দিনযাপন | ২৮০৪২০১৫

২৮ এপ্রিল … রিঙ্কন শিকদার-এর মৃত্যুবার্ষিকী …

২৮ এপ্রিল ২০১২ থেকে ২৮ এপ্রিল ২০১৫ … দেখতে দেখতে তিন বছর হয়ে গেলো ! …

10246637_10154049913960655_1082573847059341495_n

রিংকন দা’র সাথে আমার যে কখনো খুব খাতির আলাপ ছিলো তা না … এমনকি তার সাথে কখনো কোনো কাজও করা হয়নাই … অনেক আগে একবার তার সাথে একটা কাজের কথা হয়েছিলো … সে একটা নাটক লিখবে বলে ভাবছে, সেটাতে আবার সাইকোলজি’র অনেক এলিমেন্ট থাকবে … তাই নাটক লেখা শুরু করার আগে আমার সাথে সাইকোলজিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কথাবার্তা বলবে, এমন একটা আলোচনা হয়েছিলো … তারপর সেই আলোচনা আর হয় নাই … তার সাথে আমার শেষ ইন্টারঅ্যাকশনটা যে খুব পজিটিভ ছিলো তা না … রিঙ্কন দা মারা গেলো ২০১২ তে, ওই বছরই ফেব্রুয়ারিতে অন্দরযাত্রা বলে একটা উৎসব হয়েছিলো প্রাচ্যনাটের … আমার একটা ইন্সটলেশনের দায়িত্ব ছিলো … সবকিছুই রেডি করা, খালি ঝুলিয়ে দেয়ার কাজ বাকি ছিলো… ঠিক ওইসময়ই আমার প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা ইত্যাদি হাবিজাবি … আগের রাতে রাহুল দা’র বাসায় গিয়েছিলাম, কিন্তু প্রচণ্ড মাথা ব্যথার চোটে বিছানা থেকেই উঠতে পারিনি … সময়মতো শিল্পকলা গিয়ে কাজটাও নিজের হাতে করা হয়নি … রিঙ্কন দা সেসময় বেশ বিরক্ত হয়েছিলো আমার ওপর, কারণ আমার শরীরের অবস্থা সে জানতো না … কিন্তু তারপর আর তার সাথে দেখাও হয় নাই, কথাও হয় নাই … সুতরাং আমি জানি না যে ওই বিরক্তিটা পরে মিটেছিলো কি না …

রিঙ্কন দা’র মৃত্যুটা আমার কাছে ক্যামন জানি একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা … তার সাথে যেহেতু আমার আবেগীয় আদান-প্রদান ছিলোই না, তাই সে মারা গেছে তাতে আমার বাঁধভাঙ্গা কষ্ট হচ্ছে ব্যাপারটা অমনও ছিলো না … এমনকি তার সাথে স্মৃতি রোমন্থন করার মতোও ঘটনা একটা কি দুইটা, তাও প্রাচ্যনাট-এর কাজ নিয়েই … কিন্তু তারপরও এই মৃত্যুটা একটা ধাক্কা ছিলো … ক্যামন একটা স্তব্ধ অনুভূতি … তার মৃত্যুর খবর যখন পাই তখন আমি স্কুলে, ক্লাসে যাবো বলে রেডি হচ্ছি … ওই সময় মিতুল ভাই বলল যে ‘ রিঙ্কন নাকি আর নাই!’ … কিভাবে কি হয়েছে, সে আত্নহত্যা করেছে নাকি এক্সিডেন্ট করেছে সেগুলো কিছুই আমি তখনো জানি না … স্কুল শেষ করে যখন তার বাসায় গেছি, তখন জেনেছি কি হয়েছে না হয়েছে …

আগের দিন রাজা এবং অন্যান্য নাটকের রিহার্সাল ছিলো … ২৯ তারিখ শো … ওই রিহার্সালেই তার সাথে সবার শেষ দেখা … ওইদিন আমি কি কারণে জানি রিহার্সালে যাই নাই … তাই আমার সাথে দেখা হয় নাই …

