দিনযাপন | ০৫০৭২০১৫

৫ জুলাই, ২০১৪ -এর একটা কথোপকথনের খণ্ডাংশ ঃ

[ সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি। দুপুরের একটু আগে …]

আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবা?

কত?

৩০০

কখন লাগবে?

এই তো, ২টার আগেই

বাইরে তো বৃষ্টি

বৃষ্টি বলে কি আসা যাবে না? পান্থপথ এসে টাকা দিয়ে যাও

আচ্ছা দেখি, আসছি …

[ চরম অনীহা সত্ত্বেও বের হওয়া। ইনফ্যাক্ট, বাড্ডা যাবার কথা ছিলো, এখন পান্থপথ হয়ে যেতে হবে। এমনিতেই বৃষ্টি, তারমধ্যে সিএনজি পাবো কি পাবো না সেটা নিয়ে একটা টেনশন থাকবে পান্থপথে … এটাই অনীহার মুল কারণ …]

[ রওনা দিয়ে গ্রিন রোড পর্যন্ত যেতে না যেতেই দেখা গেলো রাস্তাজুড়ে হাঁটুপানি। রিকশা চলছেই না …]

[ ফোন … ]

কতদূর?

গ্রিন রোড … রাস্তায় পানি … রিকশা-গাড়ি সব স্টাক হয়ে আছে …

আমি কম্ফোর্টের সামনে দাঁড়াচ্ছি। তুমি ওখানেই নামো …

[ কম্ফোর্ট হসপিটাল দুই -চার কদম পরেই … ওখানে নেমে গেলাম … ফোন … ]

এদিকে রাস্তায় অনেক পানি, আমি পার হতে পারছি না … তুমি পান্থপথেই আসো … রিকশা নিয়ো না … দেরি হয়ে যাবে আমার … হেঁটেই চলে আসো …

[ আমিও হাঁটা দিলাম । একটু সামনে গিয়েই দেখা গেলো রাস্তার দুই ফুটপাথের মাঝের খালি অংশেও পানি … আর সামনে যাওয়ার উপায় নেই … এক রিকশায় করে এক মহিলা যাচ্ছে, উনি ডাক দিয়ে বললেন যে উনার সাথে উঠে পড়তে, অন্তত এই পানিটুকু পার হতে পারবো … তাই করলাম … ফোন … ]

কই তুমি?

রিকশায় … আসতেসি …

ধুর! আবার রিকশায় উঠসো কেন? অনেকক্ষণ লাগবে তো আসতে … রিকশা থেকে নামো …

রাস্তায় তো পানি …

দুই মিনিটের মধ্যে না আসতে পারলে আমি চলে যাবো … থাকো তুমি …

[ মেজাজ খারাপ হলো কিঞ্চিৎ! গরজটা তোমার, আর তুমিই উল্টা ফাঁপর নিচ্ছো! দেরি হলে সেটা নিয়ে নাটক করবে ভেবে নেমেই গেলাম … এবার দেখা গেলো আমাদের ‘এই কুলে আমি আর ওই কুলে তুমি’ অবস্থা! খালি মাঝখানের হাঁটু পানির ফারাক … কি করা যায় ভাবতে গিয়ে দেখলাম যে এই পানির মধ্য দিয়েই হেঁটে যাওয়াই একমাত্র পথ … কারণ অলরেডি আরো দুইবার তাড়া দেয়া হয়ে গেছে … সো, আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে সোজা ওই পানির মধ্য দিয়েই হেঁটে পাড় হয়ে গেলাম …]

[ অপেক্ষমাণ ব্যক্তিটির কাছে যাওয়ার সাথে সাথেই ঝাড়ি … ]

এভাবে পানি পাড় হয়ে আসলা কেন? … রিকশা নিতে পারলা না? …

[ ঠিক সেই মুহুর্তে আমার মাথার ভেতর একটা বিস্ফোরণ হলো! … রিকশায় উঠসি দেখে সে নিজেই ঝাড়ি দিয়ে নেমে যেতে বললো, এখন আবার সে নিজেই রিকশায় ওঠার কথা বলে! হঠাৎ করেই রাগ আর জিদের চোটে প্রচণ্ড কান্না আসলো … কোনোরকমে কান্না গিলে বললাম … ]

কি করবো ? তুমি নিজেই তো …

[ আমার কথা শেষ করার আগেই … ]

‘মাগী’রা কখনো ঠিক হয় না … লাগবে না তোর টাকা …

[ তারপর সে গটগট করে হেঁটে চলে গেলো … আমি খালি একবার তার নাম ধরে ডেকে তাকে দাঁড়াতে বললাম … পেছন পেছন একটু আগালাম … ]

এইটা আমার এলাকা … এইখানে এভাবে আমার নাম ধরে চিল্লাচ্ছো কেন? এখানে সবাই আমাকে চেনে …এভাবে রাস্তার মধ্যে মাগীরাই সিনক্রিয়েট করে …

