দিনযাপন | ০৫০৬২০১৫

তো, যেটা হলো যে, মরার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর ওভারডোজ হিসেবে আজকেই আমাদের বাসার কিছু মালপত্র মিরপুরের বাসায় শিফট করার কাজটাও শুরু হয়ে গেলো …

গতকালকে হঠাৎ সিদ্ধান্ত হলো … পুরোপুরিই ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো’ টাইপ অবস্থা …

আমারই একমাত্র বেশ কিছু জিনিস গোছানো … পাঁচটা কার্টন, বেশ কয়েকটা পেইন্টিং আর ফটোগ্রাফ, একটা বুকশেলফ আর একটা চেয়ার … সাথে বাসার আরও কিছু জিনিস … এই নিয়ে আজকে সকাল সকাল মিরপুরে গিয়ে ওই বাসায় সেগুলো রেখে দিয়ে বাসায় নিজেদের পজিশন নেয়া … সকাল ৮টায় গাড়ি আসার কথা … সেই গাড়ি আসলো না … পরে আরেকটা গাড়ি যোগাযোগ করে ব্যবস্থা হলো … সেটা আসলো ১১টার দিকে … সেটায় সবকিছু তুলে আব্বু আর অমিত রওনা দিলো পিক-আপের সাথে, আর আমি আর মা রওনা দিলাম সিএনজিতে …

একদিকে বিষয়টা ভালোই হয়েছে … আমি নিজেও গত ক’দিন যাবৎ ভাবছিলাম যে কিছু জিনিস শিফট করে ফেলতে পারলে ভালো হতো … তাতে ঘরের জায়গাও কিছু কমতো, আর নতুন কিছু জিনিস গুছিয়েও নেয়া যেতো … কার্টনগুলো রাখারই তো জায়গা হচ্ছিলো না! … এখন যেমন পাঁচটা কার্টন গেছে, আরও পাঁচটা কার্টন গুছিয়ে ফেলা যাবে … একেবারে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো শিফটিং-এর প্ল্যানটা হয়ে গেলো …

তবে মিরপুরের বাসায়ও এখনো অনেক কাজ বাকি … বাথরুমের দরজা লাগবে … টুকটাক কিছু ফিনিশিং হবে … তারপর আমি কাঠমিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাবো … কলকাতা থেকে ফিরে এসে কাঠমিস্ত্রির কাজ করিয়ে নিতে হবে সবচেয়ে আগে … তারপর বাড়ির ফিনিশিং-এর জন্য দিতে হবে …  লাইট, ফ্যান এসব লাগানো, পর্দা কেনা এগুলা টুকটাক কাজও বাকি আছে …

আজকের দিনের বিশেষ ঘটনা বলতে প্রাচ্যনাটে অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পুনর্মিলনী … আমার ব্যাচের আমি ছাড়া কেউই অ্যাক্টিভ মেম্বার নয় … প্রাচ্যনাট স্কুলের ওই ‘কালো’ ব্যাচ থেকে ৬ জনকে নেয়া হয়েছিলো … ঘটনাচক্রে ওই ব্যাচে ভর্তি হবার পরপর আমি অনিমেষ আইচের ‘মানুষ বদল’ নাটকটার কাজে ইনভল্ভড হয়ে গিয়েছিলাম … ফোলে প্রথম তিন মাস আসলে ভালোমতো ক্লাসই করিনি … পরের তিনমাসের মধ্যে আবার স্বপ্ন’র বাবা মারা যাওয়া, আমার নিজের ইচ্ছার ঘাটতি সব মিলিয়ে ক্লাস অনিয়মিত করা হয়েছে … শেষে ফাইনাল প্রডাকশনের সময়ের একটা মাস নিয়মিত ছিলাম … আমার মনে আছে, গ্রুপে মেম্বারশিপ পাবার বেশ অনেকদিন পর গ্রুপের পুরনো কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে আমাদের ব্যাচের রেজিস্টার খাতা হাতের সামনে পেয়ে নোবেল ভাই হিসেব করে বলেছিলো যে ছয়মাসের কোর্সে আমি মোট ক্লাস করেছি ১৩/১৪ দিনের মতো! … মজার ব্যাপার হয়েছিলো যে আমি নাকি আবার ফাইনাল যে রিটেন পরীক্ষা হয় সেখানে হায়েস্ট মার্ক পেয়েছিলাম! অথচ ওখানে যেসব টপিকে প্রশ্ন এসেছিলো তার একটারও ক্লাস আমি করিনি … নিজে আগে থেকেই যেটুকু যা জানতাম সেই ধারণাগুলোকে ভিত্তি করেই নিজের মতো করে উত্তর লিখেছিলাম! … আমাদের যেদিন সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিলো, সেদিন নিজের সার্টিফিকেটে ‘বি’ গ্রেড দেখে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম … কারণ আমি কোনো অ্যাসাইনমেন্ট-ও জমা দেইনি, নিয়মিত ক্লাসও করিনি! … নোবেল ভাই তখন আমাদের ব্যাচের স্কুল কো-অর্ডিনেটর ছিলো … আমার মনে আছে, আমি শো-শেষে নোবেল ভাইয়ের কাছে গিয়ে খুব আশ্চর্যবোধ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘ক্যামনে কি?’ … আমি নিশ্চিত ছিলাম যে কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। আমার সার্টিফিকেটে ‘সি’ লিখতে গিয়ে হয়তো ভুলে ‘বি’ লিখে ফেলেছে! … তখন জেনেছিলাম যে ওটাই নাকি ঠিক আছে! …

