দিনযাপন | ২৫০৩২০১৫

আজকের দিনযাপনের সবকিছুতেই প্রচণ্ড গরম, প্রচণ্ড ধুলাবালি আর দিন শেষ হয়ে রাত বাড়তে বাড়তে ঝড়ো বাতাস …

দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘লাল যাত্রা’। প্রতিবছরের ২৫ মার্চের আয়োজন। …

প্রথম লাল যাত্রায় আমার যাওয়া হয়নি। প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলাম। দ্বিতীয় লাল যাত্রা থেকে নিয়মিত থাকি … এবার পঞ্চম লাল যাত্রায় এসে মনে হলো যে এটা এখন আর কেবল একটা পারফরমেন্স নাই, একটা মহাযজ্ঞ হয়ে গেছে! আর এই মহাযজ্ঞের একটা বড় পার্ট হচ্ছে মিডিয়া এক্সপোজার! … এত এত সাংবাদিক, ফটোজার্নালিস্ট, টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা, লাইভ টেলিকাস্ট … আর আমরা মিছিল করে হাঁটবো কি? এদের সামলাতে সামলাতেই পারফরমেন্স-এর সকল মনোযোগ ছিন্ন হয়ে যায় … অথচ প্রথম তিনটা বছর আমরা তো এমন লাল যাত্রাও করেছি যেখানে একজন কি দুইজন মিডিয়ার লোক থাকতো, তাও পরিচয় সূত্রে! … আর এখন মোটামুটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমরা মিডিয়াকে ডেকে আনি, আবার তাদের হুড়াহুড়ি আর ঝাঁপায় পড়ে ছবি তোলা, ভিডিও করা নিয়ে প্রচণ্ড রকম অসুবিধায় পড়ে যাই আর তাদেরকে সামলাতে হিমশিম খাই! …

আজকে ওরকম ঝাঁপায় পড়ে কে কার চেয়ে বেশি ছবি তুলবে, কে কত ভালো ফ্রেম পাবে, আর কে কার আগে মোমেন্ট-টা ক্যাপচার করবে সেগুলা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দুই ফটোসাংবাদিক প্রায় মারামারি লাগার জোগাড় …

সুমি আপু ‘ধরণী মাতা’র সাজে মিছিল এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর এক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ওই পারফরমেন্স-এর মাঝখানেই মাইক নিয়ে পাশে পাশে হেঁটে বলছে, ‘ আপনি ক্যামেরার উদ্দেশ্যে দুইটা কথা বলেন’ … ! সুমি আপু তো তার ক্যারেক্টার নিয়ে পারফর্ম করছে, সে তাই কোনো কথা না বলে এগিয়েই যাচ্ছে, আর সেই সাংবাদিকও পাশে পাশে হেঁটেই চলেছে … শেষে আমিই বলতে বাধ্য হলাম যে ‘ ভাইয়া, এটা একটা পারফরমেন্স চলছে। এখন উনি কোনো কথা বলতে পারবে না’ … দুইবার বলার পর তিনি মুহুর্তের জন্য হতোদ্যম হলেন ঠিকই, তারপরেই ক্যামেরাম্যান কে বললেন, ‘ চলেন পেছনে যাই, অন্য কারো সাথে কথা বলি!’ …

গতবছরই মিডিয়ার অত্যাধিক এক্সপোজার আমার বিরক্ত লেগেছিলো। আজকে আরও বেশি লাগলো। একেকজন মিডিয়া জার্নালিস্ট-এর অবস্থা দেখলে মনে হয় যেন তারা ছবি তুলবে, ভিডিও করবে এজন্যই পারফরমেন্সটা হচ্ছে! কিছু বাঁধাধরা ইমেজ থাকে, যেগুলা তাদের লাগবেই। আর সেগুলার জন্য পারলে পারফরমেন্স-এর ভেতরেই তারা চলে আসে! … অথচ পারফরমেন্স যেভাবেই হচ্ছে, সেই অনুযায়ী তারা তাদের ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল অথবা কম্পোজিশন ঠিক করে না! …

