দিনযাপন | ২১১২২০১৫

গতকালকে বাসায় ফিরতে ফিরতে একটু রাত হলো, আবার প্রচণ্ড ঠান্ডায় জর্জরিত হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো কাজ বলে মনে হলো। ফলে, দিনযাপন আর লেখা হলো না। কালকে দিনযাপন লিখলে অবশ্য তেমন কিছু লেখাও হতো না। সো, খুব একটা লস-ও হয়নাই।

আজকের গল্পই করি বরং। আজকে সারাদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট বলতে প্রাচ্যনাটের শো – ‘সুরের ভেলায় আগুন খেলায়’। মিউজিক এন্সেম্বল -এর নতুন ভার্সন আর কি! আগে হতো’ফুল পাখি ও নদীর গান’, আর এখন এটা। তো সেইটার দুইটা শো হয়েছিলো গ্রুপের রিহার্সাল ফ্লোরেই। একবার ২৬ মার্চে, দেশাত্মবোধক গান নিয়ে আর তারপরের বার এপ্রিলে ফোক গান নিয়ে। আজকে প্রথমবারের মতো পাব্লিক শো হলো এটার। রবীন্দ্র সরোবরে, মানবাধিকার নাট্যোৎসবে। আমার কাজ বলতে আজকে ছিলো ভোকাল টিমটার সিটিং অ্যাারেঞ্জমেন্ট ঠিক করা। কিন্তু ওখানে গিয়ে যেই অবস্থা দেখলাম তাতে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে খুব বেশি ক্যারদানি করা যায়নি। শেষমেশ সবাই দাঁড়িয়েই গান করলো। আগে যদি বুঝতাম যে এরকম অবস্থা হবে, তাহলে তো টিউশনি বাদ দিয়ে ২ টা সময় গিয়ে রবীন্দ্র সরোবরে বসে থাকতাম না! গতকালকে প্রোগ্রামের টাইমিং নিয়ে একটা ক্যাচাল ছিলো। সাড়ে ৪টার দিকে শো শুরু হতে পারে এরকম একটা সম্ভাবনা ছিলো। তো সাড়ে ৪টায় শো শুরু হলে তখন তো আর টিউশনি-তে যাওয়া যায় না! তাহলে তো শো-টাতে আর থাকা হতো না। এদিকে নীল আবার আমাকে ২টার দিকে চলে যেতে বলেছিলো রবীন্দ্র সরোবরে, যাতে সাউন্ড চেকের সাথে সাথে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট-টাও ঠিক করা যায়। কি হবে না হবে ভেবে আমি গতকালকে আজকের টিউশনিতে যাবো না বলে এসেছিলাম। এতরকম কনফিউশনের মধ্যে টিউশনির টাইমটাই তো ম্যানেজ করতে পারতাম না। পরে অবশ্য রাতে বাসায় ফেরার পথে ভাবতে ভাবতে মনে হলো যে আমি তো টিউশনের টাইমটা সকালের দিকেও নিয়ে নিতে পারতাম! স্কুলে না গিয়ে বরং ১১টা থেকে ১টা – এরকম একটা সময় ধরে আজকে পড়িয়ে ফেলতাম, তাহলেও তো হতো! তখন অলরেডি ১১টার মতো বাজে। অত রাতে ফোন দিলে আবার কি মনে করে! সেজন্য আর ফোন করলাম না! ভাবলাম পরেরদিন গিয়ে কথায় কথায় ব্যাখ্যা করে বলে দেবো।

কাল্কেও অবশ্য যাওয়া হবে না মনে হয়। এখনো পর্যন্ত আমি শিওর না। আমি চাইছিলাম সকাল সকাল পড়িয়ে ফেলবো, দরকার হলে স্কুলে যাবো না। কিন্তু কালকে নাকি ওরা সবাই পাসপোর্ট অফিসে যাবে। গ্রুপে কালকে এই সুরের ভেলায় আগুন খেলার-ই আরেকটা শো। এখানে আবার আমার একধরণের ডেকোরেশনের দায়িত্ব আছে। আজকে অবশ্য আমি ৮০% কাজ করে এসেছি। কালকে যদি ৫টার মধ্যে পড়িয়ে বের হয়ে যেতে পারি, তাহলে হয়তো ৬টা নাগাদ গ্রুপে গেলেও সমস্যা হবে না। যেটুকু কাজ বাকি আছে অইটা টুটুল, সাদি ওরা করে নিতে পারবে।দেখা যাক, কালকে সকালে জানতে পারবো টাইমিংটা কিভাবে কি হয়। নইলে বুধ-বৃহস্পতি পড়িয়ে এই দুইদিনেরটা কমপেন্সেট করে দেবো আর কি!

