দিনযাপন | ২১০৩২০১৫

মাঝে মাঝেই একটু ঝামেলায় পড়ে যাই যে দিনযাপনের লেখাটা কীভাবে শুরু করা যেতে পারে! … এই যেমন আজকে ! … আজকের দিনের ঘটনার ব্যাপ্তি আসলে খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সেটাকে এক-দুই কথায় আবার লিখেও ফেলা যাবে না! … আর এটা শুরু করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো চমকপ্রদ পয়েন্ট-ও নেই। … ফলে, আজকের লেখাটাকে কীভাবে সূত্র টানা যায়, সেটা ভাবতে ভাবতেই রাত আড়াইটা বেজে গেলো। অন্যদিন এমন সময়ে ‘দিনযাপন’ পোস্ট করে আমি অলরেডি ঘুম! … আজকে একদিকে যেমন ঘুমও আসছে না, তেমনি দিনযাপনও লিখছি দেরী করে।

আজকের দিনের লম্বা সময় গেলো একটা ওয়ার্কশপে। ইনফ্যাক্ট, গতকালকেও এই ওয়ার্কশপের কাজ ছিলো। পারফরমেন্স আর্ট-এর ওপর এই দুইদিনের ওয়ার্কশপ। ফ্রেঞ্চ এক মহিলা কো-অর্ডিনেট করেছেন। গতকাল দুপুর থেকে বিকাল এর সেশন ছিলো, আর আজকে সকাল থেকে দুপুর। কেমন জানি একটা খাপছাড়া টাইপের ওয়ার্কশপ মনে হইলো আমার কাছে! … খুব বেশি এঞ্জয় করার মতো কিছু পাইনি। পরিচিত কয়েকটা মুখ ছিলো, মহিলার কথাবার্তা ইন্টেরস্টিং ছিলো, যা যা করিয়েছেন সেই এক্সারসাইজগুলোও বেশ ভালো লাগার মতোই ছিলো … কিন্তু ইন টোটাল, গত দুইদিন মিলায় আমার ইম্প্রেশনটা খুব ‘ওয়াও! কি একটা ওয়ার্কশপ করে ফেললাম’ টাইপ হলো না! …

সে যাই হোক, এই ওয়ার্কশপের পারফরমেন্স ট্যুর হিসেবে আজকে একটা এক্সারসাইজ ছিলো যেখানে একজনের চোখ বন্ধ থাকবে, আর একজন গাইড হয়ে তাকে হাত ধরে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়াবে। এর মাঝে মাঝেই আবার সেই গাইড যা দেখছে, সেটা চোখ বন্ধ করা ব্যক্তিকেও মাঝে মাঝে চোখ খুলতে বলে দেখাবে। এভাবে ‘চোখ খোলো’ , ‘ বন্ধ করো’ করতে করতে সেন্সরি এক্সপেরিয়েন্স-এর একটা এক্সারসাইজ আর কি! … গতকাল বিউটি বোর্ডিং-এ যখন এই এক্সারসাইজটা প্রথম করালো, তখন অনেক ইন্টেরেস্টিং মনে হয়েছে। আজকে সেটারই এক্সটেনশন হিসেবে মোটামুটি আধা ঘণ্টা ধরে এই চোখ বন্ধ করে হাঁটতে হাঁটতে আশেপাশের বিভিন্ন দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, মানুষ, গাড়ি ইত্যাদি সেন্স করার কাজ করা হয়েছে। …

