটা হচ্ছে ৩২৯, ৩৩০, ৩৩১। তো, স্বাভাবিকভাবেই বাইরের দিকের প্রথম তিনটা চেয়ার আমাদেরই হবার কথা। ১৫ জন একসাথে টিকিট কেটেছি, একসাথেই বসবো সেটাই তো স্বাভাবিক! দেখলাম যে হল ম্যানেজমেন্ট-এর মানুষজনের সেটা নিয়ে আসলে বিকার নেই। তাদের কথা, ‘ কি করবো বলেন? অলরেডি বসে গেছে তো!’ … এর আগের দিনও চাইনিজ নাটকটা দেখতে গিয়ে একই সমস্যা হয়েছে। আমরা ৬ জন একসাথে একলাইনে বসে যাবার পর দেখা গেলো ভুল লাইনে বসিয়েছে। ওই লাইনে যাদের বসবার কথা তারা আসার পর লাগলো ক্যাচাল। হল ম্যানেজমেন্ট-এর ভলান্টিয়াররা দেখি নির্বিকারভাবে বলে ‘ ভুল হয়ে গেছে আর কি! এখন আর কি করবো বলেন! একটু ম্যানেজ করে নেন!’ … আজকেও একই অবস্থা দেখে আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। একপ্রকার জিদই উঠলো যে বসলে একসাথেই সবাই বসবো। ফাইজলামি নাকি! দলবেঁধে এসে শেষে তিনজনকে এভাবে দলছুট হয়ে নাটক দেখতে হবে কেন?…

এদিকে যেই তিনটা সিটের দাবীদার আমরা, সেখানে যারা বসেছিলেন, তারা আবার আমাদের দলের অনেকের পরিচিত। আমি অবশ্য চিনতাম না। তো,  যেহেতু পরিচিত মানুষই ওই সিটগুলোতে বসেছে, তাই আমাদের দলের অন্যরাও আমার এই একসাথে বসার ব্যাপারটাকে ‘ ঠিক আছে … বাদ দাও … বসে গেছে এখন আর কি করা যাবে … তোমরাই তো দেরি করে আসলা…’ টাইপের অ্যাটিচুড দেখায় ম্যানেজ করে ফেলতে বললো। আমার তখন গেলো আরও মেজাজ খারাপ হয়ে। মনে হচ্ছে যেন একসাথে দলবেঁধে বসতে চেয়েছি এই বিষয়টাই তাদের কাছে হাস্যকর আবেগ মনে হচ্ছে! … এর চাইতে তো তাইলে নিজেরা নিজেরা এসে টিকেট কেটে নিতাম, একেকজন একেক জায়গায় বসতাম তাই ভালো ছিলো। …

গজগজ করতে করতে নাটক দেখতে বসলাম …

নাটক দেখতে বসেও আরাম নাই। সামনে বসছে এক বাচ্চা, সে খালি ঘ্যান ঘ্যান করেই যাচ্ছে যে ‘ এত গোলাগুলি কেন? … আমার ভয় লাগে! … ওরা কি করছে ? …  ‘ , পেছনের ভদ্রলোক রানিং কমেন্ট্রি দেয়ার মতো নাটকের লাইন বাই লাইন বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন তার বউকে, পাশের ভদ্রলোক ক্রমাগত খসখস আওয়াজ করে পা নাড়াচ্ছেন। এক পর্যায়ে না পারতে ভদ্রলোককে বলতে বাধ্য হলাম ‘ ভাই আপনার পা নাড়ানো বন্ধ করেন। ডিস্টার্বড হচ্ছি!’ … আর পেছনের আরেক ভদ্রলোক নাটকের মাঝখানে হল কাঁপিয়ে হাঁচি দিলেন!…আর প্রকট রিংটোনে এর তার মোবাইল বেজে ওঠার কথা তো বলাই বাহুল্য!

এত্ত সুন্দর একটা নাটক। রুদ্ধশ্বাসে দেখার মতো ! যেমন তার শিল্পীদের অভিনয়, তেমনই নাটকের ডিজাইন! যেখানে এই নাটক আমার খুব আরামদায়ক একটা জায়গায় বসে খুব মুগ্ধ বিমোহিত হয়ে দেখার কথা, সেখানে একেকবার আমার বিমোহন অবস্থার ইন্টেরাপশন হইলো আশেপাশের যত বিরক্তিকর পরিস্থিতির জন্য। …

নাটক শেষ হবার সাথে সাথেই আমার মনে হলো মেজাজ ঠাণ্ডা করতে হলে এই দৃশ্যের মধ্যেই আর থাকা যাবে না। কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে গেলাম। ভাবলাম গ্রুপে যাই। … অর্ধেক রাস্তা গিয়ে মনে হলো, ‘কোনো মানে হয় না!’ … তারপর সোজা বাসা! …

সকালবেলা থেকেই নাটকটা দেখতে যেতে একদমই ইচ্ছা হচ্ছিলো না আমার ! ভাষাকে দুপুরবেলা বলছিলামও যে গ্রুপেই যাবো সন্ধ্যা সময়। কিন্তু বিকেলে ঘটনাচক্রে শিল্পকলাতেই যাওয়া হলো, আর শিল্পকলায় যখন গেছিই তখন মনে হলো নাটকটা তাইলে দেখেই যাই। …

কেন যে দেখবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম! … এর চেয়ে গ্রুপেই যেতাম। মেজাজটাও ঠাণ্ডা থাকতো …

আজকে আব্বুর জন্মদিন। মন মেজাজ খারাপ থাকার কারণ হিসেবে তো সেটাই যথেষ্ট ছিলো, এত কিছু ঘটে মেজাজ আরও খারাপ হবার কি কোনো দরকার ছিলো? …