যাই হোক, আজকের শো-এর প্রসঙ্গে ছিলাম। সেখানে ফিরে আসি। সব মিলিয়ে শো-টা আজকে যে খুব আহামরি কিছু হয়েছে তা বলবো না। কনফিডেন্স-এর অভাবের কারণেই হোক, কিংবা ভোকাল আর মাইকের সিঙ্ক্রোনাইজেশন করতে না পারার কারণেই হোক, একজন দুইজন ছাড়া ১০ জনের ভোকাল টিমের আর কারো গলাই তেমনভাবে পাওয়া যায় নাই। ফলে ১০টা ভয়েজের যেই জোর থাকার কথা একেকটা গানে, শুনতে সেরকম লাগে নাই। সাথে নাচ ছিলো ৩টা গানে। এক্টায় স্নাতা আপু একা নেচেছে, আর বাকি দুইটা গ্রুপ ড্যান্স। নাচের কারণে গায়ক-গায়িকাদের দিকে দর্শকের হয়তো মনোযোগ তেমন একটা যায়নি, এটাই ভরসা। কালকে দেখা যাবে যে গ্রুপের মধ্যে যে শো-টা হবে, সেখানে সবাই খালি গলায় খুব কনফিডেন্টলি গান গাইছে! পাব্লিক প্লেস বলেই হয়তো আজকে সবার ভয়টাই বেশি ছিল … যারা গানের দলে আছে তারা এক দুইজন ছাড়া কেউই তো ইন ফ্যাক্ট প্রফেশনাল গানের শিল্পী না!

তবে, শো কেমন হলো, গান কেমন হলো সেটা নিয়ে আমার বলার কিছু না থাকলেও এই শো রিলেটেড একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। একটা সময় ছিলো, যখন প্রথম প্রথম গ্রুপে এসেছি তখন দেখতাম যেখানেই গ্রুপের শো হোক না কেন, দলবেঁধে গ্রুপের মেম্বারদেরই একটা বড় অংশ জাস্ট অডিয়েন্স হিসেবেই ওই শো দেখতে গেছে। এমনকি সেটা ঢাকার বাইরে হলেও! আর এখন একেক্টা শো হয়, শো-এর সাথে রিলেটেড মানুষজন ছাড়া আর কেউ থাকে না! সেটা এমনকি শিল্পকলার শো-এর ক্ষেত্রেও হয়! আমার কেন জানি এটা মানতে খুব কষ্ট হয়! আমি এই গ্রুপের একজন মেম্বার, সেই গ্রুপের একটা শো হচ্ছে, আর আমি  সেখানে থাকবো না! – এটা কিভাবে হয়? … কিন্তু হয়! ইদানীং এটাই হয়। আজকে খালি সজীবকেই দেখলাম শো দেখতে গেছে। আর কেউই না! ব্যাপারটা হয়তো এভাবেও দেখা যায় যে নাচ আর গান মিলিয়ে যে ২৫/৩০ জনের টিম ছিল, তারাই আসলে অন্য সময় ঘুরে-ফিরে ‘জাস্ট অডিয়েন্স’ হিসেবে গ্রুপের বিভিন্ন পারফরমেন্স দেখতে যায় ! …

