দিনযাপন | ১৪০৪২০১৫

পহেলা বৈশাখে বের হতে আমার একদমই ভালো লাগে না … এত ভিড়, এত মানুষ, এত শব্দ … জীবনে একবারই সকাল সকাল চারুকলা গিয়েছিলাম, ইউনিভারর্সিটিতে সেকন্ড ইয়ারে পরার সময় … অবশ্য সেটাও প্রায় ৭/৮ বছর আগের কথা, আর তখনো মানুষের এত উপচায় পড়া ভিড় হতো না … আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে অমুক তমুক ব্যানার-এ বৈশাখের আয়োজন নিয়ে এই চ্যানেল, ওই কোম্পানি, এই সংগঠন, ওই মিডিয়া বসে পড়তো না … গত তিন/চার বছর যাবত এইসব পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন ইত্যাদি ইত্যাদি দিনে ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকার আশেপাশে যাওয়াটাই একটা নরকযন্ত্রণার শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতবছর চৈত্র সংক্রান্তির রাতে চারুকলায় ছিলাম। সারারাত। বাপ্পি, মুগ্ধ আর আমি … ছবি তুলেছি, আড্ডা দিয়েছি … ভোরবেলা বাসায় এসে ঘুমিয়েছি … গতকালকেও রাতে বাইরে থাকা হবে এমন একটা পরিকল্পনা হচ্ছিলো নোবেল ভাইয়ের উদ্যোগে … কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটা রাত দুইটা পর্যন্ত বাইরে থাকার আয়ত্ত্বে আসলো … এমনিতেই আমার শরীরের অবস্থা বেশি ভালো লাগছিলো না, তারওপর ব্লিডিং … আর সেই সাথে দুপুর থেকে কয়েকদফা হাঁটাহাঁটি করে প্রচণ্ড কোমর ব্যথা শুরু হয়ে গেলো … আর সেইটা তারপর গ্রুপ থেকে বের হয়ে চারুকলা যেতে যেতেই তলপেটের ব্যথায় টার্ন নিলো … মনে হচ্ছিলো কোমরে কেউ একটা শক্ত পাথর বেঁধে দিয়ে বলেছে ‘ এবার হাঁটো!’ … চারুকলা থেকে চাংখারপুল, সেখান থেকে পেনাং রেস্টুরেন্ট, সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে বুয়েটের সামনে এসে রিকশা, আমি সেন্ট্রাল রোড নেমে গেলাম, বাকিরা গেলো রবীন্দ্র সরোবর …

আমার চাংখারপুল থাকতেই মনে হচ্ছিলো কেউ আমাকে ধরে ধরে বাসায় দিয়ে আসুক, চারতলা সিঁড়িটা পর্যন্ত ধরে ধরে উঠায় দিয়ে আসুক … আর আমি ঘরে ঢুকেই বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে পড়ি … সেন্ট্রাল রোডের মোড়টাতে ঢুকতেই দেখলাম ল্যাব এইডের পেছন বরাবর একটার পর একটা ফানুস উড়ে যাচ্ছে। বুঝলাম রবীন্দ্র সরোবর থেকে যে ফানুস ওড়াচ্ছে, সেগুলোই দেখা যাচ্ছে … কি যে অপুর্ব একটা দৃশ্য ছিলো! দুইপাশে বিল্ডিঙয়ের সারি, আর তার মাঝখান দিয়ে ছোট্ট যেটুকু আকাশ দেখা যায়, সেখানে সারি সারি ফানুসের মেলা! … একবার ইচ্ছা হলো চলেই যাই নোবেল ভাইদের সাথে … নিজের চোখে দেখবো ফানুসের মেলা, রবীন্দ্র সরোবর থেকেই দেখবো … সাথে ক্যামেরাও ছিলো … মনে মনে ভিজু্যয়ালাইজও করে ফেললাম যে সেখান থেকে  দৃশ্যটা কেমন হতে পারে … মাথার ওপর শত শত ফানুস, আর নিচে পানিতে তার ছায়া … আট নম্বর ব্রিজটার ওপর দাঁড়িয়ে তুলতে পারে পেছনে সবুজ গাছের সারি … কল্পনা করতেই ভালো লাগলো দৃশ্যটা …কিন্তু ওখানে যাবার ইচ্ছাটাকে দমাতে হলো … কারণ ততক্ষণে এমন অবস্থা হয়েছে আমার যে কেউ যদি রাস্তায় বিছানা পেতে দেয়, তাহলে সেখানেই আমি শুয়ে পড়বো … অনেক মন খারাপ হলো … চোখে পানিই চলে আসলো মন খারাপের চোটে … চুপচাপ দুই তিন ফোটা চোখের পানিকে গড়াতে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম … ‘ধুর শালা! কি যে এক বালের জীবনযাপন করতেসি!’ ভাবতে ভাবতে বাসায় ঢুকলাম মুখ নিচু করে …

