দিনযাপন | ০২০৭২০১৫

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আজকে আমি দিনযাপন লিখবোই, এরকম একটা প্রতিজ্ঞা নিয়ে বসেছি … ক্যামন করে যে দিন আর রাত পার হয়ে যাচ্ছে গত দুই-তিনদিন যাবৎ, বুঝতেই পারছি না … কাজ, ক্লান্তি, শারীরিক অসুস্থতা – সব মিলিয়ে বেহাল অবস্থা …

৭ তারিখ গ্রুপের অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইন স্কুলের শো … সেখানে কস্টিউমের কাজ করছি … কস্টিউম বানানোর কিছু নাই, কেবল বিভিন্ন নাটক আর গ্রুপের ইভেন্ট-এর কস্টিউম মিলিয়ে মিশিয়ে নাটকের চরিত্রগুলোর উপযোগী গেট-আপ তৈরি করা … নাটকটা যতটা সহজ, ততটাই কঠিন … গুপী গাইন বাঘা বাইন … রাজা-রাজরার বিষয় -আষয় … স্বাধীনতা, সময় আর অর্থায়নের সুযোগ থাকলে এখানে অনেক রকমের ফ্যান্টাসি ব্যবহার করা যেতো … সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যতটুকু পারছি করছি … কিন্তু তাতেই মনে হচ্ছে কত কাজ! … একটা মাথায় ২০ জনের কস্টিউমের   ভাবনা ভাবাটা তো আদৌ সহজ  না … তারমধ্যে চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা কম, তাই একজনই একাধিক চরিত্রে কাজ করছে … এইমাত্র কেউ শুণ্ডি রাজ্যের সভাসদ হলো তো পরের দৃশ্যেই সে হাল্লা রাজার সৈন্য … একই লোক জাস্ট লাইট অন-অফের পরিবর্তনের সাথে সাথেই এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্র হয়ে যাচ্ছে … সে যদি ৬ বছর থিয়েটার করা লোক হতো, তাহলে ট্রান্সিজশন -এর ব্যাপারটা তাকে অ বললেই চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বুঝে ফেলতো … কিন্তু এখানে মাত্র ৬ মাস পার করে ‘ বৎস, এবার বোঝ থিয়েটার কাকে বলে’ স্তরের ভেতর দিয়ে যাওয়া একজনের মাথায় পাগড়িটা কিভাবে বসবে, গায়ের চাদরটা কি করবে এগুলা তাদেরকে বোঝাবো কি? বর্ণ পরিচয়ই তো তারা এখনো শেষ করে উঠতে পারে নাই …

যাই হোক, একই সাথে বাসার জিনিসপত্র শিফটিং-এর কাজ তো চলছেই … আজকেই যেমন এক লট মালপত্র মিরপুরে রেখে আসা হলো, এর আগে গত বুধবার কিছু জিনিস নেয়া হয়েছিলো … আবার আগামী বুধবার নেয়া হবে … জুলাইয়ের ২৪ তারিখের মধ্যে নাকি বাসা ছাড়তে হবে … অবশ্য এই সেন্ট্রাল রোডের বাসার ভারপ্রাপ্ত মালিক আমাদেরকে পারলে কালকেই বের করে দ্যায় … অলরেডি টু-লেট সাইন ঝুলে গেছে, আর আজকে সারাদিনে নাকি প্রায় ৫ বার লোকজন বাসা দেখতে এসেছে … এখন বাড়িওয়ালী মহিলা যদি বলে যে বাসা ভাড়া হয়ে গেছে, নতুন ভাড়াটিয়া অ্যাডভানসও দিয়ে গেছে, কাল-পরশুই উঠবে, আপনারা চলে যান, সেটাও অস্বাভাবিক কিছু হবে না …

এর মধ্যে শরীরের ওপর দিয়েও দুইদিন ঝড় গেলো … গত মঙ্গলবার, ৩০ জুন, সিজার ভাইয়ের উৎসাহ উদ্দীপনায় আমরা দলবেঁধে পিট গ্রিল-এ ইফতার করতে গিয়েছিলাম … সেখানকার খাবারের কারণেই কিনা জানি না, কিঞ্চিৎ ফুড পয়জনিং হলো … পরশু দিন সারাদিনই বিছানায় পড়ে রইলাম, সন্ধ্যায় গ্রুপে গেলাম, বাসায় ফিরলাম প্রচণ্ড মাথা ঝিমঝিম ভাব আর পেটে ব্যথা নিয়ে … এসেই যে ঘুমালাম, উঠলাম গতকাল সকালে … কালকে সকালে মিরপুরে যাবার কথা ছিলো কাঠমিস্ত্রিকে নিয়ে … যাওয়া হলো না , কারণ শরীরের এই অবস্থায় যাওয়া সম্ভব ছিলো না … বরং, সারাদিন রেস্ট নিয়ে, ওষুধ খেয়ে নিজেকে ঠিক করলাম … আজকে কিছুটা সুস্থ …

আমার এখন খালি মনে হচ্ছে যে ৭ তারিখ কবে আসবে! শো-টা শেষ হলেই রিলাক্সড … মনে হচ্ছে যে ৭ তারিখ শো-টা শেষ হবার সাথে সাথেই হাল্লার রাজার মতো ছুটি! ছুটি! বলে দৌড়ে শিল্পকলা থেকে বের হয়ে সোজা বাসায় এসে এই যে ঘুম দিবো, একেবারে রিপ ভন উইঙ্কল-এর মতো টানা কয়েকদিন ঘুমিয়ে তারপর উঠবো! …

