দিনযাপন | ২৬০৫২০১৫

গত দুইদিন ব্যস্ততার কারণে দিনযাপন নিয়ে বসার সুযোগ হয়নি … পরশু দিন সারারাত বিবিসি’র কাজ করেছি, আর কালকে ইন্ডিয়ার ভিসা অ্যাপ্লিকেশনের কাজ …

দুইদিন যাবৎ ইন্ডিয়ার ভিসা ফরম পূরণ করতে গিয়ে মনে হচ্ছে যে বাংলাদেশের মানুষ ইন্ডিয়াতে ঘুরতে না, মনে হয় কোনো সিক্রেট মিশনে যায়! একজন মানুষের মোটামুটি চৌদ্দ গুষ্টির কে কবে কোথায় ছিলো, কেউ পাকিস্তানে ছিলো কি না, এই হইসে কি না, সেই হইসে কি না … দুনিয়ার হাবিজাবি তথ্য দেয়া লাগে। অথচ এই ইন্ডিয়ারই একটা অংশ ছিলাম আমরা একসময়, একসাথে মিলে একটাই দেশ ছিলাম । আর সেই দেশে যেতেই এখন এত হ্যাপা! ই-টোকেন নাও, কাগজপত্র নিয়ে ইন্টারভিউতে দাঁড়াও, কি করতে যাচ্ছো তার হাজারটা জবাবদিহি করো, তারপর তোমাকে ভিসা দেবে কি দেবে না সেটা ইন্ডিয়ার ইচ্ছা! …

এতদিন ই-টোকেন নাম্বার পেলে তারপর ছবি দেয়া যেতো মূল কাগজপত্রের সাথে, আর আজকে জানলাম যে এখন নাকি এমন নিয়ম করেছে যে চেহারা না দেখে ই-টোকেনও দেবে না। সুতরাং ছবি দেয়া বাধ্যতামূলক! অতএব, আবার সবাইকে বলো ছবি আনতে, সেটার স্ক্যান করে সফট কপি বানাও, তারপর অ্যাপ্লিকেশন সাবমিট করো …

সামনে জানি আরও কি কি নতুন নতুন নিয়ম জানতে পারবো!

এখন মনে হচ্ছে যতোরকমের কাগজপত্র আছে, সব নিয়ে যেতে হবে জমা দেবার জন্য। তাদের যেগুলো খুশি সেগুলো জমা রাখবে! কখন আবার কোন কাগজপত্র চেয়ে বসে কে জানে!

তবে, এই ইন্ডিয়ার ভিসা প্রসেসিং-এর কাজ করতে গিয়ে আরও কিছু বিষয় নিয়েও ভাবনার অবকাশ হলো …

যেমন, পাসপোর্ট থাকা না থাকা। দেখা গেলো যে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি নাটকের মূল যে কর্মীবাহিনী, তার বেশিরভাগেরই পাসপোর্ট নাই, নয়তো মেয়াদোত্তীর্ণ, নয়তো মেয়াদ যায় যায়! … যার পাসপোর্টের মেয়াদ যায় যায় অবস্থা, সে জানে না যে ছয় মাসের কম মেয়াদ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ভিসার আবেদন রিজেক্টেডও হতে পারে। যার পাসপোর্টের মেয়াদোত্তীর্ণ, সে বহুদিন পার হবার পরও পাসপোর্ট রিনিউ করে নাই। যাদের পাসপোর্ট নাই, তারা প্রয়োজন মনে করে নাই দেখে কখনো করেনাই। এমনকি একজনের জন্মনিবন্ধন নাম্বার, জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বারও নাই! ধরা যাক, সে যদি কোনোকারণে গুম হয়ে যায়, তাহলে সরকারিভাবে, কিংবা প্রশাসনিকভাবে তার আসলে কোনোই অস্তিত্ব নাই! …

