দিনযাপন | ১৩০৫২০১৫

গতকালকে অনেকদিন পর এমন একটা রাত কাটলো যে মাথায় কোনো কাজের চিন্তা নাই! … সেই খুশিতে কালকে রাতে ফেসবুকিং ছাড়া আর কিছুই করলাম না … এমনকি সিনেমাও দেখলাম না … অবশ্য সিনেমা দেখার উপায়ও ছিলো না … ল্যাপটপটা নিয়ে তো ঘরের মধ্যে কোথাও বসবারই জায়গা পাচ্ছিলাম না … আর সিনেমা দেখতে হলে আমি যেই আরাম করে শুয়ে, বসে থাকি সেই সুযোগই পেতাম না … যাই হোক, ঘুমিয়ে পড়লাম কালকে তাড়াতাড়িই … একটা কাজের চিন্তাহীন মাথা নিয়ে ঘুমানোর আরামটাই অন্যরকম …

কালকে অবশ্য যেই পরিমাণ স্ট্রেসফুল একটা সন্ধ্যা গেছে, তাতে করে কাজ থাকলেও মনে হয় ঘুমিয়েই পড়তাম … প্রচণ্ড টেনশন আর মেজাজ খারাপ মিলায় সারা সন্ধ্যা মাথা ভার হয়ে ছিলো, আর টেনশনটা নামার পর মাথা হাল্কা না হয়ে ক্যামন মাথা ব্যথা শুরু হলো …

টেনশনের গল্পটা কি একটু ছোটো করে বলবো? … কালকে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির শো ছিলো … তো, গত পরশুদিন সন্ধ্যায় জানলাম যে আমাকে নাকি ভিডিও প্রজেকশনের কাজ করতে হবে। এই নাটকের প্রজেকশন আমি আরেকদিন করেছি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে একটা শো হয়েছিলো, সেখানে। আর পুরো স্ক্রিপ্ট একপ্রকার আত্মস্থ থাকার কারণে ভিডিও প্রজেকশনের কিউ’র ব্যাপারেও ধারণা স্পষ্ট … আর এ পর্যন্ত মোটামুটি বেশিরভাগ শো-তেই জার্নাল ভাইকে ভিডিও কিউ ধরায় দেয়ার জন্য আমিই পাশে বসেছি …ফলে পারবো কি পারবো না সে ব্যাপারে কোনো দুশ্চিন্তা ছিলো না …তো, কালকে যেটা হলো যে বিকাল ৫টা বেজে যায়, তারপরও প্রজেক্টরের লোক আসে না! কিন্তু প্রজেক্টর নিয়ে যে আসে, সেই ফজলু ভাই আবার ব্যাপক রেস্পন্সিবল মানুষ। উনি আসুক বা উনার লোক আসুক, কল যদি ৩টায় থাকে, তাহলে ঠিক ৩ তাতেই উনি বা উনার লোক হলে উপস্থিত থাকে … ‘তাইলে কি কল দেয়া হয়নাই?’ এইরকম চিন্তা থেকে মৃদু টেনশন শুরু হলো … তার দেরি হচ্ছে কেন জানার জন্য যোগাযোগ করে জানা গেলো উনি রাস্তায় … তো মোটামুটি সোয়া ৬টা বেজে যাচ্ছে, তখনো উনি রাস্তায় শুনতে শুনতে আমার টেনশনও বাড়তে থাকলো … প্রজেক্টর যদি সাড়ে ছয়টার পরে এসে পৌঁছায়, তাহলে সেটার সেটিং, সাউন্ড আর ভিডিও চেক এগুলা সবকিছুতেই প্রচণ্ড হচপচ লাগবে, আর তারপর দেখা যাবে একটা না একটা কিছু গণ্ডগোল হয়েছে, আর সেটার কারণে হয়তো প্রজেকশনও ঠিকঠাকভাবে হবে না । অতিরিক্ত টেনশন হলে আমার মেজাজ খারাপ হতে থাকে … কালকেও সেই অবস্থাই হলো … অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম … কারণ, একবার আমার মেজাজ খারাপ ব্যাপারটা প্রায়োরিটি পেয়ে গেলে আমার কনফিডেন্স-এর বারোটা বাজবে …

