দিনযাপন | ১০০৫২০১৫

গতকালকে লেখার মতো অনেককিছু থাকা সত্ত্বেও দিনযাপন লিখবো বলে বসবার কোনো সুযোগই পাইনি … একই সাথে একই সময়ের মধ্যে যদি তিনটা ডেডলাইনের কাজ নিয়ে বসতে হয়, এবং তিনটা কাজেরই যদি শেষ সময়সীমা একই দিনে থাকে তাহলে আর কিছু করার কি সুযোগ থাকে? … প্রচণ্ড রকমের হেকটিক একটা রাত গেলো কালকে … কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা আগে করবো টাইপ অবস্থার মধ্যে ছিলাম লিটেরেলি …

যাই হোক, কালকে সন্ধ্যা সময়টা কাজে লাগাতে পারলে হয়তো কাজের চাপ অনেকটাই কমতো … কিন্তু সন্ধ্যায় হঠাৎ পরিকল্পনায় সিনেমা দেখতে গেলাম বসুন্ধরা সিটিতে … তিন্নি আপু আর আমার প্ল্যান হলো যে সিন্ডারেলা দেখবো … গতকালকেই সেটার লাস্ট শো ছিলো … আমি একবার দোনমনো করেও শেষে রাজি হয়ে গেলাম … কারণ এই মুভিটা বড় পর্দায় দেখার একটা ইচ্ছা আমার ছিলো … তো ঠিক হলো যে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার শো দেখবো … এর আগে বাটা সিগন্যালে একটা কাজ ছিলো, সেটা শেষ করে আধাঘণ্টার জন্য গ্রুপে গেলাম … সেখানে গিয়ে কথায় কথায় সিনেমা দেখতে যাবো শুনে মেবিন-ও আগ্রহ প্রকাশ করলো যে ও- ও যাবে … যেহেতু ওখানে গিয়ে টিকিট কাটা হয়েছে তাই কারো যুক্ত হওয়াটাই সমস্যা ছিলো না … ফলে তিন্নি আপু আর আমার সাথে মেবিনও যুক্ত হয়ে গেলো …

এরকম হুটহাট প্ল্যান করে একটা কিছু করে ফেলা বিষয়টা আমার বেশ ভালো লাগে … তিন্নি আপু’র চরিত্রের একটা মজার বিষয় হচ্ছে সেও এরকম হুটহাট প্ল্যান করে একটা কিছু করে ফেলা টাইপ মানুষ … অন্তত আমার চাইতে কয়েকগুণ বেশি সে এই ব্যাপারে অ্যাক্টিভ … ফলে সিনেমা দেখা, খেতে যাওয়া কিংবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ‘উঠলো বাই তো মক্কা যাই’ টাইপ প্ল্যানগুলা তার সাথে অনেক স্বচ্ছন্দে্য করা যায় …

তো, কালকের প্ল্যানটাও সেরকমই ছিলো …

গতকালকে মুভি দেখার সময় একটা মজার ঘটনা ঘটেছে … যদিও ঘটনার এই মজাটা একপাক্ষিক … কারণ আমাদের জন্য এটা মজা হতে গিয়ে আরেকজনের জন্য এটা বিরক্তিকর একটা ঘটনা হতে হয়েছে … ইন্টারভ্যাল-এর সময় তিন্নি আপু বের হলো আমার আর মেবিনের জন্য ড্রিঙ্কস আর তার নিজের জন্য হাল্কা কিছু খাবার আনতে … সে অর্ডার দিয়েছিলো পেস্ট্রি, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কাউন্টারের লোক তাকে ভুল করে চিকেন স্যান্ডউইচ দিয়ে দিয়েছে … পেস্ট্রির দাম ৭০টাকা, আর চিকেন স্যান্ডউইচ এ দাম খুব সম্ভবত ১৫০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে! আমাদের ধারণা অন্য কেউ চিকেন স্যান্ডউইচ অর্ডার দিয়েছিলো, কিন্তু তার সাথে তিন্নি আপুর কুপন মিক্সড আপ হয়ে গিয়ে তাদের অর্ডারও ইন্টারচেঞ্জড হয়ে গেছে! …