আমার কাছে কেন জানি মনে হয় যে পাসপোর্ট জিনিসটা খুবই দরকারি। প্রতিটা মানুষের জন্যই। এখন এই কসমোপলিটান যুগে পাসপোর্ট একটা ইন্টারন্যাশনাল আইডেন্টিটি। আমার পাসপোর্ট আছে মানে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে আমার অ্যাকসেস আছে। আমার গণ্ডি শুধুমাত্র বাংলাদেশ না! সমগ্র বিশ্ব। সুতরাং, পাসপোর্ট থাকাটা আমার জন্য মাস্ট। … আমার কাছে তো মনে হয় যে এটা এরকমই একটা নিয়ম হওয়া উচিত যে ১৮ বছর বয়স হলেই বাধ্যতামূলকভাবে একজনকে পাসপোর্ট করাতে হবে। হ্যাঁ, শর্ত থাকতেই পারে যে তাকে মিনিমাম ইন্টারমিডিয়েট পাস হতে হবে, কিংবা তার অমুক অমুক ব্যাপার থাকতে হবে । গণহারে করতে গেলে অন্তত আমাদের বাংলাদেশের সিস্টেমহীনতার সিস্টেমে কারো কাজই ঠিকমতো হবে না।

তো যাই হোক, এরকম আরও অনেক কিছু নিয়েই আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রচণ্ড রিলাক্টেন্ট। যেমন, রিসেন্ট পাসপোর্ট ছবি আছে কি নেই। কেউ কেউ জীবনে একবার একটা ছবি তুললে সেটারই রিপ্রিন্ট করিয়ে বছরের পর বছর চালিয়ে দেয়। ধরা যাক বয়স হয়ে গেছে ৩০, আর ছবি ব্যবহার করছে তার ২৩/২৪ বছর বয়সের! ৬/৭ বছর আগের ফেসবুকের ছবি দেখলেই তো নিজের কাছে নিজের চেহারা কত পাল্টে গেছে বলে মনে হয়, সেখানে পাসপোর্ট ছবির মতো একটা জরুরি বিষয়ও সিস্টেম লসের লুপে পড়ে এখন কত নগণ্য হয়ে গেছে!

এমনকি আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষ এটাও জানে না যে এখন পাসপোর্ট ছবির জন্য অফিসিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে সাদা … আগেকার নীল, লাল এইসব ব্যাকগ্রাউন্ড এখন আর একসেপ্ট করে না অফিসিয়াল কাজে … এই যে এই ইন্ডিয়ার ভিসা’র ফর্ম ফিলাপ করতে গিয়েই আমি অন্তত তিনজনের ছবি পেয়েছি অন্তত ৪/৫ বছর আগে নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে তোলা! … তারওপর আবার কম্পিউটার কম্পোজের দোকান থেকে ‘ছবি থেকে ছবি’ করানোও আছে একজন দুইজনের … ওইসব ছবি তো আরোই একসেপ্ট করে না! …

যাই হোক, এখন ভালোয় ভালোয় সবার ভিসা হয়ে গেলেই হয় …

দেখা যাবে হয়তো এরকম আপাতদৃষ্টিতে ‘নগণ্য’ কোনো একটা কিছুর জন্যই এক দুইজনের ভিসা অ্যাপ্লিকেশন রিজেক্টেড হয়ে গেলো! … তখন তো মহাবিপদ হয়ে যাবে … এমনিতে সময় নাই, আবার স্ট্যান্ড বাই বিকল্প মানুষও নাই …

যাই হোক … যা হয় হবে …

গতকালকে সকালে একটা ভয়াবহরকমের দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠলাম … কালকে খুব ভোরে একবার ঘুম থেকে উঠে ১০টা পর্যন্ত কাজ করেছি … তারপর একটু আরাম পাবার জন্য চোখ বুঝতেই ঘুমিয়ে গেলাম। স্বপ্নটা শূরু হলো খুবই খাপছাড়া ভাবে …

