দিনযাপন | ২৩০৩২০১৫

আজকের দিনযাপন নস্টালজিয়ায় পরিপূর্ণ …

দাদু বাড়ির এলাকায় গেলেই আমি নস্টালজিক হয়ে যাই। যে বাসাটা আগে খুব সুন্দর একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি ছিলো, সামনে খোলা একটা বড় বারান্দা কাম উঠান ছিলো, সেই বাড়ির জায়গায় এখন সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট উঠছে। সম্পত্তির ভাগাভাগির ফলাফল আর কি! তো, সেই সাততলা বাড়ি উঠতে সাত বছর না লাগলেও মোটামুটি তিন/চার বছর লেগে গেলো! অবশেষে এখন বাড়ির কাজ এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে যে ঠিকঠাকভাবে কাজ হলে মোটামুটি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সব কমপ্লিট! … বাড়ির কাজ কমপ্লিট হয়ে গেলে সবকিছু নিয়ে শিফটিং হয়ে যাবে মিরপুর! একদিকে নিজেদের বাড়িতে থাকার সুবিধা পাবো, আর অপরদিকে সবকিছু থেকে একরকম ডিটাচমেন্ট তৈরি হবে! …

তবে ডিটাচমেন্ট-এর সমাধান একটা আছে, ধানমণ্ডি এলাকায় একটা ঘাঁটি তৈরি করা! মানে মাথা গোঁজার ঠাই আর কি! …

তো যাই হোক, আপাতত শিফটিং -টাই মহাচিন্তার বিষয়! একে তো জিনিসপত্রের বহর অনেক, তার ওপর ওই বাসায় অন্তত জায়গা অনুপাতে জিনিসপত্র সাজানোর কাজটা খুবই সূক্ষ্ম বুদ্ধি এবং সময় প্রয়োগের বিষয়! … কি যে হবে সামনে বুঝতে পারছি না! … অবশ্য আপাতত সেটা নিয়ে ভাবতেও বসছি না! … একধরনের ভাবনা তো মাথায় আছেই, সেটা সময় এলেই ইমপ্লিমেন্ট করা যাবে! …

নস্টালজিয়া প্রসঙ্গে আসি …

দাদুর লেখা বইগুলো আবার একটা-দুইটা প্রকাশনী , বিশেষ করে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র আবার নতুন করে ছাপাচ্ছে। আজকে সেরকম চারটা বই পেলাম দাদীর কাছ থেকে। আমাদের বাসায় দাদুর লেখা বইগুলো আবার নতুন করে জমছে। ইনফ্যাক্ট, আমার কাছেই জমছে। দাদুর ওপর প্রচণ্ড রাগ থেকে আব্বু একদিন বসে বসে দাদুর লেখা যত বই বাসায় ছিলো সব টেনে টেনে ছিঁড়ে, বস্তায় করে সেই ছেঁড়া পাতাগুলো নিজের হাতে রাস্তায় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসেছে! … সেটাও প্রায় বছর ১৫ আগের কথাই! … পরে আমি নিজে যেখানে যে বই পেয়েছি, সেগুলো কিনে কিনে জমিয়েছি। … দাদুর অনুবাদ করা গ্রিস ও ট্রয়ের উপাখ্যান -এর একদম প্রথম এডিশনটা যে কি সুন্দর ছিলো দেখতে! নীল একটা কাভার, তাতে কালো কালিতে ট্রয়ের ঘোড়া আঁকা … বইটা ছোটবেলাতেই অনেকবার পড়েছি। গ্রিক মিথলজির প্রতি আগ্রহও ওই বই পড়েই … ওই বইটার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের এডিশনটা পরে কিনেছি, কিন্তু ওই নীল কাভারের বইটা তো আর কোথাও পাইনা! …

দাদুকে আমার কখনোই খুব ভালোভাবে পাওয়া হয়নি। দাদু জিনিসটা কি সেটা বুঝবার জন্য যে হইহই-রইরই টাইপ একটা মেলামেশা থাকে, দাদু বাড়িতে যাওয়া আসা থাকে, সেটা ছোটবেলায় যখন অনেক হয়েছে, তখন কিছুই বুঝতাম না। যখন থেকে বুঝতে শুরু করেছি, তখন থেকে দূরত্বের শুরু। আর তারপর তো অনেক বছর কেটে গেলো, কিন্তু বাবা-ছেলের মান ভাঙ্গলো না। ২০০৫ এ একবার দাদু এসেছিলো বাসায়। বয়সের ভারে যতটা না, মানসিক যন্ত্রণাতেই তার চেয়ে অনেক বেশি কাবু ছিলো। আব্বু সামনে চুপ করে বসে ছিলো, কোনো কথা বলেনি। দাদু চোখ ছলছল করতে করতে চলে গিয়েছিলো। …