তো, আজকের জায়গাটা ছিলো কার্জন হল। এমনিতেই পরিচিত জায়গা। আমার চোখ বন্ধ করে হাঁটার সময়টাতে বেশ গভীর একটা নস্টালজিক জার্নি হয়েছে। আমার পার্টনার যে ছিলো তাকে অবশ্য আমার বেশ বিরক্তই লাগলো। একে তো তিনি ইন্সট্রাকশন ঠিকমতো শুনেন নাই, তার মধ্যে দেখলাম যে উনার আসলে এই কাজটা করার খুব একটা গরজও নাই! … একটু হেঁটেই রেস্ট নিতে চান, সিগারেট খেতে চান! তো, উনার কথা না ভেবে আমি আসলে আমার নিজের মতো করেই হাঁটাটা এঞ্জয় করা শুরু করলাম। আমি ধরে নিলাম যে আমি ছবি তুলতে বেড় হয়েছি, আর একটু পর পর চোখ খুলে এক একটা কম্পোজিশন ক্লিক করবো! তো, একেকটা জায়গায় চোখ খুলে যে দৃশ্য দেখলাম, মনে মনে তার একটা ছবি তুলে নিলাম। এই মনে মনে ছবি তুলতে গিয়েই নস্টালজিক হয়ে গেলাম। মনে হলো, যা যা দেখছি সেগুলো যদি সত্যি সত্যি ছবি তোলা যেতো! … রোদ, ছায়া, গাছপালা, রঙ সব মিলিয়ে কিছু কিছু দৃশ্য এত সুন্দর ছিলো যে আমার মনে হচ্ছিলো বার বার যে আমার ক্যামেরাটা থাকলে আমি আগামীকালকেই আবার যেতাম সেখানে এবং দুপুরের কড়া রোদের কড়া ছায়ায় তৈরি হওয়া সুন্দর দৃশ্যগুলোকে ফ্রেমে বন্দি করে আনতাম! … একবার মনে হলো এই এক্সারসাইজ শেষ করে যখন লাঞ্চ ব্রেক দেবে, তখন আরেকবার নিজের মতো ঘুরে ঘুরে মোবাইলেই কিছু ছবি তুলে নেব। কিন্তু সেটা আর করার সুযোগ পাওয়া গেলো না। যখন ফ্রি হয়েছি, ততক্ষণে আলো পড়ে গেছে! …

এই ক্যামেরা বস্তুটাকে আমি ইদানীং যারপরনাই মিস করি। ছবি তোলার মতো এত ঘটনা চারদিকে! এই যে সামনে ২৪, ২৫, ২৬ একটানা অনেকগুলা প্রোগ্রাম আছে, আর সেগুলার ছবি তোলার জন্য যে আমার মন আঁকুপাঁকু করছে, ক্যামেরা পাবো কই? … তিনদিনের জন্য আমাকে নিজের একটা ভালো ক্যামেরা ধার দিয়ে খালি হাতে ঘুরে বেড়াবে এমন মহান বন্ধু তো আমার কেউ নাই এখন! …

এখনও আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে আমার ক্যামেরাটা চুরি গেছে! যদি নষ্ট হোয়ে যেতো, তাও বোধহয় দুঃখ হতো কম! চারটা বছর ওই ক্যামেরাটা আমি ব্যবহার করেছি। আমার কত কত স্মৃতি ওই ক্যামেরায় ধারণ করা। আমি যদি কখনো নতুন ক্যামেরাও কিনতাম, তাও তো ওই ক্যামেরাটা বাসায় রেখে দিতাম স্মৃতি হিসেবে। … কি যে হইলো! যেদিন ক্যামেরা হারালো, ওইদিন কিনু কাহারের থেটারের শো ছিলো, আর শো শেষে আমি গিয়েছিলাম পান্থপথ, ‘তাকে’ টাকা দেয়ার জন্য। শিল্পকলা থেকে ওই পুরোটা রাস্তা ব্যাগটাকে সাবধানে আগলে ধরে ছিলাম কারণ ব্যাগের মধ্যে ক্যামেরা, ল্যাপটপ, কয়েকটা কস্টিউম … আর ওই রাস্তাগুলো নির্জন, তাই ছিনতাইয়ের ভয়ও বেশি! … অত লম্বা রাস্তা চলে গেলাম, কিছু হলো না। পান্থপথে দাঁড়ালাম মোটে পাঁচ মিনিট। তখন সে আমার সাথে ‘টাকা’, ‘খাওয়া’ আর ‘থাকা’ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে কোনো কথা বলে না। সো, আমি নির্দিষ্ট যেখানে সবসময় দাঁড়াতাম, সেখানে দাঁড়ালাম, ফোন পেয়ে সে আসলো, বিনা বাক্য ব্যয়ে হাত বাড়ায় টাকা নিলো, তারপর চলেও গেলো। আর আমি মনে মনে ‘বালটা আমার’ বলে তাকে একটা গালি দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা ঠিক করলাম। মাঝপথে কেবল দুইমিনিটের জন্য গ্রিন রোডের এক দোকানে দাঁড়িয়ে কিউবি’র কার্ড কিনেছিলাম। তখনও ব্যাগ থেকে মানিব্যাগ বের করেছি, আর স্পষ্ট খেয়াল আছে ব্যাগের চেইনও সব ঠিকঠাক মতোই লাগানো। ওই কার্ড কেনার দোকান  থেকে বাসা পর্যন্ত দূরত্ব হবে মিনিট পাঁচেক। কি মনে করে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামালাম না, ওভাবেই রিকশায় বসলাম।ওখান থেকেই কেউ টার্গেট করেছিলো কি না জানি না! বাসার সামনে এসে ভাড়া দেবার জন্য টাকার ব্যাগ বের করবো বলে যখন ব্যাগটা সামনে এনেছি তখন দেখলাম ক্যামেরা যেই চেম্বারে ছিলো সেই চেইনটা হাঁ করে খুলে আছে, আর ল্যাপটপের চেম্বারটাও খোলা। ল্যাপটপটা আছে, কিন্তু ক্যামেরাটা নেই! প্রচণ্ড শক খেলে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে একদম পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়, আমারও তখন ঠিক সেরকম হয়েছিলো! ‘এভাবেই কেন?’ টাইপের একটা চাপা আর্তনাদ টের পাচ্ছিলাম ভেতরে, কিন্তু সেটার এক্সপ্রেশন ছিলো একদম নির্বাক! …

