দিনযাপন | ২৪০৭২০১৫

একটা সময় আমি একটা ডাইরিতে দিন-তারিখসহ আমার ফেসবুকের স্ট্যাটাসগুলো লিখে রাখতাম, যাতে অনেকদিন পর সেগুলো পড়তে গেলে নিজের মনের অবস্থা সেসময় কেমন ছিলো সেটার ব্যাপারে একধরণের অ্যানালিসিস করতে পারি নিজেই …তো, যেহেতু আমার অনেক কম ধৈর্য আর যে কোনো কিছুই খুব উৎসাহ নিয়ে শুরু করার পর একসময় বোর লাগতে থাকে, এই কাজটার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিলো … এখন তো আবার টাইমহপের কারণে বিভিন্ন বছরের একই দিনে মনের অবস্থা ক্যামন ছিলো সেটাও দেখা যায় … কিন্তু এখন আর আমার এইটার উৎসাহে আবার কাজটা শুরু করার কোনো তাগিদ কাজ করে না …

যাই হোক …

ভাবছি ফেসবুকে আরও অনেক মানুষ সারাদিনে কি কি অ্যাক্টিভিটি করে, মানে কয়টা এবং কি কি স্ট্যাটাস দেয়, কি শেয়ার দেয়, কি পোস্ট করে এইসব নিয়ে যদি ইন্টেন্সিভ রিসার্চ করা হয়, তাহলে হিউম্যান সাইকোলজি’র অনেক অনেক নতুন ডাইমেনশন পাওয়া যাবে ফর শিওর … যেমন, আমার ফেসবুক প্রোফাইলে যাদের সাথে আমার কানেকশন আছে তাদের অনেকেই আছে যারা প্রতিদিনই ফেসবুকে প্রচণ্ড অ্যাক্টিভভাবে উপস্থিত থাকে … তাদের কেউ হয়তো অ্যাক্টিভিটির জায়গায় খুবই স্পেসিফিক, যেমন একজন ফটোগ্রাফার হয়তো কেবল ছবি কিংবা ফটোগ্রাফি সংক্রান্ত বিষয়-আষয় নিয়ে পোষ্ট করে, আবার একজন হয়তো সাংবাদিক এবং সে বিভিন্নধরণের নিউজ সংক্রান্ত পোস্ট দেয়, কেউ হয়তো লেখালেখি করে আর সারাদিনে সে এটা-সেটা লেখা পোস্ট করে … এর বাইরে কিছু মানুষ আছে, যাদের ফেসবুক-এর ব্যবহার রেনডম, আর এইসব মানুষদের নিয়েই আমার যত ইন্টেরেস্ট … এরকম অনেকেই আছে, যাদের পোস্টগুলো আমার নিউজ ফিডে রেগুলার আসে, আর আমি তাদের ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি দেখতে দেখতে অবাক হই যে সারাদিনে তাদের মনোজগতে কতরকমের আবেগ-অনুভূতি কাজ করে আর তাদের ব্রেইন-ই বা কিভাবে ফাংশন করে …

যেমন, একজন হয়তো দিনের কোনো একভাগে ‘ফিলিং ডিভাস্টেটেড’ লিখে স্ট্যাটাস আপডেট দিলো যে তার খুব মন খারাপ… তার পোস্টটা পড়েই মনে হয় যে তার প্রচণ্ড মন খারাপ এবং এই ইহজগতের কোনকিছুই আজকে আর তাকে স্পর্শ করবে না … তো এই পোস্টের আধাঘণ্টা পড়েই দেখা গেলো যে সে তার একটা হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করেছে … তার আরও আধাঘণ্টা পড়ে দেখা গেলো যে সে ‘ফিলিং লাভড’ লিখে একটা রোমান্টিক মুডের কবিতা স্ট্যাটাস আপডেট দিয়েছে … তার আরও আধাঘণ্টা পড়ে দেখা গেলো যে সে তার বিভিন্ন বন্ধুদের পোস্টে স্মাইলি, লাফিং আউট লাউট ইত্যাদি ইমোটিকন ব্যবহার করে কমেন্ট করছে … তারপর দিনের শেষে সে ‘ ফিলিং হোপলেস’ লিখে এই স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমাতে গেলো যে ‘ আজকের মতো বাজে আর দুঃখভরা দিন যেন জীবনে আর না আসে’ …

এইধরণের পোস্টগুলো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ফলো করি … প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এদের আবেগ-অনুভুতির রেখাটা কিভাবে উঠে-নামে সেটা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি … আমার কাছে কেন জানি মনে হয় যে এরা একই সমান্তরালে দুইরকম জীবনযাপন করে, একটা বাস্তব জীবন, একটা ফেসবুকীয় জীবন … বাস্তব জীবনের আবেগের রেখা আর ফেসবুকীয় জীবনের আবেগের রেখা এদের ক্ষেত্রে এক হয় না বেশিরভাগ সময়ই …

