দিনযাপন | ২৫০৯২০১৫

সেন্ট্রাল রোডের বাসায় থাকতে তালুকদার ভবনের ওই ছোটো কম্পাউন্ডের মধ্যেই কমপক্ষে ৭/৮ টা গরুর কুরবানি হওয়াটা প্রতি কুরবানি ঈদেরই স্বাভাবিক নিয়ম ছিলো। বাড়িওয়ালা যখন বেঁচে ছিলো, জায়গাও একটু বড় ছিলো, তখন সেটা ছিলো দ্বিগুণ সংখ্যক … যাই হোক, এত বছরে গরুর হাম্বা, ছাগলের ম্যা ম্যা শুনতে শুনতে আর কুরবানি ঈদের সকাল থেকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একের পর এক কোপের অ্যাম্বিয়েন্স পেতে পেতে এমনই অভ্যাস হয়েছে যে আজকে এই মিরপুর এলাকায় মনে হলো যেন কেউ কোরবানিই দেয়নাই! … এত নীরব! … আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম হয়তো অনেক তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছি। কিন্তু ঘড়িতে যখন সময় দেখলাম ৯টা, তখন অনেক অবাক হলাম … সেন্ট্রাল রোডে আগে সকাল সকাল গরু-ছাগলের চিৎকার আর অন্তুর আব্বু আঙ্কেলসহ কয়েকজনের চিল্লাপাল্লায় ঘুম ভাঙত … আর এখানে কি সুনসান নীরবতা!

যাই হোক, আলসেমিপনা করতে করতে বিবিসি’র যেই কাজটা কালকে রাতেও শেষ করি নাই, সেইটা নিয়েই সারা সকাল কেটে গ্যালো। ওইটা শেষ করে তারপর গোসল করে ফ্রেশ হতে হতেই বিবি চলে আসলো … দুপুরে আমাদের সাথে খাওয়ার কথা উনার … তো আমরা বসলাম, খাওয়া-দাওয়া করলাম … মনে করার চেষ্টা করলাম যে শেষ কবে ঈদের দিন সবাই মিলে টেবিলে বসে আয়োজন করে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিলো … যাই হোক, খাওয়া-দাওয়া করে ডেজার্ট হিসেবে আইসক্রিম খেতে খেতে বিবি’র সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব হলো … তারপর বিবি চলে গ্যালো তার বাসায় … আমিও কি করবো কই যাবো এইসবের আর কোনো তাল না পেয়ে একটু রেস্ট নেয়ার ধান্দায় শুয়ে থাকলাম … ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে হাবিজাবি বিভিন্ন ফিচারগুলো ক্লিক করে পড়ছিলাম … একটা ফিচার দেখলাম ‘ এক মিনিটে ঘুমিয়ে যাবার উপায়’ টাইপের … নাই কাজ তো খই ভাজের মতো অই ফিচারও পড়া শুরু করলাম … দেখলাম যে একধরণের রিলাক্সেশন এক্সারসাইজের কথা বলেছে … হুদাই শুয়ে শুয়ে আমিও সেই এক্সারসাইজ করতে শুরু করলাম … এই করতে করতে দেখলাম যে আসলেও ঘুম ঘুম লাগছে … সকাল থেকে টানা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেছি, এমনিতেই চোখ-মাথা ব্যথা করছে … ঘুমিয়ে গেলাম … উঠতে উঠতে সন্ধ্যা … সন্ধ্যায় উঠে বিবিসি’র স্ক্রিপ্ট যেটা অনুবাদ শেষ করেছিলাম দুপুরে,  ওইটার ফরম্যাটিং করলাম, কিন্তু তারপর আর পাঠালাম না … জিমেইল ওপেন করে পাঠাতেই আলসেমি লাগলো … রেখে দিলাম …

