দিনযাপন | ০৪০১২০১৬

গতকালকে রাতে বাসার ফেরার পর থেকেই কেমন একটা অস্বস্তি লাগা শুরু হলো … আমাদের গলিটার মধ্যেই ৮/১০ টা কুকুর নিয়মিত ঘুরে বেড়ায়, রাত-বিরাতে ঘেউ ঘেউ করে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। গতকালকে ১২ টার পর থেকেই মনে হতে লাগলো যে তাদের সমস্বরে ঘেউ ঘেউ করাটা অন্যদিনগুলোর চাইতে আলাদা, একটু বেশিই অস্বাভাবিক রকমের। আমার কেন জানি মনে হতে লাগলো রাতে একটা কিছু ঘটবে। কিন্তু কি ঘটবে সেটার ব্যাপারে ক্লু পাচ্ছিলাম না। আবার এটাও ভাবছিলাম যে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেই যে মিরপুর এলাকায় এসে কুকুরের ডাকে অভ্যস্ত হতে হচ্ছে, যেটা সেন্ট্রাল রোডে প্রায় বলতে গেলে ছিলোই না! … পরে আবার দেখলাম যে কথাটা সুন্দর করে গুছাতে পারছি না। তাই স্ট্যাটাস আর দেয় হলো না। এদিকে মনের মধ্যে এই ভয়ও ঢুকলো যে আবার চোর-ডাকাতই আসে কি না! ল্যাপটপ চুরি হবার পর থেকে তো রাতের বেলা এখন এইটাই ভয় লাগে যে আবার না চোর আসে! প্রতিদিন ল্যাপটপ আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে তারপর ঘুমাই। কালকে এটাও ভাবলাম যে ওখানেই রাখবো না অন্য কোথাও রাখবো! দোনোমনো করে পরে ওইখানেই রাখলাম। এদিকে শুয়েছি প্রায় ২টার পরে, কিন্তু মোটেই ঘুম আসে না! বিছানায় এপাশ-অপাশ করছি তাও ঘুমের দেখা নাই! মোবাইলে ক্যান্ডি ক্রাশ ডাউনলোড করে খেলতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ খেলার পর একটা সময় তন্দ্রের মতো আসলো। চোখ লাগতে না লাগতেই প্রচণ্ড দুলুনিতে ঘুম ভেঙ্গে উঠলাম। ভূমিকম্প হচ্ছে সেটা যেন ঘুমের মধ্যেই টের পাওয়া গেলো। প্রায় লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। এদিকে মা-ও পাশের বিছানায় জেগে উঠেছে। কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছে। আমি ঘুম জড়ানো গলাতেই ‘ভূমিকম্প’ হচ্ছে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে গেছি। মা-ও উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। আব্বুও দেখি ঘুম ভেঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে এদিকে আসছে। একমাত্র অমিত তার ঘরে কাথা-মুড়ি দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে! এদিকে ভূমিকম্পের তীব্রতায় ঘরের জানালার কাচগুলো এমনভাবে নড়ছে যে মনে হচ্ছিলো ভেঙ্গেই বুঝি যাবে! আর আমি মনে মনে দ্রুত হিসাব করছি যে এখন যদি এই কাঁপাকাঁপি বন্ধ না হয়, তাহলে তো নিচে নেমে দাঁড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সাথে কি কি নেবো? কাঁধের ব্যাগটা হাতের কাছেই আছে, মোবাইলও হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, গায়ে দেবার জন্য একটা চাদর নিতে হবে। এর মধ্যেই আবার ভাবছি যে ল্যাপটপটাও কি নিয়ে নেবো নাকি! আবার মনে মনে এটাও যুক্তি খন্ডন করলাম যে ল্যাপটপের সবকিছুই তো অনলাইনে আছে। সো অবস্থা বেগতিক দেখলে ল্যাপটপ না নিলেও হবে। আবার এটাও ভাবছি যে যেই পায়জামাটা পরে ঘুমিয়েছি, সেটা এমনিতে কোমর প্রচণ্ড লুজ। খালি ঘুমের সময় আরামের জন্য পরি। এটা পরে বাইরে যাবো কিভাবে! এইটা তো দেখা যাবে খালি খুলে পড়ে যেতে চাইবে! বাথরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসার সময় পাবো? …

২০ সেকন্ডের মতো স্থায়ী ছিলো বোধহয় তীব্র কম্পন। তারপর থেমে গেলো। কিন্তু ওই ২০ সেকন্ডের মধ্যেই কতকিছু হিসাব-নিকাশ করে ফেললাম! এখন মনে মনে আফটার শক-এর জন্য অপেক্ষা। খালি মনে হচ্ছে এখনই না শুরু হয়!কম্পন থামার সাথে সাথেই আমি যা যা নিয়ে নিচে নামার সব একজায়গায় করে রাখলাম। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে পায়জামা চেঞ্জ করে ফেললাম। ভয়ের চোটে বাথরুমের দরজাও লাগাই নাই! ওই মুহুর্তেই যদি ভূমিকম্প হয়ে সব ভেঙ্গে-ভুঙ্গে পড়ে তাইলে তো বাথরুমেই আটকা পড়ে যাবো! সে তো আরেক বিপদ!