একজন মিউজিশিয়ান যেমন স্টেজে উঠবার আগে তার ইন্সট্রুমেন্টটা টিউন করে নেয়, একজন পারফর্মার যেমন তার কস্টিউম আর প্রপ্সগুলো ঠিকঠাকভাবে দেখে নেয়, তেমনি প্রজেকশনের কাজ করতে হলে প্রজেক্টরটাও তো আমার ইন্সট্রুমেন্ট, আমার প্রপস … এখন ওই মিউজিশিয়ান যদি শো-এর একদম আগ মুহুর্তে তার ইন্সট্রুমেন্টটা হাতে পায়, আর টিউন করার সুযোগ না পায়, তাহলে তার পারফর্মেন্স কি কনফিডেন্ট হবে? একজন পারফর্মার যদি শো-এর ঠিক শুরুর মুহুর্তে তার কস্টিউম হাতে পায়, আর তারপর দেখে যে তাড়াহুড়ায় সেটা ঠিকঠাকভাবে পরা হয়নাই, তাহলে কি তার পারফর্মেন্স কনফিডেন্ট হবে? … আমিও বারবার ভাবছিলাম, যদি প্রজেক্টরটা সেট-আপ দেয়ার পর আর ভিডিওগুলোর সাউন্ড আর ইমেজ চেক করে দেখার সুযোগ না পাই, তাহলে কিভাবে কি হবে? …

আমার জায়গায় কালকে জার্নাল ভাই থাকলে হয়তো বেশ বিন্দাস থাকতো … কারণ সে গোঁজামিল দিয়ে কাজ করে ম্যানেজ করে ফেলতে পারে … আর আমি পারফেকশনিস্ট … কাজের মধ্যে গোঁজামিল দিয়ে সেটা ‘ম্যানেজ করে নেয়া’র মতো মহৎ গুণ আমার নাই … যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি সন্তুষ্ট বোধ করি, ততক্ষণ পর্যন্ত একটা কাজ নিয়ে আমি কনফিডেন্ট বোধ করি না, কিংবা কাজটা ঠিক আছে বলেও মনে করি না … আর ওই খুঁতখুঁতানির ইফেক্টটা পড়ে আমার পারফর্মেন্স-এ …

তো, যাই হোক, শেষমেষ সাড়ে ৬টার দিকে প্রজেক্টর আসলো, লাইটের সেটিং-এর কাজের মধ্যেই তাড়াহুড়া করে প্রজেক্টরের সেট-আপ আর চেকিং-এর কাজও করা হলো … ভিডিওগুলাও ছেড়ে ছেড়ে সাউন্ড আর ইমেজ চেক করার সুযোগ হলো … কিভাবে চলবে, কিভাবে ফ্লিপ কার্ডটা ওঠানো নামানো হবে এগুলা সবকিছুও দেখে-বুঝে নেয়া গেলো … তার পর আমার টেনশন কমলো যে এখন অন্তত শো-টা ভালোমতো করা যাবে …

কিন্তু টেনশন কমার ফলাফল হলো মাথাব্যথা …

যাই হোক, আজকে সকালে উঠবার তাড়া ছিলো না … তাও একটু আগে আগেই উঠলাম … লালামরা চলে যাবে, ওদের সাথে আমিও মিরপুরে যাবো বলে ঠিক করলাম … মিরপুরে আমাদের বাসাটা একচক্কর দেখে আসাও হবে এই ফাঁকে, এই চিন্তা করেই আর কি! … তো সেই কাজগুলো সবই আরাম করেই হলো … একমাত্র স্যানিটারি ফিটিংস কেনা ছাড়া ওই বাসার আর বড় কাজ বাকি নাই … আশা করা যাচ্ছে এই মাসের শেষ নাগাদ কাজ কমপ্লিট হয়ে যাবে … অবশ্য তারপর আমাদের টুকটাক কিছু কাজ বাকি … সেগুলো তখন শুরু করতে হবে …