আজকেও অবশ্য আমার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া উচিৎ, কারণ সকাল সকাল উঠে বিবিসি’র একটা কাজ শেষ করতে হবে … তারপর কাপড়- চোপড় নাড়া দিয়ে কস্টিউমের জন্য কিছু জিনিস খুঁজে বের করতে হবে … আবার ২টা থেকে রিহার্সাল … মোটামুটি দৌড়ের ওপর থাকবো কাল সারাদিন …

আজকে সারাদিনের বিশেষ ঘটনা সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট-এর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ইফতার … আমি প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম সারাদিনের দৌড়াদৌড়ির ঠেলায় … রিহার্সালও হলো গোলমালের মধ্যে … একেবারেই অল্প সময় থাকা হলো … তাও কাঁটাবনেই শর্মা হাউজে গেট-টু-গেদারটা হলো বলে যেতে পারলাম … ইফতারের দশ মিনিট আগে গেছি, কিছুক্ষণ গল্প-গুজব, খাওয়া দাওয়া, রেইনির একদিনের বাসি জন্মদিনের কেক কাঁটা, তারপর আবার গ্রুপে এসে রিহার্সাল …

ডিপার্টমেন্ট-এর ক্লাসমেটদের সাথে বসলে এখন নিজেকে ক্যামন জানি বেমানান লাগে … প্রথম প্রথম বেমানান লাগতো, কারণ আমি উপরের সিরিয়ালে থেকেও সাইকোলজি নিয়েছি, আর বাকিরা সবাই অন্তত ৫০০ সিরিয়ালের পর থেকে এসেছে, এজন্য তারা ক্যামন দূরত্ব বজায় চলতো আর আমি একপ্রকার একঘরে হয়ে থাকতাম … আর এখন সবাই আমাকে তাদের গ্যাদারিং-এ ইনভল্ভ করতে চায়, অথচ আমি নিজেই নিজেকে একঘরে করে রাখি … ক্যামন জানি অস্বস্তি লাগে … যেই আমি ভর্তি পরীক্ষার ৩৯তম সিরিয়াল থেকে সাইকোলজিতে গিয়েছিলাম, যেই আমার সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে অনার্সে ওই ফার্স্ট ইয়ারের মতো ৩.৫৪ টাইপের একটা রেজাল্ট হবার কথা, সেখানে আমি পাস-ই করলাম না! … ওহ না! পাস করেছি, কিন্তু ৩ বছর লাগিয়ে, তার মধ্যে এক বছর রেজাল্ট স্থগিত থেকেছে, এক বছর শিমুল স্যার সুপারভাইজার হিসেবে ফেইল করিয়েছেন, আরেকবছর নাসরিন ওয়াদুদ ম্যা’ম নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওই একই ফেইল করানো পেপারেই ৩.৭৫ গ্রেড দিয়ে পাস করিয়েছেন …

আমি যদি কোনোদিন অনেক বিখ্যাত কেউ হয়ে যাই, আমার ইউনিভার্সিটি জীবন নিয়ে একটা সিনেমা হতে পারে! … সেই সিনেমা হিট হবেই হবে … কিংবা ‘বিখ্যাতদের মজার কাহিনী’তে লেখা হবে, ‘ জানেন কি? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনোদিন স্কুলে যাননি … আইনস্টাইন স্কুলের পরীক্ষায় ফেইল করেছিলেন … প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখাই শেষ করতে পারেননি? … ইত্যাদি ইত্যাদি …

গতকালকে ডিইউএফএস -এরও একটা পুনর্মিলনী ছিলো … ইফতার করে তারপর রাতভর আড্ডাবাজি টাইপের একটা প্ল্যান … পরশুদিন রাতে স্বপ্ন যোগাযোগ করেছিলো … আমি তো তখন মরার মতো ঘুমিয়েছি … কালকে সকালে কথা হলো … একে তো শরীরের অবস্থা চিন্তা করে গেলাম না … দ্বিতীয়ত, এই ডিইউএফএস বিষয়টায় আমার ক্যামন জানি অ্যালার্জি আছে … এখানকার কারো সাথে ইনফর্মাল কথাবার্তায় আমার আপত্তি নাই … কিন্তু যখনি বিষয়টা ‘ডিইউএফএস’ কেন্দ্রিক কিছু হয়, আমি চেষ্টা করি কয়েকশ’ হাত দূরে থাকতে … মনের মধ্যে এই ডিইউএফএস নিয়ে যতরকমের বিরক্তি আছে, সব উগড়ে উঠে আসতে শুরু করে …

তবে হ্যাঁ, এইখানে না গেলে আমার এটা ভালোভাবে বোঝার সুযোগ হতো না যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে সেসব তেলাপোকারাই টিকে থাকে, যারা রাজনীতির ছাতার নিচে মাথা গোঁজে … অতিকায় হস্তীদের এখানে ঠাই নাই, কারণ তাদেরকে ছায়া দেয়ার মতো বড় ছাতা তো এখনো তৈরি হয়নি! …

অনেক বকাবাজি করলাম আজকে … আর বোধহয় করা ঠিক হবে না …

আজকের মতো ইস্তফা দিয়ে ঘুমাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s