তো যাই হোক, গ্রুপে আমরা ৬ জন ঢুকেছিলাম … এখন নিয়মিত বলতে আমিই তেলাপোকার মতো টিকে আছি … ওয়াফি আছে, রাজেশ ভাইয়ের সাথে বিয়ের সূত্রে ও পারিবারিক ক্যাটাগরিতে মাঝেসাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেড়াতে আসে … বাকিদের কারো খোঁজ খবর জানি না … রিমা নামের একটা মেয়ের সাথে কিছুদিন যোগাযোগ ছিলো, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটাও আর পরে থাকেনি … ইরেগুলারিটির কারণেই আমার ব্যাচের সবার সাথে আমার খাতির-পরিচয় হয়নাই … তো, আজকের রিইউনিয়নে যেমন কথা আর স্বপ্ন আসছে … ঘটনাচক্রে এদের দুজনের সাথেই ব্যক্তিগত কারণে আমি এখন বেশ দূরত্ব বজায় চলি … স্বপ্ন’র সাথে তাও মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হলে সৌজন্যমূলক হাই-হ্যালো কিংবা দুইএক কথায় খোঁজখবর নেয়া হয় … কিন্তু কথার সাথে কোনোরকম ইন্টারঅ্যাকশনে যাওয়ার কোনো আগ্রহ আমার কখনো তৈরি হয়না … আর আমি এগুলা জোর করে অভিনয় করেও করতে পারি না … যা ভালো লাগে, যা খারাপ লাগে সবই আমার চেহারাতেই প্রকাশ পায়, আর মুখ খুললে তো বোমা ফাটেই …

আর এমনিতেও আজকে যেই গরম লাগছিলো, এতগুলা মানুষ রিহার্সাল ফ্লোরে গিজগিজ করতে দেখে ওই ঘরটায় যাবারই আগ্রহ পাচ্ছিলাম না … ভেতরেই বসে ছিলাম প্রায় পুরোটা সময় … পরিচয় পর্বের সময় গেছি, আর শেষে বিদায় মুহুর্তে …

যেই আমি কোথাও খুব বেশিদিন থাকতে পারি না, ক’দিন পরেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলি সেই আমি ৬ বছর ধরে প্রাচ্যনাটে বহাল তবিয়তে আছি, এটাই তো আমার কাছে অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট … প্রাচ্যনাট মনে হয় এরকমই, সব দলছুটদের নন্দনকানন! এখানে দলবেঁধে থেকেও দলছুট থাকা যায় … সেটাই হয়তো আমার টিকে থাকার সবচেয়ে বড় নিয়ামক! … যূথবদ্ধ থাকবার ব্যাপারটা এখানে বাধ্যতামূলক হলে ওই বন্ধনের চোটেই হয়তো আমার হাঁসফাঁস লাগতে শুরু করতো … সবসময় সবখানে যেটা হয় আর কি! …

গতকালকে বইয়ের শেলফ গোছানোর সময় ২০০৪ সালের একটা ডাইরি পেলাম … সেসময় আমি ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি … ডাইরিটা উল্টেপাল্টে দেখছিলাম … খেয়াল করলাম যে তখন আমি মাঝে মাঝেই ‘ আমার জীবনদর্শন’ শিরোনাম দিয়ে কিছু দার্শনিক গোছের কথাবার্তা লিখতাম … পড়তে গিয়ে আমার খুব ইচ্ছে হলো যে সেখানকার কয়েকটা কথা আমি দিনযাপনে তুলে দেই …

যেমন, ২০০৪ সালের ১৬ জুন তারিখে ‘আমার জীবনদর্শন’ -এ যা লিখেছিলাম তা হুবহু তুলে দিচ্ছি ঃ

