দিনযাপন| ৩০০৫২০১৫

আজকে বেশ কয়েকদিন পর একটা রাত পার করছি মাথা ভার করা টেনশন ছাড়া! সেই সাথে ‘ কাল কি হবে জানি না’ টাইপ চিন্তা-ভাবনারও বাড়াবাড়ি নাই … কালকে যাই হোক, আমার কাজ মোটামুটি গোছানো আছে … ‘হায় হায়! ক্যামনে কি’ বলার অবকাশ নাই …

তো এই নির্ভার রাত পাবার আনন্দে একটা সিনেমা দেখে ফেলবো ভাবছিলাম। ‘এল ডোরাডো’ বলে একটা অ্যানিমেশন সিনেমা দেখেছিলাম বহুবছর আগে … সেই সিনেমাটা দেখার ইচ্ছা হচ্ছে গত দুই/তিন দিন ধরে … কি প্রসঙ্গে জানি ‘এল ডোরাডো’ শব্দটা মাথায় এসেছিলো, তাতেই সিনেমাটার কথাও মনে পড়ে গেলো! …

যাই হোক, তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়াটা ফরয, কারণ প্রচণ্ড ক্লান্ত আর কেমন জানি জ্বর জ্বর একটা ভাব আছে। এমনিতেই সকাল থেকে বেশ দৌড়াদৌড়ি করেছি, তারপর শো ছিলো, সেখানে আবার এই গরমের মধ্যে এসি চলছে কি চলছে না অবস্থায় শীতের কাপড় পড়ে পারফর্ম করেছি। ঘেমেই অস্থির অবস্থা … সেই ঘাম আবার শরীরেই শুকিয়েছে … এখন যদি জ্বর আসে তো তাতে অবাক হবো না … এমনিতেই যেই দৌড়াদৌড়ি যাচ্ছে গত কদিন ধরে … এইটা তো একটা শরীর … যন্ত্র তো আর না!

