দিনযাপন | ০২০৫২০১৫

মে মাস! …

আমার জীবনে এই মে মাসটার কি জানি একটা গাঢ় প্রভাব আছে … গবেষণা করলে দেখা যাবে মে মাসের ৩১ দিনের প্রায় প্রতিটা তারিখেই লাল দাগ কেটে রাখার মতো স্মৃতি আছে …

এই মাসটা এই বছর আমার জন্য অনেক দুঃসহ … অনেক বেশি দুঃসহ …

যাই হোক, দুই দিন পর আজকে ওয়ার্ডপ্রেস-এ লগ ইন করতে সক্ষম হলাম … মোবাইলের হটস্পটটা যে কতটা কাজের সেইটাই এই দুইদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি …

দুইদিনের সমাচার সেরকম কিছুই লেখার নাই … কারণ সেরকম সিগ্নিফিকেন্ট কিছু ঘটেনাই …

তবে অল্পস্বল্প সাধারণ যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো হয়তো কথায় কথায় চলে আসবে …

আজকে যেমন আমরা রিঙ্কন দা’র স্মরণে ছোটোখাটো একটা আয়োজন করেছিলাম … রিঙ্কন দা’র লেখা গান, কবিতা এসব নিয়ে … এই আয়োজনটা আমার জন্য আজকে একটু বিশেষত্ব বহন করে কারণ ঠিকমতো বাজাতে পারি আর না পারি, কনফিডেন্স থাকুক আর না থাকুক, ভায়োলিন নিয়ে গানের দলের সাথে বসেছি … একটা দুইটা সহজ সরল নোট বাজিয়েছি … এটা অবশ্য নোবেল ভাইয়ের উৎসাহেই হয়েছে … যে যা-ই যতটুকু পারে তাকে দিয়ে ততটুকুর মধ্যেই কাজ করানোর চেষ্টা করার একটা ব্যাপার আছে নোবেল ভাইয়ের … অন্যরা বিষয়টাকে কিভাবে নেয় আমি জানি না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তার এই চেষ্টাটা আমার বেশ ভালো লাগে …

যেমন, আমি যখন মাত্রই গ্রুপে ঢুকি, তখন জুন-জুলাই সেশনের ব্যাচটার নাটক হয়েছিলো ‘ ইনহেরিট দ্যা উইন্ড’ । নাটকটার অনুবাদটা ছিলো দাদুর করা, আর সেজন্য আমিও বেশ উৎসাহ নিয়ে নাটকের রিহার্সাল দেখার জন্য রেগুলার কল টাইমের বাইরে যখন রিহার্সাল হতো, তখনও গ্রুপে গিয়ে বসে থাকতাম … নাটকের অনুবাদকের নাতনী বলেই হয়তো তখন কেউ আমাকে বলতো না যে আপনি নতুন আসছেন গ্রুপে, নাটকে আপনার কাজ নাই আগে আগে আসেন কেন ইত্যাদি ইত্যাদি … তো যাই হোক, সেই নাটকের মিউজিকের ডিরেকশনে ছিলো নোবেল ভাই … ওই সময়েই কি মনে করে আমাকে একটা দৃশ্যে চান্টিং বেল বাজানোর জন্য বসিয়ে দিলো … অথচ তখন মিউজিক সম্পর্কে আমার জ্ঞান ১০০ তে পাশ মার্ক-ও ছিলো না! … কিন্তু বিষয়টা উৎসাহব্যঞ্জক ছিলো … আদৌ কি বাজয়েছিলাম, সেটা কি টোটাল কম্পোজিশনের সাথে খাপ খেয়েছিলো কি না সেটা কিন্তু জানিই না! … তবুও বাজিয়েছি … গির্জার ভেতরে কোয়্যার-এর টিউনের সাথে চান্টিং বেল-এর খাপছাড়া টুংটাং আর কি! …

বাহ! দিনযাপনের বদৌলতে একটা প্রায় হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি কেমন করে সারাজীবনের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে গেলো! … এখন বহু বছর পরেও এই স্মৃতি হারিয়ে যাবে না …

তো, যাই হোক, আজকের দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলতে গেলে এটাই …

অদিতির গায়ে হলুদে যাবার পরিকল্পনা ছিলো একরকম … কিন্তু আমাদের প্রোগ্রামই শেষ হলো প্রায় দশটা বাজে … ওই রাত দশটা সময় একা একা নিকেতন যাওয়ার বুদ্ধিটাকে প্রশ্রয়ই দিলাম না … আর আমার বাসায় ফেরার তাগিদ … সেটা যত রাতই হোক … কিন্তু অদিতির সাথে এই সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি দেখে আরও কনফিউজড ছিলাম যে যদি কোনো ব্যবস্থা না হয় তাহলে তো ঝামেলায় পড়ে যাবো … এরকম অনেক সাত-পাঁচ ভেবে হলুদের প্রোগ্রামে যাওয়ার পরিকল্পনাটা বাদ দিলাম … ও আমাকে একরকম অনুরোধ করে রেখেছিলো যে হলুদের প্রোগ্রামে যেন অন্তত আমি ওর কিছু ছবি তুলে দেই … কারণ, ওখানে ও কোনো প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার রাখেনি … ও আমাকে অনেক আগেই বলে রেখেছিলো যে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ওর বিয়ের প্রোগ্রাম হবে, কিন্তু দিনতারিখ তখনও ফিক্সড হয় নাই … আর এখন ও আমাকে বিয়ের তারিখ যে মে মাসের ২ আর ৩ সেটা জানিয়েছে এপ্রিলের ২৭ কি ২৮ তারিখের দিকে! ততদিনে অলরেডি আমার ২ আর ৩ তারিখের শিডিউল ফিক্সড! … কালকে তাও স্ক্লাস্টিকার কাজ শেষ করে ওর বিয়ের প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করতে পারবো, কিন্তু আজকের দিনটাই পুরা ভেজাল হয়ে গেলো! …

