দিনযাপন । ১৯১২২০১৫

দুপুরবেলা স্কুলের ওয়াশরুমে যাবার সময় ওয়াশরুমের দরজা লাগাতে গিয়ে বেখেয়ালে ডানহাতের মধ্যমায় ছ্যাচা খেয়েছিলাম। তখন খুব একটা আমল দেই নাই। ভেবেছি যে খুব একটা ব্যথা লাগে নাই। সন্ধ্যার দিকে দেখলাম আস্তে আস্তে ফুলতে শুরু করেছে ছ্যাচা খাওয়া অংশটা! খুব যে ব্যথা আছে তা না, কিন্তু কেমন জানি একটা অবশ অবশ ভাব আছে। খুব বেশি মুভ করতে পারছি না আঙ্গুল। তারপরও দিনযাপন লিখতে বসলাম। কারণ আজকে এই মুহুর্তে আমার মন খারাপ, আর সেই প্রসঙ্গে কিছু লেখারও আছে!

সকালবেলা খুব আলসেমি করে স্কুলে গেছি। না গেলেই না টাইপের একটা ভাবসাব নিয়ে! একে তো ঠাণ্ডা, তার ওপর শনিবার, তার ওপরে আমার তো নিজের কোনো কাজ নাই! … তাও যেতে হবে দেখে যাওয়া। স্কুলে গিয়ে পরে তাসলিমা আপা আর আরিফিন স্যার-এর দুইটা কাজে তাও হেল্প করা হলো। এর মধ্যে আবার হঠাৎ করে ‘ক্রোক’ শব্দটা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেকটা সময় খেলাচ্ছলেই কেটে গেলো। কি একটা কথায় কথায় এই প্রসঙ্গ উঠলো যে অনেক জায়গায় যে ব্যবহার করা হয় ‘সম্পত্তি ক্রোক করা হলো’ , এই ক্রোক শব্দটা যদি ইংরেজি হয়, তাহলে এর স্পেলিং কি! সেইটা আর খুঁজে পাওয়া গেলো না! পরে বাসায় ফিরে একটু আগে গুগল ট্রান্সলেট ঘেঁটে যা বুঝলাম তা হলো যে ক্রোক শব্দটার অরিজিন সুইডিশ, আর এইটার ইংরেজি কোনো শব্দ নাই। ক্রোক বলতে বাংলায় বোঝায় ‘বাজেয়াপ্ত করা’ , যেটার জন্য ইংরেজি হচ্ছে ‘ to seizure’। সুইডিশ শব্দটা থেকেই বাংলায় এই শব্দটা ঢুকেছে মনে হয়। আব্বুর সাথে তো কথা বলি না, না হলে আব্বুকে জিজ্ঞেস করে নেয়া যেতো!

যাই হোক, স্কুল থেকে বের হয়ে পড়লাম আরেক ফাঁপরে! যাবো কই? তখন বাজে মাত্র দেড়টা! আর আমার টিউশনি ৪টায়! স্কুলেও কেউ থাকছে না! ভাবলাম গ্রুপের দিকে চলে যাই। ওখানে তো স্কুলের রিহার্সাল হচ্ছে। সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় পার করে তারপর আবার এদিকে চলে আসবো। এর মধ্যে ফৌজিয়া আপা বললেন যে উনার বাসাতেও যেতে পারি চাইলে। উনার বাসা লালমাটিয়ায়। আমার টিউশনি তল্লাবাগে, সো ওইখান থেকে আরো কাছেই হয়। তাই ফৌজিয়া আপার সাথেই জোট বাঁধলাম। উনার বাসায় গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে দু’জনে মিলে খেতে বের হলাম। উনার বাসার সাম্নেই ‘টিবিসি ক্যাফে’, ওখানে বসলাম। উনি বেঙ্গল ক্যাফে-তে যাবার কথা বলেছিলেন। আমি ভারী খাবার খাবো না বলে ওখানে যাওয়ার আগ্রহ দেখালাম না। কিন্তু ওই টিবিসি-তেই যা খাওয়া হলো, সেটাও কম না!

