দিনযাপন | ২৭০৩২০১৫

আবারো যথারীতি রাতে বাসায় না থাকার কারনবশতঃ একদিনের দিনযাপন বাদ গেলো … কিন্তু, সে যাই হোক, রাতটা তো সুন্দর ছিলো ! … হঠাৎ করেই প্ল্যান হওয়া একটা সুন্দর রাত …

কিন্তু কালকের দিনটা মোটেই খুব ভালোভাবে শুরু হয়নি। ঘুম থেকে উঠে বাসার বাইরে যাওয়া অবধি সময়টুকু বেশ ফ্রেশ মুডে ছিলাম, কিন্তু তারপর বাসার গেট পার হবার আগেই গোপীর নানীর মৃত্যুসংবাদ শুনে দিনের সকল আগাম উৎসাহই কেমন মিইয়ে গেলো। এতদিন যাবৎ একটা  প্রোগ্রামের জন্য রিহার্সাল করে এখন প্রোগ্রামের দিনই ছেলেটা থাকতে পারছে না। আমার নিজেরই কেমন মন খারাপ হয়ে গেলো। এটাই জীবন! অদ্ভুত জীবন! … দুইদিন আগেই শুনেছিলাম যে ওর নানী অসুস্থ, আন্টি উনাকে বরিশাল থেকে ঢাকায় নিয়েও এসেছেন চিকিৎসার জন্য … আর এখন এমন একটা দিনেই তিনি মারা যাবেন, সেটা তো ভাবনাতেই আসে নাই! …

এই মৃত্যুসংবাদ বিষয়টা নিয়ে আমি সবসময়ই কেমন জানি একটা ঝামেলায় পড়ে যাই! আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না সেসময় আমার কি বলা উচিত, বা কি করা উচিত! … গতকাল থেকে এইটা নিয়েই সাতপাঁচ ভাবনা মনের মধ্যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে! …

আমার চোখের সামনে দেখা প্রথম মৃত্যু ছিলো আমার বড়-নানুর, মানে নানু’র মা’র। তখন আমার বয়স ৪ কি ৫, তখনকার স্মৃতি এটাই যে আমি বেশ বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে বিকেলেও যে মানুষটাকে দেখলাম বসে ছিলো, গল্প করছিলো, তার হঠাৎ কি হলো, আর তার মাথার পাশে বসে মানুষগুলোই বা কাঁদছে কেন! তারপর জানলাম যে এভাবেই নাকি মানুষ মারা যায়, আর কাছের মানুষ মারা গেলে অন্যরা কষ্ট পেয়ে কাঁদে। … তারপর যখন নানু মারা গেলেন, সেদিনের স্মৃতি আরেকটু পরিষ্কার। তখন মাত্র ঢাকা শহরে এসে বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছি, কেজি ওয়ানে ভর্তি হবো বলে। নানু যেদিন মারা গেলেন, সেদিন আমার ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ছিলো। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলো না, সেই ১৯৯৩ সালে, ফলে মা’কে সাথে সাথে খবর দেয়ার উপায় ছিলো না। বাসায় ফেরার পর মা জানতে পেরেছিলো। বড় খালাও তখন আমাদের সাথে থাকে, মা আর বড় খালা কেমন করে কাঁদছিলো খবরটা শোনার পর। তখন আমিও একটু- আধটু মৃত্যুশোক বুঝি, ফলে আমারও মন খারাপ হলো যে নানু’কে আর দেখবো না! আমার জীবনের প্রথম পাঁচ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই কেটেছে, নানুর বাসায়। যে পরিমাণ আদর আমি নানু আর নানীর কাছ থেকে পেয়েছি, সেগুলো যদি আমি স্পষ্ট সবকিছু মনে রাখতে পারতাম, তাহলে হয়তো একটা গল্প লিখে ফেলা যেতো! … তো, সেই আদর-আহ্লাদের সূত্র নানু আর নাই, সেটা তখনকার জন্যও মন খারাপ হবার মতো ছিলো …