আমার কেন জানি মনে হয় দাদুর সাথে আব্বুর ঠিক যেমন মান-অভিমান ছিলো, কথা-বার্তা বন্ধ ছিলো, যেমন করে ১৫টা বছর পার হয়ে যাবার পরও তারা দুজন কথা বলে নাই, আমার আর আব্বুর ক্ষেত্রেও হয়তো সেরকমই হবে। আব্বুর সাথে আমার এখন একটাই কথা হয়, বাসা থেকে বের হবার সময় তাকে শুধু বলি, ‘ দরজাটা লাগিয়ে দিও’। তাও প্রায় না শোনা যায় এমন কণ্ঠে বলি সেটা। … এমনিতে তার সাথে আমার আর কোনো বিষয়ে কোনো কথা হয় না। … এখন এত এত অনুবাদের কাজ করি, এত এত লেখালেখি করি, অথচ আব্বুকে লেখাটা দেখিয়ে আর ঠিক করিয়ে নেয়া হয় না! … একটা ইংরেজি লেখা ঠিক করাতে এখন আমার বাইরের ইংরেজি জানা কাউকে ধরতে হয়, অথচ এতকাল যাবৎ ইংরেজি লেখার সবচেয়ে ভালো সম্পাদক হিসেবে আমার কাছে আব্বুর চেয়ে ভালো কাউকেই মনে হয়নি … এখনো হয় না! …

আমার ইংরেজি শেখা তো তার কাছ থেকেই! … এই যে এত ফটর ফটর করে ইংরেজি বলে ফেলি, কিছু হলেই দুই কলম ইংরেজি লিখে ফেলতে পারি কিংবা এই যে অনুবাদের জাহাজ হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন … এগুলা সবই তো তার কাছ থেকেই শেখা! …

আবার সব নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোও আমার তার কাছ থেকেই পাওয়া! … আমার মায়ের সাথে আমার কেবল চেহারাতেই মিল, আর আচার-আচরণের  সবকিছুই আব্বুর মতো! …

আমি ঠিক তার মতোই রাগ পেয়েছি, তার মতোই অভিমান পেয়েছি, তার মতোই সবকিছু ‘সরল নিয়মে’ চলবে বলে ভাবতে শিখেছি। … একই রকম মনোভাবের দুইটা মানুষের মধ্যে যখন মান-অভিমান হয়, তখন কি আর সেটা সহজে মেটে? … আব্বু আর দাদুর ক্ষেত্রে তো মেটেনি, কারণ তারা দুজনেই ‘হার স্বীকার না করা’ মানুষ ছিলো, আর তাই কেউই কখনো কারো কাছে হার মেনে নিতে পারেনি… যত কষ্টই পাক না কেন, যতই দুঃখে-কষ্টে বুক ছিঁড়ে যাক না কেন, পারেনি! … একই ভাবে এখন আমার আর আব্বুর কথা হয় না! … সেখানে কি আর আলাদা কিছু হবে? … আমিও তো ‘হার স্বীকার না করা’ কিসিমের মানুষ! … শত হলেও আমি তো আমার ‘বাপ কা বেটি’! …

আমার মনে হয়, খুব কষ্ট পেয়েছিলো বলেই হয়তো দাদুর অভিশাপ লেগেছে যে তার ছেলেকেও একই কষ্ট ভোগ করতে হবে! আর তারই ফলস্বরূপ হয়তো আব্বুর জীবনেও একই ঘটনা ঘটলো … আমার তো আর কখনো বাচ্চা-কাচ্চা হবে কি না আমি জানি না, হলে হয়তো আমার ওপরও আমার বাবার একই অভিশাপ পড়বে … আমার মাও আমাকে সবসময় বলে, ‘ তোর ঠিক তোর মতোই একটা মেয়ে যেন হয়! তখন তুই টের পাবি কীভাবে জ্বালাস তুই!’ …

আগে যখন এমন বলতো, আমি বলতাম ‘ সে সম্ভাবনা নেই! কারণ আমি তো বাচ্চাই নিবো না!’ … আর এখন আমার মনে হয় মা’র কথাটাই সত্য হোক! … তাহলে তো একটা বাচ্চা অন্তত হবেই! …

কি যে হবে জানি না! … ভালো লাগে না এগুলো ভাবতে …

আমার ফ্যামিলিতে আমার এমনই ‘হার্টলেস’ ইমেজ যে কান্না এলেও আমার কাঁদবার অধিকার নাই! … আমি হচ্ছি এখানে এমন একজন মানুষ যে সবকিছুই থোরাই কেয়ার করে চলে! … ভেতরে হৃদয়টা যদি পুড়ে ছাইও হয়ে যায়, তবুও সেই অগ্নিকান্ড অন্তত বাসার কাউকে দেখানো যাবে না! …

… এই স্বভাবটাও আমার বাবার কাছ থেকেই পাওয়া! … দাদু যখন মারা যায়, তখন অবধি তাদের দুজনের কথা হয়নি! … আব্বু তাকে দেখতে যায়নি … আমাদেরকেও যেতে দেয়নি … আমরা কেউ আব্বুর চোখে পানিও দেখিনি … হয়তো সে আড়ালে কেঁদেছে! … কিংবা কাঁদেনি! …

কে জানে কি! …

আজকেও জন্মদিনের কোনো আয়োজন হয়নি … কেক কাটা হয়নি, ফুল আনা হয়নি … কিন্তু, প্রথম প্রহরেই তাকে মনে মনে শুভ জন্মদিন জানিয়েছি আমি … তাই বা কম কি! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s