যেমন, কয়েকদিন আগে যখন রাজন নামের একটা ছেলেকে কয়েকজন লোক মারতে মারতে একেবারেই মেরেই ফেললো, সেদিন একদিকে রাজনের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুক তোলপাড়, আবার একই সময়েই বাংলাদেশ- সাউথ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশ -এর জয় নিয়ে মাতামাতিও চলছে … যেই মানুষগুলো সন্ধ্যাবেলাতেই ফেসবুকে ঝড় তুলে ফেলেছে ‘রাজনকে এভাবে মেরে ফেললো! কি দেশে বাস করি আমরা ! ‘ বলে, তারাই আবার বেশিরভাগই রাত দশটা সময় ফেসবুক মাতিয়েছে ‘ সাবাস বাংলাদেশ! এইরকম জয়ই তো চাই! এই না হলে আমার দেশ ‘ বলে … আমার কাছে মনে হয়েছে এসব মানুষ একেকটা ঘটনাকে এভাবে দেখে যে ‘ এখন রাজনকে নিয়ে কথা হচ্ছে, সুতরাং এখন প্রতিবাদের ঝড় তোলো’, ‘ এখন দেশের সাফল্য নিয়ে কথা হচ্ছে, সুতরাং প্রশংসার ফুলঝুরি ছড়াও’ … বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষেরই ভার্চুয়াল জগতের অ্যাকটিভিটি হয়ে গেছে সুইচ অন-সুইচ অফ এর মতো … যখন দুঃখ পাওয়ার ঘটনা তখন ‘ফিলিং স্যাড’ মোড চালু, আর যখন খুশির ঘটনা তখন ‘ ফিলিং হ্যাপি’ মোড চালু … আর এখন চারদিকে এতরকমের ঘটনার ঘনঘটা যে এই ‘স্যাড’ ‘হ্যাপি’ ‘অ্যাংরি’ এইসব এইসব যাবতীয় ফিলিংসগুলোর পৌনঃপুনিকতাও বেশি … এখনি কেউ দুঃখ পাচ্ছে তো আধাঘণ্টা পরেই কিছু একটা নিয়ে প্রচণ্ড খুশি হয়ে যাচ্ছে … একটার পর একটা আবেগ আসে, কোনোটার সাথে কোনোটা ওভারল্যাপ করে না … ফলে এমন হয় না যে কেউ বলে ‘ আমার অনেক মন খারাপ, কিন্তু এই ঘটনাটার কারণে এখন একটু ভালো লাগছে’ … বরং একবার বলে ‘মন খারাপ’ , তারপরেই আবার সম্পূর্ণ রিফ্রেশড হয়ে বলে ‘ মনে অনেক আনন্দ’ …

যাই হোক, এক ফেসবুক অ্যাকটিভিটি নিয়েই তো বিশাল জ্ঞানগর্ভ লেখা লিখতে শুরু করলাম … সারাদিনের কর্মকান্ডের কথাও তো একটু লেখা উচিৎ … গতকালকে রাতে বাসায় ছিলাম না, সন্ধ্যায় ফরহাদ ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত ছিলো গ্রুপের অনেকের সাথে, সেখানে গিয়ে রাতে আবার কয়েকজন মিলে থেকেও গেলাম … অনেকদিন পর খুব ভরপুর আড্ডাবাজি হলো … কি না বিষয়ে কথা বলেছি সবাই … ধর্ম, রাজনীতি, কাজ-কর্ম, বই পড়া, সিনেমা দেখা … কালকে সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের একটা-দুইটা জিনিস গুছিয়ে টিয়ামের বাসায় চলে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে বিকালের শেষে ফরহাদ ভাইয়ের বাসায় গেছি … আজকেও আবার সকালবেলা টিয়ামের বাসায় গিয়ে ঘুমিয়েছি, সারাদিন ঘুমিয়ে-টুমিয়ে বিকেলে উঠে চা-নাস্তা খেয়ে, গোসল করে তারপর গ্রুপের দিকে গিয়েছি … বাসার একগাদা জিনিসপত্র আজকে শিফট করা হলো, আবার আগামী রবিবার আরেকদফা শিফটিং হবে … মনে হচ্ছে ৩০ তারিখের আগে আসলে এই বাসা থেকে মুভ করা হবে না … আর নইলে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো ২৯ তারিখ ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির শো-এর দিনই ফাইনাল মুভ আউটের জোশ উঠবে আব্বুর … আর সেদিন মিরপুরের দৌড়ানো, শো-তে অ্যাটেন্ড করা সব মিলায় একটা ভজঘট লাগবে …

কি হয় দেখাই যাক এখন …

তবে আজকে সারারাতের জন্য আমার টেনশনের বিষয় একটাই … ঘর অলমোস্ট ফাঁকা পেয়ে ইঁদুরের গুষ্টিরা এখন প্রতিরাতেই বীরদর্পে চোখের সামনেই দৌড়ে বেড়ায় … ভয় একটাই, ঘুমিয়ে পড়লে কখন গায়ের ওপর এসে ওঠে … বাসা ছাড়া পর্যন্ত এই যন্ত্রণা সহ্য করে যেতে হবে আগামী কয়েকটা দিন … রাতের বেলা না ঘুমিয়ে ইঁদুরের গায়ের ওপর ওঠা থেকে নিজেকে রক্ষা করা, আর ভোরবেলা আলো ফুটলে ঘুমাতে যাওয়া … শেষ দুইদিন যাবৎ বাসায় এই-ই করছি …

আপাতত মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য সিনেমা দেখতে বসি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s