থাক, এগুলা কথা বাদ দেই! এইসব কথা নিয়েও দেখা যাবে একেকজন একেকরকম ইন্টারপ্রিটেশন করবে, আর তারপর তিলকে তাল করে ফেলবে। আজকেই যেমন একটা খুব লেইম জিনিস ঘটলো। আমার বেশ হাসিই পেলো ঘটনাটায়। রবীন্দ্র সরোবর গিয়ে কাজের ফাঁকে নায়ীমী, রফিক ভাই, রবিন সামনের ফুড কোর্টে খেতে গেলো। কিছুক্ষণ পর নায়ীমী ফোন করে বললো যে ওরা খাওয়া-দাওয়া করছে, আমি যেন ওখানে চলে আসি। আমার খুব হাসি পেলো। মনে হলো যে এইটা নায়ীমীকে রফিক ভাই হয়তো বুদ্ধি দিয়েছে। হয়তো কথায় কথায় বলেছে যে প্রজ্ঞাকে বললা না, ও তো মাইন্ড করবে ইত্যাদি ইত্যাদি! আর নায়ীমীও তখন সেটা সিরিয়াসলি নিয়ে আমাকে ফোন করেছে। কিংবা হয়তো সেরকম না-ও হতে পারে। যাই হোক, আমি যাই নাই। তখন মাত্র সাউন্ড চেকের কাজ শুরু হয়েছে। যে কোনো সময় হয়তো নীল-ও চলে আসবে। তখন সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট-এর কাজটাও করে নিতে হবে। পরে অবশ্য রফিক ভাইরা খেয়ে-দেয়ে ফিরে এসে খুব শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিলো, ‘আরে! লুচিটা যা ছিলো না! আর বিফের চাপটা! উফ! কি বলবো!’ … আমার তখন আরো হাসি পেলো! মানুষ এত লেইম হতে পারে কিভাবে? …

আজকে মা- আব্বুর বিবাহবার্ষিকী। এগুলা পালন করা নিয়ে কখনোই আমার তেমন উচ্ছ্বাস বা উৎসাহ তৈরি হয় নাই। এমনিতে আগে দেখতাম মা হয়তো আব্বুর জন্য একটা কিছু কিনে এনেছে, আব্বু হয়তো টাকা দিয়েছে সেটা দিয়ে মা শাড়ি কিনেছে এইরকম  হতো। কিন্তু ঘরোয়াভাবেও কোনো সেলিব্রেশন করা হয় না। এখন এইসব দিনের সাথে আমার ডিটাচমেন্ট আরো বেশি। আগে যেমন বাসায় কারো জন্মদিন হলেই অন্তত একটা কেক নিয়ে আসতাম, এখন সেটাও করি না। আর বিবাহবার্ষিকী তো অনেক পরের কথা! এই বাসায় এখন কেবল ঘুমাতে আসা আর গোসল করা, খাওয়াদাওয়া করা ছাড়া আমার কোনো অ্যাক্টিভ ভূমিকা নাই। নিজের মতোই চুপচাপ থাকি, নিজের কাজ করি, ভালো না লাগলে বের হয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসে থাকি। কালকে যেমন লালামের জন্মদিন। কিন্তু ওদের বাসায় যাওয়ার সময়ও পাবো না, আর ইচ্ছাও হচ্ছে না। জন্মদিনের কিছু তো হবে না, তাও দেখা করে আসার একটা বিষয় হতো। অবশ্য লালামের জন্মদিনের কথা তার নিজের কিংবা টিয়ামেরও ইভেন খেয়াল আছে কি না কে জানে!

দিন দিন আমার এই সবকিছু থেকে ডিটাচড হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সবকিছুই কেমন জানি মনে হয়, কিছুই ভালো লাগে না। নিজের এই ডিপ্রেসড অবস্থার জন্য ছোটো-ছোটো বিষয়গুলোতেও কষ্ট পাই বেশি। আবার স্বভাবসুলভভাবে এক্সপেক্টেশনও থাকে বেশি। এটা সবসময়েই ভুলে যাই যে আমি যেভাবে একটা জিনিস নিয়ে ভাব্ববো, আমার আশেপাশের ১০টা মানুষ সেই একই বিষয় নিয়ে মোটেই আমার মতো করে ভাব্বে না। ফলে যখন ভাবনায়, চিন্তায় আর কাজে মেলে না, তখন শুধু শুধুই বেশি বেশি মন খারাপ হয়। এই মন খারাপের মাত্রা বাড়তে বাড়তে কবে জানি দেখা যাবে গভীর রাতে একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরে টরে ভূত হয়ে গেছি! …

যাই হোক, ‘আই জাস্ট ওয়ানা লিভ, হোয়েন আই অ্যাম অ্যালাইভ  … কজ ইট’স মাই লাইফ’ … সেটাই দিনশেষে দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s