দিনযাপন | ১৬০৭২০১৫

অনেকদিন পর বেশ ফ্রি ফ্রি ভাবের একটা দিন … তবে দিনটা কাটলো বাইরে বাইরেই …

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মা’র সাথে নিউমার্কেট যাওয়া হলো … উদ্দেশ্য মিরপুরের বাসার জন্য টুকটাক কিছু জিনিসপত্র কেনা … বাথরুমের ধোয়া-মোছার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কাপড় মেলার জন্য দড়ি, ঘরের জন্য ময়লা ফেলার বাস্কেট এইসব এইসব জিনিস, কুশন, কুশন কাভার এইসব আর কি! … এইগুলা কিনে টিনে বাসায় আসলাম দুপুরে …

বিকালে বের হবো কি না, হলেও কই যাবো সেটা নিয়ে একটা অনিশ্চিয়তা ছিলো কিছুক্ষণ … ইন্সট্রুমেন্ট-এর দোকানে একটা কাজ ছিলো, আবার তিন্নি আপুর সাথে ইফতার হ্যাংআউট হতে পারে এরকমও একটা বিষয় ছিলো… এমনিতে শুয়ে শুয়ে সেন্স-এইট সিরিজটা দেখছিলাম … আর কিছু না হলে হয়তো এইটাই দেখতাম বাসায় বসে … এর মধ্যে তিন্নি আপু তার ভাইয়ের কলকাতা যাওয়ার টিকিট কেটে, রূপি ভাঙ্গায়-টাঙ্গায় প্ল্যান করলো এলিফ্যান্ট রোডে স্টার-এ ইফতার খাওয়া যেতে পারে … আর গোপীকে আমার সাথে ইন্সট্রুমেন্ট-এর দোকানে যেতে বলসিলাম, ও বললো ইফতারের পরে আসবে … তো ভাবলাম যে সবদিক দিয়েই টাইমিং সুন্দর …

স্টারে গিয়ে বসে পড়ার পর বুঝলাম যে এটা খুবই বাজে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে … ওদের একটা ইফতার প্ল্যাটার আছে, যেখানে ছোলা-পেয়াজু-বেগুনি এইসবই দেয় আর সেটার দাম ১৪৫ টাকা, আবার ওইটা নাকি নিতেই হবে … যে আর যেই আইটেমই অর্ডার দিক না কেন, সাথে এই ১৪৫ টাকাও তার খরচ করাই লাগবে! … আমরা ভাবলাম যে তিনজন আছি, সাথে দুইটা লেগ রোস্ট নিয়ে না হয় পয়সা উশুল করি … কিন্তু দেখা গেলো যে লেগ রোস্টও নেই … এই ভর সন্ধ্যায় তো আর পোলাও-বিরিয়ানি খাওয়ার কোনো মানে হয় না … আবার এমন একটা সময় তখন যে বের হয়ে আর কোথাও যেতে যেতেও সাইরেন পরে যাবে, আর ইফতারের জন্য জায়গাও হয়তো পাওয়া যাবে না … অগত্যা এই ছোলা-পেয়াজু ইফতারই করলাম …

আমি ধারণা করছিলাম যে শুধুমাত্র আমার সাথে ইন্সট্রুমেন্ট-এর দোকানে যাওয়ার জন্য ঈদের ভিড়ে গোপী হয়তো আসবে না … আলটিমেটলি আমার ধারণাই ঠিক হলো … যেহেতু কাজটা আজকে-কালকেই হতে হবে এমন জরুরি না, তাই ও যখন বললো আজকে না এসে কাল আসবে, আমার ভালো-খারাপ-রাগ-বিরক্তি এই টাইপ কোনো অনুভূতিও হলো না … সমস্যা একটাই যে কাজটা আজকে-কালকে না হলে হাতে যেটুকু টাকা আছে সেটা খরচ হয়ে যাবে, আর তারপর আবার ব্যাংকে যেটুকু টাকা জমিয়েছি সেটা তুলে খরচ করে ফেলতে হবে … সেটা করতে চাচ্ছি না বলেই ঈদের আগেই কাজটা শেষ করে ফেলতে চাচ্ছি …

কালকেও যদি না হয়, তাইলে আলটিমেটলি ঈদের পরেই করা লাগবে … কোনোভাবে টাকাটা খরচ না করে জমিয়ে রাখতে পারলেই হয় …

