দিনযাপন | ০৪০৫২০১৫

গতকালকে দিনযাপনে যা যা লিখবো বল্যে ভাবনা ছিলো, তার কিছু জিনিস আর লেখা হয়ে ওঠেনি । একে তো ক্লান্ত ছিলাম, আর দ্বিতীয়ত কালকের দিনযাপনে আসলে ভিন্ন প্রসঙ্গই চলে আসলো …

তো, মন্দ্রিয়ানের পেইন্টিং নিয়ে একটা কোয়েন্সিডেন্স-এর ঘটনা লিখতে চাইছিলাম । ইন ফ্যাক্ট ঘটনাটা সেই ২ তারিখ ঘটেছে, কিন্তু সেদিন থেকেই লেখার সুযোগ পাচ্ছি না। পিয়েত মন্দ্রিয়ান-এর কাজ আমার বরাবরই ভালো লাগে। কিন্তু আমার একটা বাজে অভ্যাস হচ্ছে যে আমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্টিস্ট-এর নাম মনে রাখতে পারি না … এমন না যে নামটা আমি ভুলে যাই, কিন্তু যখন কোনো কাজ দেখি তখন আর কাজ আর শিল্পীর নাম একসাথে কোডিং করতে পারি না … তো, গত কয়েকদিন যাবতই এরকম একটা ব্যাপার হচ্ছিলো । মিরপুরের বাসায় মন্দ্রিয়ানের পেইন্টিং-এর প্যাটার্নে কিছু কাজ করবো বলে ভাবছিলাম। মোটামুটি পুরো বাসার ইন্টেরিয়র সেভাবেই সাজানোর ইচ্ছা। যেমন ধরা যাক একটা শেলফ দেয়ালে ঝুলছে, সেটার ভেতরটা লাল রং করে দেবো। আবার ওই এই দেয়ালে আর কিছু রাখলে সেটাকে হয়তো নীল রং করে ফেলবো … তারপর বিস্কিট কালারের দেয়ালে লাল আর নীল আয়তাকার দুইটা বস্তু একটা প্যাটার্ন তৈরি করবে … কিংবা জানালার কাচগুলোতে মন্দ্রিয়ানের পেইন্টিং-এর মতো করে স্টিকার লাগাবো, তাহলে যেটুকু রোদ এসে ফ্লোর টাইলসে পড়বে, তার ছায়াটাও একটা প্যাটার্ন তৈরি করবে … কিন্তু, ঘটনা হলো যে আমি পেইন্টিংগুলো যে নেটে খুঁজে দেখবো, তার জন্য তো আর্টিস্টের নাম দরকার! আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না যে আর্টিস্টটা কে! ফলে বিস্তারিত গবেষণা করারও সুযোগ হচ্ছিলো না … শেষমেষ যখন ভাবছি যে আমি নিজেই না হয় ওই আর্টিস্টের স্টাইলে কিছু প্যাটার্ন ডিজাইন করে নিবো, তখনই তার নাম মনে করার সুযোগ হয়ে গেলো! …

সব্যদা ক্লাস নিচ্ছিলো প্রাচ্যনাটে … ডিজাইন -এর ক্লাস … সেদিন আমিও কি মনে করে ক্লাসে গিয়ে বসলাম … ডিজাইন এর ব্যাপারে তো আমি সবসময়ই ইন্টেরেস্টেড, আর সব্যদা’র ক্লাস সবসময়ই ভালো হয় বলে জানি …উনি যখন পাঠশালায় আর্ট হিস্ট্রির ক্লাস নিতো তখনই সবার কাছে শুনতাম …  সেজন্যই আরও আগ্রহ নিয়ে বসা … তো, সেখানে সব্যদা ডিজাইন এর ব্যাপার স্যাপার বোঝাতে গিয়ে কথায় কথায় বিভিন্ন আর্টিস্ট আর তাদের স্টাইলের রেফারেন্স দিচ্ছিলো … এ পর্যায়ে হঠাৎ মন্দ্রিয়ানের প্রসঙ্গ তুলে আর প্যাটার্ন পেইন্টিং-এর কথা বললো … আর আমি তখন মনে মনে ব্যাপক খুশি হয়ে ভাবলাম যে আজকের ক্লাসটায় এভাবে হঠাৎ এসে বসেছিলাম মনে হয় এজন্যই যে এরকম হঠাৎ করে মন্দ্রিয়ানের নামটা মনে পড়ে যাবে! …