যাই হোক, সেখান থেকে ৪টার মিনিট দশেক আগেই আজমাইন, মানে যেই ছেলেকে পড়াবো তার বাসায় পৌঁছে গেলাম। সেই ছেলে পড়তে বসলো ঠিকই। নিজেই আগ্রহ নিয়ে ‘আগলি ডাকলিং’ গল্পটা পুরোটাই রিডিং পড়ে ফেললো! কিন্তু তারপরেই তার পড়তে বসার উৎসাহে ভাটা পড়লো! নিতান্তই নিরুৎসাহে সে বাকি সময়টুকু পড়লো! কিছু লিখতেই তার যত অনাগ্রহ। যা বুঝলাম, ওকে লেখাতে হবে – এটাই ইন ফ্যাক্ট আমার চ্যালেঞ্জ আর কি! … কালকের জন্য কতগুলো হোমওয়ার্ক দিয়ে আসছি। কি করে দেখা যাক!

গ্রুপে এখন নাচ আর গানের রিহার্সাল চলে। ২১ আর ২২ তারিখ শো। আমি নাচিও না, গাইও না! তাই ক্যামন জানি, কই বসি, কই যাই, কি করি টাইপের অবস্থা হয়ে যায় গ্রুপে গেলে! আর আজকে তো এমনিতেই আঙ্গুলের অবস্থা খারাপ, যুত মতো কোথাও বসে বা দাঁড়িয়ে থেকেও আরাম পাচ্ছি না! আবার কিছু যে করবো, সেরকম কাজও নাই! সবাই নাচে বা গানে ব্যস্ত, সো কারো সাথে সেভাবে কথা বলেও টাইম পাস করার উপায় নাই! বসে বসে রিহার্সাল দেখি, এই ! আর আজকে তো এমনিতেই কিছু ভালো লাগছিলো না। আঙ্গুলের টেনশনে আর কোনো কিছু নিয়ে উৎসাহ পাচ্ছিলাম না! এম্নকি গানের টিমের সাথে বসে থেকে আজাইরা গলা মেলাতেও না! … মাঝখানে গ্রুপের চাঁদা তোলার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের লিস্ট আপডেট করতে বসলো টুটুল। তখন ইমন ভাই ডেকে লিস্টে নাম-টাম কারো বাদ পড়লো কি না সেগুলো চেক করতে বললো। তবু তো একটা কিছু করার পাওয়া গেলো! তাতেই আমার মহা আনন্দ! …

