দিনযাপন | ১৩০৯২০১৫

প্রায় ৩/৪ দিন হয়ে গেলো দিনযাপন লেখা হচ্ছে না … সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুল, সেখান থেকে শিল্পকলা অ্যাকাডেমি, সেখান থেকে গ্রুপ, তারপর বাসা, তারপর ক্লান্তি, তারপর ঘুম, তারপর আবার সকালে উঠে স্কুলের প্রস্তুতি … এভাবেই যাচ্ছে কয়েকটা দিন … মাঝখানে শুক্র-শনিও গেলো দৌড়ে দৌড়েই …

এর মধ্যে আবার কয়েকদিন যাবৎ নতুন অভ্যাস হয়েছে যে রাতের বেলা বাসায় ফিরে গোসল করে, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুম আসার আগ পর্যন্ত ভায়োলিন বাজাই … এখন নিজে নিজেই একটা টিউন শুনে সেটার নোটেশনগুলা বের করে বাজাতে পারি … নিজের এই ইম্প্রুভমেন্টে নিজেই মুগ্ধ! … সেই মুগ্ধতায় ভায়োলিন বাজানোর উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেছে! … এখন খালি হাত নিশপিশ করে! কোনটা বাজাই, কোনটা বাজাই টাইপ একটা ভাবসাব! … এখনো টিউনেই বাজাতে পারি না, অথচ মেলোডি তুলতে পারি এটা নিয়েই কত নাচানাচি! …

যাই হোক, দিন যাচ্ছে ব্যস্ততায়, রাতও যাচ্ছে ব্যস্ততাজনিত ক্লান্তিতে … ১৮ তারিখ সোলায়মান মেলা … এইবারের আয়োজক প্রাচ্যনাট … ডেকোরেশন হবে থেমাটিক … এবারের থিম রিসেন্ট সব অনাচার, হত্যাযজ্ঞ এইসব … একটা বিরাট দানব মরা, আধমরা বাচ্চা-কাচ্চার স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে টাইপ একটা বিশাল ইন্সটলেশন হবে … সেইটার জন্য খড় দিয়ে ফিগার বানানো হচ্ছে গত ৪/৫ দিন যাবৎ … এদিকে গ্রুপে চলছে ওইদিনের কালচারাল প্রোগ্রামগুলোর রিহার্সাল … গান, নাচ হবে … পারফরমেন্সও আছে একটা … সবাই খালি সবার দোষ ধরতে ব্যস্ত … ও এটা করে নাই, এ ওটা করসে … এটা কেন এমন হইলো … ওইটা কেন অমন হইলো না … এইসব আমার ভালো লাগে না … আমি সেকারণে নিজের গরজেই এইসব যাবতীয় ডেকোরেশন, নাচ, গান, পারফরমেন্স সবকিছুর যারা যোগাযোগের ম্যানেজমেন্টে আছে, তাদের এই দলের সাথে ওই দলের লিয়াজোঁ করার মহান দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছি … দেখা গ্যালো যে একজন বলসে সে সেটের কাজে টাইম দিতে পারবে না … তো, সে কেন পারবে না সেই কারণটা না জেনেই, কিংবা তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সেই বিষয়ে আলোচনা না করেই তাকে দুনিয়ার ফাঁপর দিয়ে দেয়া হইলো! … ফলাফল হইলো যে সে কাজে আসে, কিন্তু মুখ কালো করে থাকে! … কিংবা একজনকেই সবাই সেট, নাচ, গান সবকিছুতেই চায় … আর সকলপক্ষই একইভাবেই তাকে ফাঁপর দীতে থাকে যে ‘তোমাকে এটা করতে বলসি, এইটাই করবা’! … আমি এইগুলা দেখি আর বিরক্ত হই! বিরক্ত হইতে হইতে একসময় মুখ খুলি … তাতে আবার একেকজন এমন রিঅ্যাক্ট করে যে আমি যেই শান্তিপূর্ণ মনোভাব থেকে তার সাথে কথা বলতে যাই, সেটা আর হয় না! … মানে বিশাল ক্যাচাল! … কারো ব্যাপারে কারো সহনশীলতা নাই! …