শ্মশান-এ নিয়ে তাকে গোসল করানোর পর যখন চিতায় নেবার আগে সবার শেষবারের মতো দেখার জন্য বাইরের বেদীটায় শুইয়ে রাখলো, তার গায়ে হাত দিয়ে দেখেছিলাম … কি ঠাণ্ডা আর শক্ত হয়ে আছে … গলার মধ্যে দড়ির স্পষ্ট দাগ … আমি এর আগে কখনো কোনো মৃত শরীর ছুঁয়ে দেখিনাই … ক্যামন একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছিলো সেটা … মনে হচ্ছিলো যেন একটা শক্ত পাথরের মূর্তি ধরেছি, যেটা মানুষের চামড়া দিয়ে স্টাফ করা …

প্রায় সাড় তিন ঘণ্টার মতো চিতার আগুনে পুড়ে পুড়ে একটা দেহ ছাই-এ পরিণত হয়েছে … অনেকটা সময় ধরে বসে বসে দেখছিলাম কিভাবে পটপট শব্দ করে চিতার আগুনে একটা শরীর পোড়ে … পায়ের হাড়গুলো পোড়ার সময় কিভাবে পা দুটো উঁচু হয়ে যায়, যেন মানুষটাই জীবিত হয়ে পা উপরে তুলে উবু হয়ে শুয়ে আছে … দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, উপুড় করে না শুইয়ে সোজা করে শোয়ালে কি পুড়তে থাকা দেহটা উঠে বসতো? …

আমি কখনো চোখের সামনে কাউকে কবর দিতেও দেখিনি … কিন্তু একটা দেহকে মাটি চাপা দেয়া হচ্ছে দেখার চাইতে পুড়িয়ে ছাই করা হচ্ছে দেখাটার মধ্যে ক্যামন একটা স্যাডিজম আছে! …

রিঙ্কন দা’র বাবা ওইদিন সারাদিনে একটাই কথা বলেছিলেন, ‘ তোরা দুইটা ছেলে আমার জন্ম সার্থক করে দিয়ে গেলি!’ …

এই কথাটার কারণেই কি না জানি না, রিঙ্কন দা মারা গেছে সেটার জন্য তার প্রতি আমার সমবেদনা নাই … তার বড় ভাই সঞ্জীবন দা-ও প্রাচ্যনাটের সদস্য ছিলেন … উনি রিঙ্কন দা’র মতো হুট করে মারা যান নি, কিন্তু অনেক দিন ধরে একটু একটু করে নিজেকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছেন … সঞ্জীবন দা-কে আমি পাইনি, তার গল্পই শুনেছি … আর রিঙ্কন দা’কে যতটুকুই হোক চোখের সামনে দেখেছি … উনাদের বাবার জীবনটা ক্যামন অদ্ভুত ! নিজের হাতে দুই ছেলের চিতায় আগুন দিয়েছেন … তাও এমন দুইজন ছেলে যারা নিজেদের নিয়ে হতাশ না হয়ে নিজেদের কাজগুলো করে গেলে অনেক বড় কিছু হতে পারতো! … কিছু মানুষ মনে হয় এরকমই হয়! তাড়া স্বপ্ন দেখে অনেক বড় বড়, কিন্তু সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য কি করা যেতে পারে সেটা নিয়ে না ভেবে বরং হতাশাবাদী হবার বিলাসিতা করে, স্বপ্ন নিয়ে কেবল বড় বড় কথাই বলে যায়, আর নিজেদের ‘মিসফিট’ ভেবে ভেবে স্বপ্ন থেকেই দূরে সরে যায় …