আজকে গ্রুপ থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরতে গিয়ে খুব ঝামেলায় পড়লাম! অমিত আসবে না। ভেবেছিলাম সাদি তো অন্তত খামার বাড়ি পর্যন্ত সাথে যাবে। দেখি যে সাদিও নাই! এদিকে সিএনজিই পাই না! প্রায় আধাঘণ্টা শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা সিএঞ্জি পাওয়া গেলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা। বাসায় এসে নেটে বসে দেখি আরেক কাহিনী! গ্রুপ থেকে বের হয়ে সব দলবেঁধে হাতিরপুলে পিজা হাউজে গেছে পিজা খেতে! সন্ধ্যা থেকেই সবাই নায়ীমীর সাথে গুতাগুতি করছিলো যে ও চাকরি পেলো, ইভেন্টের টাকা পেলো কিন্তু খাওয়ালো না! তো সেই সূত্রেই বোধহয় নায়ীমী’র পিজা ট্রিট! কই ভাবছিলাম যে সাদি বোধহয় তাড়াতাড়ি চলে গেছে, তাই ফোন দিবো কি দিবো না ভেবে ফোনও করি নাই, সেই সাদি পর্যন্ত ওই ট্রিট পাওয়ার দলে বসে আছে! তখন ভাবলাম যে হয়তো গ্রুপ থেকে নেমে চা খাওয়ার ওখানে যেতে যেতে প্ল্যান হয়েছে, ফলে যারা যারা ছিলো সবাই দলে দলে যোগ দিয়েছে! আবার গ্রুপ থেকে শেষ পর্যন্ত বের হলাম আমি, রানা, গোপী, রিমন আর রিতা। গোপী বাসায় যাওয়ার তাড়া আছে, তাই নেমেই চলে যাবে এসব বলছিলো। তো কখন চলে গেলো সেটাও টের পেলাম না। ছবিতে দেখি যে সেও ওই ট্রিট-এর ওখানে! তখন আমার কেমন জানি ‘লেফট আউট’ ফিলিংস হলো! তারমানে তো এটা হঠাৎ প্ল্যান না! গ্রুপে কথাবার্তা হয়েই সবাই একসাথে বের হয়েছে! তো, গ্রুপে তো আমিও ছিলাম, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে যখন কথা হচ্ছিলো তখনো ছিলাম … এত মানুষকে নিয়ে গেলো ট্রিট দেয়ার জন্য, আর আমি যে ওর সাথে ওই স্কুলেই চাকরি করি, সেই কমননেসের জায়গা থেকেও আমাকে একবারও বললো না! খাওয়াটা এখানে আমার জন্য ইস্যু না। স্কুলে থেকে বের হয়ে তো প্রায়ই আমরা দুইজন এখানে সেখানে খাই। কোনোদিন ও বিল দেয়, কোনোদিন আমি দেই। আমার খারাপ লাগলো এইজন্য যে গ্রুপের যেই মানুষগুলোর সাথে আড্ডাবাজি করা হয়, বা করতে ভালো লাগে, যাদের সাথে সময় কাটলে মনে হয় দিনটাই ভালো হয়ে গেলো, সেই মানুষগুলো সবাই একসাথে আর আমি সেখানে নেই! রীতিমতো কান্না চলে আসার মতো খারাপ লাগলো ঐ মূহূর্তে! বুঝলাম যে নায়ীমী হয়তো আমাকে বলে নাই যে ওরা খেতে যাবে সবাই মিলে। কিন্তু আমিও তো আজকে কিভাবে কিভাবে গ্রুপের রিহার্সালের শেষে সবার আলোচনার মধ্যে থাকি নাই, আবার সবাই যখন একসাথে নেমেছে তখন ওদের সাথে নামি নাই! আবার সাদিকে ফোন করে চলে গেছে কি না জিজ্ঞেস করবো ভেবেও করি নাই! যে কোনো একটা বিষয় হলেই তো ওই আড্ডাবাজিটায় আমারও থাকা হয়ে যেতো! যেই মুহুর্তগুলোর জন্য মুখিয়ে থাকি, সেই মুহুর্তগুলো যখন আসে, তখন আমার আর সেখানে থাকা হয় না! কি কপাল আমার! …

ইদানীং অনেক ছোটো ছোটো না পাওয়াগুলোও অনেক বড় কষ্ট দিয়ে ফেলে! হয়তো আমারই আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, কিন্তু এরকমও হয় যে প্রায় ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না এমন একটা কিছু নিয়েও আমি অনেক কষ্ট পেয়ে যাই আর দিনশেষে বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলায় ঠেকে আসা কান্না চেপে ঘুমাতে যাওয়া হয়! … কি জানি! একদিক থেকে এটা কিন্তু ভালো যে এরকম অনেককিছুর পরিকল্পনা থেকে আমি লেফট আউট হয়ে যাই … তাতে করে কখনো কোনো কারণে ডিটাচড হয়ে গেলে তখন ভালো ভালো সময়ের কথা মনে করে আহা-উহু করতে হবে কম, বরং ‘ওই তো, ওইদিন আমি ছিলাম না’ … ‘ ওই তো, ঐ জায়গায় আমাকে নেয় নাই’ … ‘ ওই তো, ওই প্ল্যানটা হলো, আমি জানলামই না!’ জাতীয় বিষয়গুলো বেশি বেশি থাকলেই ভালো। ডিটাচড হয়ে গেলে তখন কষ্ট-ও হজম হবে তাড়াতাড়ি।

যাই হোক, আঙ্গুলে অলরেডি ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। ভাত খেতেও ইচ্ছা হচ্ছিলো না। আর কিছু খেলামও না। রাতে ক্ষুধার চোটে ঘুমাতে পারবো কি না জানি না। এমনিতেই নিজের ওপর মেজাজ খারাপ, যেটা মিস করলাম সেটা নিয়ে মন খারাপ, তার ওপর ক্ষুধা … কম্বিনেশনটা খারাপ না! …

যাই হোক, আজকের মতো দিনযাপন শেষ করি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s