দিনযাপন | ২২১২২০১৫

অনেকদিন আগে নোবেল ভাই আর সন্ধি’র সাথে কোনো একটা কথা প্রসঙ্গে ঠাট্টাচ্ছলে বলাবলি হচ্ছিলো যে যেভাবে সবকিছু খুল্লাম খুল্লা লিখতে শুরু করেছি, তাতে একসময় হয়তো মানুষ আমার নাম দেবে ‘দিনযাপন সন্ত্রাসী’ আর কি না কি লিখে ফেলি এই ভয়ে আমার সাথে চলা-ফেরা, কথা বলাই কমিয়ে দেবে,!ঐসময় দিনযাপনেও লিখেছিলাম এই বিষয়টা নিয়ে!  সেটাই দেখা যাচ্ছে সত্যিকার অর্থে ঘটছে! এখনো কেউ আমাকে ‘দিনযাপন সন্ত্রাসী’ নাম দেয় নাই, কিন্তু কি না কি লিখবো সেই কারণে অ্যাভয়েড করে চলা, কিংবা পারতপক্ষে কথাবার্তা, ইন্টারঅ্যাকশন কমিয়ে দেয়া, কিংবা ‘প্রজ্ঞা আমার নামে এইরকম লিখলো!’ টাইপ একটা ভাবনা মনের মধ্যে পুষে রাখার বিষয়গুলো ঘটছে!

স্কুলে পড়তাম যখন, তখন আমাদের কয়েকজন বন্ধু’র মধ্যে একটা অভ্যাস ছিলো – নিজের পারসোনাল ডাইরিটা আরেকজনকে পড়তে দেয়া। ধরা যাক, আমি তৃষাকে আমার ডাইরি দিলাম, ওই ডাইরিতে আমি হয়তো তৃষাদের সাথে বিভিন্ন ঘটনায় আমার আনন্দ, দুঃখ, রাগ, অভিমান এসবের কথাও লিখেছি। কিন্তু সেই অনুভূতিগুলো বা কথাগুলো হয়তো মুখে মুখে তাদেরকে কখনো বলি নাই। তখন ওই ডাইরি পরে সে সেটা জানলো। তারপর সেটার প্রেক্ষিতে সে একটা চিঠি লিখতো, সেই চিঠিতে সে আমার ডাইরি’র লেখাগুলোর প্রত্যুত্তর দিতো। আবার ওর ডাইরি আমাকে দিতো, আমি পড়তাম, তারপর একই প্রসেসে আমিও একটা চিঠি লিখে আমার কথা/উত্তর দিতাম। তারপর হয়তো রাগ-অভিমানের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া হয়ে আবার ভাব হয়ে যেতো, কিংবা তৃতীয় কারো ব্যাপারে আমরা এরকম কোনো সিদ্ধান্তে আসতাম যে ‘ওর কারণেই তো অমুক ঘটনাটা ঘটেছিলো’ , ‘ তার কারণেই তো বিষয়টা এরকম প্যাচ লেগে গেলো’ কিংবা ইত্যাদি ইত্যাদি।

নিজের ডাইরি পড়তে দেয়ার অভ্যাসটা আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবেই পছন্দের ছিলো। কারণ, যখন আমি জানতাম যে কখনো না কখনো আমি ডাইরিটা কাউকে পড়তে দেবো, তখন আমি যা-ই লিখি না কেন, তাতে নিজের প্রতি প্রচন্ডভাবে সৎ থাকার চেষ্টা করতাম। কোনোকিছু নিয়ে যদি মিথ্যা লিখি, তাহলে তো ধরা পড়ে যাবো, আর সেটা নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে যে নিজের ডাইরিতে কেন মিথ্যা লিখেছি! তারপর যখন কলেজে উঠলাম, ইউনিভার্সিটিতে উঠলাম তখন আস্তে আস্তে ডাইরি লেখার অভ্যাসটাতেই ভাটা পড়তে শুরু করলো। প্রথমত, আগের মতো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখার ধৈর্য কাজ করতো না। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে আমি আসলে নিজেই নিজের প্রতি সৎ থাকতাম না, আর সেই অসততার কথাগুলো ডাইরির পাতায় লিখে নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্বও বাড়তে দিতাম না!