তারপর অনেক গবেষণা করে-টরে শেষে একটা সিনেমা দেখতে বসলাম … সিনেমার নাম ‘দ্যা ভিজিট’ … খুব আহামরি কিছু না … দুই পিচ্চি কখনো তার দাদা-দাদিকে দেখে নাই, বহুবছর পরে দাদা-দাদিই যোগাযোগ করে ওদেরকে এক সপ্তাহের জন্য বেরিয়ে যেতে বলে … ওরাও এক্সাইটেড হয়ে যায় … কিন্তু গিয়ে দেখে যে দাদা-দাদি মহা সাইকো টাইপের দুই পাবলিক … সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে আবিষ্কার হয় যে এরা আসলে ওদের আসল দাদা-দাদি না … কিঞ্চিত রেড রাইডিং হুড ঘরানার কাহিনী আর কি! … কিন্তু সিনেমার সবচেয়ে দূর্বল গাঁথুনি এটাই যে পিচ্চি দুইটা কি আসার আগে একবারের জন্যও তাদের দাদা-দাদির কোনো ছবি দেখে নাই? … সিনেমার প্রথমেই বলসে যে তাদের মায়ের সাথে নাকি দাদা-দাদি নেটে যোগাযোগ করসে … সেখানে কি ছবি থাকবে না? মা-ই বা ক্যামন? ছেলে-মেয়েকে দাদা-দাদির ছবি দেখাবে না? …

যাই হোক, সিনেমা দেখা শেষ করে খাওয়া দাওয়া করে এখন এই যে বসলাম দিনযাপন লিখতে …

কুরবানি ঈদের ব্যাপারটা আসলে আমার ঠিক পছন্দ হয় না … যেই কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে এই কুরবানি ঈদ, সেই মূল বিষয়টাই এখন আর নাই … কুরবানি শুরু হয়েছিলো নিজের প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর নামে কুরবানি দেয়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে … এখন মানুষ আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্য দেখানোর উদ্দেশ্যে বছর ছড় কুরবানি দেয় ঠিকই, কিন্তু আনুগত্য প্রকাশের চাইতে নিজেদের বিত্ত-বিলাসের শো-অফটাই মনে হয় যে বেশী থাকে … এইটা এখন যত না ধর্মীয় উৎসব, তারচেয়েও বেশি ‘ফ্যাশন’ … কে কত দাম দিয়ে গরু কিনলো সেইটা জাহির করে বেড়ানো, সেই গরুর সাথে আবার সেলফি তুলে ফেসবুকে দেয়া, এমনকি গরু কুরবানি দিচ্ছে সেইটারও ভিডিও ফুটেজ কে কে জানি দেখলাম ফেসবুকে দিয়েছে! … মানুষ আস্তে আস্তে মনে কি পরিমাণ অসুস্থ মানসিকতার হয়ে যাচ্ছে সেইটাই ভাবছিলাম এগুলার নিউজ ফিড দেখতে দেখতে …

আর কুরবানি ঈদে এই ঢালাওভাবে গরু-ছাগল কুরবানির বিষয়টা আমি নিতে পারিনা আরেকটা কারণে … ছোটবেলায় কিন্তু আমি আগে বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুরবানি দেয়া দেখতাম … কিভাবে গরুটাকে সবাই ধরে বেধে শোয়ায়, তারপর রগের অংশটুকু ধরে আল্লাহু আকবর বলে কোপ দেয়ার সাথে সাথে গলগল করে রক্ত ছোটে …  একবার কুরবানি ঈদের আগের রাতেই মনে হয়, স্বপ্নে দেখলাম যে পরিচিত-অপরিচিত অনেকগুলা বাচ্চা-কাচ্চা টাইপের মানুষজন কম্পাউন্ডের একপাশের উঁচু দেয়ালের ওপর উঠছে, আর ঝাঁপ দিচ্ছে … তাদের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে … একজন বললো যে কুরবানির ঈদ, তাই তারা কুরবানি দিচ্ছে নিজেদের … পুরা ফ্লোরটা রক্তে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিলো … এবং যেটা দেখলাম যে একেকজন ঝাঁপ দিচ্ছে মানুষ অবস্থায়, ওই ফ্লোরে পড়ে যাবার পরেই সে হয়ে যাচ্ছে গরু … ওই দৃশ্যটা মাথায় এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিলো যে এরপর থেকে আমি আর কুরবানি দেখতে পারি নাই … এখনো আমার এমনকি ওইরকম রক্তে মাখামাখি ফ্লোর দেখলেই ওই স্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায় … বীভৎস একটা স্বপ্ন ছিলো সেটা … এবং কুরবানি ঈদের আগের রাতেই দেখার কারণে আমি এরপর থেকে আর কুরবানি বিষয়টাও সহজভাবে নিতে পারিনাই …