দিনতারিখের হিসাবে আজকের দিনটার ঐতিহাসিক সিগ্নিফিকেন্স হচ্ছে গতবছর আমি এইদিনে অফিসিয়ালি শিওর হয়েছিলাম যে সোহেল আসলেই আরেকজনের সাথে ইনভল্ভড। [ টের পাচ্ছি, যারা নিয়মিত দিনযাপন পড়ে, বা এখন সবগুলো দিনের লেখা পড়ছে, তাদের অনেকেই মনে মনে বলছে ‘ আবার সোহেল! আর কি কিছু নাই লেখার?’ … কিন্তু ফ্যাক্ট হচ্ছে যে অন্তত আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় ‘আজ এই দিনে’ ক্যাটাগরিতে সোহেল প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আসবেই!] … ওই সময় আমি নিয়মিত ইউপিএল-এ যাই … তো, সেইদিন মুগ্ধ হঠাৎ ফোন করলো যে ও গুলশানের দিকে কি একটা কাজে এসেছে … ফ্রি থাকলে নর্থ এন্ড-এ ওর সাথে একটা কফি আড্ডা হতে পারে … নর্থ এন্ড কফি রোস্টার ইউপিএল-এর অফিস থেকে মিনিট পাঁচেক-এর হাঁটা পথ … তো গেলাম … ওইখানে বসে এটা-সেটা কথা বলতে বলতে হঠাৎ মুগ্ধ বললো, ‘ আচ্ছা, সোহেলের সাথে তো তোর ফেসবুকে অ্যাড নাই, না?’ ~ ” না” ~ ” তাইলে তো তুই এটাও দেখিস নাই” … বলে সে মোবাইলে সোহেলের প্রোফাইল বের করে দেখালো সোহেলের খুব রিসেন্টলি দেয়া রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস – ” ইন আ রিলেশনশিপ উইথ … ” … ঠিক ওই মোমেন্ট-টার কথা আমার একেবারে স্পষ্ট মনে আছে … একেবারে থান্ডারস্টাক হবার মতো মুহুর্ত ছিলো ওটা … কারো সাথে ইনভল্ভড এইটুকু বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু তাই বলে একেবারে জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে সে ওই মেয়ের সাথে প্রেম করছে, আর আমাকে বলে যে ওরকম কিছুই না! … মাথার মধ্যে একসাথে অনেকরকমের আবেগ, অনুভূতি একসাথে ওইটুকু মুহুর্তের মধ্যে খেলা করছিলো … কি করা উচিৎ? কি বলা উচিৎ? … মুগ্ধ’র সামনে কি আমার এই বজ্রাহত হওয়া আবেগটা প্রকাশ করা উচিৎ? নাকি খুব পার্ট নিয়ে বলা উচিৎ , ‘ হ্যাঁ, জানি তো!’ … সোহেলের কাছ থেকে আমি আসলে কতটা দূরে, সেইটা যে আমি হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম সেটা কি বুঝতে দেয়া উচিৎ? … সেটা বুঝলে কি মুগ্ধ আবার পাল্টা বলবে না যে ‘ তোর মতো একটা বুঝদার মেয়ের এই অবস্থা!’ … এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে প্রচণ্ডরকমের ভাবলেশহীন চেহারা বানিয়ে শুকনা গলায় বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ! এই মেয়ের সাথে তো ও বহুদিন যাবতই ফোনে কথা বলে, ফেসবুকে চ্যাট করে’ … রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসটা আপডেট করেছিলো ৮ সেপ্টেম্বর, ওর জন্মদিনের পরদিন …