এখনও পর্যন্ত ওই নির্বাক অবস্থা আমার কাটেনি! … আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না যে চলন্ত রিকশায় ব্যাগের চেইন খুলে এভাবে কেউ আমার ক্যামেরা চুরি করে নিয়ে গেছে! …

প্রথম ‘তাকে’ই আমি জানিয়েছিলাম ক্যামেরা চুরির কথা, যেহেতু মাত্রই তার সাথে দেখা করে ফেরার পথেই ঘটনাটা ঘটলো। তার এক্সপ্রেশন ছিলো লাইক, ‘ ওহ! কি আর করবা!’ … ভাবটা ছিলো এমন যে আমি এভাবে ক্যামেরা, ল্যাপটপ নিয়ে চলি, দোষ তো আমারই বেশি! … প্রচণ্ড মন খারাপ করে ‘তাকে’ আমি রাতে একটা বড় মেসেজ পাঠিয়ে লিখেছিলাম যে ক্যামেরাটা আমার কত প্রিয় ছিলো আর সেটা হারিয়ে আমার কত খারাপ লাগছে । তার উত্তর ছিলো একটা শব্দ, ‘ হুম’ … আচ্ছা, প্রচণ্ড অপছন্দের কারো যখন কোনো বিপদ হয়, সেটার খবর যদি সে আমাকে বলে, আমি তো তার বিপদের কথা শুনে মোটেও রিলাক্টেন্ট থাকবো না তাই না? মন থেকেই তো তার কোনো একটা ক্ষতির জন্য আমার খারাপ লাগবে, এবং সেই খারপ লাগাটা আমি তার কাছে প্রকাশও করবো। অথচ যার সাথে দেখা করতে গিয়ে আমার এই বিপদ, যে কিনা আমার সাথে টাকা হোক আর শরীর হোক, যে কোনো একটা কারণে সম্পৃক্ত, তার আদৌ এইরকম একটা ঘটনায় কিছু যাবে আসবে না? … এমনকি সে একটু সিম্প্যাথিও জানাবে না? … আমার সাথে কেউ দেখা করতে এসে তার যদি কোনো মূল্যবান জিনিস চুরি যেতো, তাহলে তো আমার নিজের মধ্যেই অপরাধবোধ হতো যে আমার কারণেই তার হয়তো এমনটা হলো! কারণ আমার সাথে দেখা করার জন্য না আসলে তো আর তাকে অত রাতে ওভাবে ওই রাস্তায় ফিরতে হতো না! …

তবে হ্যাঁ, তার কিছুদিন পর সে আমাকে মাঝে মাঝে তার ক্যামেরা দিতো ছবি তোলার জন্য। সে তার ব্যক্তিগত জিনিস নিয়ে ওভার-প্রটেক্টিভ, তাই আমার আসলে তার কাছ থেকে ক্যামেরা নিতে অস্বস্তিই লাগতো। কিন্তু এক একটা সময় উপায় না পেয়ে তার ক্যামেরাই নিতে হতো। অবশ্য, একটা সময় বিভিন্ন ঘটনার পর সে হয়তো আমার প্রতি তার কেয়ার দেখানোর জন্যই ক্যামেরা দিয়ে আর ফেরতও চাইতো না। … একটা সময় বিভিন্ন কথাপ্রসঙ্গে যখন আমি তাকে বললাম ক্যামেরাটা আমাকে দিয়ে দিতে, বিনিময়ে তার কাছ থেকে আমি যা টাকা পাই তা মাফ, সে আমাকে ক্যামেরা দিলো না, বরং কয়েকদিনের মধ্যেই ওই ক্যামেরা বিক্রি করে দিলো! … ওই ক্যামেরা বিক্রির টাকা থেকে কিছু টাকা আবার সে আমাকেও দিয়েছিলো, ‘ধারের কিছু অংশ শোধ’ হিসেবে ! …