কই কই যে দৌড়ালাম আজকে! এমনিতে সকালে যে সময় বের হবো বলে ভেবেছিলাম, সেটা পারলাম না … কারণ ভিসার কাগজপত্র গুলো গুছিয়ে নিতে নিতে একটু দেরি হলো … ভেবেছিলাম যে সাড়ে দশটার মধ্যে বের হবো … আগে পার্লারে গিয়ে চুলে শ্যাম্পু করে তারপর পাসপোর্ট ছবি তুলতে যাবো। তো বের হতে হতে সাড়ে বারোটা বাজলো … ছবি তুলতে গেলাম ফটোহাট। বললো আধাঘণ্টার মধ্যে ছবি দিয়ে দেবে। তখন বাজে প্রায় ২টার মতো। আমার ক্ষুধাও লেগেছে বেশ। আমি পাশেই লা বাম্বায় একটুখানি খাওয়া-দাওয়া করে, বাকি সময়টুকু কাটানোর জন্য রাস্তার উল্টোদিকে নয়্যার নামে নতুন একটা দোকানে আজাইরাই ঘুরে তারপর যখন আধাঘণ্টা পার করে ফটোহাটে গেলাম, তখন শুনি আমার ছবিটা এখনো হয়নি! জানা গেলো যে হিসেবের গোলমাল করে আমার রিসিড নাম্বারে আরেকজনের ছবি দিয়ে দিয়েছে … এরকম আমিসহ তিনজনের ছবির সিরিয়াল মিস হয়ে গেছে … আরও মিনিট বিশেক বসে তারপর ছবি পেলাম। … ছবি নিয়ে তারপর গেলাম ধানমণ্ডি চার নাম্বারে … অ্যাপ্লিকেশন ফর্মগুলো প্রিন্ট করতে … সেই কাজ সেরে শিল্পকলা যেতে যেতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেলো … উপরে উঠতে যাবো এমন সময় নায়ীমী আর মেবিনের সাথে দেখা। ওরা নাকি চা খেতে যাচ্ছে … পরে অবশ্য চা খাওয়া হলো না … জয়িতা দি’র দোকানে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কাবাব  এইসব খাওয়া হলো … উপরে উঠেই আবার দৌড় শুরু হলো … কস্টিউম চেঞ্জ, কোরিওগ্রাফির স্টেজ রিহার্সাল, প্রপস চেক … এর মধ্যে কিছু জিনিস প্রিন্ট করতে পাঠাবো একজনকে, সেটার জন্য গ্রুপের প্যাড দরকার … আমার ফোনে টাকা নেই, তাই ফুয়াদ আর টুটুলকে দিয়ে কয়েকবার ফোন করালাম রানাকে যাতে প্রিন্ট করার জন্য যাকে পাঠাবো সে পথে গ্রুপের প্যাডের কাগজ নিয়ে নিতে পারে … এদিকে রানাও ফোন ধরে না … আমি সময় নষ্ট না করে সামিকে পাঠিয়ে দিলাম গ্রুপে, আর এদিকে রানাও একটু পরে শিল্পকলায় এসে হাজির … সে নাকি গ্রুপের প্যাডও সাথে করে নিয়ে এসেছে … কাহিনী হলো স্কুলের ক্লাস থেকে বের হয়ে যে নিশ্চয়ই ফুয়াদ বা টুটুলকে ফোন দিয়েছে, আর তারপর শুনেছে যে কি জন্য তাকে ফোন করা হচ্ছিলো … সে কারণে নিজ দায়িত্বে সেটা নিয়ে এসেছে … আমার বেশ বিরক্ত লাগলো! কারণ রানাকে ফোনে না পেয়ে আমি সামি ছেলেটাকে শুধু শুধুই তাইলে গ্রুপে পাঠালাম ! আমাকে তো একবার হলেও রানা ফোন দিতে পারতো, যেহেতু শুনেছে যে আমি প্যাডের কাগজ খুঁজছি! … কয়টা কাগজ লাগবে, কেন লাগবে সেটা জানবে না? … আমি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে এতবার যে এতজন ফোন দিচ্ছিলো, ফোন ধরে নাই কেন … সে উত্তর দিলো ‘ অমিতাভ রেজার ক্লাসের মাঝখানে আমি ফোন ধরবো কেন?’ … আমার খুবই মেজাজ খারাপ হইলো এই যুক্তিতে … সে অমিতাভ রেজার ক্লাসেই থাকুক আর যেখানেই থাকুক, গ্রুপের একাধিক ব্যক্তি তাকে পরপর ফোন দিচ্ছে মানে নিশ্চয়ই ইমার্জেন্সি! … সেটা তো বুঝতে হবে! … মুখ দিয়ে বের হয়েই যাচ্ছিলো ‘ অমিতাভ রেজা কোন চ্যাটের বাল যে সে ক্লাস নিতে আসছে বলে জরুরি ফোন ধরা যাবে না?’ … সেটা বলা থেকে নিজেকে বিরত করলাম … ও আজাইরা যুক্তি দিয়েছে দেখে কি আমিও আজাইরাই মেজাজ দেখাবো নাকি? … বললাম যে আমি কিছু জানি না, ও এখন কেমনে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবে সেটা ও জানে … পরে দেখলাম ও নিজেই সামিকে ফোন করে বলে দিয়েছে গ্রুপের কোথায় প্যাডের কাগজ থাকে …

রানা আর ফুয়াদ মাঝে মাঝেই এত পাকনামি করে নিজেরা নিজেরা যে বিরক্তই লাগে! … আবার এমনও না যে পাকনামি করে কোনো একটা কাজ স্মুথলি করতে পেরেছে! …কেমন জানি একটা লিনিয়ার প্যাটার্নে ফাংশন করা ব্রেইন নিয়ে চলে …

যাই হোক, গোঁজামিল দিয়ে হলেও কাজটা হয়েছে …

সবসময়ই দেখেছি নিজের কাজটা আমি নিজে যতটা ভালো করি, আর কাউকে করে দিতে বললেই সেই কাজটায় একগাদা ভুল বের হয় … অথচ অন্যের কোনো একটা কাজ যখন আমি করে দেই, তখন তো সে যেভাবে করতো তার চাইতেও অনেক ভালোভাবে সেটা আমি করে দিতে পারি! … আমি বুঝি না এই ব্যাপারটা কেন হয়! … যাদেরকে বলি তাদের বোঝার সমস্যা, না আমার বোঝানোর সমস্যা! …

