দিনযাপন | ২৪০৮২০১৫

বছরটা ক্যামন লাফায় লাফায় চলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে! অলরেডি আগস্ট মাসেরও শেষ সপ্তাহ চলতেসে! … মনে হচ্ছে দুইদিন পর চোখের পলক ফেলবো আর ডিসেম্বর মাসটাও চলে আসবে, বছরটাও শেষ হয়ে যাবে! …

আজকে সকাল থেকেই ক্যামন একটা ঢিমা তালের দিন গ্যালো … সকালে আমি ঘুম থেকে উঠার পর এগারোটার দিকে মা আর আব্বু বাইরে গ্যালো … ম্যাট্রেস, রান্নাঘরের পাশের বারান্দার জন্য সিঙ্ক এইসব কি কি জিনিসপত্র কেনার জন্য … আমি ভাবলাম একা একা বাসায় বসে কি করবো, একটু পর টিয়ামের বাসায় চলে যাবো, সেখানে দুপুরে খেয়ে-দেয়ে তারপর আসবো … এর মধ্যেই গতকালকের ‘রাজা এবং অন্যান্য’ নাটকের শো-এর কিছু ছবি পোস্ট করে তারপর বের হই চিন্তা করে বসলাম … তারপর সেইসব ছবি এডিট করে, পোস্ট করতে করতেই দেখি বেলা একটা বেজে গ্যালো! … তখন আর বের হয়ে কি করবো? ৩টা সময় মিস্ত্রি আসবে, তখন তো আবার বাসাতেই থাকতে হবে … সেজন্য আর বের হলাম না …

বিকালে বের হয়ে গ্রুপের দিকে গেলাম … সাধারণত শো-এর পরদিন গ্রুপে সবাই ক্যামন একটা অলিখিত ছুটি কাটায় … আর কিছু মানুষ, যারা সারাবছরই কিছু হোক বা না হোক গ্রুপে আসে, তারা শো-এর পরদিনও থাকে … আজকেও সেরকমই অবস্থা ছিলো … ফুয়াদ, রানা, শর্মী, সাদি, শশাঙ্ক দা, কলি আপু, আমরিন … এইরকম সব রেগুলার মুখ … আজকে কাজ-কর্ম নাই তাই আড্ডাবাজিই হলো … পরে আবার আপেল ভাই এসে জয়েন করলো আড্ডায় …

