দিনযাপন| ১০১০২০১৫

বেশ লম্বা একটা ভাটা পড়ে গেছে দিনযাপন লেখায়। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইচ্ছা করেই লিখতে বসি নাই, নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণের কথা ভেবেই … কিন্তু তারপর থেকে এই আজকে পর্যন্ত কয়েকটা দিন লেখা হচ্ছে না এক তো ব্যস্ততার জন্য, আর দুই, মাঝখানে একটু অসুস্থও ছিলাম।

আজকে জিদ ধরেছি, লিখবোই …

দিনযাপনও আমার ডাইরি লেখার অভ্যাসের মতো হারিয়ে যাক সেটা আমি মোটেই চাই না। মরি, বাঁচি, দিনযাপন লিখতে হবে …

যাই হোক, ব্যস্ততা হচ্ছে একটা ট্রান্সক্রিপশনের কাজ। ইথারের অফিসের কাজ। ১ ঘণ্টার একেকটা ইন্টারভিউ ট্রান্সক্রিপ্ট করতে হবে, সময় বাধা ৮ ঘণ্টা। এটা ঠিক যে একটা ১ ঘণ্টার ইন্টারভিউ ট্রান্সক্রিপ্ট করতে সবমিলিয়ে ৮ ঘণ্টাই লাগে। কারণ, গড়ে প্রতি ১০ মিনিটের ট্রান্সক্রিপশন করতে সময় লাগে ১ ঘণ্টার মতো। এখন ঘটনা হচ্ছে, টানা ৮ ঘণ্টা তো আর বসে ট্রান্সক্রিপ্ট করা সম্ভব হয় না। ইন ফ্যাক্ট, ১ ঘণ্টার বেশি একটানা কানে হেডফোন লাগিয়ে রেখে কথাও শোনা যায় না। কান-মাথা ব্যথা হয়ে ক্যামন ইম্ব্যালেন্স লাগতে থাকে। ফলে ঘণ্টাখানেক কাজ করে আবার কিছুটা সময় ব্রেক নিতে হয়। …

… এখন ঘটনা হচ্ছে, আমি কাজ করার টাইমিং-টা করেছি মোটামুটি এরকম যে শুক্র-শনি সারাদিন, মঙ্গলবার সারাদিন, আর বাকি যেই চারদিন আমি স্কুলে যাই সেসময় যখন যতটুকু করে পারি। … সেরকম হিসেব করলে শুক্র, শনি আর মঙ্গলবার আমি সারাদিন কাজ করে, ব্রেক নিয়ে গড়ে ৪/৫ ঘণ্টা কাজ করতে পারি। সে হিসেবে আমার একেকটা ইন্টারভিউ ট্রান্সক্রিপ্ট করতে সময় লাগে গড়ে দুই থেকে আড়াই দিন … গত সপ্তাহে আমার টার্গেট ছিলো ৪টা ইন্টারভিউ, কিন্তু এর মধ্যে দুইদিন প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর ডিহাইড্রেশনে ভোগার কারণে আমি কাজ করতে পেরেছি ২টা ইন্টারভিউ নিয়ে … এর মধ্যে আবার নতুন আরও কিছু ইন্টারভিউ পাঠিয়েছে আজকে … এই সপ্তাহে সবকিছু ঠিকঠাকমতো হলেই হয় … টার্গেট ৪টা ইন্টারভিউর অন্তত ৩টা করতেই হবে আগামী ৭ দিনে …

আজকে আমার মন বেশ খারাপ। স্কুলের একটা ঘটনা নিয়ে। ঠিক ঘটনা নিয়ে না, ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মাথায় গিজগিজ করতে থাকা চিন্তা-ভাবনা’র কারণেই মূলত মন খারাপ। আরও ভালোভাবে বললে, মেজাজ খিঁচে থাকা টাইপের একটা অনুভূতি …