আজকে দুপুরেও একটা মেজাজ খারাপ করা ঘটনা ঘটেছে … সকালবেলাই সিজার ভাই ফেসবুকে কথায় কথায় লিখেছিলো যে আজকে সে আর সাজিয়া আপু বসুন্ধরা সিটি যাবে, চাইলে আমি, তিন্নি আপু বা ইথার তাদের সাথে লাঞ্চ টাইমে জয়েন করতে পারি … আমি তখনো শিওর ছিলাম না যে আমার কাজের কতটুকু সময় লাগবে, তবুও বলে রেখেছিলাম যে যাবো … কিন্তু পাসপোর্ট ছবি তুলতে গিয়েই তো কতটা সময় চলে গেলো। তাই আর যাওয়া হলো না … ভাবলাম যে বসুন্ধরা সিটিতে লাঞ্চ করা না করা আর কি বিগ ডিল … ঘণ্টা দেড়েক পরে ফেসবুক ব্রাউজ করতে গিয়ে দেখি তারা ফিস অ্যান্ড কোং এ গেছে খেতে! আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো … ‘ আর কোনোদিন কথা বলবো না’ টাইপ মেজাজ খারাপ … কারণ ফিস অ্যান্ড কোং এ যাওয়ার একটা প্ল্যান অনেকদিন আগে থেকেই আমাদের ছিলো, সিজার ভাই, সাজিয়া আপু, তিন্নি আপু আর আমি, এই চারজন। একদম পাক্কা প্ল্যান যে গেলে চারজন মিলেই যাবো … তো বাকি তিনজনের এ ফ্রি থাকে তো ও ফ্রি নাই এসব করতে করতে প্ল্যানটা পেন্ডিং ছিলো … কিন্তু, এইটা পাক্কা যে এই প্ল্যান তখনি কার্যকর হবে যখন আমরা চারজনই ফ্রি … সেখানে আজকে হঠাৎ ইচ্ছে হলো তো ফিস অ্যান্ড কোং চলে গেলো, আর সেটাও চারজনের একজনকে ছাড়া – এটা আমার কাছে রীতিমতো বিশ্বাসঘাতকতার মতো লাগলো! তার মানে কি? এতদিন যা যা প্ল্যানিং হয়েছে তার সবই জাস্ট কথার কথা ছিলো? … আসলে মন থেকে এরকম কোনো বিষয় ছিলো না যে এই প্ল্যান কার্যকর হতে হলে চারজনকেই লাগবে? … মানুষের মুখের কথা কি আসলেই এত ফালতু হয়? … খালি বলার জন্য বলে? … তাও আবার সিজার ভাইয়ের মতো মানুষও এরকম করতে পারে? … রেগেমেগে সিজার ভাইকে মেসেজ পাঠালাম যে ঘটনাটা আমার মনে থাকবে! তারপর সিজার ভাই অনেকবার ফোন দিয়েছে, আমি ধরি নাই … ধরবোও না … যাদের মুখের কথা আর মনের কথা এক হয় না তাদের সাথে কথা বলার যাবতীয় আগ্রহ আমার দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে … এ টাইপের মানুষদের আমি এখন আর সহজভাবে নিতেই পারি না …

অথচ, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এসব মানুষের সংখ্যাই আমার চারপাশে সবচেয়ে বেশি! …

বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি, মহা বিরক্ত …

বিরক্ত হওয়া হয়তো আমার সাজে না … হয়তো আর সবার মতো আমারও এটা ভেবেই চলা উচিৎ যে এই দুনিয়াতে এখন টিকে থাকার সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে চুপ করে থাকা … ‘ একটা হলেই হয়’ টাইপ ভাবসাব নিয়ে চলা … সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করে চলা … ইত্যাদি ইত্যাদি …

কিন্তু, দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, না আমি চুপ করে থাকতে পারি, না ‘ একটা হলেই হয়’ ভাব নিয়ে চলতে পারি , না সবকিছু গোঁজামিল দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে চলতে পারি …

কি মিসফিট আমি! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s