দিনযাপন | ১৩০৭২০১৫

খাট হঠাও ! খাট হঠাও ! করতে করতে অবশেষে খাট হঠলো … আপাতত আগামী কয়েকদিন পর্যন্ত আমার ঘুমের জায়গার কোনো ঠিক-ঠিকানা থাকবে না … মিরপুরে গিয়ে টিয়ামের বাসায় থাকবো তারও উপায় নাই, কারণ এদিকে বেশ কিছু খুচরা কাজ-বাজ আছে … ২৪ তারিখে বাসা ছাড়ার আগ পর্যন্ত টুকটাক অনেকগুলা কাজ শেষ করতে হবে, ঘরের অনেক কিছু গোছাতে হবে … কিন্তু, ঘুমাবো কই? … ঘরে ইঁদুর প্রজাতির যেসব প্রাণী রাতভর ঘুরে বেড়ায় তারা তো এখন খালি ঘর পেয়ে আরো ডেসপারেট হয়ে যাবে! … মাটিতে তোশক পেতে ঘুমালে দেখা যাবে গায়ের ওপরেই উঠে বসেছে! …

প্রচণ্ড ক্লান্ত আজকে … সারাদিন গরমের মধ্যে মিরপুরের বাসার মধ্যে বসে থেকে থেকে একে তো অস্থির লাগতে থাকে, আর পা ফুলে ঢোল হয়ে যায় … আজকেও তাই হলো … সারাদিন ধরে বারান্দার ফ্রেমের বার্নিশ, পর্দার ফ্রেম, রান্নাঘরের এটা-সেটা শেলফ এইসব লাগানোর কাজ হলো … সকালে ৮টার দিকে এসে খাট খুলে দিয়ে তারপর মিরপুর যাওয়ার কথা, এদিকে মিস্ত্রি ফোনই ধরে না! … শেষতক সাড়ে ১০টার দিকে সে ফোন দিয়ে জানালো যে সরাসরি মিরপুরে চলে যাচ্ছে, আপাতত এদিকে আসবে না … চরম মেজাজ খারাপ হলো মিস্ত্রির ওপর … এক খাট খোলা নিয়ে তিন-চারদিন যাবত এই ঘ্যানাপ্যাঁচাল চলতেসে! … যাই হোক, মিরপুরে বাসায় এখনো ফ্যান লাগায়নি, তাই অস্থির টাইপের গরম লাগতে থাকে … এর মধ্যেই কাজের তদারকিও করতে হয় … আর খাবার-দাবারের ঝামেলা তো আছেই … আজকে না পারতে বাধ্য হয়ে শেষে কেয়া ফুপির বাসায় গিয়ে দুপুরে একটু ভাত খেয়ে আসছি … তারমধ্যে আরেকবার বের হলাম পর্দার জন্য পাইপ-টাইপ এসব কিনতে … গরমের মধ্যে দুইবার বের হয়ে আমার অবস্থা আরো কাহিল হয়ে গেলো … এদিকে আরাম করে কোথাও বসে থাকবো সেই ব্যবস্থাও এখনো হয়নি … হয় টুলের ওপর একটু বসি, নয়তো সরাসরি ধুলামাখা মাটিতে … এটাও আরেক যন্ত্রণা …

তাও ভালো যে এইসব যন্ত্রণা করে কাজগুলো অন্তত এমন একটা অবস্থায় এসেছে যে এখন চাইলেই বাসায় উঠে যাওয়া যাবে … এই ঈদের ঝামেলা যদি মাঝখানে না থাকতো, তাহলে হয়তো ২৪/২৫ তারিখের আগেই চলে যাওয়া যেতো …

আজকে বাসায় কাজ চলতে চলতে আমি হঠাৎ করে একটা ব্যাগের ভেতর পুরনো একটা চিঠি আবিষ্কার করলাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময়টায় লিপন নামের একটা ছেলের সাথে আমার বেশ খাতির ছিলো … আমি তাকে নিয়ে ভাবতাম, সে আমাকে নিয়ে ভাবতো টাইপ খাতির … তার আগে – পরে আরো অনেক কাহিনী যা আছে সেগুলোও হয়তো কখনো না কখনো লেখা হবে, আজকে কেবল চিঠির কথাই লিখি … চিঠিটা পড়তে পড়তে বেশ চমৎকৃত হচ্ছিলাম … এমন কিছু বিষয়ে লিপন চিঠিটা লিখেছিলো সেরকমকিছু যে আদৌ ঘটেছিলো সেটাই আমি পুরোপুরিই ভুলে গিয়েছিলাম! … লিপনের কতটুকু মনে আছে কে জানে! এই চিঠি এখন ওকে পড়তে দিলে ও হয়তো সম্পূর্ণ অস্বীকারও করতে পারে যে এরকম কিছু ঘটেই নাই, ও আমাকে টেস্ট করার জন্য লিখেছিলো এইসবও বলতে পারে! …

যাই হোক, চিঠির বিস্তারিত প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ পরে করা যাবে। আগে চিঠি থেকে অল্প অংশ এখানে লিখে নেই –

