দিনযাপন | ২৯০৩২০১৫

” প্রজ্ঞাপু, যেভাবে নাম ঠিকানা সব কিছু মেনশন করে দিনযাপনে লিখতেসেন, দেখা যাবে আপনার সাথে কয়েকদিন পর কেউ আর ভয়েই কথা বলতেসে না, কারণ তারা ভাববে যে কিছু বললে যদি আপনি আবার তাদের কথা দিনযাপনে লিখে ফেলেন !…আপনাকে তো দেখা যাবে একদিন সবাই নাম দেবে ‘দিনযাপন সন্ত্রাসী’ !” … কথায় কথায় সন্ধি বলছিলো আজকে। রাব্বি আবার তাতে যোগ করলো, ‘ কিন্তু এইটার কিন্তু একটা ভালো দিকও আছে! যারা এসবকিছুর পরও আপনার সাথে থাকবে, বুঝবেন যে তারাই আপনার সুজন! … দেখা যাবে যে আপনি কি লিখলেন না লিখলেন সেটাতে তাদের কিছু যায় আসে না …”

‘দিনযাপন সন্ত্রাসী’ কথাটা শুনে মজা পেলাম। কেমন জানি মনে হলো যেন সিনেমার ভিলেনদের মতো করে ব্ল্যাকমেইল করবো যে ‘ এত লক্ষ টাকা দিতে হবে, নইলে কিন্তু দিনযাপনে অমুক কথা বলে দিবো !” … বিষয়টা ভিজুয়ালাইজ করতেই তো ক্যামন মজা লাগে! … শুধুমাত্র দিনযাপনে কারো সম্পর্কে লিখি বলে যদি কেউ তাতে করে আমার সাথে আর না মিশতে চায়, তাহলে তো আমার প্রতি মানুষের মনোভাবটাই আমি বরং অনেক ভালো করে বুঝবো! … রাব্বি যেমনটা বলছিলো … আমি যদি কারো ব্যাপারে নেতিবাচক কথা লিখেছি বলেই তার খুব রাগ হয়, তাহলে তো নিজেকে প্রকাশ করার ব্যাপারে তারই সঙ্কোচ আছে … আমি তো এমনকি কাউকে ভুল বুঝেও কিছু লিখতে পারি … এমনও হতে পারে যে একটা ঘটনা সঠিক না জেনেই আমি হয়তো সে ব্যাপারে কিছু লিখেছি … সেটাকে যদি সহজভাবে নেয়া যায় যে ‘ও আমাকে এভাবে ভুল বুঝেছে’ আর তারপর সেটাকে আবার সহজভাবে মিটিয়েও ফেলা যায়, তাহলে কিন্তু আমিও আমার ভুলটা শোধরাতে পারি …

যাই হোক, গতদিনের দিনযাপনের লেখাটা একটু বেশিই মনে হয় খোলামেলা হয়ে গিয়েছিলো … এটা সত্যি যে অন্যের ব্যাপারে লিখতে গেলে আমার এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সবাই সবকিছু সহজভাবে নিতে পারে না … আশেপাশের সবাই তো আর সহজ মানুষ হয় না! …

কিন্তু, আজকের দুপুরের ওই আলোচনার ভিত্তিতে আমার মণে হলো যে আমি দিনযাপন কেন লিখি সেটার ব্যাপারে একটা স্পষ্টতাজ্ঞাপন মনে হয় জরুরি! … কারণ, পরিচিত মানুষদের অনেকেই ইদানীং মনে হচ্ছে দিনযাপন পড়ছে …