আর নানী যেদিন মারা গেলেন … তখন আমি কলেজে পড়ি, আর সেদিন আমাদের কলেজের স্টাডি ট্যুর – যমুনা রিসোর্টে। মা আমাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে গেলো। বাসে উঠে রওনা দেবার মুহুর্ত থেকেই আমার কেমন অস্থির অস্থির লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন কিছু এঞ্জয় করতে পারছি না। কিন্তু কেন যে এমন লাগছিলো সেটার তো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না! … এমনকি সিস্টার শিখাও একবার হঠাৎ আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ? তোমাকে অনেক আনমনা লাগছে!’ … তো, এভাবেই সারাদিন পার করে ওই খচখচ ভাব নিয়েই ঢাকায় ফিরলাম। কলেজে বাস থামার পর দেখলাম আব্বু আর অমিত আমাকে পিক করতে গেছে। একবার অবাক হলাম যে মা তো আসার কথা, ওরা কেন! তারপর মনে হলো যে রাত হয়ে গেছে বলেই হয়তো ইত্যাদি ইত্যাদি … বাসার গেট দিয়ে ঢোকার মুখে আব্বু ভাত রান্না নিয়ে কি জানি বলছিলো, তখন আমার প্রথম খটকা লাগলো! মা কই? অমিতের কাছে তখন শুনলাম যে নানী মারা গেছে আর সেই সকাল ৯টা সময়ই মা, টিয়াম আর লালাম  ব্রাহ্মণবাড়িয়া রওনা দিয়েছে। … নানী মারা গিয়েছিলেন সকালবেলা। আমাকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরতে না ফিরতেই নানীর মৃত্যুসংবাদ পায় মা, তারপর দুই বোনকে নিয়ে সাথে সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রওনা হয়। … আমার মধ্যে তখন কষ্ট পাওয়ার চাইতে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হলো … সারাদিনের অস্থিরতা তাহলে এই কারণেই ছিলো! … এটাই কি রক্তের টান? … জীবনটা কি অদ্ভুত! … একজন মানুষকে আর কোনোদিন দেখবো না, তার আদরটাও আর পাবো না , আর সেই মানুষটার মারা যাবার খবর পেলাম রাত দশটায় বাড়ি ফিরে! তাকে শেষবারের মতো একবার দেখে নেবার সুযোগটাও মেলেনি! … আর শেষ কবে দেখা হয়েছিলো, সেদিন কি করেছিলাম তাও তো মনে নেই! …

দাদু’র মৃত্যুর স্মৃতি কেবল একটা ফোন কল। ছোটো ফুপা সম্ভবত ফোন করে জানিয়েছিলেন মা’কে। কিন্তু তাকে শেষ দেখার স্মৃতি হিসেবে পুঁজি করতে হয়েছে ২০০৫-এ হঠাৎ করে তার একদিন বাসায় আসা আর তারপর ‘ক্যামন আছো?’ ‘ ভালো আছি’ ছাড়া আর কোনো কথা না হবার স্মৃতি! …

দাদী এখনো জীবিত, তবে একদিন তো তিনিও মারা যাবেন … তখন কি হবে কে জানে! …

পরিচিত কারো কাছের মানুষেরা মারা যাবার খবরে আমি কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যাই! … কারো বাবা – মা মারা যাবার খবরে আমি এমনকি কি যতটা সম্ভব তাদের বাসায় যাওয়া থেকেও দূরে থাকি। অনেক মানুষই যেমন এসে একটা-দুইটা কথা বলে স্বান্তনা দিয়ে ফেলতে পারে, আমি সেটা পারি না। আমার কাছে কোনো শব্দ আসে না। আমার কাছে মনে হয় যে মানুষগুলা মারা যাবে এটাই তো সত্য, হয়তো মৃত্যুর ধাক্কাটা হঠাৎ করেই প্রস্তুতি ছাড়া আসে আর সেজন্যই কেমন খারাপ লাগে। কিন্তু কি বলে আসলে এই খারাপ লাগাকে পোষ মানানো যায়? যখন কারো কাছের মানুষের মৃত্যুসংবাদ সামনা-সামনি শুনতে হয়, তখন তো পরিস্থিতি আমার জন্য আরও নাজুক হয়ে যায়। আমার তখন কেমন জানি লাগতে থাকে। আমার কি করা উচিৎ সেটাই আমি বুঝে উঠতে পারি না। তাকে একটু জড়িয়ে ধরলে কি যথেষ্ট হবে? নাকি ‘ সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা’ টাইপ কিছু একটা বলতে হবে? … কি করবো, কি বলবো সেটা ভাবতে গিয়েই আমার টেনশন বেড়ে যায়। আবার মনে হয় যে, যদি কিছু না বলি, তাহলে তো ভাববে ‘ মেয়েটা কেমন! কিছুই আসলো গেলো না তার?’ …

এই যেমন গোপীর নানী মারা গেছে, সেটার কথাই যদি বলি … তার নানীকে তো আর আমি চিনি না, কিন্তু প্রাচ্যনাটে যে মানুষগুলোর সাথে বেশিরভাগ সময় চলাফেরা হয় তাদের মধ্যে গোপী একজন হওয়ায় তার যে কোনো সুখ-দুঃখের ঘটনাই আমাকে একটু হলেও ইফেক্ট করে। যেমন, আমার খারাপ লাগার জায়গাটা ছিলো যে ‘ আজকে প্রোগ্রাম, আর আজকেই বেচারা থাকতে পারবে না!’ … কিন্তু তাকে তো আর ওই মুহুর্তে আমি সেটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে কিছু বলতে পারি না! আবার তার এরকম একটা খবর শুনে আমি তার সাথে যোগাযোগ করে ‘ কি অবস্থা রে?’ টাইপ কিছু বলবো না, সেটাও তো আমার কেমন কেমন লাগবে! … খুব অস্বস্তিকর একটা জায়গা থেকে ফোন দিলাম, কিন্তু আলটিমেটলি আসলে কথাবার্তা খুবই খাপছাড়া হয়ে গেলো! … আমি শিওর যে ওইরকম একটা ফোন পেয়ে সে ধরেই নিয়েছে যে আমি দায়সারা গোছের একটা মনোভাব থেকে ফোন দিয়েছি! … এরকম মহা মুশকিলের একটা অবস্থায় পড়ে যাই আমি কারো মৃত্যুসংবাদ শুনলে! …