দেখলাম যে রুবেল ভাইয়ের জন্মদিন, ওইটার আবার পার্টি হচ্ছে [গতকালকে সত্যি সত্যিই রুবেল ভাইয়ের জন্মদিন ছিলো, সেটাই হয়তো মাথায় গেঁথে ছিলো] … ফ্যামিলি পার্টি … আমি সম্ভবত ছবি তোলার জন্য গিয়েছি … এর মধ্যে জয়িতা দি- ও সেখানে এসেছে … সেও নাকি রুবেল ভাইয়ের কি এক দুর সম্পর্কের আত্মীয় হয় … আমি আরও অবাক হয়ে ভাবলাম যে এতদিন ধরে গ্রুপে দুইজন একসাথে কাজ করছে, অথচ আমরা কেউ এইটা জানি না! … এইসবের মধ্যেই ওইখানে এক মহিলার সাথে কথা হলো … তার আবার দুই মেয়ে … তাদের সাথে কথা বলার ফাঁকেই লোকেশনটা পার্টির সেন্টার থেকে পাল্টে আমাদের বাসা হয়ে গেলো! … যেটা হলো যে ওই দুই মেয়ের মধ্যে ছোটোটার বয়স মনে হলো বছরখানেকের মতো, আর মাত্রই হাঁটতে শিখেছে … এ জন্য ওকে অনেক চোখে চোখে রাখতে হয় … তো সামহাও একদিন ভোরের বেলা সবাই ঘুমাচ্ছে, আমার ঘুম ভেঙ্গে হঠাৎ খেয়াল হলো যে ওই পিচ্চিটা ঘুম ভেঙ্গে একা একা কোথাও চলে গেছে … খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় গিয়ে আমার মেরুদণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে গেলো … ওই পিচ্চি বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর এক ইঞ্চিও যদি সামনে যায় তাহলে নিচে পড়ে যাবে … একদিকে ভাবছি যে ও সাইজে এতই কি ছোটো যে গ্রিলের ওইটুকু ফাঁক দিয়ে বের হয়ে গেলো, আরেকদিকে ভাবছি এখন কি করা উচিত … যখনি তাকে ধরতে যাবো, তখনি সে নিচে পড়ে গেলো … চারতলা থেকে সোজা নিচে … প্রচণ্ড ভয় পেয়ে আমি ঘরে চলে আসলাম … তখনো কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি … আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না … কাউকে কিছু বলবো? কিছু বললে যদি আবার সবাই আমাকেই সন্দেহ করে! ধরা যাক সবাই বললো যে তোমার বাচ্চা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে কমপ্লেক্সে ভুগো বলে তুমি ওই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছো! কিংবা কেউ যদি বলে যে এতদিনে তোমার একটা বাচ্চা হলেও হতে পারতো, কিন্তু হয়নি বলে যে তোমার এত অনুতাপ, সেজন্য তুমি এমন করেছো! … এইসব ভেবে আরও ভীত হয়ে আমি নিজেও ঘরে গিয়ে ঘুমানোর ভান করলাম … কতক্ষণ পড়ে যথারীতি বাচ্চার খোঁজ পড়লো … আমি বলে দিলাম যে দেখি নাই … এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে কেউ একবারও বারান্দা দিয়ে নিচে তাকায় নাই … সবাই ভাবছে বাইরে কোথাও বের হয়ে গেছে …এর মধ্যে আমি দেখলাম যে আমার অফিস বাসার নিচতলাতেই … অফিসে গিয়ে আমি বারবার ওই জায়গাটার দিকে তাকাই, যেখানে বাচ্চাটা পড়ে আছে … একবার ভাবি যে ‘হঠাৎ দেখতে পেয়েছি’ টাইপ ভান করে সবাইকে বলি যে ওইখানে বাচ্চাটা পড়ে আছে … কিন্তু সাথে সাথেই আবার ‘ যদি বুঝে ফেলে যে আমি আগেই জানতাম’ এই ভয়টা আমাকে গ্রাস করে … এদিকে জবা দি আমার কলিগ … সে সামহাও বুঝতে পেরেছে আমার একটা অস্বস্তি হচ্ছে কিছু নিয়ে … সে এসে বারবার জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে! … একটু পড় সেই এসে খবর দিলো যে একটা বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে, চারতলার ওপর থেকে পড়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি … আর আমি বারবার প্রার্থনা করছি যে এটা যেন স্বপ্ন হয়! … কিন্তু কিছুতেই এটা স্বপ্ন বলে ভাবতে পারছি না – স্বপ্নের ভেতরেই এমনটা হচ্ছে … শেষে যখন সত্যি সত্যি ঘুম ভাঙলো, তখন আমার আনন্দে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা হলো যে আসলেই একটা স্বপ্ন দেখছিলাম! …