” … আর, তাছাড়া, আমার বাবা-মাও আমাদের relation টা মেনে নিবে বলে মনে হয় না। তাদের desire অনেক high। আমাকে বড়লোক ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার educated মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন। তাই, তোমাদের economic দিকটা আরেকটু developed হোলে ভালো হতো। সেটা অনেক পরের ব্যাপার। তবে তোমার father-mother educated এটা হয়তো তাদের কাছে admirable, তবুও … “

সেই ২০০৫ সালের ৮ জুলাই যখন লিপন চিঠিতে এসব কথাবার্তা লিখেছিলো তখন রাগ হয়েছিলো এটা ভেবে যে আমার সাথে সে রিলেশন করবে কি করবে না সেটার সাথে আমার আর্থিক অবস্থার কেন সম্পর্ক থাকবে! সেই সময় মনে মনে এরকম সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম যে আর যাই হোক, এই কথার পর আমি প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াৎ সজ্ঞানে কখনোই লিপনকে বিয়ে করবো না … কারণ যে ছেলে মনে করে একটা মেয়েকে ছেলের বাবা-মা’র কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে বড়লোক হতে হবে, ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, সেই ছেলেকে বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে! …

আজকে যখন চিঠিটা পড়ছিলাম, তখন ১০ বছরের চিন্তা-ভাবনা-অভিজ্ঞতায় চিঠির অনেক কথা অনেক ভিন্নভাবে আমাকে স্ট্রাইক করলো … ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাও তখনো শেষ হয়নি যেই ছেলের, বয়স যার তখনো মাত্র ১৮ কি ১৯, সেই ছেলেকে তার সামাজিক শিক্ষা ওই বয়সেই সম্পর্ক, ভালো লাগা,ভালোবাসা এগুলাকে এতটা জাস্টিফাই করতে শিখিয়েছে! … এসব নিয়ে তার থট প্রসেসটা ক্যামন স্টেরিওটিপিক্যাল হয়ে গেছে ওই বয়সেই! … ১৮/১৯ বছর বয়সের একটা ছেলের ভালোবাসার অনুভূতি, সম্পর্কের দর্শন কোথায় এমন হওয়ার কথা যে ‘তুমি আমাকে পছন্দ করো? তাইলে আর কি! চলো প্রেম করি! তারপর যা হয় হবে!’ …

এখন সে কি করে, আদৌ কোনো বড়লোক ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার মেয়েকে বিয়ে করেছে কি না সেসব কিছুই জানি না … অনেক আগে ফেসবুকে লিপনের সাথে যোগাযোগ হয়েছিলো, কিন্তু তারপর একবার কি একটা মন্তব্য করেছিলো একটা বিষয়ে, তারপর থেকে আর যোগাযোগ রাখার তাগিদ বোধ করিনি … পরে সম্ভবত সে-ই আমাকে ব্লক করে দিয়েছে …

তবে এটা ঠিক যে এই সমাজে টিপিক্যাল মেন্টালিটির ছেলেরা ক্যামন হয় সেটা আমি চিনতে শুরু করেছি লিপনকে দিয়ে, আর শেষ করেছি সোহেল-কে দিয়ে … ভবিষ্যতে কখনো যে আর কোনো ছেলেকে আমি প্রেম-ভালোবাসা-সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারে এক বিন্দুও বিশ্বাস করতে হলে সেই ছেলেকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেটা লিপন, অনিক, সোহেল-দের মতো ছেলেদের বদান্যতায়ই …

এরকম যার সাথেই আমার যা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে একটা বই লিখে ফেলা যেতে পারে … তাতে করে যে আমার কপালে খুব খারাপি আছে সেটাও আমি নিশ্চিত … অনেক কিছুই হতে পারে … নিজের গুমর ফাঁস হয়ে যাক সেটা কি কেউ চায়? … কিন্তু তাদের এইসব ঘটনার সাথে যেহেতু আমিও একটা অংশ এবং আমার যেহেতু নিজের কথা কাউকে জানাতে বাঁধে না সেহেতু আমার আত্মকথার মধ্যে তাদের প্রসঙ্গ চলেই আসবে … আমার সাথে যারা যারাই যেভাবেই অ্যাটাচড ছিলো, নিজের কথা জানাতে গিয়ে তাদের যদি নাম – ঠিকানাসহ আমার সবকিছু বলতেই হয়, সেটা তো আমি বলবোই … এমন কাজ কেনই বা করবো যেটা কাউকে বলাই যাবে না? …

একটা কথা মনে হয়ে মজা পাচ্ছি … আমার এই লেখা যদি সেসব ছেলেদের কেউ পড়ে থাকে, তাহলে তাদের মনে প্রথম চিন্তা আসবে যে ‘ আমার কথাও কি তাইলে বলে দিবে?’ … ওই চেহারাগুলো কল্পনা করার চেষ্টা করছি … মে বি, দ্যা অনলি থিং দে ক্যান নাও রিগ্রেট ইজ বিয়িং ইনভলভড উইথ মি অ্যান্ড মাই লাইফ অ্যানিওয়ে! …

আজকে আর লিখবো না … ঘুমানোর জায়গা থাকুক আর না-ই থাকুক, আমাকে ঘুমাতেই হবে এখন … প্রচণ্ড ক্লান্ত আমি … ঘুমের রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হয়ে যাচ্ছে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s