আমাদের কম্পাউন্ডে এক আন্টি থাকেন। উনি আমাকে দেখলেই উনার মেয়ের পড়াশোনার খোঁজখবর দেন, টিউশনি করানোর জন্য ভালো স্টুডেন্ট-এর খোঁজ আছে কি না জানতে চান, মেয়েকে কোন কলেজে দেবেন এগুলা নিয়ে আলোচনা করেন … আমার কেমন জানি একটু অস্বস্তি লাগে উনার সাথে কথা বলতে। মানে আমি যেই লাইফস্টাইল-এ চলি, সেটা নিয়ে উনার আবার কি ধারণা সেটা তো আমি জানি না! … সেজন্য খুব অস্বস্তি হয়। … তো, একদিন তার সাথে এরকম করেই নিচে দেখা হলো। আমিও স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে ‘ ভালো আছেন আন্টি?’ জিজ্ঞেস করলাম। আন্টি তখন আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ ত্বিষা, মা, তোমার আঙ্কেল কয়েকদিন আগে মারা গেছেন!’ … বলেই তিনি কাঁদতে শুরু করলেন … আমি তখন প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। কি বলবো তাকে আমি? আমার এক্সপ্রেশনটাই বা কি হওয়া উচিৎ? … কি করলে ঠিক হবে? … এইসব ভাবতে ভাবতে উনারে অনেক কষ্টে বললাম, ‘ সরি আন্টি! আমি তো জানতাম না!’ … উনিও কেমন একটা ব্ল্যাঙ্ক এক্সপ্রেশন দিলেন। আমি আর কি করবো না বুঝতে পেরে তাকে একবার জড়ায় ধরে নিয়ে বললাম, ‘ আন্টি, থাক, কাইদেন না!’ … ‘ আমি আসি, ঠিক আছে?’ … বলে আমি মোটামুটি গটগট করে হেঁটে বের হয়ে গেলাম গেট দিয়ে … তারপর লিটেরেলি একটা হাফ ছাড়লাম! …

কি জানি, এটা হয়তো খুবই অদ্ভুত টাইপের একটা আচরণ! … আমার হয়তো জানা থাকা উচিৎ কখন কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে আমার খারাপ লাগাটা বোঝাতে হবে! … কিন্তু আমি সেটা পারি না! …

মৃত্যু জিনিসটাই আমাকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলে দেয়! … নাকি আমিই আসলে এতটাই আসামাজিক যে এসব পরিস্থিতির সঠিক আচরণবিধিটা জানি না? … নাকি এটার কারণ এই যে আমি প্রচণ্ড হার্টলেস? … কে জানে! …

এ যাবৎকাল পর্যন্ত কোনো মৃত্যুসংবাদে আমার কান্না আসেনি। … মন প্রচণ্ড বিষণ্ণ হয়েছে, কিন্তু সেই বিষণ্ণতাও আমি প্রকাশ করতে পারিনি … আমার কাছে মনেই হয়েছে সেটা বরং আরও বেশি অস্বস্তিকর হয়ে যাবে … কিভাবে প্রকাশ হলে অস্বস্তি কম হতে পারে ভাবতে ভাবতেই তারপর অতটা সময় চলে যায় যে তারপর আর সেই বিষণ্ণতা প্রকাশের সুযোগ থাকে না! …

আমার নিজের হাতে একটা জীবনের মৃত্যু ঘটিয়ে আমি অবশ্য প্রচণ্ড কেঁদেছিলাম! … কিন্তু ওই একই শোকের বহিঃপ্রকাশ তো আর সব মৃত্যুর ক্ষেত্রে হবে না! … কারণ ওই কান্না যতটা না মৃত্যুশোক ছিলো তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি তো অপরাধবোধ ছিলো … ওই মৃত্যুটা তো সরাসরি আমার নিজের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত, আর সেখানে আমার নিজের একটা ভূমিকা আছে …

কিন্তু অন্য সব মৃত্যুর ক্ষেত্রে? … মৃত্যুসংবাদগুলো পেয়ে আসলে কেমন হওয়া উচিৎ আচরণ? …

মৃত্যু জিনিসটাই জানি ক্যামন! …

ক্যামন জানি! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s