ক্লাস সেভেনের সাথে ক্লাস ছিলো। ক্লাসে ঢুকতে যাবার মুহুর্তে কানে এলো এক স্টুডেন্ট আমার নাম-কে বিকৃত করে বলছে ‘ ও এখন তো ‘মগা’ টিচারের ক্লাস’ … আজকালকার ছেলে-পেলে ‘টিচার’ জাতিকে মিনিমাম রেস্পেক্ট করে না, সেটা জেনে এবং মেনেই স্কুলে শিক্ষকতা করি, কিন্তু তারপরও কেন যেন খুব খারাপ লাগলো। ক্লাসে ঢুকলাম। যেই স্টুডেন্ট কথাটা বলেছে সে তখন এরকম অঙ্গভঙ্গি করতে শুরু করলো যে ‘ও আচ্ছা, টিচার শুনে ফেলেছে’ ‘ উপ্স! কি করলাম’ … সেটাও আসলে আমাকে দেখানোর জন্যই … কেন যেন নিজেকে প্রচণ্ড হেল্পলেস লাগলো! … একবার ভাবলাম যে নিজেই বকা-ঝকা দিয়ে বসিয়ে দেবো নাকি প্রতিদিনের মতো … তারপরেই মনে হলো যে আগামীকালকেও তো ক্লাসের আগে সে এরকম আরেকটা কিছু বলবে … আমাকে নিয়ে, বা অন্য কোনো টিচারকে নিয়ে … চিন্তার অসহায়ত্ব থেকেই ওদের ক্লাস টিচারকে ডাকলাম। ক্লাস টিচার সুস্মিতা আপা কিছুক্ষণ বকলেন, তারপরের পিরিয়ডে ওকে সেকশন ইনচার্জ-এর কাছে নিয়েও গেলেন। হয়তো সে শাস্তি পাবে …

কিন্তু ঘটনাটা ঘটার পর থেকেই কেমন জানি বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেলাম। নিজে ওদের বয়স্যা থাকার সময়ে স্কুলের টিচারদের প্রতি আচরণগুলো ক্যামন ছিলো, টিচার মানেই রেস্পেক্ট করার মতো মানুষ সে সম্পর্কে ক্যামন একটা জোরালো চিন্তাধারা ছিলো সেগুলো মাথায় বারবার কাজ করতে শুরু করলো। ক্যামন জানি কান্না আসছিলো বারবার … মানতেই পারছিলাম না যে একটা বাচ্চা এই সময়ে এসে একজন টিচারকে এতটা ফালতু হিসেবে ট্রিট করে! অথচ জানি যে এটাই সত্য … অথয জানি যে এখন যুগটাই এমন যে এখানে ‘শিক্ষক’ জাতি এখন আর মেরুদণ্ড সোজা করার কারিগর না, বরং জাস্ট অ্যানাদার ব্রিক অন্য দ্যা ওয়াল! … কিন্তু, তারপরও কেন জানি ব্যাপারটা সহজে নিতেই পারছি না আজকে! …

এই যে এখন দিনযাপনে এটা লিখতে বসলাম … এর মধ্যেই আমার সারাদিনের চেপে রাখা বিষাদটা কান্নায় টার্ন নিয়েছে! … হয়তো আমি বেশি স্বপ্নবিলাসী দেখেই ইম্যাজিন করি যে আমার স্টুডেন্টরা সব হবে আজীবন গল্পের বইয়ে পড়ে আসা দুরন্ত, অথচ শ্রদ্ধাশীল স্টুডেন্টস, তাদের সাথে আমার সম্পর্ক হবে খুব ফ্রেন্ডলি, ক্লাসে কেবল বই থেকে রিডিং না পড়ে অনেক মজা করে পড়াবো, অনেক আলোচনা করবো, অনেক গল্পের মতো করে একটা জিনিস পড়াবো আর তাতে করে বাচ্চাদের মুখস্তবিদ্যার অভ্যাস আর চিন্তা আস্তে আস্তে সেলফ এক্সপ্লোরিং চিন্তায় টার্ন নেবে! … ইন্টেরেস্টিংলি, আমি আমার পার্টটুকু যথাসাধ্যই আমার কল্পনার সেই চরিত্রের মতো করতে চেষ্টা করি, কিন্তু যেহেতু স্টুডেন্টদের কল্পনার সাথে আমার কল্পনার কোন মিল নেই তাই তারাও সেভাবে ভাবে না। ফলে স্টুডেন্টরা আমার কল্পনার মতো হয় না।