মাঝে মাঝেই এমন হয় যে সবকিছু একসাথে চলে আসে! এই যেমন আজকে একই সাথে রিঙ্কন দা’র প্রোগ্রাম, স্ক্লাস্টিকার নাটক, অদিতির গায়ে হলুদ! … গতকালকেও যেমন একই সাথে আমার মিরপুরে যাওয়ার জরুরত, আবার গর্তের শো, পাপেটের শো … গর্তের শো-তে পারফরমেন্স করার কথা ছিলো, কিন্তু সেটা আগের দিন ক্যানসেল করে দিতে হলো কারণ সেদিন সকাল থেকে মিরপুরেই থাকতে হয়েছে …

আমাদের মিরপুরের বাসার রং পর্যন্ত হয়ে গেছে … আজকে মেইন দরজাও লাগিয়ে ফেলেছে … এখন খালি স্যানিটারি ফিটিংস কেনা বাকি … মনে হচ্ছে মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই বাসার কাজ শেষ করে ফেলবে! … এতদিন যাচ্ছি যাই করতে করতে প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলো … মাত্রই হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম যে আরও মনে হয় ছয়মাস লাগবে, আর এখন দেখা যাচ্ছে এমনভাবেই কাজ আগাচ্ছে যে পারলে কালকেই বাসা রেডি করে দিয়ে দেয়! …

এদিকে বাসায় মোটামুটি জি বাংলা সিরিয়াল চলছে … ইউরিন ইনফেকশনের জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া হলো … আর তারপর টিউমারের কথাও জানলো বাসায় … তো এখন আমার মা ‘ হায় হায়! আমার মেয়ের কি হবে’ টাইপ হা-হুতাশ করে বেড়াচ্ছে … তার এইসকল অতি নাটকীয় আচরণ বরাবরই আমার অপছন্দ … একদমই আর দশটা টিপিক্যাল মহিলার মতো আচরণ শুরু করে মাঝে মাঝে … তার মতো একজন মানুষকে যে এইসব করলে মানায় না, সেইটা তাকে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নাই … সেই ক্ষমতা অর্জন করতে হলে আমাকে হয়তো জঙ্গলে গিয়ে কঠিন তপস্যা করতে হবে …

যেমন, ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট দেখাতে গিয়ে সে ডাক্তারের কাছেই ঘ্যানঘ্যান শুরু করলো যে ‘ আমার মেয়ের কি হবে!’ ‘ ওর বাচ্চা কাচ্চা কেমনে কি হবে’ ‘ডাক্তার দ্যাখেন ও তো বিয়েই করতে চায় না!’ ‘ বিয়ে শাদি না করে বাচ্চাকাচ্চা না নিয়েই কি থাকবে নাকি সারাজীবন’ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি! … আচ্ছা, ডাক্তারের কাছে গিয়ে এইসব করার কোনো মানে হয়? …

আজকে কি করলো? ডাক্তার বলেছিলো যে ল্যাব এইডের টেস্ট-এ তার তেমন ভরসা নাই , অন্য কোথাও করাতে … একজনকে রিকমেন্ড-ও করলেন … মোদ্দা কথা ল্যাব এইডের সাথে ওই ডাক্তারের লিয়াজো কম, আর যার কাছে আরেকবার আল্ট্রাসোনোগ্রাম করানোর জন্য রিকমেন্ড করেছে সেই ডাক্তারের সাথে তার লিয়াজো … ডাক্তাররা তো সাধারণত তাদের পরিচিত সার্কেলের মধ্যেই এইসব রেফারেন্স দেয়, উনিও তাই-ই করেছেন … আল্ট্রাসনোগ্রাম যে এখনি করতে হবে সেটা কিন্তু ডাক্তার বলে নাই … ইউরিন ইনফেকশনের ওষুধের কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো তার কাছে যাওয়া লাগবে না … তো সেজন্য হাতে মাসখানেক সময়ও আছে … আমার মা আমার সাথে কোনো আলোচনা না করেই আজকে নিজে নিজে আল্ট্রাসনোগ্রামের জন্য ওই রিকমেন্ড করা ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসছে … আগামীকাল দুপুর ২টায় তাও আবার! … পেমেন্ট হিসেবে দুই হাজার টাকাও নাকি দিয়ে আসছে! … আর আমি কালকে দুপুর বেলা আড়াইটার মধ্যে স্ক্লাস্টিকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবো … সুতরাং ওই সময় যাওয়া তো আমার পক্ষে সম্ভব না! …

