দিনযাপন | ২০০৬২০১৫

হঠাৎ করেই অনেক বছর আগের ডাইরি পড়তে বসলে নিজেকেই অনেক নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়। আজকে থেকে প্রায় ১৫ বছর আগের আমি কি ভাবতাম, কিভাবে ভাবতাম কিংবা তখন আসলে চারপাশ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিটাই বা কি ছিলো, সেটার বোঝাবুঝিটা অনেক ইন্টেরেস্টিং বোধ হয়। আজকে পুরনো ডাইরিগুলো কার্টনবন্দি করতে গিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। নিজের লেখা পড়ে নিজেই অনেকবার চমৎকৃত হলাম। নিজের চিন্তা প্রক্রিয়ায় নিজেই ধাক্কা খেলাম অনেকবার। অনেককিছুই অমুক ভাবে, তমুকভাবে ভাবতাম, লিখতাম দেখে নিজের কাছেই নিজেকে  নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা হলো। একটা বুদ্ধি এলো মাথায়। এই যে ফেসবুকে টাইমহপ নামের একটা অ্যাপ্লিকেশন এখন প্রতিদিন সবাইকে মনে করিয়ে দেয় যে ‘এই দিনে’ কবে ফেসবুকে কি ঘটেছিলো, ঠিক সেভাবেই একটা ‘ এই দিনে ডাইরির পাতায় কি লিখেছিলাম’ টাইপ স্মৃতি রোমন্থন হতেই পারে! … ডাইরির লেখাগুলো অবশ্যই আমি ঢালাওভাবে ব্লগে বা অন্য কোনো অনলাইন মিডিয়াতে প্রকাশ করবো না। তবে, ব্যক্তিগতভাবে একটা আর্কাইভ তৈরি করাই যেতে পারে! …

ব্যাপারটা আসলে এরকম হবে যে অনেক অনেক বছর পর যদি আমার মতোই কেউ থাকে যে মানুষের চিন্তা প্রক্রিয়া নিয়ে অতি উৎসাহী আর সে যদি আমার লেখাগুলো কোথাও পায় আর তারপর এরকম ডেটলাইন ধরে গবেষণা করতে বসে, তাহলে তার কাজটা আমি যথেষ্টই সহজ করে দেবো! … তাকে আর একটা একটা করে ডাইরি, ফেসবুক স্ট্যাটাস, মেসেজ বক্স কিংবা দিনযাপনের লেখা ঘেঁটে ঘেঁটে এক ঘটনার সাথে আরেক ঘটনার লিঙ্ক খুঁজতে হবে না … খালি অ্যানালাইসিস এর কাজটুকুই থাকবে তার জন্য …

১৯৯৬ সাল থেকে ডাইরি লিখতে শুরু করেছি … আজকে এই ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই প্রায় ২০ বছরের প্রতি ২০ জুনের ডাইরির লেখা, ফেসবুক স্ট্যাটাস, ফেসবুকের মেসেজবক্স, ফোনের মেসেজ বক্স, দিনযাপনের লেখা যদি একসাথে করা হয়, তাহলেই তো একটা বিশাল আর্কাইভ দাঁড়িয়ে যাবে। বছরের আর বাকি ৩৬৪ দিনের কথা বাদই দিলাম! … এরকম একজনের প্রতিদিনের ইতিহাস ঘেঁটেই তো পুরো একটা জাতির ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাওয়া যেতে পারে! …

আমার মাঝে মাঝে খুব মনে হয়, এই যে পৃথিবীর বিভিন্ন আনাচে-কানাচে সেই কয়েক লক্ষ বছর আগের পাথর যুগের আঁকা-আঁকিগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো যে বা যারা এঁকেছে, তারাও কি কেউ না কেউ এভাবে ভেবেছে যে পৃথিবীটা একদিন অনেক অনেক বিস্তৃত আর ব্যস্ত হয়ে যাবে, আর তখন তাদের এই কীর্তিকলাপ নিয়ে দিনরাত গবেষণা করে মানুষ তাদের অস্তিত্বের ইতিহাস খুঁজে বেড়াবে?

আজকে খুব বেশি কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। লিখবার মতো কিছু যে আদৌ আছে তাও নয়। আজকে ঘুম থেকে উঠবার পর থেকেই জিনিসপত্রের গোছগাছেই সময় গেছে। মাঝখানে কিছুটা সময় স্ক্লাস্টিকার ছবিগুলো নিয়ে বসেছি। আজকেই ছবিগুলো দেবার কথা ছিলো, কিন্তু ইমন ভাই আজকে গ্রুপে আসলো না দেখে আর দেয়া হলো না। তো, দুই কার্টন বই আর এক কার্টন ডাইরি গুছিয়েই দিনপার করে দিয়ে তারপর সিনেমা দেখতে বসলাম একটা – টুমরোল্যান্ড। সিনেমাটা ভালো লাগছিলো না দেখতে। ভাবলাম বের হয়ে গ্রুপে চলে যাই। এর মধ্যেই বৃষ্টি নামলো, আর আমিও সেই সুযোগে আধাঘণ্টা ঘুমিয়েও নিলাম। তারপর উঠে সোজা গ্রুপে … এটা নিয়ে আর দিনযাপনে কি লিখবো?