আমি ভাবছিলাম যে যার চিকেন স্যান্ডউইচ পাবার কথা, কিন্তু পেস্ট্রি পেয়েছে তার রিঅ্যাকশনটা কি ছিলো! … তিন্নি আপু না হয় ৭০ টাকা খরচ করে দ্বিগুণ দামের জিনিস পেলো, তার তাতে লস হয় নাই, কিন্তু যে প্রায় ১৫০ টাকা খরচ করে অর্ধেক দামের একটা খাবার পেলো তার কেমন লাগছিলো ? ! … সে তখন কাউন্টারের লোকজনকে কিরকম ভাবে মনে মনে গালি দিচ্ছিলো? সে কি বিরক্ত হয়ে আর সিনেমার বাকি অংশ মনোযোগ দিয়ে দেখতেই পারেনাই? নাকি তারও এই ঘটনায় কিছু আসে যায় নাই এবং আমাদের মতোই সেও ‘ আরে ইন্টেরেস্টিং তো’ ভেবে নিয়ে ব্যাপারটা এঞ্জয় করেছে?

এইসব টুকরো ঘটনাগুলো আমাদের জীবনের প্রতিটা মুহুর্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে সেটা নিয়ে ভাবতে আমার বেশ ভালো লাগে …

যেমন ধরা যাক, আমি কোনো একটা রিকশায় উঠলাম এবং সেই রিকশাওয়ালার সাথে আমার ব্যাপক তর্কাতর্কি হইলো … তারপর আমি ভাড়া না দিয়েই সেই রিকশা থেকে নেমে গেলাম … তারপর সে যখন পরের প্যাসেঞ্জার ওঠাবে তখন কিংবা দিনের বাকি অংশে এই ঘটনার প্রভাবে সে কেমন আচরণ করবে? …

হিউম্যান বিহেভিয়র বিষয়টা যেমনটাই জটিল, তেমনটাই ইন্টেরেস্টিং …

যাই হোক, মুভি দেখে বের হবার পর তিন্নি আপু চলে গেলো কারওয়ানবাজারের দিকে, আমি আর মেবিন রওনা দিলাম পান্থপথের দিকে … পান্থপথের মোড়ে এসে আমার মহা অস্বস্তি শুরু হয়ে গেলো … এই জায়গাটায় একটা সময় এতবার এসেছি, কখনো ‘তাকে’ টাকা দেয়ার জন্য, নয়তো দেখা করার জন্য … আর এখন ওই এলাকার আশপাশ দিয়ে গেলেই মনে হয় যে যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তাইলে আমি কি করবো? তো আমি ভাবছিলাম যে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা নিয়ে নেই, কিন্তু মেবিন হঠাৎ প্রায় জোর করে আমাকে রাস্তা পার করায় একেবারে ওই ‘ডেঞ্জার জোন’ -এই নিয়ে ফেললো … আমি ভাবলাম ও হয়তো একা একা রিকশা ঠিক করতে চায় না বা এরকম কিছু … সে বললো সামনের ক্লাউড ব্রিস্তো -তে বসে এক কাপ কফি খেয়ে তারপর যাও … ক্লাউড ব্রিস্তো! মানে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে সে ওই রাত ৯টা/১০টার দিকে সাধারণত চা খায়, নয়তো এলাকার দুই ফ্রেন্ড-এর সাথে গল্প করে সেখানে! … সাথে সাথে ঘড়িতে সময় দেখলাম … মনে হলো যে হার্টবিট বাড়তে শুরু করেছে … নার্ভ সচল হয়ে গেলো কয়েকগুণ … ভাবতে লাগলাম এখন যদি ওর সাথে দেখা হয়ে যায় তাইলে কেমনে কি করবো? মেজাজ ঠিক রাখবো কিভাবে তারপর? শান্ত থাকতে পারবো তো? … রাতটা কেমন যাবে? … প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ থাকবে নাকি কান্নাকাটি করবো? … এইসব ভাবতে ভাবতে সামনে আগালাম … ক্লাউড ব্রিস্তোতে ঢুকবার সময় তাকে দেখলাম না … মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, কিন্তু তারপর মনে হলো বের হবার সময় যদি দেখা হয় তখন? তারপর কেন জানি মনে মনে ইচ্ছাই হলো যে ‘ দেখা হোক’! নিজের সাথে নিজের একটা পরীক্ষা হয়ে যাক! … ক্লাউড ব্রিস্তোতে বসেও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম … যদি তাকে দেখা যায়! … দেখলে কি হতো জানি না! … সেটা জানার জন্যই হয়তো দেখতে চাচ্ছিলাম! …

