দিনযাপন | ০৬০৯২০১৫

কথা নাই বার্তা নাই, সাড়ে ৫টার দিকে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে গ্যালো। কিছুক্ষণ বিছানায় উসখুস করে , এপাশ ওপাশ করে ভাবলাম যে একটু মোবাইল নিয়ে সময় কাটাই, তাহলে হয়তো ঘুম এসে যাবে আবার। মোবাইলটা হাতে নিয়েই দেখলাম ঠিক যেসময়টায় ঘুম ভেঙ্গেছে ওই সময়েই সোহেলের কাছ থেকে একটা মেইল এসেছে! … আমার ফোনের ভাইব্রেশন অফ করা, তাই এরকমও না যে মেইল এসেছে এইটার নোটিফিকেশনে মোবাইল ভাইব্রেট করেছে, আর আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। অথচ কিভাবে কিভাবে ওর মেইলটা যখন আসলো, তখনই আমার ঘুমটাও ভেঙ্গে গ্যালো! … কাকতালীয়ই বটে! …

এতদিন পরে হঠাৎ করে সে কেন মেইল করতে পারে সেই গবেষণাটা আপাতত পেন্ডিং রেখে ওর মেইলের কন্টেন্ট নিয়ে কথা বলি। যেই কথাগুলো লিখে ও মেইল করেছে, এরকম একটা মেসেজ, অথবা চিঠি, অথবা সাক্ষাতে কথা বলার মতো কিছু একটা কোনো একদিন হবে সেটা আমি একরকমের নিশ্চিত ছিলাম। … এখন ওর অনেক অনুশোচনা হয়, রাতে ঘুমাতে পারে না, ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখে, মরে যেতে ইচ্ছা করে, সারাক্ষণ তাকে পাপবোধ তাড়িয়ে বেড়ায়, সে মন থেকে এখন সরি ফিল করে, আমার কাছে ক্ষমা চাওয়াটা জোকস ছাড়া কিছুই না তারপরও আমি যেন পারলে তাকে মাফ করে দেই … সবশেষে, যেই শাস্তি আমি দেবো সেটাই সে যখন বলবো তখনই মাথা পেতে নেবে, কিন্তু ‘ওর ফ্যামিলি যেন কিছু না জানে!’ … এগুলা জানলে ওর ফ্যামিলির সবাই মেন্টালি কতটা শকড হবে সেটা ভাবতে গেলেই … এই ফ্যামিলিই ওর সবকিছু … ওদেরকে সে কোনোভাবে কষ্ট দিতে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি …

আমি খুব হাসলাম … লিটেরেলিই বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে হাসলাম … হাসতে হাসতে আমার চোখে পানি চলে আসলো! … এতকিছুর পরেও একটা মানুষ কি কন্সিস্টেন্টভাবে নিজেকে ফ্যামিলির কাছে ‘ভালোমানুষ’ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চায়! … ওর ফ্যামিলি যাবতীয় সব ঘটনা জানবে, ওকে ঘৃণা করবে এর চেয়ে বড় শাস্তি ওর জন্য আর কি হতে পারে? … ওকে শাস্তি যদি আমার দিতেই হয়, তাহলে তো এই শাস্তিটাই দেয়া উচিত, তাই না? … একটা সময় চিন্তা করতাম যে ওর সবচেয়ে বড় শাস্তি হতে পারে আমাকে বিয়ে করে আমাকে নিয়ে সারাজীবন এক ছাদের নিচে থাকা … কিন্তু সেই চিন্তাটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গ্যাছে … এখন আর ওর কি শাস্তি হওয়া উচিত ভাবতে গেলে এই অপশনটা মাথায় আসে না! … বরং মনে হয় যে দুনিয়ার সবাই সবকিছু জানে, এইটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় শাস্তি! …

আচ্ছা, এইটা যদি সিনেমা কিংবা সিরিয়ালের গল্প হতো, আর আমি যদি টিপিক্যাল কুটনামী করা কোনো চরিত্র হতাম, তাহলে এরকম টুইস্ট করতে পারতাম যে ‘ শাস্তি চাও? ঠিক আছে, আমি তোমাকে দুটো অপশন দিচ্ছি! এক, তুমি আমাকে বিয়ে করবা, তার বিনিময়ে কখনো তোমার ফ্যামিলির কাউকে কিছু বলবো না … আর দুই, আমি তোমার ফ্যামিলির সবাইকে সব জানাবো, তারপর তোমার যা হবে সেটাই তোমার ভাগ্য বলে মেনে নেবে!’ … মানে ইন এনি ওয়ে ওর ফ্যামিলি আসলে সবকিছু জানতোই! … আমার চিন্তা করতেই হাসি পাচ্ছে যে বিষয়টা ক্যামন হইতো! … এইরকম একটা ডায়ালগ দেয়ার সাথে সাথে তিনবার সোহেলের চেহারা জুম ইন হতো আর পেছনে বাজ পড়ার মতো ঠাস ঠাস করে ড্রামের বিট পড়তো! তারপর আমাকে আবার তিনবার জুম ইন করে দেখাতো যে আমি মিটিমিটি হাসছি! … তারপর দেখা যেতো আমাকে সোহেল বিয়ে করেছে, আর আমি সাথে সাথেই মহা কুটনামী করে সবাইকে সব কিছু বলে দিয়েছি! হা হা হা … আমার ভিজু্যয়ালাইজ করেই হাসি পাচ্ছে! …