হয়তো বা এখানে অপমানিত বোধ করার কোনো যুক্তি নেই, কিন্তু আমার খুব অপমান করার মতো লেগেছিলো ঘটনাটা! … আমার তো টাকার চাইতে ক্যামেরাটাই বেশি দরকার ছিলো, কারণ আমি ছবি তোলার জন্য মুখিয়ে ছিলাম! নতুন ক্যামেরা কেনার টাকা তো আর আমি চাইলেই জোগাড় করতে পারছি না এখন! … যাই হোক, তার ক্যামেরা, তার চিন্তা, তার সিদ্ধান্ত ! … আমি তো এখানে কিছু বলার অধিকার রাখি না! …

আমার প্রচণ্ড কষ্টের জায়গা এটাই যে, ঠিক যে মুহুর্তে মনে মনে পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম যে সামনে ফটোগ্রাফির অনেকগুলা কাজ করবো, ঠিক তখনই জনৈক চোর আমার ক্যামেরাটা নিয়ে গেলো! …

এখন ফলাফল – আমার ফটোগ্রাফি বন্ধ। মোবাইলে যতটুকু পারি ছবি তুলি, মাঝে মাঝে একজন-দুইজন এর কাছে ক্যামেরা চাই যখন খুব দরকার হয়। আর সেসময় মনে হয় যে যতটা কষ্ট করে দশজনকে ফোন করে একজনের কাছে ক্যামেরা পাওয়া যায় তার চেয়ে ছবি না তুলে থাকাটাই ভালো! …

চোখের সামনে দিয়ে কত কিছু ঘটে যায়, কত মুহুর্ত চলে যায়, কিন্তু ছবি তোলা হয় না! …

ক্যামেরা আদৌ কবে কিনতে পারবো জানি না। টাকা-পয়সার তো কোনো সংস্থান নেই, যেটা আলাদা করে ‘ক্যামেরা ফান্ড’ হিসেবে জমাবো! টুকটাক ফ্রি-ল্যান্স অনুবাদ করে যা পাচ্ছি তার অর্ধেকের বেশিই তো ধার শোধ করতে করতে চলে যাচ্ছে! … সেদিন শিল্পকলার গেটে দাঁড়িয়ে মজা করে বলছিলাম যে ‘ ঢাকা শহরে আমি যে হাজার-পনের শ’ মানুষকে চিনি প্রত্যেকে যদি মিনিমাম ৫০০ টাকা করেও দেয়, তাহলেও আমার ক্যামেরা কেনার অর্ধেক টাকা উঠে যাবে, আর বাকিটা আমিই না হয় ম্যানেজ করলাম!’ … সবাই সেটাতে তাল দিয়ে পাল্টা মজাও করলো যে ‘ করেন তাইলে!’ ‘ ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে ফেলেন আজকেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি … কত সহজে আমরা আমাদের কষ্ট নিয়ে জোকস করতে পারি! … অত সহজে যদি কষ্টগুলা আসলেই দূর হয়ে যেতো, তাহলে কি আর চিন্তা ছিলো? … এমনও মানুষ আমারই পরিচিত আছে যে বা যারা মোটেই প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার না, অথচ নিকন ডি ৮০০ -এর মতো ক্যামেরা গিফট পায়, আর আমাকে এখন যদি এই ক্যামেরা কিনতে হয় তাহলে মোটামুটি ভিক্ষা করে টাকা যোগাড় করতে হবে! ধার করেও পোষাবে না! …

ঈশ্বরের বসবাস আসলেই ভদ্র পল্লীতেই বোধ করি … যাকে দেন দুই হাত ঢেলে দেন, আর যাকে দেন না, কিছুই দেন না! … কিংবা এমনই অল্প অল্প করে দেন যে সেটাতে আসলে পোষায় না! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s