লাইফে মাঝে মাঝেই এরকম কাকতালীয় ঘটনা ঘটলে বেশ আনন্দ পাই …

আজকে সারাদিন স্বপ্ন বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম … ভোরের দিকে একবার ঘুম ভাঙলো, তারপর আবার ঘুমিয়ে গেলাম … সেসময় একটা স্বপ্ন দেখলাম … একজনকে নিয়ে বেশ ইন্টিমেট একটা মোমেন্টের স্বপ্ন … সেটা দেখার পর থেকেই স্বপ্ন জিনিসটার সাইকোলজি নিয়ে সারাদিন ভাবনা কাজ করতে থাকলো … এই ভাবনাটা আমার নতুন না মোটেই … স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে আমি সবসময়ই অনেক গভীরভাবে ভাবি … সে প্রসঙ্গে দিনযাপনেই মাঝখানে এক দুইদিন লিখেছিলাম … আজকে কি স্বপ্ন দেখে এই চিন্তাটা মাথার মধ্যে গেঁথে আছে সেটা না হয় না-ই বলি … স্বপ্নটা ভাবিয়েছে এটাই আসল কথা … আমি সাধারণত মানুষকে নিয়ে ইন্টিমেসি’র স্বপ্ন খুব কমই দেখি … তাই যখনি কাউকে নিয়ে ওরকম কোনো স্বপ্ন দেখা হয় তখন সেটা ভাবায় … কারণ, স্বপ্ন যদি অবচেতন মনের সাথে সম্পর্কিত হয়েই থাকে, তাহলে যাকে নিয়ে এরকম স্বপ্ন দেখলাম তাকে নিয়ে কি অবচেতনে আমার মধ্যে কোনো ভাবনা আছে কি না, সেইটা নিয়েই তখন গবেষণা করতে থাকি …

যেমন, ক্লাস টেন -এর শেষে নাকি এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার আগে আগে সেটা ঠিক মনে নাই, তখন এক জায়গায় বাংলা মডেল টেস্ট দিতে যেতাম। সেখানে একটা ছেলে ছিলো, ওকে চিনি না, জানি না, কোনোদিন ইভেন হাই- হ্যালোও বলি নাই, কিন্তু মাঝখানে ক’দিন তাকে নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতাম! খুব রোমান্টিক স্বপ্ন সেরকম না … খুবই সিম্পল … হয়তো দেখলাম যে আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি, আর বের হয়েই দেখলাম সে সাইকেল নিয়ে বাসার সামনে দাঁড়ায় আছে! [ অথচ সেই ছেলে সাইকেল চালাতো কি না সেটাও আমি জানতাম না!]  … কিংবা আমি রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছি, সে আমার পাশে পাশে হাঁটছে [ রাস্তাটা আবার দেখা যেতো হলিক্রস কলেজের মাঠের ভেতরের রাস্তা, যেখানে তার ঢুকতে পারারই কথা না!] ইত্যাদি ইত্যাদি … তখন ওই স্বপ্নগুলো আমি একটা ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম কারণ সেগুলো আমাকে অনেক ভাবিয়েছিলো … অনেক বছর পরেও যখন আবার সেগুলো পড়েছি, তখনও ভাবতাম যে কেন আউট অব নোহোয়্যার ওই ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম! …

স্বপ্ন জিনিসটা আসলে অনেক অদ্ভুত! … একই সাথে অনেক ইন্টেরেস্টিং! … নিজেকে নিয়ে ভাবনার জন্য অবশ্যই …