তো, যাই হোক, যেহেতু ওই কাজটা ক্যান্সেল হলো, আর তিন্নি আপুর বা অমি’রও কাজ নাই, তাই আমরা সয় থ্রি ভায়া ধানমণ্ডি ২-এর আড়ং টাইপ একটা প্ল্যান করে হাঁটতে শুরু করলাম … আড়ং- গিয়ে বেশ অনেকটা সময় তাগা কর্ণারে এটা-সেটা ড্রেস দেখলাম, ট্রায়াল দিলাম … একটুখানি সময় হোম ডেকর কর্ণারে ঘুরে তারপর বের হলাম … গ্রুপে যাবো কি যাবো না ভাবছিলাম, কারণ তখন অলরেডি ৯টার মতো বাজে, আবার কেউ আসছে কি না ওখানে তাও জানি না … নায়িমী আর বিপ্লবকে ফোন দিলাম, ওরা কেউ যায়নি … রানার সাথে কথা হলো, ও বললো যে ও-ও যায়নি … তাইলে আর গ্রুপের দিকে গিয়ে কি করবো, এই ভেবে সয় থ্রি-র উদ্দেশ্যেই রওয়ানা দিলাম … মাঝখানে আবার হ্যাপি আর্কেডে ঢুকে কিছুক্ষণ টি-শার্ট দেখা হলো … এর মধ্যে বৃষ্টিও নামলো … হাল্কা বৃষ্টি, আবার গুড়ি গুড়িও না … সয় থ্রি পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে বৃষ্টিতে অনেকটাই ভিজলাম … সয় থ্রি তে বসে কফি, হট চকোলেট এইসব খেয়ে যখন বের হই, তখন গেটে আবার শুভ’র সাথে দেখা হলো … তিন্নি আপু আর অমি যাবে তেজগাঁও, আর আমি সেন্ট্রাল রোড … অলরেডি তখন ১১টার মতো বাজে … আমি ভাবলাম যে বৃষ্টি তো নাই, আর বাসা পর্যন্তও হেঁটেই চলে যাওয়া যাবে, শুভকে না হয় বলি সাথে একটু যেতে … শুভও না বললো না … কিন্তু একটুখানি আগায় রাস্তার মোড়ে আসার পরেই বৃষ্টি শুরু হলো আবার, আর আলিয়াস ফ্রসেস এর মাথায় আসতে আসতে সেইটা বেড়েও গেলো … কেমন জানি বিরক্তিই লাগলো যে ধুর, এর চেয়ে একাই রিকশা নিয়ে নিতাম … এখন তো বৃষ্টি নামলোই, নিজেও ভিজলাম, সাথে আবার আজাইরাই আরেকজনকেও ভেজালাম … কনকর্ড আর্কেডিয়ার কাছে এসে মনে হলো যে আর হেঁটে যাওয়া ঠিক হবে না বৃষ্টিতে … রিকশা নিয়ে নিলাম … শুভ কি মনে করলো কে জানে! মনে হয় ভাববে যে গ্রুপের সিনিয়র হইসি দেখে জুনিয়র একজনকে রাস্তায় পেয়ে এভাবে খুব ফাঁপর নিলাম!

যাই হোক, ব্যাপারটা এমন না যে আমি ইচ্ছা করেই এমন সব জায়গায় যাচ্ছি যেখানে যেখানে সোহেলের সাথে আমার কোনো না কোনো স্মৃতি আছে … ক্যামন ক্যামন করে জানি ব্যাপারটা হয়ে যাচ্ছে … এই যে সয় থ্রি-তে গেলাম, সেটাও তাই … ওর সাথে সয় থ্রি-তে গিয়েছি একদিন … তাও অল্প সময়ের জন্য … কিছুক্ষণের জন্য বাসার সামনেই কোথাও বসার একটা ব্যাপার ছিলো … কোথায় বসবো জিজ্ঞেস করাতে সয় থ্রির নামই প্রথম মাথায় এসেছিলো, তাই বলেছি … সয় থ্রি-তে যাবার পর সে বলছিলো যে সয় থ্রি’র কথা শুনে সে খুব অবাক হয়েছে, কারণ এখানে নাকি তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড কে নিয়ে প্রায়ই আসতো … তার কয়েকদিন পরেই দেখেছিলাম যে আমার সাথে ঘুরতে-ফিরতেই সে আবার নতুন করে যেই মেয়ের সাথে প্রেম করতে শুরু করেছিলো, তাকে নিয়েও কোনো এক রোজায় এরকমই কোনো একটা সময়ে সে সয় থ্রি- তেই গিয়েছিলো … ওই মেয়ের ছবি দেখে বুঝেছিলাম যে সয় থ্রি আসলে তার স্পেশাল ডেটিং জোন … ওইখানে তাকে নিয়ে আমার যাওয়াটা তার জন্য সঙ্গত কারণেই অবাক হবার মতো ছিলো … সয় থ্রিতে যাওয়াটা আমার জন্য আজকে অনেক বেশিই অসস্তির ছিলো, কারণ যতটা না তার আমার সয় থ্রি যাওয়ার স্মৃতি আমার মনের মধ্যে ভাসে, তার চেয়ে বেশি সয় থ্রিতে ওই মেয়েটার যে ছবি দেখেছিলাম, এবং বুঝেছিলাম যে সে নতুন কোনো সম্পর্কে জড়াচ্ছে এবং আমাকে যাবতীয়রকমভাবে ইগ্নোর করার উছিলাগুলা আসলে তার ঢাল মাত্র, তখন থেকে সয় থ্রি জায়গাটা আসলে মাথার মধ্যে টগবগ করে রক্ত গরম করার স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে …

কি কপাল আমার! সেই সয় থ্রি-তেই আজকে যাওয়া হলো, হিসেব মতে যেই সিটে ওই মেয়ে আর সে বসেছিলো, ঠিক সেখানেই কাকতালীয়ভাবে বসা হলো! … এইটা আসলে মেমোরি ওভারল্যাপিং হলো না আজকে … মেমোরি ইগনিশন হলো … কোল্ড কফি অর্ডার দিতে গিয়ে মনের ভুলে হট চকোলেট অর্ডার দিয়ে দিলাম … ক্রিম অ্যান্ড ফাজ-এ গেলে যে সে খালি হট চকোলেট খেতো, সেইটা কথায় কথায় তিন্নি আপুকে বলছিলাম … তারপর নিজেও কোল্ড কফি দিবো ভেবে রেখে বললাম হট চকোলেট … ধুর ছাতা টাইপ এইসব ঘটনা আর ঘটনার প্রেক্ষিতে অনুভূতিগুলো মেজাজ খারাপই কেবল বাড়ায় …

সেই যে অনেকদিন ধরেই একটা বোম ফাটিয়ে দেখতে চাইছি কি হয়, কিন্তু বোমটা আর ফাটানো হচ্ছে না … গত কয়েকদিন যাবৎ আবারো ইচ্ছে করছে বোমাটা ফাটিয়েই দেই … এরকম মেজাজ খারাপ করা ঘটনা একটার পর একটা ঘটতে থাকলে মনে হয় যেকোনো দিন বোমাটা ফাটিয়েই ফেলবো … যা হয় হবে … বোমার বিস্ফোরণ আত্মঘাতী হলেও সই, তবুও ধ্বংস হোক আমার যাবতীয় যন্ত্রণার অনুভূতি … কিংবা নতুন কোনো রূপ পাক … মাথা থেকে, বুক থেকে, মন থেকে, জীবন থেকে একটা ভার নামুক …

কি কথায় কথায় তিন্নি আপুকে বলছিলাম যে দিনযাপনে আস্তে আস্তে সবার সবকিছু নাম – ঠিকানাসহ লিখতে শুরু করবো… তিন্নি আপু তখন  বলছিলো যে কয়দিন পর তো তুই আর আমি তসলিমা নাসরিনের মতো হয়ে যাবো রে! … কথাটা আমিও মাঝে মাঝেই ভাবি … তসলিমা নাসরিন যেভাবে সাহসের সাথে তার জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো অকপটে লিখে যেতে পেরেছে, সেভাবে যদি আর দশটা মেয়েও পারতো, তাহলে বাংলাদেশের চেহারা অনেক ভিন্ন হতো … আমি তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা বিস্তারিত পড়িনি, কিন্তু তাকে নিয়ে লেখা সমালোচনাগুলো পড়েছি, তাকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা হয় সেগুলো শুনেছি … তাতে করে আমার মনেই হয় যে তাকে সবাই ভয় পাই দেখেই একঘরে করে দিয়েছে, দেশ থেকে বের করে দিয়েছে … তার মতো করে আরো কয়েকজন মেয়ে যদি লিখে ফেলতে পারতো, নিজেদের জীবনকে অকপটে সামনে তুলে ধরতে পারতো, তাহলে যারা ভয়ের চোটে তসলিমা নাসরিনকে দেশেই ঢুকতে দেয় না, তারা ভয় পেয়ে অন্তত তাদের জীবনযাপন পাল্টাতো …

আমি যদিও তসলিমা নাসরিনের মতো বৈপ্লবিক কোনো চিন্তা থেকে দিনযাপন লিখি না … অন্তত এখনো না … আমি দিনযাপন লিখি, কারণ আমি আমার নিজের চিন্তা, নিজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে নিজের কাছে সৎ থাকতে চাই … এখন একটা কাজ করে পরে সেটাকে আড়াল করে রাখার জন্য কিভাবে কি করবো সেই জীবন আমি যাপন করতে চাই না … সেটা করতে গিয়েই জীবনে কেবল অনুশোচনাই বেড়েছে, অনুতাপই বেড়েছে … এখন আমি যা-ই করি, সেটা নিয়ে দিনযাপনে লিখি … আমি অন্তত এখন আমার নিজের কাছে সৎ … এখানে আমার অতীতের কথা আমি যেমন অকপটে বলবো, বর্তমানের ঘটনাও তেমনি অকপটেই বলা হবে, আর ভবিষ্যৎ চিন্তার ব্যাপারেও তাই …

অবশ্য তাতে যদি বিরাট কোনো বিপ্লব ঘটে যায়, সেটা নিতান্তই কাকতালীয় হবে …

যাই হোক, বহু জ্ঞানগর্ভ কথা বলে ফেললাম আজকে … আপাতত অফ যাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s