যাই হোক, গতকালকে আর দেখা হলো না … কিন্তু সত্যি সত্যিই এটা এখন ‘তার’ ব্যাপারে আমার একটা ‘গ্রেটেস্ট ফিয়ার’ যে তার সাথে যদি রাস্তায় চলতে ফিরতে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, তাহলে আমি কি ফিল করবো! তার সাথে হয়তো বা কথা বলবো না, চিনি না জানি না ভাব নিয়ে অন্য দিকে ফিরে চলে যাবো … কিন্তু মনের ভেতর কি চলবে? … ‘তাকে’ নিয়ে ভাবলেই তো আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, আর চেহারা দেখলে তাহলে কি হবে? … এই কয়েকদিন আগেই তারা ‘ফটো মেকার’ গ্রুপের সবাই মিলে মাওয়া-তে ফটোওয়াকে গিয়েছিলো … ওই গ্রুপে কিছু কিছু ফটোগ্রাফারের ছবিতে তাকে দেখলাম … তখন আবারো মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো কোনো কারণ ছাড়াই … এখন মনে হচ্ছে যে তার যেসব বন্ধুবান্ধবের সাথে আমার ফেসবুকে অ্যাড করা আছে তাদেরকেও আনফ্রেন্ড কিংবা ব্লক করে দেয়াই ভালো … সে কি করে, না করে সেগুলো না জানি, সেটাই ভালো …

হয়তো কোনো একদিন তাকে রাস্তায় কোনো একটা মেয়ের সাথেও দেখতে পারি … ওর মতো ছেলেরা যতই মুখে বড় বড় কথা বলুক না কেন, আসলে মেয়েদের সাথে কোনো না কোনো সম্পর্ক ছাড়া থাকতে পারে না … সো, আজ হোক কাল হোক সে নিশ্চয়ই আবারো কারো সাথে ইনভল্ভড হবে আর তারপর বিভিন্ন সময় কথাপ্রসঙ্গে সেই মেয়েকে বলবে আমি কত খারাপ যে তার সাথে এই করেছি, ওই করেছি, টাকা দিয়েছি, তারপর আবার সেই টাকা নিয়ে তাকে ‘খোঁটা’ দিয়েছি, আমি প্রচণ্ড অ্যাগ্রেসিভ ব্লা ব্লা ব্লা … সে মাঝে মাঝে আমার কাছে তার কোনো একজন ‘এক্স গার্লফ্রেন্ড’ এর গল্প করতো ঠিক এরকম করে … আমি তার গার্লফ্রেন্ড ছিলাম না, কিন্তু তার সাথে আমার যে সম্পর্কই থাকুক না কেন, আমার ব্যাপারেও সে হয়তো এরকম করে অন্যকে বলবে, কারণ তার মতে আমি তো ‘তার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছি’ !

কিংবা … হয়তো অলরেডিই তার কারো সাথে এখন ইনভল্ভমেন্ট আছে! … কে জানে! …

ধুর! কেন যে আমি এখনো ‘তাকে’ নিয়ে এত কিছু ভাবি! … সত্যি সত্যি যদি এমন কোনো উপায় পাওয়া যেতো যে তার ব্যাপারে সবকিছু আমি ভুলে যাবো, তাহলেই আসলে সবচেয়ে ভালো হতো! … তার কথা এত বেশি বেশি ভাবি দেখে মাঝে মাঝে নিজের ওপরেই আমার প্রচণ্ড বিরক্তি আর ঘৃণা কাজ করে …