আজকে আমার একজন বন্ধুর জন্মদিন … নাহ! ‘বন্ধু’ শব্দটা তার ব্যাপারে খাটে না … একসময় তার সাথে আমার বেশ খাতির ছিলো, কিন্তু তারপর বহুবছর যাবৎ সেটা নাই … তবে তার সাথে পরিচয় না হলে আমি জানতাম না যে এমন অনেক ছেলে আছে যারা মেয়েদের সাথে প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে মেশে জাস্ট বিকজ তারা তাদের ফ্রেন্ডদের সাথে বাজি ধরে যে ‘ অমুক মেয়েরে আমি পটায় দেখাচ্ছি! জাস্ট ওয়েইট!’ … সে একটা বিশাল সাজানো নাটকের মধ্য দিয়ে ইমোশনাল কথাবার্তা আর আচরণ এর মাধ্যমে আমাকে পটিয়ে বাজিতে জিততে সক্ষম হয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু পরে বিভিন্ন কারণে যখন সেগুলো সে নিজেই আমাকে জানিয়েছিলো, তখন আর তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো থাকে নাই … সেই মহাকাব্য এখন না হয় বাদ দেই … একটাই খালি মজার বিষয় বলি না হয় … ব্যাপারগুলো এমন হয়েছিলো যে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার মাঝখানেই বিভিন্ন ঘটনার কারণে তার সাথে আমার অনেক ক্যাচাল ছিলো, আর আমি প্রচণ্ড বিরক্তি আর মেজাজ খারাপ নিয়ে পরীক্ষা দিতাম … এমনও হয়েছিলো যে পরদিন পরীক্ষা, আর আমি বইয়ের ফাঁকে মুখ গুঁজে সারাদিন ধরে কেঁদেছি … ফলাফল, পরীক্ষা দিয়েছি আগে যা পড়েছি, যা মডেল টেস্ট দিয়েছি সেই বিদ্যা দিয়েই … তারপরও দেখা গেলো যে সে সায়েন্সের স্টুডেন্ট হয়েও তার জিপিএ আমার মতো একজন হিউম্যনিটিজ-এর স্টুডেন্ট এর চেয়ে কম! … তো, সেটারই ফল সে পেয়েছিলো ভর্তি পরীক্ষার সময় … বুয়েট-এ সে চান্স পায়নাই … শেষমেষ গিয়ে খুলনায় পড়াশোনা করেছে … ততদিনে তার সাথে আমার যোগাযোগ একদমই নাই বললেই চলে … আমি ততদিনে হেসেখেলে পিকনিক পিকনিক মুডে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে অনেক উপরের সিরিয়ালে থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছি … তো, একদিন সে ফোন করে আমাকে বেশ কড়া কড়া কথা শুনিয়েছিলো … কথার সারমর্ম ছিলো এই যে আমার সাথে সে যাবতীয় সাজানো নাটক করেছে বলে আমি নাকি তাকে অভিশাপ দিয়েছি, আর সেজন্যই নাকি এত খাটাখাটনি, পড়াশোনা করার পরেও তার রেজাল্টের এই অবস্থা! আমার কারণেই তার বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ হয়ে গেছে! …

আমি সেইসময় হাসবো না কাঁদবো সেটাই বুঝে পাইনাই! …

পরে তার ওই ফোনের কথাবার্তার উত্তর আমি তাকে একটা চিঠিতে দিয়েছিলাম … আর তার প্রত্যুত্তরে সে তার দুই মেরুদণ্ডহীন তেলানো টাইপ বন্ধু  নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে এসে আমাকে দুনিয়ার কথাবার্তা শুনিয়ে গিয়েছিলো … ইনস্ট্যান্টলি আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু পরে আমার অনেক বেশি হাসি এসেছে … কারণ, যে চিঠিটা আমি লিখেছিলাম, সেটা ইংরেজিতে ছিলো, আর সেখানকার অর্ধেকের বেশি কথাই সে উল্টা বুঝেছিলো! … তখন আমার তার প্রতি করুণাই হয়েছিলো! ইংরেজি ভালো জানে না বুঝলে তো আমি বাংলাতেই চিঠি লিখতাম! … তাহলে অন্তত উল্টা বুঝে এত কষ্ট করে অত কথা বলে নিজের শক্তি ক্ষয় করতে হতো না …

কিছু কিছু ছেলে মানুষ পারেও! … আর আমারও কিভাবে কিভাবে জানি এইসব প্রচণ্ড ইগোসেন্ট্রিক ছেলেদের সাথেই খাতির হয়! …

তো, কয়েক মাস আগে ‘সে’ যখন ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে পোস্ট দিয়ে বেড়াচ্ছিলো যে আমি তার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছি, তার টুট টুট মেরে দিয়েছি, তখন আমার আবারো বহুবছর আগের এই ঘটনাটার কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো! …

