দিনযাপন | ১১০৪২০১৫

সারাদিনের মধ্যে একমাত্র পাঠাশালা সিনে ক্লাবের মিটিং-এর কাজটাই ঠিকমতো হলো … মহুয়া আপার সাথে দেখা করে ছবিগুলো দেবার কথা ছিলো, কিন্তু সেটা কালকের জন্য পিছিয়ে দিলাম। কারণ তাড়াহুড়ো করে কাজটা শেষ করতে মন চাইছিলো না। আর তাছাড়া ছবিগুলো সুন্দরভাবে প্রিন্ট করে দেবারও একটা বিষয় আছে। ফলে সন্ধ্যার সাক্ষাতটা পিছিয়ে কালকে করে নিলাম। এখনো অবশ্য সময় ঠিক করা হয়নাই।সন্ধ্যায় কালকে উর্নাজালের শো আছে, সেখানে ছবি তুলতে যাবো। সুতরাং উনি বিকালে সময় না দিলে কালকেও হয়তো উনাকে ছবি দেয়া হবে না। এখন মনে হচ্ছে যে মনের জোর করে হলেও আজকেই দিয়ে দিতাম ছবিগুলো, তাহলেই ভালো হতো! … ক্লায়েন্ট বলে কথা! … বন্ধু-বান্ধবের ছবি হলে না হয় ফেসবুকে কয়েকটা ছবি দিয়ে বলতাম বাকি ছবি কয়েকদিন পর … এখানে তো আর তেমনটা সাজে না! …

যাই হোক, কালকেরটা কালকে দেখা যাবে … আপাতত আজকের দিনের কথা ভাবি …

আজকের দিনটা অনেকাংশেই স্মৃতিবহুল … দুই বছর আগে আমরা, মানে জেম, নোবেল ভাই, নীল, শোভন, আমি, রাফায়েল এইরকম আমরা আমরা মিলে ইউল্যাব থিয়েটারের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ নাটকের ডিরেক্টরিয়াল কাজ করেছিলাম। মূল পরিচালনা ছিলো জেম এর, আর আমরা বিভিন্ন কাজে, যেমন মিউজিক, কোরিওগ্রাফি, কস্টিউম, সেট এইসবের দায়িত্বে ছিলাম। প্রথমবারের মতো  বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়া আমাদের প্রথম থিয়েট্রিক্যাল কাজ ছিলো বলেই ওইটা অনেক স্পেশাল। আর দুই বছর আগের এই দিনেই নাটকটার শো হয়েছিলো। আমি কস্টিউম করেছিলাম নাটকটার। অনেক মজার আর ভালো কিছু সময় কেটেছিলো নাটকটার কাজ করতে গিয়ে । টুকরা টুকরা অনেক অনেক স্মৃতি … আলাদা করে মনে করার মতো না, আবার একসাথে অনেক কিছু! …

শো-এর শেষে স্টার-এ দলবেঁধে খেতে যাওয়া হয়েছিলো… রাতে আবার একদল ইউল্যাবিয়ান আমাদের সাথে ছিলো … পরের দিন জলের গান-এর প্রথম অ্যালবাম বের হবে, তার পোস্টারিং করার জন্য রাতের বেলা সব দলবেঁধে বের হলাম … হাতিরপুল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত হাঁটা আর পোস্টার লাগানো … কারা কারা যে ছিলো, সবার কথা মনেও নাই … সন্ধি ছিলো, অন্তু ছিলো বোধহয় – নাকি শান্ত? ,  নাবিলাও কি ছিলো? সাজিদ ছিলো, শানস আর নাহিদ ছিলো … এরকম কারা কারা যেন … আমি তো আবার বহুদিন দেখা না হলে, যোগাযোগ না হলে অনেকেরই নাম ভুলে যাই! … সে কারণে এই মুহুর্তে আর মনে পড়বে না সবার নাম …