ভেবেছিলাম আজকে ভায়োলিনটা টিউন করিয়ে বাসায় নিয়ে আসলে কালকে দিনের বেলাটা ভায়োলিনের প্র্যাকটিস করবো। কিন্তু ফুয়াদ, গোপী আর আমি, তিনজন মিলে এক ভায়োলিনের ব্রিজের প্লেসমেন্ট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে, আর একাধিকবার স্ট্রিং পজিশন আর টিউন অ্যাডজাস্ট করতে করতে শেষে ই-স্ট্রিং ছিঁড়েই গেলো … অতএব আগামীকাল স্ট্রিং কিনে নিয়ে গিয়ে আবারো টিউন করতে হবে … ফুয়াদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপতে গিয়েও আজকে কিভাবে কিভাবে নিজেকে সামলে ফেললাম। গায়ের জোরে ব্রিজ-এর পজিশন ঠিক করতে গিয়ে ভায়োলিনের গায়ে বেশ গাঢ় দাগ বসিয়ে দিলো। আমি বারবারই বলছিলাম যে স্ট্রিংগুলো লুজ করে নিয়ে ব্রিজটা সরাতে। সেটা পাত্তাই দিলো না। ভায়োলিনের গায়ে বসে যাওয়া দাগ নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করাতে সে আমাকে খুব বয়ান দিলো যে তার ৩৫ হাজার টাকা দামের ভায়োলিনেই দাগ পড়ে, আর আমারটার দাম তো মাত্র ৬ হাজার, সুতরাং আমি এত উতলা কেন হচ্ছি! … আমি খুবি আজব বোধ করলাম! আমার ভায়োলিন ৬ হাজার টাকাই হোক, আর ৬ লাখ টাকাই হোক, এইটা তো আমার কাছে অনেক সেন্সিটিভিটির একটা জিনিস! দামী হোক, কম দামী হোক, এইটা আমার ইন্সট্রুমেন্ট, আমি এটা বাজাই, এটার সাথে আমার একটা সখ্যতা তৈরি হয়েছে! এখন আমি ভায়োলিনে বো চালালে বুঝতে পারি তারগুলো টিউনে আছে নাকি নাই। টিউনে থাকলে সে কত সুন্দর শব্দ তৈরি করে সেটাও এখন আমি বুঝি। আমার সাথে আমার ভায়োলিনের এই বোঝাবুঝির সম্পর্কে যদি আমার নিজের হাতে ওই ভায়োলিনে দাগ পড়ে , কিংবা কোনোরকমের ক্ষতিসাধন হয় তাতে না হয় আমার উতলা হবার কারণ নাই, কারণ তখন আমি নিজের ঘাড়েই পুরো দায়টা নিতে পারবো। কিন্তু আরেকজনের ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে সেটাতে যদি আমি দাগ ফেলে দেই, কিংবা কোনোকিছু নষ্ট করে ফেলি, সেটার দায়বদ্ধতা তো আমার জন্য আরও অনেক বেশি! এই সেন্স যদি কারো না থাকে, তাহলে সে যত দামের ইন্সট্রুমেন্টই ব্যবহার করুক, আর যতদিন যাবতই ভায়োলিন বাজাক, তাতে আসলে তার কমনসেন্সের তো কোনো উন্নতি হবে না! … চাইলেই এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক বেশি রিঅ্যাক্ট করতে পারতাম, কিন্তু নিজেকে দমিয়ে নিলাম। যার এই বুঝটাই নাই যে অন্যের জিনিস কতটা যত্নের সাথে ব্যবহার করতে হয়, তাকে আমি সেটা বোঝাবো আমার কি সাধ্য?

যাই হোক, দিন দিন আমি এইসব ঘটনায় অভ্যস্ত হতে শিখছি। আমাকে এখন অনেক কষ্ট করে হলেও শিখতে হচ্ছে, মানতে হচ্ছে যে এই পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রধানতম শর্ত হচ্ছে ব্রেইনলেস হওয়া আর সেন্সলেস হওয়া। যে যত কম তার ব্রেইন আর সেন্সকে কাজে লাগাবে, সে জীবনে তত বেশি ভালো থাকবে … দুর্ভাগ্যবশত এই দুইটার কোনোটাই আমি হতে শিখি নাই … কিন্তু এখন আমাকে শিখতে হবে কিভাবে এই প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমি অন্তত বেঁচেবর্তে থাকতে পারি! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s