আমি অনেক ছোটবেলা থেকেই ডাইরি লিখি … সেই ক্লাস সিক্স থেকে … এখনো পর্যন্ত আমার অনেক প্রিয় অভ্যাসের একটা হচ্ছে ডাইরির পাতায় এই মনের কথা লিখে রাখা … তো, একটা সময় আমার মনে হলো, এই ডাইরি লিখবার বিষয়টা এই যুগে এসে কাগজে-কলমে না হয়ে এমন কোনো মাধ্যমে হওয়া উচিৎ যেটা সত্যিকার অর্থেই মানুষের কাছে পৌঁছাবে। হ্যাঁ, আমার মনের কথা আমি মানুষের কাছে জানানোর জন্যই লিখি … একটা সময় ছিলো যে অনেক বিখ্যাত মানুষেরা ডাইরি লিখতেন, তারপর তাদের মৃত্যুর পর সেই ডাইরি প্রকাশিত হতো, মানুষ পড়তো আর অনেক ঘটনার অনেক নতুন ব্যাখ্যা পেতো … কিন্তু এখন সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই এত দ্রুত হারিয়ে যায়, মানুষের সাথে মানুষের ইন্টারঅ্যাকশনগুলো এতই বিস্তৃত যে ‘ একদিন আমি অনেক বিখ্যাত হবো, তারপর আমার ডাইরি লোকে পড়বে আর জানবে যে দুনিয়াদারি নিয়ে আমি আসলে কি ভাবতাম!’ এই ভাবনা করাটাই বোকামি! … আমি ডাইরি কেন লিখি? আমার মনের যে কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনাই , কিংবা কোনো একটা কিছু নিয়ে যা ভাবছি সেটাকে প্রকাশ করার জন্যই তো! ডাইরি লিখে সেটা যদি কেউ লুকিয়ে রাখে, তাহলে আর সেই ডাইরি লিখবার মানে কি হলো? … তো, এখন আমার কাছে মনে হয় যে আমাদের চারপাশে এত এত মুখ, এত এত ঘটনা সারাদিনে ঘটে যে এগুলা নিয়ে অনেক বছর পর আর মানুষ মাথা ঘামাবে না। দুনিয়াটা এখন প্রায় ঝড়ের বেগে চেঞ্জ হয়! আর সে কারণেই ২৪ ঘণ্টার দিনাতিপাতই একটা ঘটনার রেশ ধরে রাখে, তারপর আবার অন্য কোনো একটা ঘটনা এসে সেই আগের দিনের ঘটনাকে মন থেকে মুছে দেয় …

আর আমার চিন্তাধারাটা এমন যে আমি কিছু কিছু ঘটনা, কিছু কিছু ভাবনাকে এভাবে হারিয়ে দিতে চাই না । আর সেজন্যই এমন একটা মাধ্যমে সেই প্রতিদিনের ঘটনা আর ভাবনাগুলোকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাই যাতে সেই ঘটনার রেশ কেটে যাবার আগেই সেটা সম্পর্কে আমার আশেপাশের মানুষেরা আমার ভাবনাটা জানে … হতেই পারে আমার চিন্তাটা একপেশে হয়, হতেই পারে আমি এমন একটা কিছু ভাবলাম যেটা আসলে তেমন নয় … অন্তত আমার ভুল বোঝার বিষয়টাও তো মানুষ জানলো! … ধরা যাক কারো ওপর আমার খুব রাগ হলো, আর তারপর আমি তার সাথে দিনের পর দিন কথাই বললাম না।তারপর অনেক বছর পর জানলাম যে আসলে যেই ঘটনার সূত্র ধরে রাগ করেছিলাম সেটার পেছনের ঘটনাগুলো আরও অন্যরকম ছিলো। আর সেটা যদি ওইসময় আমি জানতাম, তাহলে আর আমার রাগ উঠতো না! … কিন্তু তাতে করে কি ই বা হলো? মাঝখানের ওই কয়েকটা বছর তো আসল ঘটনা না জানার কারণে আমি রাগ করেই কাটালাম! …

এই বিষয়টাই আমি কখনো ঘটুক বলে চাই না … অন্তত আমার নিজের চিন্তা-ভাবনাগুলো আমি সবার কাছেই পরিষ্কার রাখতে চাই … মনে এক চিন্তা আর মুখে আরেক কথা রেখে আমি চলতে পারি না … আমি কি ভাবছি, আমি কি চাইছি তা অন্তত মানুষের জানা থাকুক। তাতে করে তারা আমার সাথে যে আচরণ করবে তা জেনে-বুঝেই করবে …