রাতে গ্রুপ থেকে বের হয়ে কাঁটাবনের মোড়ে দাঁড়ায় মিডিয়া এথিকস নিয়ে বেশ জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হচ্ছিলো সোহেল, গোপী আর আমার। এখনকার বেশিরভাগ সাংবাদিকেরই ব্যাকগ্রাউন্ড জার্নালিজম কিংবা মিডিয়া স্টাডিজ না,ফলে মিডিয়া এথিকস সম্পর্কে তারা জানে না। তাদেরকে এই এথিকস জানানো ও শেখানোর দায়িত্বটা তখন ওই পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের ওপরেই বর্তায়। কিন্তু, যারা মিডিয়া স্টাডিজ থেকে পড়াশোনা করা সাংবাদিক, তারা নিজেরাও বা আসলে কতটুকু এথিকস প্র্যাকটিস করে তাদের কাজে? … আবার এমন না যে তারা এথিকসটা মানেনা বা জানে না, কিন্তু চ্যানেলের টিআরপি বাড়াতে যে নিউজটা দরকার, সেটা পাবার জন্য প্রয়োজনে তারা এথিকস এর ধার ধারে না! … এমনকি যে পত্রিকা বা চ্যানেলে তারা কাজ করে, সেই পর্যটিকা বা চ্যানেলেরও এথিকস মেনে খবর হলো কি হলো না, সেটার চাইতে খবরটার টিআরপি মূল্য কত বেশি সেটাই গুরুত্বপুর্ণ! … এরকম নানাবিধ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। সেই আলোচনা অবশ্য পরে মিডিয়া এথিকস থেকে ডালপালা গজায় গ্রন্থগত বিদ্যা থেকে শুরু করে একদম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি পর্যন্ত যায় যায় অবস্থা। আমি অনেক আগেই আলোচনা থেকে সরে গেছি, কিন্তু গোপী আর সোহেল দুজনেই দুজনের যুক্তিতে সরব। একজনের বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম আর আরেকজনের বয়সের অনুপাতে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, পড়াশোনা সবকিছুই বেশি – ফলে দুজনের যুক্তিখণ্ডনের পর্বটা বেশ ইন্টেরেস্টিং ছিলো।

তবে, যাই হোক, কথা এটাই সত্য যে কারণ যাই হোক, চিন্তা যাই হোক, আমাদের দেশে মিডিয়া এথিকস এর অনুশীলন যে প্রায় হয়না বললেই চলে সেটা এরকম যে কোনো প্রোগ্রামে সাংবাদিকদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়! …

আজকে একবার ভেবেছিলাম যে ছবি তুলবো না। পরে গতকালকে সনেট-এর সাথে যোগাযোগ করে ওর কাছে আজকে আর আগামীকালের জন্য ক্যামেরা চাইলাম। লালযাত্রা হলো আজকে, আর কালকে স্বাধীনতা দিবসে প্রাচ্যনাটে দেশের গানের প্রোগ্রাম আছে। সে কারণেই শেষ পর্যন্ত ক্যামেরা ম্যানেজ করা। … পুরো লালযাত্রার শেষে এসে এমন কিছু ছবি পেলাম যে মনটাই ভালো হয়ে গেলো … ক্যামেরা ধার করা সার্থক! না হলে তো চোখের সামনে দিয়ে মুহুর্তগুলো চলে যেতো, অথচ ছবি তোলা হলোনা এই ভেবেই আফসোস হতো খালি! …

আজকে অনেক অনেক ক্লান্ত। লাল যাত্রায় অনেকটা পথ হেঁটেছি, তারপর যখন গান-বাজনা হলো তখনও ঠায় দাঁড়ানো। একে তো প্রচণ্ড গরম, তার মধ্যে ধুলা-বালিতে অস্থির অবস্থা। বাসায় এসে গোসল করবো সেই শক্তিটাও পেলাম না। এখন দিনযাপন লিখতে বসলাম ঠিকই, কিন্তু এক ফোঁটা শক্তি নেই শরীরে, মাথাও কাজ করছে না।

অতএব, আজকের দিনযাপন এখানেই শেষ …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s