ইন ফ্যাক্ট, তার কথা না, আমার সাথে তার যাবতীয় আচরণের কথা …

সব ভুলতে হবে … সব …

কিছুই মনে রাখতে চাই না … কিছুই না … সে, আমি, আমরা … কিছুই না …

আজকে সারাদিনের তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই … রাতে প্রচণ্ড চাপ নিয়ে কাজ করেছি বলেই কি না জানি না, সকাল থেকে মাথা ব্যথার চোটে অস্থির হয়ে গেলাম … যেখানে সকালে ১১টার দিকে মিরপুর যাওয়ার কথা, সেখানে বাসা থেকেই বের হলাম ১২টার পর … মিরপুর যাওয়া আসাও একটা হেকটিক ব্যাপার … ফলে আরও কাবু হয়ে গেলাম … বিকেলে বাসায় ফিরে আবার ঘুম দিলাম ঘন্টাখানেকের জন্য … সন্ধির সাথে চারুকলায় একটা এক্সিবিশন দেখতে যাবো বলে প্ল্যান ছিলো, কিন্তু আজকেই আবার স্ক্লাস্টিকার ছবিগুলো দিতে হতো বলে ওইগুলা প্রিন্ট করানোর জন্য বের হলাম… ফলে এক্সিবিশনটায় আর যাওয়া হলো না … গ্রুপের রিহার্সাল শেষে শাহবাগ … তারপর বাসা … আর এখন একটা কাজ নিয়ে বসে সেটা শেষ না করে উল্টো দিনযাপন লিখছি … আজকে আর কাজ করতেও ভালো লাগছে না … এখন ঘুমিয়ে গিয়ে কালকে সকাল সকাল উঠে করবো তাও ভালো …

শরীরের ওপর এখন আর বেশি চাপ দিতে পারি না … লুথা হয়ে যাচ্ছি দিন দিন …

‘বিন্দাস লাইফ’ না হোক, একটা মোটামুটি রকমের মন ভালো করা ‘লাইফ’ হইলেই তো আমি খুশি থাকি … সেইটার কোনো অধিকার সম্ভবত আমার নাই … এখন শুধু দুঃখ – কষ্ট গিলে থাকার লাইফ … হাসিখুশি থাকার মুখোশটা খুব দ্রুতবেগে জীর্ণ হয়ে যাচ্ছে …

গতকাল থেকে প্রমা আর লালাম আমাদের বাসায় … প্রমার পরীক্ষা শেষ বলে সে বেড়াতে এসেছে … যেই আমি কোনোদিন আমার এই পিচ্চি বোনটাকে একটা কিছুতে না পর্যন্ত বলি নাই, সেই আমি আজকে বিকালে হঠাৎ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ওকে কড়া গলায় বকা দিয়েছি … সাথে সাথে দেখলাম মুখ কালো করে বসে রইলো … আমি তারপর বের হয়ে গিয়েছিলাম কাজে … রাতে বাসায় ফিরে দেখলাম সে অলরেডি ঘুমিয়ে গেছে … কয়েকদিন আগে ওদের বাসায় গিয়েও কি একটা কারণে ওর ওপর মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে সেদিনও বেশ কড়াভাবে রিঅ্যাক্ট করেছি! আমি ওকে বকা দিতে পারি সেটা সে কখনো কি কল্পনাও করতে পারতো? … আমিও কি পারতাম? … কিন্তু এখন পারি! … এখন আমি অল্পতেই প্রচণ্ড অধৈর্য হয়ে যাই … মেজাজ খারাপ হয়ে যায় … সেটা যে শুধু প্রমার ক্ষেত্রে তা না, প্রতিদিনের চলাফেরার অনেক টুকরো টুকরো ঘটনার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে চলছে …

ফ্যাক্ট হচ্ছে, আই ফিল নো ফান ইন মাই লাইফ নাও …

এভাবে জীবনযাপনের বিষয়টা আর যাই হোক, কোনোভাবেই ভালো লাগার মতো কিছু না …

কিন্তু এটাই এখন আমার জীবনযাপন … নিজের সাথে নিজের ক্রমাগত মানসিক যুদ্ধ করে যাওয়া জীবন …

এবং আমি এটা প্রচণ্ডরকমের ঘৃণা করি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s