হঠাৎ করে যে এভাবে ঘুম ভাঙলো, আর তো ঘুম আসে না! এদিকে তখন অলরেডি ফজরের ওয়াক্ত। আকাশ-ও ফর্সা হয়ে যাচ্ছে। শুয়ে শুয়ে কতক্ষণ ফেসবুকে মানুষজনের ভূমিকম্প সমাচার পড়লাম। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দেখার চেষ্টা করলাম যে মাত্র হয়ে যাওয়া ভূমিকম্পের আপডেট পাওয়া যায় কি না – কোথায় এপিসেন্টার, কত মাত্রার এইসব এইসব … ইন্ডিয়ার মনিপুর –এ, ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্প … সিলেটের খুব কাছেই তো! ঢাকা থেকেও তো প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরে। খুব একটা কম না! এই টেক্টোনিক মুভমেন্ট-এর যদি ওয়েস্টওয়ার্ড আগানোর টেন্ডেন্সি থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য রিস্ক ফ্যাক্টরই বটে! গতরাতের ভূমিকম্পটা আসলেই প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার মতো ছিলো! গত বছর ২৫ এপ্রিল যে ভূমিকম্প হলো নেপালে, সেটার ঝাঁকিও যথেষ্ট কম ছিলো কালকের চেয়ে। আমিই রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছি গতকালকে।

আজকে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে ‘কিনু কাহারের থেটার’-এর শো ছিলো। আমি যাবো কি যাবো না করতে করতে শেষে আর গেলাম না। লালামের পুতুলের কাজটা শেষ করাটাই এখন জরুরি। আজকে জাহাঙ্গীরনগরের শো-তে গেলে তো সারাদিনে আর কাজ হতো না। কালকে সন্ধ্যার মধ্যে সব কাজ শেষ করতে হবে। তারপর লালাম প্যাকিং করতে শুরু করবে। আবার এর মধ্যেই গত দুই/তিন দিন যাবৎ পেট-টাও খুব আরামদায়ক অবস্থায় নাই। যাই খাচ্ছি প্রচণ্ড গ্যাস হচ্ছে, আর বাথরুমে যাচ্ছি। ফলে জাহাঙ্গীরনগরে গিয়ে বাথরুমে যেতে হলে কিভাবে কি হতো, সেই রিস্ক আর নিলাম না। এমনিতেই বাসার বাইরে বাথরুম নিয়ে আমার যথেষ্ট শুচিবায়ু আছে । তবে, আমি অবশ্য আজমাইন-কে পড়িয়ে সেখান থেকে গ্রুপের দিকে গেলাম। এমনিতেও নিউমার্কেট বা গাউসিয়ার দিকে গিয়ে তুলি কিনবো এরকম প্ল্যান ছিলো, তারওপর গতকালকে লালামের প্যাকিং-এর জন্য কার্টন বক্স কিনে সেগুলো ভুলে গ্রুপেই রেখে চলে গিয়েছিলাম! আবার বাবুল ভাই-এর কাছ থেকে একটা মাল্টি-কালার হেয়ার উইগ কিনেছিলাম। সেটার টাকা পাওনা ছিলো উনি। আজকে কিনু কাহারের শো-তে উনি যাচ্ছেন মেক-আপ এর জন্য। সো, এই উছিলায় উনার টাকাটাও দিয়ে দিতে পারলাম। পরে আমি আবার সবার সাথে বাসে করে টেকনিক্যাল পর্যন্ত গেলাম। তারপর সেখানে নেমে রাস্তা পার হয়ে রিকশা নিয়ে মিরপুর ১১ নাম্বার চলে আসলাম।

আজকে তো রাতে মনে হয় এই ভয়েই ঘুম আসবে না যে আবার না ভূমিকম্প হয় কালকের মতো! অন্তত আফটার শক তো ! ইমার্জেন্সি সবকিছু হাতের কাছে গুছিয়ে রেখে, অবস্থা বেগতিক হলে হুট করে বের হয়ে যাওয়া যায় এরকমভাবে রেডি হয়েই ঘুমাতে যেতে হবে!

আজকে আর কি লিখবো? তেমন কিছুই তো লেখার পাচ্ছি না! … আজকের মতো তাইলে দিনযাপন এখানেই শেষ …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s