গ্রুপে আজকে কণার সাথে একটা বিষয় নিয়ে বেশ তর্ক হলো … হয়তো কণা সহনশীল টাইপের মেয়ে হলে এইটা একটা আলোচনা হতো, কিন্তু তার কোনো একটা আচরণকে প্রশ্ন করলেই সে টেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে বলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টা তর্কই হলো … ও সবসময়ই ওর কথায়, আচরণে ‘সিনিয়ার’ ‘ জুনিয়ার’ বিষয়টা নিয়ে কন্সার্ন থাকে … তার চাইতে গ্রুপে যারা সিনিয়ার, তাদের সাথে তার একরকম আচরণ, আবার যারা জুনিয়ার তাদের সাথে একরকম আচরণ … আগে এইগুলা নিয়ে ডিরেক্ট কথাবার্তা বলতো, পরে যখন সেগুলো নিয়ে ঝামেলা–টামেলা হয়েছে তখন থেকে একটু ইনডিরেক্টলি বলে … আজকে কথায় কথায় এরকম একটা বিষয় নিয়ে ওর সাথে বেশ লেগে গ্যালো আমার … শুধু প্রাচ্যনাটেই না, আমাদের বাঙ্গালি সমাজেই হুটহাট কাউকে ‘বেয়াদব’ বলে দেয়ার একটা প্র্যাকটিস আছে … আমি এই ব্যাপারটার প্রচণ্ড বিরোধী … আদব-কায়দা বিষয়টা নিতান্তই আপেক্ষিক … এইটা একেক সমাজে, একেক লাইফস্টাইলে একেকরকম … ফলে আমি যেটাকে আদব বলে মনে করি সেটা কেউ করলো না দেখেই আমি তাকে বেয়াদব বলে ফেলতে পারি না … আজকে কথা শুরু হয়েছিলো অবাক-কে নিয়ে … কি কথায় কথায় ওর প্রসঙ্গ আসলো, আমি বেশ পজিটিভ একটা কমপ্লিমেন্ট দিলাম অবাকের ব্যাপারে, সাথে সাথে কণা তেতে উঠলো যে সে নাকি বেয়াদব … কারণ সে খুব অ্যাটিচুড নিয়ে চলে, কাজ করতে বললে ‘ক্যামন ক্যামন’ এক্সপ্রেশন দেয়, আবার কেউ কিছু বললে নাকি ‘ আমি কি করেছি’ টাইপ রিঅ্যাকশনও দেয় … অবাকের সাথে আমার গ্রুপে হাই-হ্যালো ছাড়া কথাবার্তা, কিংবা কাজ-কর্মের অবকাশ হয়নাই কখনো … ফলে তার সম্পর্কে এইসব বিশেষণ সবই কণার কাছে শোনা … যাই হোক, আমি বলতে চাইছিলাম যে সবাইকে এভাবে বেয়াদব তকমা লাগায় দেয়ার আগে তার ব্যাকগ্রাউন্ডটাও ভাবা উচিত … আই মিন, তার সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড, এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড … কারণ যাকে আমি কোনো একটা আচরণের জন্য জাজমেন্টাল হয়ে ‘বেয়াদব’ বলে ফেলছি, তার বেড়ে ওঠার পরিবেশে, কিংবা তার সোশ্যাল লাইফস্টাইলে এগুলা হয়তো সে হরহামেশাই এরকমই দেখে থাকে, কিংবা সমাজের কোথাও কোথাও নিজেকে একটু ডিগ্রেড করে চলতে হয় সেটা হয়তো তাকে কেউ কখনো বলেই নি … এখন আমি যদি চাই সে চেঞ্জ হোক, আমরা সবাই যেভাবে যা করি সেটা সেও করুক, তাহলে তার যেটুকু পজিটিভ সেটাকে আগে অ্যাপ্রিশিয়েট করতে হবে … তারপর তাকে আস্তে আস্তে এই মোটিভেশনে আনা যাবে যে ‘সবাই যেরকম করে আমিও তাদের সাথে থাকার জন্য ওরকম করি’ … য্যামন, আমি আসলে সকল কনভারসেশন শুরু হওয়ার আগে বলছিলাম যে অবাকের একটা জিনিস পজিটিভ যে ও গ্রুপে রেগুলার আসুক বা না আসুক, গ্রুপের কোনো কাজ করুক বা না করুক অ্যাটলিস্ট গ্রুপের যে কোনো শো হলে সে উপস্থিত থাকে এবং হল ম্যানেজমেন্ট-এর কাজও করে … কথায় কথায় ইস্যু বের হলো যে সেটের কাজ দিলে তো করবে না … আমার কাছে সেটা খুব স্বাভাবিক মনে হলো … হল ম্যানেজমেন্ট-এর কাজ সে করে, কারণ এখানে কোনো কায়িক শ্রম নাই, শরীর ঘামবে না, হাত-পা ধুলা লাগবে না … অবাক-কে দেখেই মনে হয় যে ও হচ্ছে বাবা-মা’র আদরের লাডলা, এক গ্লাস পানিও নিজের হাতে ঢেলে খায় না … সে গ্রুপে আসার পর ‘জাস্ট বিকজ হি ইজ জুনিয়ার’ তাকে ডাক দিয়ে যদি বলা হয় ‘অ্যাই, সেট-টা গুছাতে হবে, এদিকে আসেন তো’ সেটা কি তার ভালো লাগবে? … ও প্রথমেই ভাববে যে ‘ এই কাজ করতে গেলে হাতে ধুলো লাগবে, ইয়াক!’ … তারপর একটা ‘না করলে হয় না?’ টাইপ এক্সপ্রেশন দিবে … আর তখন গ্রুপের সিনিয়াররা সেই এক্সপ্রেশন দেখেই বলে বসবে, ‘ ওকে তো কাজ করতে বললেই ও মুখ বানায় … বেয়াদব!’ … কি আজিব! …

মাঝখানে আরেকদিন দোলা-কে নিয়েও কার সাথে জানি তর্ক লাগসিলো আমার … রানা’র সাথে বোধহয় … দোলা হইলো বড়লোকের আহ্লাদি মেয়ে … ড্যাডি’স প্রিন্সেস টাইপ লাইফস্টাইল … চা খেলেও কাপটা পানি দিয়ে ধুয়ে তারপর খায় … ওকে যদি বলা হয় রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাও তো, ও কি সাথে সাথেই ‘ জ্বি ভাইয়া, বানাচ্ছি’ বলে রান্নাঘরে গিয়ে কাজ করা শুরু করবে? … ওর বাসার রান্নাঘর নিশ্চয়ই টাইলস দেয়া, ঝকঝকে-তকতকে… সেখানেই সে কোনোদিন হয়তো এক কেটলি পানিই গরম করে নাই … আর প্রাচ্যনাটের ঘিঞ্জি রান্নাঘর দেখলেই ওর হয়তো মনে হয় ‘ ছিঃ কি নোংরা!’ … ওকে দিয়ে তো চাইলেই এসব কাজ করানো যাবে না … এগুলার সাথে ইউজড টু হওয়ার স্পেস তো দিতে হবে … আগেই ‘ কাজ করতে বললে করে না, বেয়াদব’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলে জীবনেও তো ওর কাজ করার মোটিভেশন তৈরি হবে না … উল্টা বাইরে গিয়ে বলবে, ‘ গ্রুপে ঢুকলাম অ্যাক্টিং করার জন্য, আর আমাকে দিয়ে নোংরা কাজ করায়!’ … এখন ওর কাছে এইগুলা নোংরা কাজ মনে হইলে তো সেটা ওর দোষ না! … ওর জীবনযাপনই এরকম … ওঁই জায়গা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ওকে আর দশজনের চাইতে অনেক বেশি স্পেস দিতে হবে, সময় দিতে হবে …

