দিনযাপন | ২১০৫২০১৫

মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যে মনে মনে সন্দেহ হয় যে আমি বড় ভোঁদাই, নাকি যার জন্য ঘটলো সে বড় ভোঁদাই! … যেমন আজকে! … সকালে ব্যাংকে গেলাম । উদ্দেশ্য সাজিয়া আপুর কাছ থেকে আমার পাসপোর্টটা নিবো, টাকা তুলবো আর একটা চেক জমা দিয়ে আসবো … তো পাসপোর্ট নিলাম, টাকা তুললাম, চেকও জমা দিলাম … বাসায় ফেরার পর দুপুরের দিকে ব্যাংক থেকে ফোন দিয়ে জানালো যেই চেকটা জমা দিয়েছি ওটা অ্যাকাউন্ট পে চেক না, ক্যাশ চেক … অথচ না ওইটা আমি খেয়াল করেছি, না ব্যাংকে যিনি আমার চেকটা জমা রাখলেন তিনি খেয়াল করেছেন! … আমি তখন চিন্তা করতে বসলাম যে আমি না হয় ভোঁদাইয়ের মতো ক্যাশ চেককে অ্যাকাউন্ট পে চেক মনে করে চেকটা খুলে না দেখেই সপ্তাহখানেক হুদাই ব্যাগে নিয়ে ঘুরেছি, কিন্তু ব্যাংকে যিনি চেক নিয়েই সারাদিন কাজকর্ম করেন, তিনি চেকটা দেখেও বুঝলেন না যে এইটা    ক্যাশ চেক! …

এইসব ঘটনার কোনো উত্তর আমার কাছে অন্তত কখনো থাকে না!

আবার, ওটারও কোনো উত্তর আমার কাছে থাকে না যে একটা জিনিস ভালো জানি বলে সবার সব কাজ আমার ওপরেই কেন এসে বর্তায় , আর আমিও কেন তাদের একেকজনের চাইতেও দ্বিগুণ উৎসাহে সেই কাজটা একাই করে ফেলার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ি! …

এই যেমন কলকাতার সম্ভাব্য শো-এর জন্য ভিসার অ্যাপ্লিকেশন দিতে হবে, আর আমিও বীরবিক্রমের মতো ৮/৯ জন মানুষের ভিসা অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম ফিল আপ করছি … কারণ এক, তাতে একবারে সবগুলো অ্যাপ্লিকেশন সাবমিট হয়ে যাবে … কারণ দুই, সবাই মিলে যদি একসাথে বসেও একই সময় করা হয়, তাহলে ৯ জনের মধ্যে অন্তত ৬ জন ৬ রকমের রংবেরঙের ভুল করবে … আমার মতো খুঁতখুঁতানি মানুষ অন্তত ‘ আরেক একটা হলেই হবে’ বলে সন্তুষ্ট হবে না … সুতরাং, সবার ফর্ম ফিলাপ আমিই করি তাই সই! … ভুল যদি হয় তো একরকমের ভুলই হবে, কিংবা একটাই বিশাল ভুল হবে … তাও তো শান্তি যে ভুলটাও আমিই করেছি! … নিজের ওপর নিজের রাগ করার প্রতিবর্তী ক্রিয়াটা অন্তত অন্য কারো কাছে নিজেকে মা কালী সদৃশ বলে অবতীর্ণ করবে না! …

অন্তত, এই কাজটার মজা হচ্ছে যে আমি এক বসায় ৯টা মানুষের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারছি! … একটা মানুষকে বোঝার জন্য সে কয়বার ইন্ডিয়া গেছে, কিংবা তার বাড়িঘর কই সেটা গুরুত্বপূর্ণ না … কিন্তু অনেকসময় মাথায় থেকে যাওয়া এইসব ছোটোখাটো তথ্যই অনেক বড় কিছুকে বুঝতে সাহায্য করে! … এই কারণে কাজটা আমি এঞ্জয়ও করছি! …