তো, ওইদিন রাতে আমরা কয়েকজন আবার সুজনের বাসায় ছিলাম … সীসা পার্টি হবে, এরকম একটা আয়োজন ছিলো … মুগ্ধ, বাপ্পি, বাপ্পির দুই ফ্রেন্ড, শৌনক, অভিরূপ, পুতুল, সাজ্জাদ … রাতে সোহেলকে মেইল করেছিলাম, ‘ তোমার রিলেশনের কথা আমার মুগ্ধ’র কাছ থেকে জানতে হলো! … তুমি নিজের মুখে আমাকে বললে আমি কষ্ট কম পেতাম! … এমন তো না যে আমি এতদিনেও কিছু বুঝিনাই বা জানি নাই? … খালি শিওর হওয়া বাকি ছিলো … সেটা তোমার কাছ থেকেই হতে পারতাম … ‘ …  সেই মেইলের উত্তর এসেছিলো, ‘ আমি জানাই নাই, কারণ এটা বেশিদিন স্টে করবে কি না আমি জানি না। রিলেশনে যাওয়ার পর থেকে আমার কিছুই ভালো যাচ্ছে না, লাগছেও না … এইজন্যই তোমার সাথে বেশি টাইম স্পেন্ড করতে চাই গত কিছুদিন ধরে । তাহলে কি এখন তুমি আমার সাথে থাকবানা? আই মিন যেভাবে সব চলছে, চলবে না? আর মুগ্ধ তোমাকে কেন এই কথা বলসে, সেটাও আমি জানি‘ …

আই শুড সে, দিজ ওয়াজ দ্য মোমেন্ট আই স্টার্টেড হেটিং হিম! … এরকম একটা উত্তরের পর ওর প্রতি আমার যেটুকু ভালোলাগা ছিলো সেটা কোথায় জানি উবে গিয়েছিলো মুহুর্তের মধ্যে … আমি এই রিপ্লাইটা মুগ্ধকে দেখিয়েছিলাম … মুগ্ধ খুব আস্তে করে মন্তব্য করেছিলো, ‘অ্যাসহোল’ … আর ওই মুহুর্তের জন্য আমারও সোহেলের প্রতি ঠিক ওই অনুভূতিটাই কাজ করছিলো যে ‘ হি ইজ রিয়েলি অ্যান অ্যাসহোল অ্যান্ড নট ইভেন ওয়ার্থ স্লিপিং উইথ মি’ … আর ঠিক তখনি আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, মুগ্ধরা যে সোহেলের ব্যাপারে সবকিছু জানে, সেটা আমি ওকে জানিয়ে দেবো … সেদিন রাতে যেহেতু বাসায় ছিলাম না, এবং নিশ্চিতভাবেই ও জেগে থাকা অবস্থায় ওকে মেইল করে কথাগুলো বললে ও সাথে সাথেই ফোন করে যা-তা বলবে, সে কারণে আমি ওই রাতটা অ্যাভয়েড করে গিয়েছিলাম … পরদিন বাসায় ফিরে দিনের বেলা তাকে আমি মেইল করেছি … আর সেই গল্পটা কালকের জন্য রেখে দিচ্ছি …

 গতবছরেই, এর মধ্যেই কোনো একদিন … খুব সম্ভবত ১২ তারিখ, সোহেলের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত ফসিল-এর ঘড়ি হাতে পেয়ে ওকে দিয়েছিলাম … শিপমেন্টের দেরির কারণে ৭ সেপ্টেম্বরে জন্মদিনে ও ঘড়িটা হাতে পায়নি … কিন্তু ৭ তারিখ থেকে ওই ১২ তারিখে ঘড়ি পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন নিয়ম করে আপডেট নিয়েছে যে ঘড়িটার শিপমেন্ট কতদূর কি আপডেট, কবে আদৌ সে ঘড়িটা হাতে পাবে … নিজের গিফট কেউ এভাবে চেয়ে-চিন্তে নেয়, এমনটা কখনো কাউকে দেখিনাই বলেই এই আচরণগুলো আমার কাছে অনেকবেশি অদ্ভুত ছিলো … এই সমস্ত আচরণ বাচ্চারা করে বলে জানতাম … প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত কেউ এরকম করতে পারে, সেটা কখনো মাথাতেও আসে নাই … যাই হোক, ওর ঘড়ি যেদিন হাতে পেয়েছি, সেদিন আবার গ্রুপের কাজে চাঁদনি চকে গিয়ে নিজের মানিব্যাগ আর আইপড খুইয়েছিলাম … এইটার কথা বলছি তার কারণ হচ্ছে যে এই মানিব্যাগ আর আইপড চোর নিয়েছিলো ব্যাগ খুলে … আর ঘড়িটা আমি কি মনে করে ব্যাগে ঢুকাতে গিয়েও ঢুকাইনাই … মনে হয়েছিলো যে ভেঙ্গে যায় যদি! সেকারণে হাতেই রেখেছিলাম ব্যাগটা … মানিব্যাগ আর আইপড হারানোয় যতটা না কষ্ট পেয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি রিলিভড ফিল করেছিলাম এই ভেবে যে ঘড়িটা আমি যদি কোনো কারণে ব্যাগে রাখতাম, তাহলে ওই চাঁদনি চকেই ১৬,৫০০ টাকার গচ্ছা যেতো … আর ওই ঘড়ি যদি চুরি হতো, তাহলে সোহেল যেরকম মানসিকতার ছেলে, ও আমাকে মুখের ওপর এটাও বলতে পারতো যে আমি আসলে ওই ঘড়ি অর্ডারই দেইনাই, আর এখন ওকে না দেয়ার জন্য এই গল্প ফেঁদেছি! …