কিন্তু, ভার্সিটি শেষ করে বের হয়ে যাবারও অনেকদিন পর আমি যখন একবার পুরানো ডাইরিগুলা ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছিলাম, তখন একটা জিনিস আবিষ্কার করে খুব অবাক হয়েছিলাম। সেটা হলো এমন যে, ধরা যাক, একইরকম একটা ঘটনা, কিন্তু তার পাত্র-পাত্রী আলাদা, কিন্তু ওই ঘটনার ব্যাপারে আমার চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি একইরকম! খুব লেইম কিন্তু বোঝার জন্য সহজ একটা উদাহরণ দেই। বলা যেতে পারে যে বিষয়টা এরকম যে কোনো এক বছর আমি একজন সম্পর্কে লিখলাম যে ‘ অমুককে ছাড়া আমি বাঁচবো না’, তারপর তার সাথে কয়েকদিন পর কথাবার্তাই বন্ধ হয়ে গেলো, আবার আমি বহাল তবিয়তে বেঁচেও রইলাম। তারপর, দুই বছর পর আমি আবার আরেকজন সম্পর্কে লিখলাম, ‘অমুককে ছাড়া আমি বাঁচবো না’, কিন্তু তার সাথেও ক্যাচাল হলো, আর আমিও বহাল তবিয়তে বেঁচে রইলাম। আবার, ৫ বছর পর আমি তৃতীয় আরেকজন সম্পর্কে লিখলাম, ‘অমুককে ছাড়া আমি বাঁচবো না’। তারপর … এভাবে চলতেই থাকে আর কি! কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে যে এই প্রতিটা এন্ট্রির ক্ষেত্রেই আগের এন্ট্রি সম্পর্কে যেকোনো প্রকার স্মৃতি আমার মাথা থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যায়! অমুককে ছাড়া বাঁচবো না টাইপ কথাবার্তা কিন্তু আমি কারো সম্পর্কে সত্যি সত্যি কখনো লিখি নাই।এমনি বললাম আর কি! যাই হোক, দেখা গেছে যে অনেক দিন পর পর ডাইরি লিখতে বসে এরকমভাবে কোনো একটা সিমিলার ঘটনা বারবার ঘটেছে, আর আমারও ডাইরি এন্ট্রি প্রতিবারই একইরকম হয়েছে! …

তখন থেকেই আমার মনে হয়েছে যে একেক্টা লেখার মধ্যে কানেকশন যদি বের করা যেতো, তাহলে কতো ইন্টেরেস্টিং হতো! নিজের ব্যাপারেই নিজের কতরকমের নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হতো! এখন যেটা ফেসবুকের ‘অন দিজ ডে’-তে হয়, সেরকম আর কি! …

তো, এরপর অনেক অনেক সময়, অনেক অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে যখন গতবছর সোহেলের সাথে সম্পর্কের খাতিরে বিভিন্নজাতের ঘটনা ঘটলো, তখন আমার আবার একটা নতুন রিয়েলাইজেশন হলো। সোহেলের আর আমার কি ধরণের সম্পর্ক, কি কানেকশন, কি ব্যাপার-স্যাপার সেগুলো যদি আমি নিজের মধ্যে গুটিয়ে না রেখে আশেপাশের মানুষদের সাথে শেয়ার করতাম, তাহলে হয়তো একেকটা ঘটনা আরও অন্যরকম হতো। হয়তো কোনো কোনো ঘটনা ঘটতোই না! … কিন্তু আমি সেটা করি নাই। দীর্ঘ ৯/১০টা মাস একটা মানুষের সাথে মিশেছি, থেকেছি, মিলেছি, কিন্তু তার ব্যাপারে মিনিমাম শেয়ারিং কারো সাথে করি নাই! আর সেটার সুযোগে একটার পর একটা এমন সব দেয়াল আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে সবকিছু থেকে আমি কেবল দূরেই সরে যেতে থেকেছি! সো, তখন আমার রিয়েলাইজেশনটা হয়েছে এমন যে, যদি এরকম হতো যে সেই স্কুল জীবনের মতো করে আশেপাশের মানুষগুলো আমরা একে-অন্যের মনের কথাগুলো, চিন্তাগুলো, একদম র অনুভূতিগুলো জানতে পারতাম, তাহলে কার সাথে মিশবো, কার সাথে না, কিংবা কে আসলে আমাকে কি ভাবে, সেগুলো সম্পর্কে তো ধারণা পেতাম! ‘মানুষ চেনা দায়’ বলে বলে তখন আর মাথা চাপড়াতাম না!

সবার মনের কথা জানা তো আর সম্ভব না! সবাই তো আমার মতো না যে নিজেদের মনের কথা অন্যকে জানানোর জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ডাইরি লিখতে বসবে, কিংবা পাশে বসে বলবে, ‘আমি এখন এটা ভাবছি!’ … সবার মনের কথা জানার চেয়ে নিজের মনের কথাটার ব্যাপারে সৎ থাকাটাই আমার কাছে তখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো! আজকে আমি যা ভাবছি, কালকে সেটার ওপরে অনেক অনেক ধরণের আস্তর পড়বে, আর সেই আস্তরগুলোর নিচে আমার প্রকৃত ভাবনাটা এডিট হতে থাকবে। তারপর একসময় সেটা নিয়ে যদি কথা বলার প্রসঙ্গ আসে, তখন আমি সেটাকে ঘষে-মেজে এমন একটা চেহারায় এনে বলবো যে সেই কথাটা একটা ঘটনা বিশেষের জন্য পক্ষপাতী হবে! মানে, সোজা কথায়, তখন ওই পরিস্থিতিতে, ওই মানুষদের সামনে আমি ঠিক সেই কথাটাই বলবো, যেটা বললে কোনো এক পক্ষের উপকার হবে! সেটা না করলে বিষয়টা কেম্ন হয়, সেটা দেখার প্রেষণাটা আমার খুব তীব্র!