” আমরা যখন দুঃখ পাই তখনি আমরা প্রধানত কাঁদি। কিন্তু আমরা এজন্য কাঁদি না যে আমরা দুঃখ পেয়েছি। আমরা কাঁদি আমাদের দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থার কথা চিন্তা করে। যা আমাদের দুঃখ দেয় তার জন্য আমরা কাঁদি না, কিন্তু কোনো বিষয় কেন আমাদের দুঃখ দেয় তা উপলব্ধি করতে গিয়ে আমরা কাঁদি। গত ১৩ জুন যেমন, ইংল্যান্ড – ফ্রান্সের খেলায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯০ + ১ আর ৯০ + ২ মিনিটে দুটো গোল করে জিদেন যখন ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দিলো, তখন আমি কেঁদেছি। ইংল্যান্ড হেরেছে সে জন্য আমার চোখে পানি আসেনি। জিদেনের unexpected তৎপরতায় ফ্রান্স জিতে গেছে এটা মনে করতেই আমার চোখে পানি এসেছে। আসলে আমরা আমাদের দুঃখের জন্য কাঁদি না। আমাদের দুঃখের বিপরীতে সুখের কথা চিন্তা করে কাঁদি এজন্য যে আমরা সুখটা পাইনি, দুঃখটা পেয়েছি। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা যখন সুখ ধরতে ধরতেও হারিয়ে ফেলি তখন আমরা সেই অধরা সুখের কথা চিন্তা করে কাঁদি, প্রাপ্ত দুঃখের কথা নয়। আমরা কি পেয়েছি তা আমরা চিন্তা করি না, কিন্তু কি পেলে কি হতো, আর তা না পাওয়ায় এখন কি হয়েছে তা চিন্তা করি । সেরকমই, আমরা কি কারণে দুঃখ পেয়েছি তা চিন্তা করার আগে চিন্তা করি, আমরা দুঃখ না পেয়ে সুখ পেলে কি হতো! এটাই ধ্রুব সত্য। আমরা negativity’র জন্য দুঃখ পাইনা, দুঃখ পাই positivity’র অনুপস্থিতির জন্য। “

আবার, ২০০৪ সালের ৩ জুলাই তারিখে লিখেছিলাম ঃ

” মানুষ নিজেকে যত অন্যের সাথে জড়ায় তত তার জীবনে পরিবর্তন আসে। মানুষ একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট, নির্ভরশীল হয় বলেই তার জীবন যেরকম হবার কথা সেরকম হয়না, পাল্টে যায়। মানুষ অন্যের জন্য চিন্তা করতে গেলেই তাকে নিজের অনেক কিছু হারাতে হয়।… আমরা নিজেদের জন্য যেভাবে চিন্তা করি, তাতে অন্য কাউকে জড়ালেই আমাদের চিন্তা-ভাবনা, জীবনধারা পাল্টে যায়। আসলে এসব বন্ধু,পরিবার,আত্মীয়-স্বজন এসবের কোনো মূল্য নেই। এরা হলো প্রভাবক। এদের উপস্থিতিতে প্রতিক্ষণেই আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসে। মানুষ যেদিন নিজের জন্যই … কেবল নিজের জন্যই সবকিছু করতে শিখবে, ভাবতে শুরু করবে, সেদিনই মানুষ নিজেকে খুঁজে পাবে!

we must remember that we are INDIVIDUALS. “

নিজের এরকম পুরনো পুরনো লেখাগুলো পড়তে বেশ মজাই লাগে এখন। দেখা যায় যে অনেক কিছুর চিন্তাই এখনো পাল্টে যায় নাই, আবার অনেক চিন্তাই আগাগোড়া পাল্টে গেছে … মিরপুরে যাবার পর সবকিছু গুছিয়ে নেবার পর ‘পুরনো ডাইরির পাতা থেকে’ টাইপের একটা লেখার সিরিজ করা যেতে পারে … সেখানে ডাইরির লেখাটাও থাকবে, এখনকার চিন্তাটাও থাকবে … মিল হলে তা স্বপক্ষে যুক্তি আর অমিল হলে তার স্বপক্ষেও যুক্তি খণ্ডন থাকবে … ইন্টেরেস্টিং হতে পারে ব্যাপারটা! … দিনযাপনের মতোই ! … আরেকরকমের সেলফ -অ্যানালাইসিস … আর সেই সাথে পৃথিবীর কাছে নিজের অস্তিত্বকে আরেকটু প্রকাশিত করা …

তবে, আজকে আর লিখবো না … আজ বেশ ক্লান্ত … গরম আর শিফটিং-এর দৌড়াদৌড়িতে বেশ ক্লান্ত বোধ করছি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s