কিন্তু, মাঝে মাঝেই এটাও মনে হয় যে একটু ভালো ইংরেজি লিখতে, বলতে, পড়তে জানা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট এসবের কাজ ভালো বোঝা আমাদের দেশে অনেকক্ষেত্রে অনেকসময় অভিশাপস্বরূপ হয়ে আসে! যেমন ধরা যাক, একজন ভালো ইংরেজি জানে, যেকোনো বিষয়ে তার এই ইংরেজি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল থেকে তার আশেপাশের মানুষেরা নিজেদের ইংরেজি সংক্রান্ত অজ্ঞানতাকে খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে জাহির করবে … শুধু ইংরেজি না, বাংলার ক্ষেত্রেও তাই … বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষই মনে হয় ঠিকমতো বাংলা শব্দের বানান পর্যন্ত জানে না … ‘আরে বানান একটা হলেই হয়! বোঝা গেলেই হলো!’ … নিজের ভাষার প্রতি এতটাই গা ছাড়া ভাব, অথচ ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই বাংলা ভাষার ‘চেতনা’ একেবারে ফুটন্ত ভাতের মতো চাউরে ওঠে! … ‘এই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলো সালাম, বরকত, রফিক … বাংলা আমার মুখের ভাষা … আমার মায়ের ভাষা … ‘ আরও কত কি! … আর ইংরেজির কথা তো বাদই দিলাম …

সেরকম, আবার কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট এর ব্যাপারেও মানুষের রিলাক্টেন্সি বেশ উঁচু লেভেলের … ইন্টারনেট এর ব্যবহার বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ফেসবুক-এ সীমাবদ্ধ, খুব বেশি হলে একটুআধটু ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপ, মুভি ডাউনলোড, নয়তো স্টুডেন্ট হলে গুগল থেকে অ্যাসাইনমেন্ট কপি পেস্ট! … অনেক সহজভাবে যদি বলা যায়, ধরা যাক একটা কোনো তথ্য নিয়ে কনফিউশন তৈরি হচ্ছে কাজ করতে গিয়ে … ওখানে যদি ৫ জন থাকে তো অন্তত তিনজনের অ্যানড্রয়েড ফোন থাকবে … কিন্তু তাদের কেউই এইটা ভাববে না যে ‘ আচ্ছা, দেখি তো গুগলে সার্চ দিলে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না!’ …। শেষমেষ ওই কনফিউশন কনফিউশনের জায়গাতেই থাকবে, আর কাজটা হবে অজ্ঞতাবশত গোঁজামিল মার্কা … এই যেমন ওইদিন, গ্রুপে একটা কাজ হচ্ছিলো … সেখানে বঙ্গভঙ্গের প্রসঙ্গ আসছিলো … বঙ্গভঙ্গ কেন হয়েছিলো, ইতিহাসটা কি সেটা কেউই জানে না! … বঙ্গভঙ্গের মধ্যে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান সবকিছুর ভাগাভাগি হয়ে গেলো! … অথচ ওইখানে যে মানুষগুলো ছিলো কেউ একবারও গুগলে সার্চ দিয়ে ইতিহাসটা জেনে নেয়ার কথা ভাবে নাই … আমার ওইখানে কোনো কাজ নাই, তারপরও আমিই পরে বসে বসে ইতিহাস কপচাইলাম সবার কাছে! …

অভিশাপের কথা যে বলছিলাম, সেটার প্রাসঙ্গিকতা আসলে এখানেই … যেকোনোভাবে আমি ইংরেজিতে লিখতে, পড়তে, বলতে সাবলীল … আমি দিনরাত এটা-সেটা বিষয়ে কিছু না বুঝলেই গুগলের কাছে সাহায্য চাই … সারাদিন এটা সেটা ইমেইল, জিমেইল নিয়ে কাজ করি, ব্লগ লিখি ইত্যাদি ইত্যাদি … তো, ইংরেজির কথা যদি বলি, ওইটা তো আর ঐশ্বরিকভাবে আমার ওপর নাযিল হয়নাই … আমি প্রচুর বাংলা, ইংরেজি বইপত্র পড়েছি … বাংলা দিয়ে ইংরেজিকে বুঝছি, ইংরেজি দিয়ে বাংলাকে বুঝেছি … ছোটবেলায় প্রিয় কাজ ছিলো ডিকশনারি পড়া … বসে বসে শব্দ নিয়ে, শব্দের উৎস নিয়ে গবেষণা করতাম নিজে নিজে ডিকশনারি ঘেঁটে … আমার মতো এইরকম করে, কিংবা অন্যান্য বিভিন্ন রকম চর্চার মাধ্যমে অনেকেই ইংরেজি হোক আর বাংলা হোক, সেটা সাবলীলভাবে বলতে, পড়তে, লিখতে পারে … আর যারা চর্চা করে নাই তারা পারে না … মুশকিল হচ্ছে, যারা চর্চা করে না, তারা একেবারেই করে না …