এই কথা না হয় আমি ধারণা করে বললাম … ঘড়িটা পাওয়ার পর সে আসলে কি করেছিলো, সেটা তো বলা যেতে পারে … সত্যি ঘটনা সেটা … তার আগে আমাকে এটা বলতে হবে যে এই ঘড়িটা সে জন্মদিনের উপহার হিসেবে নিয়েছিলো … আর তারই একমাস আগে সে ফাস্টট্র্যাকের একটা ঘড়ি নিয়েছিলো, ৪৫০০ টাকা দামের, ‘রেগুলার’ ইউজ করবে বলে! … ফসিলের ওই ঘড়িটা থাকবে স্পেশাল ইউজের জন্য! … অবাক হবার সকল ক্ষমতা হারিয়ে ওই ফাস্টট্র্যাকের ঘড়িও আমিই কিনে দিয়েছিলাম … তো, আসল ঘটনা হচ্ছে যে সে বাসায় গিয়ে আমাকে জানালো যে ঘড়িটা তার মন মতো হয়নাই, কারণ ফসিলের ঘড়িটার ডায়াল ফাস্টট্র্যাকের ঘড়িটার ডায়ালের চেয়ে অনেক ছোটো, আর ও আসলে তো অত ছোটো ডায়ালের ঘড়ি পরে না! … তারপর আবার এটাও বললো যে ফসিলের আরেকটা মডেল-এর ঘড়ি তার এখন ভালো লাগছে, ওইটার ডায়ালও বড়, সেক্ষেত্রে ‘আরও কিছু টাকা দিয়ে’ ওই নতুন মডেলের ঘড়িটা নেয়া যায় কি না! … ওইদিন আমি সত্যি সত্যি কিছু বলার বা কিছু অনুভব করার সকল ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম … ফসিলের ওই ঘড়ির লিঙ্ক, মডেল নাম্বার যাবতীয় সবকিছু ও বের করেছে, আমি খালি অর্ডার দিয়েছি আর টাকা দিয়েছি … ঘড়ির ডায়াল সাইজ কত সেটা কি ও একবারও দেখেনাই? … আর দেখুক বা না দেখুক, গিফটের জিনিস তো! ও বারবার চাইলো বলে এতো কষ্ট করে, এত দাম দিয়ে একটা জিনিস দিলাম, আর উল্টা আমাকেই বলে যে গিফট পছন্দ হয়নাই! … তাও আবার এমন একটা গিফট যেটা ও নিজেই দেখে-বুঝে ঠিকঠাক করে বাছাই করেছে! …

আজকে আর কি লিখবো? … রাত বাজে দুইটা … কালকে ছাত্রদের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে অবরোধের কারণে অনেকগুলো স্কুল বন্ধ দিয়েছে, কিন্তু এক্সেল অ্যাকাডেমি খোলা … সুতরাং, সকাল ৯টা সময় আমাকে বের হতে হবে বাসা থেকে … কালকে ১১টায় ক্লাস … সুতরাং আগে আগে গিয়ে পৌঁছাতে হবে … যদি অবরোধ শুরু হয়ে যায়, তাইলে আর স্কুলে গিয়ে পৌঁছানো হবে না সময়মতো! …

এখন বরং গিয়ে ঘুমাই … অনেক কাজ সকাল থেকে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s