 তবে, এক কাজের সূত্রে অনেকগুলা মানুষের সাথে ভালো চেনা পরিচয় হয়েছিলো … এখনো অনেকের সাথেই অনেক নিয়মিত যোগাযোগ আছে … অনেকেই দিনযাপনের নৈমিত্তিকতার অংশ হয়ে গেছে … এটাই তো অনেক …

আজকে সারাদিন নাকি বিশ্ব ভাইবোন দিবস গেছে … ফেসবুকে দেখলাম অনেকেই হ্যাপি সিব্লিংস ডে লিখে তাদের ভাই/বোনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ইমোশনাল পোস্ট দিয়েছে … আমি আগে জানলেও অবশ্য এরকম কোনো পোস্ট দিতাম বলে মনে হয় না … মুড বেশি ভালো থাকলে ফাজলামি টাইপ একটা কিছু দিতাম, সিরিয়াস কিছু মোটেই না! … ‘ আমার ভাই আমার কলিজার টুকরা’ টাইপ ইমোশন আমার কখনোই আসে না! … কলিজার টুকরা যদি হয়ও, সেইটা গদগদ হয়ে বলবার মতো আবেগ আমার কাজ করে না! … আমরা পিঠাপিঠি ভাই বোন…এরকম ভাই বোনদের মধ্যে নাকি অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাঙ্ক সম্পর্ক থাকে … কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক অদ্ভুত। একটা সময় আমাদের মধ্যে প্রচুর কথা হতো, একসাথে বসে সিনেমা দেখা হতো, খেলা দেখা হতো, একই গল্পের বই শাফল করে করে পড়া হতো … কিন্তু এখন ওর সাথে আমার কথা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘ কি অবস্থা?’ ‘এই তো’ ‘বাসায় থাকবি, না হলে?’ ‘আচ্ছা, থাক, হলে গেলাম’ ‘ তোর ল্যাপটপে একটু বসা যাবে?’ ‘ তোর ক্যামেরাটা কি দেয়া যাবে?’ … ইত্যাদি ইত্যাদি … আর মাঝে মাঝে কথাবার্তা হয় ফেসবুকে … কোনো পোস্টের কমেন্টে, কিংবা কালেভদ্রে চ্যাটবক্সে! …

গত কয়েক বছরের মধ্যে ওর সাথে আমার সবচেয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিলো গত বছর আব্বুর সাথে ঝগড়া করে কথা বন্ধ করবার পর। আর এখন এত বছরের মধ্যে গত দুই-তিন মাস হলো সবচেয়ে বেশি ইন্টারঅ্যাকশন হচ্ছে ও প্রাচ্যনাটে স্কুলিং করছে বলে …

তারপরও এখনো পর্যন্ত বাসায় আমার সবচেয়ে কম্ফোর্ট জোন আমার ভাই … যদিও তার সাথে আমার ব্যাক্তিগত বিষয়ের কোনো শেয়ারিং হয় না, তার ব্যাক্তিগত বিষয়-আষয় নিয়ে আমিও মাথা ঘামাই না … তারপরও মাত্র দেড় বছরের পার্থক্য হবার কারণেই বোধহয় আমাদের চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, কাজ কর্ম কোনো না কোনোভাবে একটা কমন প্ল্যাটফর্ম-এ এসে মিলে যায় …