ওই যে বানানের কথা বলছিলাম … ধরা যাক par can বলে একধরনের লাইট আছে … শ্রবণজনিত বিকৃতির কারণে ‘পার ক্যান’ হয়ে গেছে ‘ পারকেন’ … তো, সেদিন একজন লাইটের লিস্ট করার সময় লিখলো parken … অথচ যে এটা লিখলো সে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা এবং একটা বড়সড় আকারের ট্যাব নিয়ে ঘোরে … ট্যাবের কথা বললাম এই জন্য যে অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেমে চলে এমন যে কোনো ট্যাবে ডিকশনারি থাকুক বা না থাকুক, গুগল সার্চের অপশন অবশ্যই থাকে … আর গুগল নিজেই একটা জীবন্ত ডিকশনারি স্বরূপ …  কিন্তু, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবার পরও, থিয়েটারে লাইট নিয়ে বহুদিন কাজ করার পরও, এবং এরকম রিসোর্সফুল একটা যন্ত্র নিয়ে ঘোরার পরও সে একবারের জন্যও কখনো জানার প্রয়োজন মনে করে নাই যে সে যেসব লাইট নিয়ে কাজ করে সেগুলোর নাম-ধাম-বানান আসলে কি! … আরও ইন্টেরেস্টিং হচ্ছে যে লিস্টটা উনি মাইক্রোসফট ওয়ার্ড সফটওয়্যারে করেছেন এবং সেখানে বানান ভুল হলে নিচে লাল দাগ দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বানান ভুল … অথচ …

আব্বুর কাছ থেকে পাওয়া একটা শিক্ষণ প্রক্রিয়া এখন আমাকে প্রচণ্ডরকমের সাহায্য করে … আগে যখন আমি তাকে কোনো ইংরেজি শব্দের বানান কিংবা অর্থ জিজ্ঞেস করতাম, সে আমাকে ডিকশনারি ধরিয়ে দিয়ে বলতো খুঁজে বের করো! … ইংরেজি ব্যাকরণ, রচনা, অনুচ্ছেদ-এর ক্ষেত্রেও যেটা হতো যে আমাকে বলতো ‘নিজে একটা কিছু লিখে আনো!’ … আমিও দুনিয়ার ভুলভাল ইংরেজি দিয়ে একটা কিছু লিখতাম … সেটা আব্বু লাল কালিতে রঙ্গিন করে দিয়ে ঠিক করে দিতো … এভাবে করতে করতে যেটা হলো যে আমি শিখলাম কিভাবে লিখলে ঠিক, কিভাবে লিখলে ভুল, কোন শব্দের বানান কোনটা, কোন অর্থ কেন … তারপর যখন ক্লাস সেভেন কি এইট পার করে ফেললাম, ততদিনে ইংরেজির ওপর আমার বেশ ভালো দখল চলে আসলো … আগে যদি একটা কিছু লিখলে ১০ টা ভুল তো, তখন হলো হয়তো তিনটা! … আর এখন আমি মানুষের লেখা ঠিক করে দেই, বাংলাকে ইংরেজি করে দেই! …

আই উইশ, আমাদের স্কুল কলেজগুলাতেও যদি সিমিলার প্র্যাকটিসটা থাকতো, তাহলে ইংরেজি কিংবা বাংলা কোনো ভাষাতেই মানুষের বেসিক জ্ঞানটা নাজুক থাকতো না …

আগে ভাষা শেখার জন্য খালি বই-ই ছিলো, আর এখন বইয়ের চেয়েও অনেক সহজে প্রচুর পরিমাণ রিসোর্স পাওয়া যায় ইন্টারনেটে … সেগুলোর হাতে গোনা কয়েকটা কাজে লাগাতে পারলেই যথেষ্ট … অথচ সেটাই কেউ করে না …

যদি করতোই, তাহলে এখন এই রাত ৪টা সময় আমাকে জেগে জেগে বাংলা আর ইংরেজি ভাষার দখলদারিত্ব কিংবা একটা জিনিস সম্পর্কে বেসিক জ্ঞান রাখার ব্যাপারে এরকম জ্ঞানগর্ভ দিনযাপন লিখতে হতো না …

মনে হয় একটু বেশিই জ্ঞান কপচায় ফেললাম আজকে … আপাতত মানুষ আমাকে ‘আঁতেল’ ঠাওরানো শুরু করার আগেই আমি অফ যাই …

ঘুমাতে হবে …

কালকে অনেক অনেক অনেক কাজ …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s