তো, সেখান থেকে লালামের বাসা হয়ে, দুপুরে ওখানে খেয়েদেয়ে, গোসল করে, ঘুমিয়ে তারপর সন্ধ্যায় গ্রুপে আসলাম … এদিকে আবার প্ল্যান হলো যে বুয়েটে নাকি চিরকুট ব্যান্ড গান গাইতে আসবে, সেখানে যাওয়া হবে … নোবেল ভাইয়ের উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে গ্রুপ থেকে বুয়েটের দিকে যাওয়া হলো … অমিতদের ডিপার্টমেন্ট-এরই প্রোগ্রাম, পরিচিত জায়গা, কয়েকটা পরিচিত মুখও আছে … ফলে ভালোই লাগছিলো … এদিকে চিরকুট ব্যান্ডের জন্য সময়ই দেয়া হয়েছিলো রাত ১১টায় … কিন্তু যতদূর বোঝা গেলো যে বুয়েটের স্টুডেন্ট-দের পারফর্মেন্স শেষ হতেই রাত বারোটা বেজে যাবে … হঠাৎ করেই নোবেল ভাইয়ের উৎসাহে ভাটা পড়লো, আবার তার সেই ভাটার টানে ফুয়াদ আর গোপী চলেই গেল … আমার বেশ মেজাজ খারাপ লাগলো হঠাৎ … একে তো গোপী আর ফুয়াদের ওপর, আবার নোবেল ভাইয়ের ওপরও … আসার সময় সবাইকে ডাক দিয়ে নিয়ে আসলো নোবেল ভাই, অথচ চলে যাচ্ছে দেখে দুইজনকে আটকালো না যে কিছুক্ষণ পরে যাক … সবাই মিলে একসাথে একসাথে ছিলাম, গল্পগুজব তো অন্তত হচ্ছিলো … এমনিতেই তো প্রায় সাড়ে এগারোটা -বারোটা পর্যন্ত শাহবাগেই থাকা হয়, সেটা না হয় বুয়েটেই হতো … এর মধ্যে চিরকুটের গান শোনা গেলে বোনাস … নইলে সাড়ে এগারোটার পরে না হয় সবাই একসাথেই চলে আসতাম … অবশ্য তারপরই মনে হলো যে গল্পগুজব করার মোটিভেশনটা তো আমার ছিলো, নোবেল ভাই আটকাবে কেন? … আমি তো বলেছিই ওদেরকে থাকতে, ওরা সেটাকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে থাকে নাই … হয়তো ওদেরও আসলে একসাথে আড্ডাবাজির মোটিভেশন নাই … সবাই সবার নিজেরটাই বুঝবে, আর আমি সবারটা বুঝবো, সেটাই তো সবসময় হয় … সো, এখানেও বা তার অন্যথা হবে কেন? … এই ভেবে নিজের মেজাজকে ঠাণ্ডা করলাম … কিছুক্ষণ পর নোবেল ভাইও চলে যেতে চাইলো … আমার তখন উঠতে ইচ্ছে হলো না … নিজের জন্য একটু একলা সময় দরকার ছিলো মেজাজটা পুরোপুরি ঠাণ্ডা করার জন্য … নোবেল ভাইকে বললাম চলে যেতে, বললাম পরে যাবো …

তো আমিও ইন ফ্যাক্ট তার আধাঘণ্টা পরেই বের হয়ে গেলাম, যদিও তখন চিরকুট উঠবে উঠবে ভাব … অমিতকে বললাম বাসা পর্যন্ত সাথে আসতে … বাসার গেট বারোটায় লাগিয়ে দেয়, কিন্তু তারপরও আধাঘণ্টার মতো দারোয়ানরা থাকে … আর আমি যখন আসলাম তখন সাড়ে বারোটাও বাজে নাই, কিন্তু এসে শুনি দারোয়ান নাকি অলরেডি ঘুমিয়ে গেছে! …সবচেয়ে সহজ উপায় ছিলো নোবেল ভাইকে ফোন করা, কারণ তার কাছে মেইন গেটের একটা চাবি আছে, সো দারোয়ান থাকা না থাকা নিয়ে সমস্যাই হতো না … কিন্তু কেন জানি নোবেল ভাই-এর সাথে আজকে আর যোগাযোগ করতে ইচ্ছা হলো না … এদিকে মা একবার দারোয়ান, একবার কেয়ারটেকারকে কয়েকবার করে ফোন করে না পেয়ে শেষে সেই নোবেল ভাইকেই ডাক দিলো চাবির জন্য! … যেখানে প্রচণ্ড রিল্যাকটেন্ট অনুভুতিবশত নিজেকে দূরে রাখার জন্য নোবেল ভাইদের সাথে বাসায়ই ফিরলাম না, সেখানে আবার সেই তার সাথেই যোগাযোগ! …

