দিনযাপন | ১২০৭২০১৫

মিরপুরে যেদিন যাওয়া হয়, সেদিন বাসায় ফিরতে ফিরতেই রাত দশটা বাজে। সারাদিন একে তো কোথাও বসতে পারি না আরাম করে, খাওয়া দাওয়াও ঠিকমতো হয় না, পানিও খাওয়া হয় কম … বাসায় ফিরতে ফিরতে শরীরে আর শক্তির অবশিষ্টটুকু থাকে না … মোটামুটি ১২টা কি সাড়ে ১২টার মধ্যেই ঘুমিয়ে যাই …

ফলাফল, দিনযাপন লেখাই হচ্ছে না …

গতকালকেই যেমন মিরপুর থেকে বাসাতেই ফিরলাম রাত ১০টা বাজে … সারাদিন কাঠমিস্ত্রি কাজ করলো … সন্ধ্যার পর টিয়ামের বাসায় ইফতার করে চলে আসবো ভাবছিলাম, কিন্তু মিস্ত্রি বললো যে অন্তত বারান্দার ফ্রেম-এর কাজটা শেষ করে ফেলতে চায় … ফলে সন্ধ্যায় ইফতারের সময় টিয়ামের বাসায় গিয়ে অল্প ইফতার করে, গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আবার মিরপুরের বাসায় গেলাম … সেখানে কাজ শেষ করে বের হতে হতে প্রায় সাড়ে নয়টা বাজলো … বাসায় এসে কোনোরকমে অল্প ভাত খেয়েছি, তারপর ঘুম …

আজকেও সারাদিন এটা-সেটা খুচরা ঘোরাঘুরি হয়েছে … সকালে বের হয়ে প্রথম গেলাম স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি … ওখানে জার্নালিজমে মাস্টার্স করা যায় কি না সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম অনেকদিন ধরেই … মাস্টার্স বলতে ওখানে নন-জার্নালিজম যারা যায়, তাদের প্রিলি ফাইনাল বলে একটা কিছু নামে মাস্টার্স -এর কোর্সটা হয় … কিন্তু ওটাতে স্টুডেন্ট কম হয় বলে সেই কোর্সই এবার উঠিয়ে দিয়েছে! … অতএব এখানে আর মাস্টার্স করা হচ্ছে না … এখন ক্রিমিনলজি-ই পরবর্তী ভরসা … কিন্তু ক্রিমিনলজি-তে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় … আর পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবার বিষয়টায় কনফিডেন্ট হতে পারছি না … তিন্নি আপু যদিও ভরসা দিয়েছে যে একসাথে বসে প্রিপেরাশান নেবে, অঙ্ক যা আছে সেগুলো আমাকে বুঝিয়ে দেবে … তারপরও … দ্যাখা যাক, কি হয়!

স্ট্যামফোর্ড থেকে ব্যাংকে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। চেক জমা দেবো, আবার টাকাও তুলবো … সাজিয়া আপু পরে অবশ্য বললো চেকগুলো তাকে দিয়ে যেতে, পরে জমা দিয়ে দেবে … সেটাই করলাম … কিন্তু টাকা তোলার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েও বিপত্তি … তিনটা কাউন্টারের একটাতে একজন ক্লায়েন্টেরই লাখ লাখ ক্যাশ জমা হচ্ছে, ফলে ওখানে আর কাউকে সার্ভিস দেয়া হচ্ছে না … আরেকটা কাউন্টারেও এক লোক প্রায় ২৫টা চেক জমা দেবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে … একটাই কাউন্টারে অন্যান্য সাধারণ চেক জমা আর টাকা তোলা হচ্ছে … এর মধ্যে কম্পিউটার হ্যাং হয়ে দশ মিনিট কাজ বন্ধ থাকলো … পাশেই বিশাল বিস্ফোরণের শব্দ করে ইলেক্ট্রিসিটির ট্রান্সমিটার বার্স্ট করলো … আর আমি খালি ভাবছিলাম, আচ্ছা এই ব্যাংকে তো সে-ও আসে নেট-এর বিল জমা দিতে, যদি কখনো দেখা হয়ে যায় তখন আমি কি করবো? … আগে তো না হয় ওর নেট-এর বিলও ঘুরায়-প্যাচায় ‘ তুমি আপাতত দিয়ে দাও, আমি আপুর কাছ থেকে টাকা পেলে তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি’র ফাঁদে পড়ে আমাকেই দিয়ে দিতে হতো, ফলে তখন ওর আর ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না … কিন্তু এখন ওর নেট-এর বিলের টাকা যে-ই দিক, সেই টাকা জমা দেয়ার জন্য কি ও-ই আসে? নাকি নতুন কোনো ভোঁদাই-কে জোগাড় করতে পেরেছে ওর সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য? … জানি না অবশ্য! … একটু আগে দেখলাম তার ফটোগ্রাফার বড়ভাই-এর সাথে দলবেঁধে শপিং করতে গেছে বসুন্ধরা সিটি-তে, সেই ছবি ওই দলেরই একজন ফেসবুকে পোস্ট করেছে …