এরকম ভয়ঙ্কর একটা বিষয় যেন শুধু স্বপ্নই থাকে! …

ইদানীং মাঝে মাঝেই এমন হয় যে নিজেকে নিয়ে কি করবো বুঝে উঠতে পারি না … নিজেকে একটা অথর্ব মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছু মনে হয় না … ঘুমাতে যাই, মনে হয় যে ঘুমিয়ে করবোটা কি? ঘুম ভেঙ্গে উঠতে যাই, মনে হয় যে উঠে করবোটা কি? গ্রুপে যাই, সেখানেও মনে হয় যে আমার আসলে এখানে কি করার আছে? … যাদের সাথে ঘুরি-ফিরি তাদের মধ্যেও আমার থাকার প্রয়োজনীয়তা কি সেটাও খুঁজে পাই না … মাঝে মাঝেই মনে হয় যে আমি না থাকলেই কি? … বাসায় থাকলেও মনে হয় যে এখানে বসে থেকে কি করছি … বাইরে গেলেও মনে হয় যে এত মানুষের ভীড়ের মধ্যে কই যাবো, কি করবো! … যে কাজগুলো করছি, সেগুলো করতে গিয়েও মনে হয় যে আমি হয়তো এই কাজগুলো করার জন্য উপযুক্ত না …

কেমন জানি হয়ে যাচ্ছি! … এই শরীরটা নিয়ে আর চলতে ইচ্ছে করে না … আয়নার সামনে দাঁড়ালেই মনে হয় একটা ডিস্টরটেড ফিগার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি … বিশাল বড় পেটটা তো আগেও ছিলো, কিন্তু তখনো এটাকে এত অসহ্য লাগতো না … এখন টিউমারের কথা জানার পর থেকেই মনে হয় যে এই যে আমার এত বেশি ওজন, এই যে চেহারা এগুলা সবকিছুই তো টিউমারজনিত হরমোনাল ইমব্যালেন্স-এর কারণেই … নইলে আমি তো এখনো সেই ইউনিভার্সিটি লাইফের মতো ৫০/৫৫ কেজি ওজনের হাল্কা-পাতলা মানুষই থাকতাম … প্রায় ৭৫ কেজি ওজনের একটা ভারী শরীর বয়ে চলতে হতো না … মানুষ কথায় কথায় ‘হাতি’ ‘গণ্ডার’ এসব বলে হাসাহাসি, ফাজলামিও করতো না, খাওয়া দাওয়া নিয়ে খোঁটাও দিতো না …

ইদানীং মনে হচ্ছে শরীরে আবারো একগাদা ফ্লুয়িড জমছে … মাঝখানে তো বেশ পাতলা হয়েছিলাম, তখন আবার সবাই বলতো, ‘ ওয়াও প্রজ্ঞা! ডায়েট করো নাকি? কি শুকায় গেছো তুমি!’ … সপ্তাহ দুয়েক হলো খেয়াল করছি যে শরীর আবার ফুলে উঠছে … সাথে পেটটাও … প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছে সারাক্ষণ … মনে হচ্ছে কোথাও গা এলিয়ে বসলে কিংবা শুলেই ঘুমিয়ে পড়বো …

মনের মধ্যে অনেকগুলা জিনিস, অনেক অনেক কথা চেপে আছে … সেগুলা হাল্কা করতে হবে … তাও যদি একটু শান্তি পাই মনে …

আর ভালো লাগে না এসব …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s