কিংবা আমার কল্পনাই হয়তো ব্যাকডেটেড! ফলে সেসব স্টুডেন্ট আগে থাকলেও এখন আর পাওয়া যায় না! …

যাই হোক, বাদ দেই এদের কথা …

এটাও ঠিক যে এরকম কিছু স্টুডেন্ট-ও আমি সানিডেইলে থাকতে পেয়েছিলাম যারা সত্যিকার অর্থে আমাকে পছন্দ করতো আমার ফ্রেন্ডলি অ্যাটিচুডের জন্যই। এখনো তাদের সাথে ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে যোগাযোগ হলে তারা বলে যে তারা আমাকে মিস করে … এমনকি এমনও হয়েছে যে এক্সেল একাডেমিতে ক্লাস সেভেনে একজন স্টুডেন্ট আছে তার কাজিন হচ্ছে সানিডেলের আমার এক স্টুডেন্ট, মাইশা। মাইশা যখন তার কাজিনের কাছে আমার কথা শুনেছে, একদিন নিজে স্কুলে এসে আমার সাথে দেখা করে গেছে! … এরকম স্টুডেন্টদের কাছ থেকে এরকম আচরণ পেলে তখন আবার নিজেকে প্রচণ্ড প্রাউড মনে হয় যে একটা স্টুডেন্ট-এর কাছে আমি কতটা মূল্য পেয়েছি! …

আর তারই বিপরীতে যখন মাহিরের মতো স্টুডেন্ট-এর কাছ থেকে এরকম আচরণ পাই যে বুঝে বা না বুঝে সে টিচারের নাম বিকৃত করে ‘মগা’ ডাকে, তখন অপমানের বোধে তৎক্ষণাৎ চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে।

আচ্ছা, যাই হোক, এই প্রসঙ্গই বাদ …

আপাতত আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। খালি ৫ অক্টোবরের একটা আপডেট জানায় লেখা শেষ। কেন জানি ওইদিন এর আগের দিন থেকেই মাথায় ঢুকসিলো যে কফিনে শেষ পেরেক ঠুকবার মতো দুলু আন্টি, পূর্ণা, মুগ্ধ এরকম কয়েকজনকে একটা গ্রুপ মেসেজে রেখে সোহেলের যাবতীয় ঘটনা লিখে জানিয়ে দেই … তাতে করে দুলু আন্টি সোহেলের কথাও জানবে, আবার মুগ্ধ যে সব জানে অথচ নিজের পিঠ বাঁচাতে চুপ করে থেকেছে সেটাও জানবে, আবার পূর্ণা বা বাকি সবাই যতটুকু ঘটনা জানে, যতটুকু জানে না সবই জানবে … কিন্তু ৫ তারিখ সারাদিন খুব নিয়ন্ত্রণ করে কাটালাম নিজেকে। দিনশেষে আর ইচ্ছে করলো না যে লিখি। কিন্তু, তাঁর বদলে আরেকটা কাজ করলাম। ইনফ্যাক্ট, জিদ মেটানোর জন্যই কাজটা করা । সোহেলকে মেইল করে বললাম যে ও মরে গেলে আমি খুশি হবো, ও যেন মরে গিয়ে আমাকে শান্তি দেয়! …

ও কোন রিপ্লাই করবে এমনটা আমি আশা করিনি … ও রিপ্লাই করেও নি … ওর আবার যখন নিজের আমার পায়ে ধরে মাপ চাইবার মতো অবস্থা হবে, তখন ঠিকই মেইল করে খুব গদগদ ভাব দেখিয়ে বলবে ‘মাফ করে দাও’! …

যাই হোক, আজকের মতো লেখা শেষ করছি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s