ধুর! নাহ! এসব ফাজলামি বাদ দেই … আসলে কি কাকতালীয় ব্যাপার যে এমন একটা সময় ও এরকম একটা মেইল করলো যখন আমি আসলে একপ্রকার ঠিক করেই ফেলেছি যে দুনিয়াবাসীকে ওর ব্যাপারে একটা ছোটোখাটো আভাষ দেবো! … গতকালকে দিনযাপনে এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ইনডিরেক্টলি কয়েকটা লাইন লিখেছিলাম, কিন্তু সেটাও আসলে যে এই পরিকল্পনা না জানে তার বোঝার কোথা না! … আর সোহেল কি আমার দিনযাপনের লেখা পড়ে কি না সেটা অবশ্য আমি জানি না! … পড়লে তো ওর জানারই কথা যে আমি অলরেডি ওর নাম-ধাম মেনশন করে বা না করে অনেক কথাই এখানে বলে ফেলেছি! … যেটুকু বলা হয়নি সেটুকুও বলা বা না বলায় এখন আসলে আর কিই বা আসে যাবে? …

আগামীকাল ওর জন্মদিন … গতবছর জন্মদিনের আগে টাকা নিয়েছিলো ঘুরবে বলে … সেই টাকা নিয়ে সে তার তৎকালীন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরেছে … ট্রিট-ও দিয়েছে হয়তো বা … আবার আমিই উল্টা ওকে ট্রিট দিয়েছিলাম রাতের বেলা … আবার একসাথে রাতে থেকেছিও … সময়গুলো তখন ক্যামন জানি অস্থির ছিলো … এর সপ্তাহ খানেক আগেই শাহরিয়া আপুর বাসার ঘটনাটা ঘটেছিলো … আর আমিও কোনোভাবেই সোহেলকে এটা বলার সাহস পাইনি যে মুগ্ধরা অলরেডি আমাদের কথা জানে! … আর কোনকিছু এভাবে চেপে রেখে চলাটা তো আমার জন্য সবসময়ই কষ্টকর … মুগ্ধদের যখন বলতে পারতাম না সোহেল আর আমার কথা, তখন একটা চাপ ছিলো … তারপর যখন ব্যাপারটা উল্টে গ্যালো যে মুগ্ধরা সবকিছু জানে, অথচ সোহেল এটা জানে না যে মুগ্ধরা জানে তখন আবার আরেকরকম চাপের মধ্যে পড়লাম … কি কষ্ট করে খুব স্বাভাবিক চেহারা বানিয়ে চলতাম … অবশ্য আমারও একটা পয়েন্ট ছিলো যে ও তো ওর গার্লফ্রেন্ড হয়েছে, কারো সাথে ইনভল্ভড হয়েছে এইসব আমাকে জানায়নি … অথচ এমনও হয়েছে যে রাতে একসাথে আছি, ওই মেয়ের ফোন এসেছে, ও ঘুমিয়ে ছিলো, আর ফোনের স্ক্রিনে মেয়েটার নাম উঠেছে সেটা আমি দেখেছি … আবার কোথাও খেতে গেছি, তখন আমারই ল্যাপটপ নিয়ে বসে বসে ও ওই মেয়ের সাথে ফেসবুকে চ্যাট করেছে, অথচ আমি যে কেউ একজন সামনে বসা সেটা সে কেয়ারই করেনাই … ফলে আমার কাছে আবার এটাও মনে হতো যে মুগ্ধরা জানে এইটা ওকে না বলাটা আমার কোনো অপরাধ না, যদি সে তার ইচ্ছামতো সবকিছু চোখের সামনে ঘটার পরও এড়িয়ে যেতে পারে …

আর এখন আসলে ওর প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নাই আমার … মায়া-দয়া- ভালো লাগা- ভালোবাসা কিছুই না … শরীরের প্রতিটা রক্তবিন্দু জুড়ে কেবল ঘৃণা আর ঘৃণা … আর যাকে ঘৃণা করি সে আদৌ বাঁচলো কি মরলো তাতেও আমার কিছু আসে যায় না! … আর এতকিছুর পরও সোহেলের মতো মানুষ যেখানে বরাবরের মতোই ‘ ফ্যামিলিকে কিছু জানিয়ো না’ বলে , ‘ ক্ষমা চাওয়ারও আমি যোগ্য না’ বলেই আবার বলে যে ‘ মাফ করে দিও’ , কিংবা যে এতকিছুর পরেও আসলে ফ্যামিলির কাছে ‘ভালোমানুষ’ টাই থাকতে চায়, তার প্রতি আমার ঘৃণা তো কমবেই না, বরং বাড়তে পারে! …

ওর এই মেইলটা আসলে কিভাবে কিভাবে জানি আমার মনে মনে আগামীকালের জন্য যেই পরিকল্পনাটা ছিলো সেটাকে আরও অনেক বেশি মোটিভেটেড করেছে! … কালকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কনফিউজড ছিলাম যে আসলেই কাজটা করবো কি না … আর ওর মেইল পাওয়ার পর নিশ্চিত হলাম যে কাজটা আমি করবোই … যা হয় হবে! …

যাই হোক … আজকের দিনযাপন যদি সে পড়ে তাহলে নিশ্চয়ই খুব অফেন্ডেড ফিল করবে যে ও আমাকে এত নরম হয়ে মাফ টাফ চেয়ে মেইল করলো, তার অনুশোচনার কথা বললো আর আমি উল্টা সেই কথাগুলা এভাবে সবাইকে বলে দিলাম! … তো, দিনযাপনে তো আমি প্রতিদিনের কথাই লিখি … যা ঘটেছে … যা হয়েছে … সুতরাং এটাও ইনএভিটেবল যে ওর ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ মেইলের কথাও আমি এখানে লিখবো …

আজকে আর কিছু লিখবার পাচ্ছি না … রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটা বোম ফাটিয়ে ঘুমাবো … দেখা যাক, সেটার কি ইমপ্যাক্ট পরে সামনের দিনগুলোতে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s