কি জানি ! আমারই মনে হয় সমস্যা আছে! কোনো সুপারপাওয়ার আছে মনে হয়! ফলে, আমার সাথে যে-ই দুই নাম্বারি করে তারই উল্টা মনে হয় যে তার জীবন যৌবন সব ধ্বংস হয়ে গেছে আমার কারণে ! … কিন্তু আমি তো সজ্ঞানে সচেতনভাবে তাদেরকে অভিশাপ দেই না, কিংবা তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাক এমন কিছু করি না! … তাহলে ক্যামনে কি? …

ছেলেদের এই ইগোসেন্ট্রিজমটা বেশ মজার … যখনি তারা কোনো বিষয়ে মেয়েদের সাথে পেরে ওঠেনা, কিংবা প্রচণ্ড মিজারেবল সিচুয়েশনের মধ্যেও যখন কোনো মেয়ে এগিয়েই যেতে থাকে, তখন তারা ওই মেয়েদেরকে বিভিন্নভাবে হিউমিলিয়েট করতে থাকে! … এই জিনিস কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘটে অবশ্যই, কিন্তু বন্ধুত্ব, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কম হয় না! …

আগে আমার এসব ঘটনায় অনেক রাগ উঠতো, মনে হতো যে কি সমস্যা আমার যে এদের সাথে কয়েকদিন খাতির থাকার পরেই সবকিছু ক্যাচাল লেগে যায়? … আর এখন হাসি পায় … মনে হয় যে আমার সমস্যা এটাই যে আমি অনেক বেশি ‘আমি’ হয়েই চলি, কারো জন্য নিজেকে নেগোশিয়েট করি না, কিংবা কম্পেন্সেট করি না …

এই এমন সেদিন, গ্রুপে বসেই জার্নাল ভাইয়ের সাথে বেশ মৃদু তর্কাতর্কি হয়ে গেলো … তার বক্তব্য এই যে আমি ঘরে যেমন, বাইরেও তেমন … কিন্তু বাইরে যে নিজেকে একটু সবার সাথে মিলিয়ে অনেক সাতপাঁচ ভেবে চলতে হয়, সেটা আমি করি না … তো আমি তাকে এটা বোঝাতে ব্যর্থ হলাম যে আমি যা তাই-ই তো সব জায়গায় প্রকাশ পাবে … আমি মানুষটাই যদি এমন হই যে যেটা যেমন মনে হয়, সেই অনুভূতিটাই সবজায়গায় প্রকাশ করি, তাহলে তো আমি ঘরে-বাইরে সবাজায়গায় একই কাজই করবো! … যেমন, সে হুদাই একটা ফাঁপরবাজি করে পরে সেটা ‘ফান’ করছে বলে ম্যানেজ করতে চাইছিলো, যেটা আমার একদমই ভালো লাগে নাই, তাই মুখের ওপর বলেছিলাম যে তার সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না … সেই প্রসঙ্গ থেকেই যাবতীয় জ্ঞান দান …

আর আমার কথা হচ্ছে, কি করলে মানুষ আমাকে পছন্দ করবে সেই চিন্তা-ভাবনা করে যদি আমাকে চলতে হয়, তাহলে তো আমি নিজের মনুষ্যত্ব বলে আসলে কিছু থাকবে না! … অন্যের কি বালটা আসলো গেলো, তার জন্য আমি আমার ‘আমিত্ব’  কেন বিসর্জন দেবো! …

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে চারপাশে সেসব মানুষের সংখ্যাই বেশি যারা সবার সাথে তাল ঠিক রেখে চলতে গিয়ে নিজের যে একটা ‘নিজস্বতা’ বলে কিছু থাকে সেটাই হারিয়ে ফেলে, আর ওই গোঁজামিল দেয়া চরিত্রটাকেই ‘নিজস্বতা’ বলে চালিয়ে যেতে থাকে … কথায় কথায় তারা বলে ‘আমি এরকমই’ , অথচ ক্রমাগতই তাদের কথায় ও কাজে প্রমাণিত হয় যে ‘তারা মুখে এক আর মনে আরেক’ …

অনেক তাত্ত্বিক কথাবার্তা হয়ে যাচ্ছে … আর বেশি আগানো ঠিক হবে না … আজকে এমনিতেই অনেক কথা লিখে ফেলেছি …

অতএব, আজকের মতো এখানেই লেখা শেষ করা যাক …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s