এতরকমের চিন্তার জায়গা থেকেই ‘দিনযাপন’ লিখতে শুরু করা। নিজের প্রতি অসততার যে বিশাল দেয়াল তৈরি করেছি, সেটাকে ভাঙ্গার তীব্র প্রতিজ্ঞা নিয়ে। আমি খুব সচেতনভাবেই চেষ্টা করি একটা ঘটনা, কিংবা একজন মানুষ সম্পর্কে আমার একদম র অনুভূতিটা প্রকাশ করতে। সেটা পজিটিভই হোক, আর নেগেটিভ। ‘আর দশজন কি ভাববে?’ – এই চিন্তাটাকে একজন মানুষের জীবনের চলার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা বলে মনে হয় আমার। আরেকজন কি ভাববে, কি বলবে সেটা নিয়ে আমরা যতটা না চিন্তিত থাকি, নিজেরা অন্যের ব্যাপারে কি ভাবছি, কি বলছি সেটা নিয়ে ততটাই কম চিন্তা করি!’ আমার নিজের ব্যাপারে আমি এই প্র্যাকটিসটা ভাঙতে চেয়েছি। হয়তো অনেক বেশিই আদিম হবার চেষ্টা! কিন্তু, আদিম হয়েও যদি নিজের কাছে নিজে সৎ থাকা যায়, সেটাই আমার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ! নিজের মনের কথা খোলাখুলি বলতে আমার কখনো বাঁধে না। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে এই মনের কথা বলার বিষয়টা আর ইন্সট্যান্ট হয়ে ওঠেনা, তারপর বাটারফ্লাই ইফেক্টের মতো বাতাসের গতিপথই বদলে যায়!

আজকে সারাদিনের সব ফিরিস্তি বাদ দিয়ে ‘দিনযাপন’ নিয়েই ফিরিস্তি দিচ্ছি, কারণ এই ‘দিনযাপন’ নিয়েই আজকে অনেক অনেক কথাবার্তা হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আজকে লিখতে গেলে অনেক কিছু লিখে ফেলতে হবে। আর সেটা আমি এখন করবো না। প্রথমত, রাত এখন প্রায় পৌনে দুইটা বাজে। দ্বিতীয়ত, এখনো আমি রাতের খাবারটা পর্যন্ত খাই নাই। আর তৃতীয়ত, আমাকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে, কারণ সকালে ৭টায় বের হয়ে যাবো! অন্তত ২টা থেকে ৫টা/সাড়ে ৫টা পর্যন্ত যদি না ঘুমাই, তাহলে কালকে সারাদিনের জন্য খুব সমস্যায় পড়ে যাবো। এমনিতেই একটা শ্যুটিং-এর কাজ! তারমধ্যে আবার আমারও কিঞ্চিৎ পারফর্মেন্স আছে! সারারাত না ঘুমায় ওইখানে গিয়ে ঝিমানোর কোনো মানে হবে না

অনেকদিন আগের একটা দিনযাপনে আমি প্রসঙ্গক্রমে লিখেছিলাম যে এরকম যদি হতো যে সবাই প্রতিদিন এরকম করে দিনযাপন লেখে আর সেটা অন্য সবাই পড়ে, তাহলে মনে হয় পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গাগুলো অনেক ক্লিয়ার থাকতো! দেখা যেতো, একটা ঘটনার প্রেক্ষিতেই দশজনের দশরকম যুক্তি-তর্ক-বিশ্লেষণের দিনযাপনগুলো হাজার বছর পরের ইতিহাসবিদদের কাছে ভীষণরকমের গুরুত্বপূর্ণ নথিও হয়ে যাচ্ছে!… কিন্তু বাস্তব সেটা না! বাস্তবটা উল্টো! এখানে সবাই সবার মনের কথাগুলো মনেই রেখে দিয়ে, বাইরে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বাক্যটাই বলে! আর যারা মনের আদিম অনুভূতিটা প্রকাশের দুঃসাহস দেখায়, তারা অন্যদের দৃষ্টিতে হয় ‘পাগল’ নয়তো ‘অসুস্থ’!

যাই হোক, আর লিখতে পারছি না! … অলরেডি ঘুমে পৃথিবী অন্ধকার হতে শুরু করেছে।অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে যাই! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s