গত রোযায় তো তাকে এখানে সেখানে ইফতার করিয়ে কয়েক হাজার নেকির সওয়াব হতো আমার … এবার কার সওয়াব হচ্ছে কে জানে! …

দুপুরে আমি আর তিন্নি আপু কোথাও খাবো বলে একটা প্ল্যান করেছিলাম … ইন ফ্যাক্ট, ব্যাপারটা ছিলো এমন যে আমার গত কয়েকদিন ধরে খুব কাচ্চি বিরিয়ানী খেতে ইচ্ছে করছে! তিন্নি আপু আজকে ইন্ডিয়ার ভিসা’র অ্যাপ্লিকেশন জমা দেবার জন্য ধানমণ্ডিতে আসার কথা। তাই এরকম একটা প্ল্যান করেছিলাম যে যেহেতু সে ধানমণ্ডিতেই আছে সেহেতু দুপুরে একসাথে খাওয়া যেতে পারে … সেই সূত্রে আমার কাচ্চি খাওয়ার সাধটাও মিটিয়ে ফেলা যাবে … কিন্তু যখন ব্যের হলাম তিন্নি আপুর সাথে তখন মনে হলো যে এখানে ধানমণ্ডি এলাকায় তো এক স্টার ছাড়া আর কোথাও সেভাবে কাচ্চি পাওয়া যায় না, আর স্টারের কাচ্চি-তে যে পরিমাণ তেল দেয়, সেটা খেলে এই গরমে আরো অস্বস্তি লাগবে … কোথায় যাবো, কি খাবো আলোচনা করতে করতে বাবুর্চি আর কড়াই গোস্ত’র প্রসঙ্গ এলো … ‘বাবুর্চি রেস্তোরাঁ’র নাম শুনেই আমি না বলে দিলাম, কারণ ওইখানে ‘তাকে’ নিয়ে মাঝে মাঝেই গেছি, খাইয়েছি – ওখানে গেলেই ওইসব কথা মনে হয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে … তিন্নি আপু শুনে বললো যে বাবুর্চি-তেই যাবে … আমার নাকি মেমোরি ওভারল্যাপিং-এর প্র্যাকটিস করা উচিৎ … তো গেলাম … তিন্নি আপু বলছিলো যে ওখানে গিয়ে যেই সিটে আমরা ইউজুয়ালি বসতাম আজকেও আমাকে সেখানেই বসাবে … কিন্তু সেটা অবশ্য হলো না … তিন তলা বন্ধ না কি যেন, আমাদের বসতে দিলো দুই তলায় … বাবুর্চিতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে পাশেই ‘ব্রেড অ্যান্ড বিয়ন্ড’এ বসে ঠাণ্ডা ল্যাটে খেতে খেতে বেশ অনেকক্ষণ গল্পগুজব হলো আমার আর তিন্নি আপুর … এখন গ্রুপে ইফতারের আগে কেউ আসে না, তাই পরে যাবো চিন্তা করে বাসায় চলে আসলাম ওখান থেকে … ঘণ্টা দুই-এর একটা আরামের ঘুম হলো, তারপর উঠে গ্রুপে গেলাম …