উফ! আজকে দিনযাপন লেখাটা পেইনফুল হয়ে যাচ্ছে … কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা … শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, হেঁটে কোনোভাবেই আরাম পাওয়া যায় না এই কোমর ব্যথায়। কারণ, ব্যথাটা হয় একদমই সায়াটিকা নার্ভের অংশটাতে … পিরিয়ড হইলেই এক একটা যন্ত্রণা আমার মোটেই সহ্য হয়না …কেমন জানি লুথা হয়ে যাই সবকিছুতে … চলতে ফিরতেই ইচ্ছা করে না … আর টিউমারের এখন আরও নাজুক অবস্থা হয়ে যাবার কারণে যন্ত্রণাটা আরও বেশি হয়। আগামী দুই-তিনটা দিন আমাকে এইটা সহ্য করে যেতেই হবে … টিউমারটার কেমন একটা চিনচিন টাইপের ব্যথা হতে থাকে সারাক্ষণ … আরও অসহ্য লাগে … মনে হয় ভেতর থেকে একটা কিছু ক্রমাগত খোঁচাচ্ছে … এই টিউমারটা দিন দিন এত অসহ্য হয়ে উঠছে সবকিছু মিলিয়ে, মাঝে মাঝে মনে হয় আর কোনোদিকে না ভেবে এইটাকে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্তটাই নিয়ে নেই … টিউমারের কথা শুনলেই মানুষ বলে, সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হচ্ছে একটা বিয়ে করে ফেলো, তারপর বাচ্চা নিয়ে নাও, আর বাচ্চা হবার সময় টিউমারটা ফেলে দাও … এই বুদ্ধি তারা দেবার অনেক আগেই আমি ডাক্তারের কাছ থেকে শুনে এসেছি, সেই সম্ভাবনা যেটুকু ছিলো সেটাও নিজেই নিজের হাতে নষ্টও করেছি … এখন যাই করবো সেটাই অনেক রিস্কি হবে, আর ফলাফল নেগেটিভ হবার সম্ভাবনাটাই বেশি … আর, আমার মতো মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই চিনি না জানি না কারো সাথে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ করা সম্ভব না … আর, জীবনটাও সিনেমা না যে ‘সে’ সব ভুলগুলো বুঝে নিয়ে প্রচণ্ড অনুতপ্ত হয়ে এসে বলবে ‘সবকিছুই তো আমার জন্যই এমন হলো … এখন থেকে যাই ঘটুক, আমি আছি’ , কিংবা অন্য কেউ সিনেমার ‘দেবতুল্য’ প্রেমিকের মতো এসে বলবে, ‘যাই ঘটেছে, যাই ঘটুক, আই ডোন্ট কেয়ার … এখন থেকে আমি আছি … ‘ … এই দুনিয়াতে অন্তত আমার মতো বান্দার দায়িত্ব নেয়ার মতো আউলা কেউ আছে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি না … সুতরাং, এই টিউমার পেটের মধ্যে পুষে আসলে নিজের কষ্টই বাড়াচ্ছি …

কিন্তু, আবার আমি এখনো পর্যন্ত বাসায় বলতে পারিনি আমার এই অবস্থার কথা, পারবো বলে মনে হয় না … এই এক টিউমারের কথা বলতে গেলে কেঁচো খুঁড়তে সাপের মতো এত এত লুকানো গল্প বের হয়ে আসবে যে আমার নিজের নাজুক অবস্থান নিয়ে আমি যেভাবে যতটুকু টিকে আছি, সেটাও আর থাকতে পারবো না …অন্তত নিজের ফ্যামিলির কাছে যে ‘কঠিন’ ‘পাষাণ’ ইমেজটা আছে, সেটার বিপরীত রূপটা তাদের দেখিয়ে ফেলে নিজের কাছে হেরে যাওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে …

এক হতে পারে, যদি কখনো কোথাও চলে যাই, আর না ফিরি, আর তার আগে বিশাল চিঠি লিখে সব জানিয়ে যাই … কারণ, তখন তাদের সামনে দাঁড়াবার কিংবা তাদের সাথে কোনো প্রকার ইন্টারঅ্যাকশনে যাবার প্রয়োজন হবে না …

দূরে সরে যাবার উপযুক্ত উপলক্ষ্য বা সুযোগ কোনোটাই হচ্ছে না …কিন্তু আমি খুব চাই, সবকিছু থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যাবার মতো একটা কিছু সুযোগ আসুক আমার … কাছের মানুষদের কষ্ট পাওয়াটা দূর থেকে দেখাটাই স্বস্তিদায়ক …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s