চাচা-ফুপু-কাজিন এইসব সম্পর্কের সাথে আমার পরিচয় প্রায় নাই বললেই হয়। শুধু অস্তিত্ব আছে এই সম্পর্কগুলোর, কিন্তু মেলামেশায় নাই … আমরা একেকজন কাজিন তো এমনও আছি যে জন্মের পর থেকে এখনো পর্যন্ত চেহারাই দেখি নাই! … শুধু জানি যে অমুক চাচাতো বোন, চাচাতো ভাই … ছোটো চাচাও তো বেঁচে নেই। সে বেঁচে থাকলে হয়তো এই বাড়ির কাজের উছিলায় তার সাথে, চাচির সাথে আর ভাইবোনগুলার সাথে দেখা হয়ে যেতো … ছোটো চাচা বিষয়টাও আসলে আমার অভিজ্ঞতায় বা স্মৃতিতে বেশ সংক্ষিপ্ত! … ছোটবেলার ছবিতে আর দুয়েকটা স্মৃতিতে সে আছে, আর অন্যথা সেও একজন অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই না! … এমনকি সে যখন মারা গেছে, তখনও আমাদের কারো যাওয়া হয়নি! … আমার বাবা তার বাবার মৃত্যুতেই টলেনি, আর ভাই তো ভাই-ই! …

আমার মামা-খালাদের দিকেও যে আমার খুব হই-হুল্লড় করে মেলামেশা হয় তা না। মামাদের মধ্যে একজনের চেহারা দেখিনাই বহু বছর। আরেকজনের সাথে দেখা হয় কালেভদ্রে। এই যেমন গতকাল বড়মামা বাসায় এসেছিলো। সে যখন আসলো, তখন আমি ঘুমে, আবার আমি যখন ঘুম থেকে উঠে বেড় হয়ে গেলাম, তখন সে ঘুমে! ফলে দেখাও হলো না, কথাও হলো না। অবশ্য বড় মামা এবং তার মেয়ে ফেসবুকে আছে, এবং আমার যে কোনো পোস্টে তারা  নিয়মিত লাইক দেয়! … একমাত্র খালাদের সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আর যত আহ্লাদিপনা! বড় খালা একা মানুষ। খালুও মারা গেছেন, তার বাচ্চা-কাচ্চাও নাই। আমি আর আমার ভাইকে সেই ছোটবেলায় দেখা-শোনা করতো, আর এখন করে ছোটোখালার মেয়েকে। আমরাই তার বাচ্চা-কাচ্চার মতো, কলিজার টুকরার মতো। ছোটোখালার মেয়েটার বয়স ছয় বছর। কিন্তু তার সাথেই আমার যত খেলা-ধুলা, হাসিঠাট্টা! সেও আমার ন্যাওটা। আমার কাছে সেও আমার কলিজার টুকরার মতো। … ওর জন্মের পর পর আমি প্রায়ই বলতাম যে আরেকটু বড় হলে ওকে আমি আমার কাছে নিয়ে আসবো আর ‘আমার দ্বিতীয় ভার্সন’ বানাবো! … যতই দিন যাচ্ছে সে আমার কলিজার টুকরা না, আরও বেশি কিছু হয়ে যাচ্ছে! …

আচ্ছা, মানুষ কি আগে থেকেই টের পায় তার জীবনে কি হবে? … কোনো একটা ভাইব কি কাজ করে? … অদৃশ্য কোনো ভাইব? … আমার যদি আর কখনো বাচ্চা-কাচ্চা না হয়, তাহলে এই পিচ্চিটাই তো সব আদরের ভাগীদার হবে! … এই অদৃশ্য ভাইব থেকেই কি ওকে আমি ঠাট্টাচ্ছলে সবসময় আমার কাছে নিয়ে আসতে চেয়েছি? …