একটা অফটপিকে যাই এবার … টাইমহপের কল্যাণে মনে পড়লো যে ২০১২ সালের এই দুই/এক দিনের মধ্যেই আমি জেনেছিলাম যে শিমুল স্যার দায়িত্বের সাথে আমাকে ফাইনাল প্রজেক্টে ফেইল করিয়েছেন এবং আমার সেকারণে আমার অনার্সের রেজাল্টও এসেছে ফেইল … ওইটা নিয়ে আমি অনেক হতাশ ছিলাম … হতাশ হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও লিখেছিলাম যে “May be I should decide to ‘QUIT’ myself now…from my ‘guinea pig’ life….or, may be i should become ‘indifferent’ to the failures of experiments done…..” … সেই স্ট্যাটাসে আবার সেই সময় সোহেলও কমেন্ট করেছিলো … বেশ একটা ‘টেক আ ব্রেক’ টাইপের উৎসাহ দেয়া কমেন্ট … অবাকই হলাম … ওই সময়টায় মুগ্ধ’র সাথে আমার একটা গল্প আছে … সেই গল্পের যুতসই প্রসঙ্গ আসলে তখন বিস্তারিত লিখবো … তবে, তখন মুগ্ধ’র সাথে যেই গল্প ছিলো, তার খাতিরেই সোহেল আমার স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছিলো কি না সেটা আমি বুঝবার চেষ্টা করছি … আমি ঠিক জানি না যে আমার সাথে মেলামেশা শুরু করবার আগে মুগ্ধ’র সাথে আমার গল্পের কতটুকু সোহেল জানতো, আদৌ জানতো কি না … আমি নিজে সোহেলকে বলেছিলাম, এবং তখন সোহেল এরকমই বলেছিলো যে সে জানতো না … আবার মুগ্ধ আমাকে একবার বলেছিলো যে আমার সাথে সোহেল মেশার একটা কারণ হতে পারে যে মুগ্ধ’র ওপর কিঞ্চিত প্রতিশোধ নেয়া … সোহেলের এক মডেল ফ্রেন্ড ছিলো, তার সাথে আবার একসময় মুগ্ধ’র বেশী ভালো খাতির হয়েছিলো বলে নাকি সোহেলের চাপা রাগ আছে … সেই রাগ মেটানোর জন্যও সোহেল মুগ্ধ’র বান্ধবীর সাথে বেশী খাতির করে মুগ্ধকে দেখিয়ে দিতে পারে সেটার একটা সম্ভাবনা মুগ্ধ বলেছিলো … এই ব্যাপারটা আমি কখনো সোহেলকে জিজ্ঞেস করি নাই … এমনিতেই আমার নিজেকে সোহেলের কাছে এত বেশী ইউজড মনে হতো যে মুগ্ধ যেটা বলেছিলো, আসলেও যদি সেরকম কিছু আছে বলে জানা যেতো, তাহলে হয়তো নতুন করে খারাপ লাগা তৈরি হতো না, খালি অবিশ্বাস আর ঘৃণার স্তরটা আরেক্টু ঘনীভূত হতো …

যাই হোক, অনেক লিখে ফেললাম … আপাতত আবারো ঘুমের রাজ্যে নিজেকে সমর্পন করে দেই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s