আমার ইদানীংকার মেজাজ-মর্জি সাপেক্ষে মনে হচ্ছে সবকিছু থেকে দূরত্ব তৈরি করে ফেলাটাই আসলে বেটার … যা কিছু এখনো ভালো আছে, সেগুলো ভালো অবস্থায় থেকেই দূরে থাকুক … এতদিন পর্যন্ত এমন একটা অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম যে কিছুই ভালো লাগে না … তারপরও ভালো লাগার মতো একটা দুইটা জায়গায় জোর করে নিজেকে উপস্থিত রেখেছি … ভাবনা ছিলো একটাই যে এতে করে হয়তো সবকিছু ভুলে থাকার, ভুলে যাবার জন্য মনের জোর তৈরি হবে … কিন্তু, ইদানীং যেটা হচ্ছে যে সবকিছুতেই প্রচণ্ড বিরক্ত লাগে … কেউ ভালো কিছু বললেও বিরক্ত লাগে, খারাপ কিছু বললেও বিরক্ত লাগে … কাজ থাকলেও বিরক্ত লাগে, না থাকলেও বিরক্ত লাগে … কেউ কথা বললেও বিরক্ত লাগে, না বললেও বিরক্ত লাগে … একা একা থাকলেও বিরক্ত লাগে, আবার সবার সাথে থাকতে গেলেও বিরক্ত লাগে … এত এত বিরক্তি নিয়ে আমি যে কি করবো, কই যাবো তাই বুঝতে পারছি না … সবসময়ই বেশ ‘ আই অ্যাম কুল’ , ‘ নো প্রবলেম’ , ‘ আচ্ছা, ঠিক আছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবসাব নিয়ে চলছি … কারণ বিরক্তিবোধের জায়গাটা কারো সামনে প্রকাশ হোক, কিংবা সেটা কোনো অকওয়ার্ড সিচুয়েশনে আমাকে বা আমার কারণে অন্য কাউকে নিয়ে ফেলুক সেটাও আমি চাইছি না …

কি জানি! … কোনোভাবে যদি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতাম, কিংবা কোনোভাবে যদি সবাইকে আমার অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দেয়া যেতো, তাহলে হয়তো বেশ হতো! … সবাই মনে অনেক আনন্দ, ভালো লাগা, ভালোবাসা, কিংবা অন্তত নিজেদের অনেক বাস্তব ব্যস্ততা নিয়ে চলে আমার চারদিকে … তাদের মাঝখানে আমি একজন প্রচণ্ড বিষণ্ণ, প্রচণ্ড হতাশ, সবকিছুতেই বিরক্ত হওয়া, কিংবা অল্পতেই মন খারাপ করে ফেলা, যে কোনো মুহুর্তে জীবনকে শেষ করে দেয়ার চিন্তা করা মানুষের উপস্থিতি আসলে বেমানান … যখনই একগাদা মানুষের মধ্যে তখনি ‘ কি হলে আমার ভালো লাগবে’, সেই চিন্তাতেই আসলে এতটা  বুঁদ থাকি যে অন্যদের নিজস্ব বাস্তবতার জন্য যখন সেই ভালো লাগার বিষয়টা হয় না, তখন নিজেরই খারাপ লাগার জায়গাটা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় … তাতে নিজের জন্যও ক্ষতি, অন্যের জন্যও ক্ষতি …

ফলে, সবচেয়ে ভালো সবকিছু থেকে দূরে থাকা … মানুষের সাথে মেশার অপশন যত কম হবে, ততই ‘ভালো লাগার’ অপশনও বই পড়া, সিনেমা দেখা, ছবি আঁকা, নেহায়েত একটু ফেসবুকিং করা এইসব যাবতীয় কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে থাকবে … তখন আর মানুষের সাথে সাথে থেকে, তাদের সাথে চলে, তাদের সাথে সময় কাটিয়ে, কথা বলে, আড্ডা দিয়ে নিজেকে ‘ভালো বোধ’ করাতে হবে না …

নির্বাসন … নিজের জন্য আমার এখন নির্বাসনই ভালো …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s