স্বপ্ন যদি মনের মতো করেই সত্য হতো তাহলে কি আর তারা স্বপ্ন থাকতো? …

তবুও, স্বপ্নের কাছাকাছি তো একটা কিছু করা যায়, একটা কিছু হওয়া যায় …

রিঙ্ক দা তার ভাইকে নিয়ে লিখছিলো ‘কেরামত নামা’ , আর এখন কেরামতনামা’র সংলাপ আর গানের কথাগুলো পড়তে গেলে মনে হয় যে নিজের কথাই লিখেছিলো সে … ভাইয়ের পথ অনুসরণ করেছে বলেই হয়তো এমনটা মনে হয় …

রিঙ্কন দা মারা যাবার কয়েক মাস পর তার লেখা একটা নাটক দেখেছিলাম টিভি-তে … একটা ছেলে বাবা-মা-প্রেমিকা-সমাজ সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ঘরের ভেতর দড়িতে ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করে … রিঙ্কন দা-ও নিজের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো নিজেকে … ওই নাটকটায় সে নিজের জীবনের গল্পই লিখেছিলো কি না কে জানে! … তার লেখা গান, কবিতা, নাটক সবখানেই সে নিজেই বিদ্যমান বলে মনে হয় এখন ! …

অনেক আগে আমার একটা স্কুলমেট-এর কথা শুনেছিলাম যে সে নাকি ছাদ থেকে পড়ে আত্নহত্যা করেছে … আমার পরিচিত মানুষদের মধ্যে কেউ আত্নহত্যা করেছে সেরকম ঘটনা তারটাই প্রথম শুনেছিলাম … কিন্তু সেটা শুনেছিলাম সে মারা যাবারও অনেক পরে … আর রিঙ্কন দা’র মৃত্যুটা অনেক কাছ থেকে দেখা, শোনা …

আমি অনেক ভীতু মানুষ … নিজের হাতে নিজেকে মারতে ভয় লাগে … ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরে যাওয়াটা তবু কম কষ্টকর … ধীরে ধীরে শরীর নিস্তেজ হবে, অথচ কোনো ব্যথা, কোনো অনুভূতি থাকবে না … মাঝখানে একবার চেষ্টা করারও চেষ্টা করেছি! … কিন্তু সেটা যেই জিদ থেকে করতে চেয়েছিলাম, তিনটা ঘুমের ওষুধ খেতে খেতেই সেই জিদটার আরেকটা রিয়েলাইজেশন ঘটেছিলো … ফলে ‘ শিট! কি করছি!’ টাইপ একটা অনুভূতি নিয়ে বাকি ওষুধগুলো সব ফেলে দিয়েছিলাম … তাই সে যাত্রা আর মরে যাওয়া হয় নাই …

আজকের দিনযাপন জুড়ে রিঙ্কন দা-ই কেবল … সারাদিনে তো আর কিছু ঘটেও নাই … বাসাতেই ছিলাম, সিনেমা দেখলাম শুয়ে শুয়ে… ইন টু দ্যা উডস … ফেয়ারি টেল টাইপ মুভি … আজকে শরীর একটু ভালো … ব্লাডারের চাপ -এর যন্ত্রণা একটু কমেছে …

কিন্তু বেশীক্ষণ বসে থাকতে পারি না … আরেকটা দিন রেস্ট নিলে বসে বসে কাজ করার মতো সুস্থ বোধ করবো আশা করছি …

অনেকগুলা কাজ জমে আছে … শেষ করতে হবে সব … মে মাসের ৫ তারিখের মধ্যে সব কাজ শেষ করে গোছগাছ শুরু করে দিতে হবে …  অন্তত ৫টা দিন ডেডিকেটেডলি গোছগাছের পেছনেই দিতে হবে …

Advertisements

One response to “দিনযাপন | ২৮০৪২০১৫

  1. ” স্বপ্ন যদি মনের মতো করেই সত্য হতো তাহলে কি আর তারা স্বপ্ন থাকতো? …

    তবুও, স্বপ্নের কাছাকাছি তো একটা কিছু করা যায়, একটা কিছু হওয়া যায় … ” ভাল্লাগসে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s