সকালে ঘুম ভাঙলো এগারটার দিকে … উঠেই দেখি চমক! লালাম, টিয়াম, ছোটোখালু আর প্রমা এসেছে! … টিয়ামের নাকি কালকে থেকেই আমাদেরকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে, তাই সকালবেলা উঠেই চলে এসেছে … অবশ্য ছিলো না বেশিক্ষণ … বড়জোর ঘণ্টা দেড়েক … তবে দেখা হয়ে ভালো লাগলো তাদের সবার সাথে … আমি তো ক’দিন যাবৎ মিরপুর যাবার সময়ই পাচ্ছি না …

দুপুরে নায়িমীর বাসা, তারপর রওনা দিলাম বুয়েটের উদ্দেশ্যে … বাংলামটর থেকে রাস্তা বন্ধ, হাঁটতে হবে … হেঁটে হেঁটে শাহবাগ হয়ে, টিএসসি পার হয়ে, ফুলার রোডে এসে রিকশা পাওয়া গেলো … অতদূর পথ হেঁটে আবারো আমার কোমর ব্যথা ফিরে আসলো, সেই সাথে পায়ে ব্যথা আর ভুভুজেলার অসহ্য যন্ত্রণাময় শব্দে মাথা ভার হয়ে গেলো … বুয়েটে পৌঁছায় কতক্ষণ বসে বসে আর্কিটেকচারের ছেলেমেয়েদের কালচারাল প্রোগ্রাম দেখলাম …

বুয়েটে অবশ্য আমার যাবার ইচ্ছা ছিলো বিকেলের দিকে … তখন আরাম করে ছবিও তোলা যেতো, আর সবার সাথে দেখাও হতো … বুয়েটে গেলেই তো অনেক পরিচিত মুখের সাথে দেখ হয়ে যায় … অর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট-এই তো কতজন! আমার স্কুলের ফ্রেন্ডরা, ক্লাসমেটরা, অমিতের বন্দু-বান্ধব … সন্ধ্যায় এমনিতেই যখন গেছি তখন সবাই কালচারাল প্রোগ্রাম দেখতে ব্যস্ত, আর অন্ধকারের মধ্যে আমি এক নজরেই সবাইকে খুঁজেও পাই না … অমি আর এশার সাথে দেখা হলো … অমিতের ক’জন বন্ধুর সাথে … কিছুক্ষণ বসলাম বুয়েটে … শাহবাগ, টিএসসি’র ভিড় আর শব্দ পার করে এখানে এসে তবু একটু রিলাক্সড লাগছিলো …

কিন্তু ভালো লাগছিলো না আর বাইরে থাকতে … খুব ক্লান্ত লাগছিলো হঠাৎ করে … গ্রুপে চলে গেলাম … ওখানে তাও ইচ্ছামতো বসবার, বিশ্রাম নেবার সুযোগ আছে …

কালকে ‘আ ম্যান ফর অল সিজন্স’ এর শো … আমার অনেক প্রিয় একটা নাটক … কিন্তু নাটকটার শো হয় দুই কি তিন বছরে এক বার ! …

আগামী কয়েকটা দিন এটা-সেটা অনেক ব্যস্ততা … অথচ আমি নিষ্কর্মা ছুটি খুঁজছি …

কোথাও ঘুরতে যাবার খুব ইচ্ছা হয় … কতদিন কোথাও বেড়াতে যাই না … কিন্তু যাবো কই? … আর আমার তো এক মহা সমস্যা হচ্ছে একা একা কোথাও যেতে মোটেই আমার ভালো লাগে না … ঘুরতে তো না-ই … কখনো পালিয়ে গেলে না হয় একাই চলে যাবো … ইন টু দ্য ওয়াইল্ড …

মন ভালো না … মেজাজ ভালো না …

তবুও ভালো থাকার অভিনয় করে চলছি …

ভালো লাগে না …

ইদানীং অল্পতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় …

নিজেকে অনেক কষ্টে শান্ত রাখি … মুখ বুজে থাকি … হাসি হাসি মুখ … কি আছে জীবনে! …

তারপরও রিকশাওয়ালা, সিএঞ্জিওয়ালা, দোকানদার, কিংবা রাস্তায় ধাক্কাধাক্কি করে চলা মানুষগুলোর ওপর মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না …

অস্থির … সব অস্থির …

ভাল্লাগেনা … ক্লান্ত …

ঘুমায় পড়ি, সেটাই ভালো …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s