‘এসব করতে না পারলে গ্রুপে আসছে কেন?’ বলে অনেকেই খুব একটা উত্তর দিয়ে দেয় এদের ব্যাপারে! … এইটা আরও আজিব! … কারো কারো, বিশেষ করে এইরকম চকোলেট গার্ল, চকোলেট বয়দের গ্রুপে আসার একটা মূল কারণ থাকে যে এরা অভিনয় করতে চায় মিডিয়াতে … তাদের হয়তো কেউ বলে যে অভিনয় করতে চাইলে একটা কোর্স করে আসেন অভিনয়ের … তারা খোঁজখবর নিয়ে জানে যে প্রাচ্যনাটের কোর্সটা ভালো, আর তখন এখানে আসে … তারপর বন্ধুবান্ধব আছে দেখে, কিংবা নেটওয়ার্কিং ভালো হবে ভেবে কিংবা একেবারেই ভালো লাগার জায়গা থেকে গ্রুপে ঢোকে … গ্রুপে এসে সে দেখে যে এখানে ফ্লোরটা নিজেদের ঝাড়ু দিতে হয়, চা বানাতে হয়, সব ধুলা-ময়লা ঘেঁটে পরিষ্কার করতে হয়, এমনকি বাথরুমও ধুতে হয় … কিন্তু এইসব কাজ তারা সারাজীবনই দেখে এসেছে ‘বুয়াদের কাজ’ হিসেবে … থিয়েটার করতে হলে এইগুলাও যে একটা পার্ট এই ধাক্কা সামলাতেই তো ওদের ৬ মাস লেগে যাওয়ার কথা! …আর সেখানে সবাই কিভাবে এক্সপেক্ট করে যে এরা এসেই গ্রুপের এইসব ‘কামলাগিরি’ করতে শুরু করবে? …

ইদানীং দেখি যে এইসব ‘ বেয়াদবি’ ‘ রি-অ্যাক্ট’ করা ইত্যাদি ইত্যাদি টার্ম গ্রুপে খুব বেশি ইউজ হয় … গ্রুপে আসছে দুই/তিন বছরও হয়নাই, এর মধ্যেই একেকজন জাজমেন্ট দেয়া শুরু করে যে তার ইমেডিয়েট জুনিয়ার-দের এ বেয়াদব, ও রি-অ্যাক্ট করে ইত্যাদি! … আমার কাছে খুব আজিব লাগে এই বিষয়টা! … আমার যুক্তি হইলো যে হাতের পাঁচ আঙ্গুল তো সমান না! সেরকম সব মানুষও একরকম না … আর এইখানে তো একেকজন একেক জায়গা থেকে আসে … গ্রুপে হয়তো একজন একদমই জুনিয়ার, কিন্তু তার ব্যক্তিজীবনে সে হয়তো তার কর্মক্ষেত্রে, পড়াশোনার জায়গায় কিংবা বন্ধুমহলে অনেক বড় হ্যাটম! … সুতরাং গ্রুপে আমার চাইতে অনেক পরে জয়েন করেছে দেখেই তাকে আমি ‘ অ্যাই, তুমি/ আপনি জুনিয়ার … এটা করেন … সেটা করেন … এহ! বেয়াদব’ এইসব বলে ফেলতে পারি না!

অনেকেই দেখি এরকম করে … আমার খুব বিরক্ত লাগে … মাঝে মাঝেই একেকজনের সাথে এগুলা নিয়ে আমার তর্ক বেঁধে যায় … এই তর্কের কোনো সুরাহা নাই … আমি একা একজন এইসব নিয়ে গলাবাজি করে তো আর দশজনের মুখ বন্ধ করতে পারবো না, এমনকি থট প্রসেস- ও বদলাতে পারবো না … আমি নিজে গ্রুপে এইসব ‘আমি সিনিয়ার, তুমি জুনিয়ার’ বিষয়টা মেইনটেইন করে চলি না … যখন কাজের প্রয়োজন হয়, তখন আপনা থেকেই কাজের ক্ষেত্রে সিনিয়ারিটি, জুনিয়ারিটি’র জায়গা তৈরি হয়ে যায় … কাজের ব্যাপারে আমি অনেকসময়ই অনেকের ওপর বিরক্ত হই … যে কাজ ঠিকমতো পারবে না তাকে আমি কাজ করতেও বলি না … যে পারবে তাকে যখন কোনো একটা কাজ করতে বলা হয় এবং সে করে না, তখন তার প্রতি বিরক্ত হই … খুবই সিম্পল … একজন ধরা যাক কম্পিউটার চালাতেই পারে না, তাকে তো আমি কোনো একটা কিছু প্রিন্ট আউট বের করতে বলবো না … আবার তাকে প্রিন্ট আউট বের করতে বলে সে করতে পারবে না বলাতে তাকে বেয়াদবও বলে বসবো না … গ্রুপে এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এরকম যে কাউকে কিছু করতে বলা হলো, আর সে না করলো মানেই সে ‘বেয়াদব’ ! … বড়ই আজিব! …

অনেক পক পক  করলাম … এখন অফ যাই … ঘুম আসছে অনেক … রাত বাজে পৌনে চারটা! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s