স্কুলে পড়তাম যখন, সে সময় মাঝে মাঝেই বান্ধবীদের একে- তাকে আমার ডাইরি দিতাম পড়ার জন্য। সেই ডাইরিতে হয়তো তাদের ব্যাপারেও লেখা থাকতো … তাদের সাথে কোনো একটা ঘটনায় খুব আনন্দ পেয়েছি, কিংবা খুব কষ্ট পেয়েছি এরকম অনেক কিছু … কিংবা আমার নিজের অনেক অনেক ভাবনা-চিন্তার কথা … তো সেগুলো তারা পড়তো আর কেউ কেউ সেগুলোর প্রত্যুত্তরে বিশাল চিঠি লিখে উত্তর দিতো, মন্তব্য করতো … এভাবে অনেক ভুল বোঝাবুঝির যেমন অবসান ঘটতো, তেমনি আমার নিজের ব্যাপারেও আমি একধরণের ইভালুয়েশন পেতাম যেটা আমাকে অনেক সাহায্য করতো নিজেকে বোঝার ব্যাপারে …

ভার্সিটিতে উঠতে উঠতে এই প্রাকটিসটা বাদ হয়ে গেলো … ভার্সিটি লাইফে একবারই একজনকে ডাইরি দিয়েছিলাম পড়ার জন্য … তার কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা চিঠিও পেয়েছিলাম … আর সেই চিঠি তাকে নতুন করে চিনতে আমাকে সাহায্যও করেছিলো …

এই যে দিনযাপন, এটার অনুপ্রেরণা এই ডাইরি লেখার অভ্যাস থেকেই পাওয়া! … দিনযাপন পড়ে আমাকে কেউ ভালো ভাববে, কেউ খারাপ ভাববে, কেউ বলবে ‘আহারে! মেয়েটা এমন সেটা তো কখনো বুঝি নাই’ … আবার কেউ ভাববে, ‘ হায় আল্লাহ! এই মেয়ে যে এইরকম সেইটা তো কখনো চিন্তাও করি নাই!’ … কেউ নাক সিটকাবে, আবার কেউ কাছে টানবে … কারো সাথে দূরত্ব কমবে, কারো সাথে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হবে …

এটাই তো জীবন … এভাবেই তো আমাদের দিনযাপন হয় … আমাদের মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া অনুভূতিগুলো আমরা কেউ মুখ ফুটে বলি, কেউ বলি না … যারা বলি তাদের দিনযাপন একরকম … যারা বলি না তাদের দিনযাপন আরেক রকম … মনের কথা খুলে বলার কারণে কারো জীবন পাল্টে যায় … আবার মনের কথা প্রকাশ না করার কারণেও কারো জীবন পাল্টে যায়! … কেউ ভাবে ‘ বললেই বোধহয় ভালো হতো’, আবার কেউ ভাবে ‘ না বললেই ভালো হতো’ …

আমি না হয় সবকিছু বলে ফেললে কি ঘটে সেটা দেখবার ঝুঁকিটাই নিলাম …

আজকের দিনযাপনে আর কিছু নেই … দিনের প্রায় পুরোটা ভাগই কার্জন হল আর চারুকলায় ছবি তুলে কেটেছে … একদম মনের সাধ মিটিয়ে ছবি তুলেছি … মডেল বলতে সন্ধি, সেই সাথে টুকটাক ছবি উঠলো রাব্বি আর পারভেজ-এর … সনেটের ক্যামেরাটা বেশ ভালো কাজে লাগছে … আর একই সাথে আমার নিজের একটা ক্যামেরা চাই সেই ইচ্ছাটাও তীব্র করে দিচ্ছে … কারণ, আর যাই হোক, ছবি তোলার জোশ উঠেছে আমার …

মনে হচ্ছে, ধার করে হলেও একটা ক্যামেরা কিনে ফেলতেই হবে ! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s