বড় খালু মারা যাবার পর থেকে তো এই পিচ্চিই আমার বড় খালার সব … তাকে অবলম্বন করেই বড় খালা সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করে … আমি সেখানেই বা ভাগ বসাই কেমন করে? …

মিরপুরের বাসাটা হয়ে যাক, সেটার জন্য আমার একটাই লোভ – সবাই মিলে একসাথে থাকতে পারা! … আমার ছোটো ফুপুর বাসা দাদু বাসার ঠিক পরের গলিতেই, খালার বাসাও মিরপুরেই – আমাদের ওই বাসা থেকে ১০ মিনিটও দূরত্ব না … আমাদের ওই একই ফ্ল্যাটে ছোটো চাচি থাকবে, দাদী থাকবে। ফলে, মিরপুর চলে গেলে এতদিন পরে হলেও আমি একটা ‘সবাই মিলে মিশে থাকা’ ফ্যামিলি পাবো! … এইরকম একটা ফ্যামিলি লাইফের আমার খুব খুব লোভ … কখনো পাই নি যে, সেজন্যই … বড়ররা তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করেছে, আর তারপর যাবতীয় আদর, আহ্লাদি, হইহই- রইরই ফ্যামিলি লাইফ থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমরা ভাই-বোনেরা …

কারো সাথে মিশতে পারা, সুন্দর করে কথা বলতে পারা, ইন্টার-অ্যাক্ট করতে পারা এগুলো হয়তো সেসব কারনেই শিখতে পারি নাই! … বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময় আমার ‘অ্যাটিচুড প্রবলেম’ এর কথা শুনতে হয় … জানি না, সেটার একটা বড় কারণ হয়তো বাবা-মা-চাচা-ফুপু-মামা-খালাদের কোলাহল আর ঝগড়াঝাঁটি দেখে দেখে বড় হওয়া শৈশব- কৈশোর … ভালোভাবে কথাবার্তা শুনলেই না ভালোভাবে কথা বলতে শিখবো! …

কি জানি, বাড়ি হয়ে যাবার পরও হয়তো অবস্থা একই থাকবে … কিংবা আরও খারাপই হবে …

এই বাড়ির কাজের সূত্রেই তো আব্বুর সাথে আমার কথা বন্ধ হলো! …

সবকিছুই যে কেন এত জটিল! … একজন মানুষের জীবনে সবকিছুতেই এত জটিলতা কীভাবে থাকে? …

জীবনযাপন অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন …

এবার আরেক নস্টালজিয়া প্রসঙ্গ …

দিনশেষে একটা গান শুনছিলাম, হুইস্কি লুলাবাই … অনেকদিন পর আজকে গানটা শুনলাম … গান শুনে মন আরও খারাপ হয়ে গেলো … ‘তার’ ভাবনাও এখন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে … তাকে আমি যতই ভাবি যে ভুলে থাকতে পারছি, ততই কোনো না কোনোভাবে সে মনে চলেই আসে … আচ্ছা, সারাক্ষণ যদি আমি ওরকম গানটার মতো মদ-টদ খেয়ে টাল হয়ে থাকতাম, তাও কি তাকে ভুলে থাকতে পারতাম? … কয়েকদিন আগেও তো কিঞ্চিৎ মাতাল হয়ে, খোলা ছাদ পেয়ে বারবার ‘কীভাবে লাফ দেয়া যায়’ সেটা ভেবেছি আর বাকিরা আমাকে হাত ধরে ধরে নিয়ে ঘুরেছে যাতে সত্যি সত্যি লাফ না দিয়ে দেই! … অতঃপর তার কথা ভাবতে ভাবতেই কান্নাকাটি করেছি … কেন যে তাকে আমি ভুলে থাকতে পারি না! …

এত রকমের মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে তাকে ভুলে থাকতে না পারাটাও একটা জলজ্যান্ত যন্ত্রণা হয়ে গিয়েছে …

সবকিছু কেমন যেন অস্থির …

পালিয়ে বাঁচবো, তারও উপায় নাই …

একেবারে সুস্থ মস্তিষ্কে ভেবেচিন্তে নিজের হাতেই নিজেকে মুক্তি দেবো, সেই সাহসও নাই! …

কি হবে আসলে আমাকে দিয়ে? …

প্রোবাবলি, কিছুই না ! … খালি বড় বড় স্বপ্ন দেখে যাবো, আর বড় বড় কথা বলবো, লিখবো … এই তো! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s