গ্রুপে আজকে খালি যুক্তি-তর্ক-বিশ্লেষণই হলো বিভিন্ন বিষয়ে … গ্রুপে বসে বকুল ভাইয়ের সাথে দলবেঁধে জেন্ডার ডিস্ক্রিমিনেশন, স্টেরিওটাইপ, সেন্সেটাইজেশন এইসব নিয়ে কথা হলো … গ্রুপ থেকে বের হয়ে চা খেতে খেতে রানা’র সাথে আলোচনা শুরু হলো গ্রুপের নতুন ছেলেপেলেদের কেন ধরে রাখা যায় না, কি অ্যাপ্রোচের কারণে তারা আসতে চাইলেও চিন্তা করে যে ‘এদের এমন ব্যবহার, আর আসবো না!’ … এইসব এইসব নিয়ে কথা হতে হতে সেটাও বেশ যুক্তি-তর্কের দিকে চলে গেলো … সেই তর্ক চললো রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত … বাসায় ফিরলাম যখন তখন বাজে রাত ১২ঃ০৫ … বাসায় ফেরার তাড়া না থাকলে হয়তো তর্ক আরো চলতো … কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে বকুল ভাইয়ের সাথে যেমন  পরস্পরের যুক্তিকে গ্রহণ করে গঠনমূলক তর্ক করা যায়, যুক্তিগুলোকে বিশ্লেষণ করা যায়, রানার সাথে সেটা হয় না … বরং, যখন দেখা যায় যে রানা ওর নিজের যুক্তিটাকেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে এবং আমি বা অপর পক্ষ কি বলছে সেই পয়েন্ট-টাই ধরতে পারছে না, তখন বিরক্তিবোধ হয় …

যাই হোক, এই যে খাটটার ওপর শুয়ে বসে আজকে দিনযাপন লিখছি, কালকে সকালেই খুব সম্ভবত এই খাট আর খাটের জায়গায় থাকবে না! … মিস্ত্রি আসবে সকালে, এই খাট খুলে দিয়ে যাবে – এখন পর্যন্ত এরকমই পরিকল্পনা আছে … সেরকম হলে মিরপুরে ওঠার আগ পর্যন্ত আজকেই আমার আরামে হাত-পা ছড়িয়ে খাটে শোয়ার শেষ রাত … সেটা কোনো ফ্যাক্টর না, যদি ইঁদুর অস্থিরতা করে ঘরময় না দৌড়ায় … একে একে ইঁদুরের অভয়ারণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর ইঁদুরেরা আরো অস্থির হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে … খাট-টা সরিয়ে ফেলার পর ইঁদুর আরো কি পরিমাণ ডেসপারেট হয়ে ওঠে সেটাই চিন্তার বিষয়! …

গত পরশু দিন যে তিন্নি আপু, তার ছোটোভাই আর ছোটভাইয়ের কিছু বন্ধু – বান্ধব আর তিন্নি আপুর দুই জুনিয়র ফ্রেন্ড মিলে সিনেপ্লেক্স পর পর দুইটা মুভি দেখা হয়েছে সেটা তো লেখা হলো না … সকাল ১১ টায় ইনসাইড আউট দেখা হলো, দুপুর ২ঃ৪৫-এ মিনিয়নস … ইনসাইড আউট বিগ স্ক্রিনে দেখে বেশ ভালোই লাগলো, ল্যাপটপে ছোটো পর্দায় অ্যানিমেশনের ডিটেইল অনেককিছুই চোখে পড়েনাই … আর মিনিয়নস দেখতে গিয়ে বাসায় যেমন গড়াগড়ি দিয়ে হেসেছিলাম, হলেও তাই করেছি … এই উইকেন্ড মুভি ম্যানিয়ার আইডিয়াটা খারাপ না … মাসে হাজার – পনের শ’ টাকা মুভি দেখার পেছনে খরচ করাই যায়! … বিগ স্ক্রিনে মুভি দেখার মজাটা আর কই পাওয়া যাবে? …

আজকে আর কি লিখবো? … অনেক ক্লান্ত লাগছে … সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিবিসি’র একটা কাজ শেষ করে, মিস্ত্রি আসলে খাট খুলিয়ে তারপর আবার মিস্ত্রিকে নিয়ে মিরপুর যেতে হবে … মিরপুরে কাজ শেষ করে ফিরতে কতক্ষণ কে জানে! …

তবে, এত কষ্ট করে বাসাটা যদি মনের মতো হয়, সুন্দর হয় তাহলেই শান্তি …

আপাতত, ঘুমিয়ে শান্তি পাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s