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমার হাতে সময় খুব কম, কয়েকদিনের মধ্যেই মরে যাবো এমন কিছু একটা হয়েছে আর সেজন্য আমার মা-খালারা শোকে বিহ্বল হয়ে ‘হায় কি হলো’ বলে দিন কাটাচ্ছে …

এইসব অতিরিক্ত হাইপারঅ্যাক্টিভ আবেগ দেখলেই আমার গা জ্বলে … ওইদিন খালার বাসায় গেলাম … কি একটা কথায় মজা করতে করতেই বললাম যে টিউমারের কথাটা তাইলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দুনিয়াবাসীকে জানায় দেই … সাথে সাথে বড়খালা মোটামুটি বিশাল এক বানী দিয়ে বসলো … ‘ এইরকম কাজ ভুলেও করিস না! এইসব কেউ ভালোভাবে নেবে না … পরে কে কি বলবে না বলবে … ‘ … মানে সে বোঝাতে চাইলো যে মানুষ এসব যত বেশি জানবে ততই আমার ‘সুপাত্র’ পাওয়ার এবং ‘ বিয়ে হবার’ সম্ভাবনা কমে যাবে! … আমি নিশ্চিত, দুইদিন পর তাদের বয়ান শুরু হবে যে ‘নামায কালাম পড়া শুরু কর’ ‘হিজাব নিয়ে নে’ ‘ তুই অমুক তমুক টাইপ চলাফেরা করিস দেখেই আল্লাহ এরকম একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্যে তোকে ফেলসে’ ‘ একটু আল্লা-বিল্লা কর’ ‘এই তাবিজ নে’ ‘ ওই তাবিজ নে’ ইত্যাদি ইত্যাদি …

সে যদি জানে আমার ‘দিনযাপন’ -এর কথা, এবং সেখানে কি কি লিখি … তাহলে তো মনে হয় হার্টফেইল করেই মারা যাবে! …

মনে হচ্ছে ‘ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড’ মুভিটার ওই ছেলেটার মতোই পালিয়ে যেতে হবে … এইসব নাটকের মধ্যে যত থাকবো ততই নিজের মেজাজ-মর্জিই বেহুদা খারাপ হবে … না এরা আমাকে বুঝবে, না আমি তারকে বোঝাতে পারবো যে ‘ হোয়াটএভার ইট ইজ, দিস ইজ মি’ … এদের এই ‘ তোর কি হবে রে’ টাইপ আবেগের এত আতিশয্য সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে! …

ভাবতে অবাক লাগে যে এই ২০১৫ সালে এসেও আমার এরকম চার দেয়ালের মধ্যেই জীবনযাপনের সবকিছু আটকে ফেলা মা-খালাদের সাথে জীবনযাপন করতে হয়! অথচ এরা প্রত্যেকেই যথেষ্ট বাইরে বাইরে কাজ করা মানুষ, অনেক ধরণের মানুষের সাথে তাদের কাজ করার, কাজের সূত্রে মেশার অভিজ্ঞতা আছে … অথচ তারপরও দিনশেষে তাদের চিন্তার গণ্ডি ওই ‘ আল্লাহ কি শাস্তি দেবে’ আর ‘ সমাজের মানুষ কি বলবে’ -তেই সীমাবদ্ধ! …

আর আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এইরকম মানুষের সংখ্যাই কেন জানি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে চারপাশে ! … মন খুলে উদার হবার বদলে সবাই দিন দিন কেমন খুপরির মধ্যে নিজেদের মনকে, আর চিন্তা প্রক্রিয়াকে আবদ্ধ করে ফেলছে …

খুবই পেইনফুল বিষয় এটা … ওইদিন দেখি ডাক্তারও বলছিলো যে ‘ ৫% এর মধ্যে না থেকে বাকি ৯৫% এর দিকে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ’ … তার কথা শুনে আমি মনে মনে বেশ হাসলাম … সবাই এভাবেই চিন্তা করে বলেই আমার মতো মানুষেরা ৫% -এর খাতে পড়ে … এটা যদি ৫% না হয়ে ৫০% হতো, তাহলেই শুধু বাংলাদেশ না, সারা দুনিয়ার চেহারাই পালটায় যেতো … সেটা হয় না বলেই আমাদের মতো ৫% মানুষদের এত সমস্যা … ওইদিন উত্তরটা দেই নাই … আরেকদিন ডাক্তারের কাছে গিয়ে এইসব প্রসঙ্গ আসলে অবশ্যই একটা গোছানো উত্তর দিয়ে আসবো … কারণ আমি এই ৫% -এর মধ্যেই থাকতে চাই … ভেড়ার পাল যেদিকে যাচ্ছে অন্ধের মতো সেদিকেই পা বাড়াতে চাই না …

কিন্তু, চারপাশে তো ভেড়ার সংখ্যাই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s