সেদিন সেই মুহুর্ত থেকেই হঠাৎ করেই আমার মনে তার প্রতি একটা প্রবলরকমের অপছন্দের অনুভূতি দৃঢ় হয়ে গিয়েছিলো … তবে, আমি নিজেও নিশ্চিত হতে পারিনি যে কোনটা তার কাছে সিনক্রিয়েট ছিলো … ওইভাবে পানির মধ্য দিয়ে রাস্তা পার হওয়াটা, নাকি তাকে নাম ধরে ডাকাটা! … হতে পারে সে এভাবে ভাবে যে এরকম করে কোনো ভদ্রস্থ মেয়ে পানি পার হয় না, আর সেখানে রাস্তার সবাই দেখেছে যে আমি পানি পার হয়ে তার কাছেই গিয়ে দাঁড়িয়েছি … ‘রাস্তার মানুষ কি ভাবলো’ এই ভয়েই নিশ্চয়ই সে ভীত হয়েছিলো … সে যদি গটগট করে হাঁটা শুরু না করতো, তাহলে তো আমিও তার নাম ধরে ‘ সোহেল দাঁড়াও’ বলে চিল্লায় উঠতাম না … আর তাহলে নিশ্চয়ই রাস্তায় আরো কম লোকই খেয়াল করতো যে রাস্তায় কে পানি পার হলো, কে কি করলো …

যাই হোক, তারপর সেদিন রাতেই সে আমাকে ঘোষণা দিয়ে এক মাসের জন্য ফেসবুকে ব্লক করলো, আর বললো যে আর কোনোদিন যেন পান্থপথ না যাই তার সাথে দেখা করতে … ফেসবুকের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু এইটা জানতাম যে দুইদিন পরই সে নিজেই পান্থপথে গিয়ে টাকা দিয়ে আসতে বলবে আমাকে … এবং সেটাই হয়েছিলো … একমাস কেন, পরের কয়েকমাসেও ফেসবুকে আমাকে আনব্লক না করার যথেষ্ট কারণ ছিলো তার, যেটা আমি পরে বুঝেছিলাম … এই ঘটনাটা একটা উছিলা ছিলো মাত্র …

সেদিন খুবই মেজাজ খারাপ হয়েছিলো এই ঘটনায় … আর আজকে একবছর পরে এসে হাসিই পাচ্ছে … এখানে যদি ব্যক্তিটা সে না হয়ে অন্য কেউ হতো, তাহলে কি করতাম আমি? … যখন ফোন করে বলতো যে টাকা লাগবে, তখনি সোজা বলে দিতাম যে বৃষ্টিতে আমি অত দৌড়াদৌড়ি করতে পারবো না … তার যদি খুব দরকার হয় তাহলে সে এসে নিয়ে যেতে পারে … সেখানে আমি নিজে বৃষ্টি, হাঁটু পানি সব পার হয়ে তাকে মাত্র ৩০০ টাকা দিতে গেছি, আর তারপর গালি শুনেছি … জীবনে অতটা গুরুত্ব কোনোদিন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দিয়েছি বলে মনে পড়ে না …

কি যে হয়েছিলো আমার! …

যাই হোক, সেদিনের এই ঘটনায় অন্তত আমার এই গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা যথেষ্টই কমেছিলো … নিজের সুবিধার কথাও এরপর থেকে আমি বলতে শুরু করেছি …

আজকে সন্ধ্যায় আমাদের গ্রুপের আরেক সহচর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করলো … সুমি আপু … রিঙ্কন দা’রই ব্যাচমেট … আমার সঙ্গে খুব খাতির ছিলো না, কিন্তু দেখা হলে হাই-হ্যালো- কি খবর এইসব কথাবার্তা হতো … আমি যখন গ্রুপে ঢুকি তখন থেকে উনি ইরেগুলার হওয়া শুরু করেছেন … ফলে, গ্রুপমেট হিসেবে ইন্টারঅ্যাকশনের সুযোগ খুব একটা হয়নি … তার সাথে আমার শেষ মনে রাখার মতো স্মৃতি একটাই … দুই/তিন বছর আগে বৈশাখের সময় তার কাছ থেকে একটা বড়সড় টেপা পুতুল নকশার মুখোশ কিনেছিলাম … ৮ হাজার জিনিস দামাদামি করে শেষে সাড়ে ৩ হাজারে কিনেছি … দাবি ছিলো একটাই, গ্রুপের ছোটবোন হিসেবে তো এইটুকু এক্সট্রা খাতির আমি পেতেই পারি! … ওই টেপা পুতুল মুখোশটা এই বাসায় জায়গা নাই দেখে পাঁচতলায় রেখেছিলাম … শরীফ ভাই ঘরের রিনোভেশনের সময় ওইটা স্টোরে রেখেছে না ফেলেই দিয়েছে জানি না … কেন জানি গত ছয়মাসে উনাকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি … যদি ফেলে দেয়া হয়, তাহলে তো তার সাথে আমার আর কোনো স্মৃতির উপাদান নাই … আর যদি ওটা স্টোরে থাকে, তাহলে হয়তো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওটা মিরপুরের বাসার দেয়ালে ঝুলবে …

আজকে অনেক কথা লিখে ফেললাম … অনেক রাতও হলো … কালকে সকাল সকাল মিরপুরের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে হবে … সেখান থেকে ২টার মধ্যে আবার কাঁটাবন যেতে হবে, কারণ ৪টা থেকে স্কুলের নাটকটার ফাইনাল রান থ্রু … সেটাও আবার কস্টিউম আর প্রপস সহ … সুতরাং, আমাকে থাকতেই হবে যে কোনো উপায়ে …

ফলে, এখন ঘুমিয়ে পড়াটাই কর্তব্য …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s