দিনযাপন । ১২০১২০১৬

তিনটা দিন গ্যাপ পড়ে গেলো দিনযাপন লেখায়। সঙ্গত কারণও ছিলো। ১১ তারিখ প্রাচ্যনাট স্কুলের শো ছিলো। সেটা নিয়ে একরকম ব্যস্ততা ছিলো। ফলে রাতে বাসায় ফিরেই টায়ার্ড হয়ে ঘুমিয়ে গেছি, নয়তো অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করেছি। আর গতকালকে তো যেই অবস্থা গেছে! সোবহানবাগ থেকে শিল্পকলা অ্যাকাডেমি পর্যন্ত প্রায় পুরোটা রাস্তা হেঁটে গিয়ে তারপর আবার ননস্টপ দৌড়ানোর পর বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছু করার অবস্থা থাকে?

গতকালকে সকাল থেকেই আসলে কপালের উপর দিয়ে খারাবি-ই গেছে! সোয়া দশটার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছি, সোবহানবাগ যাবো টিউশনি-তে। সাথে অমিত। ও কাঁটাবন যাবে, গ্রুপে। ঠিক হলো যে ও কাঁটাবন-এর জন্য সিএনজি নেবে আর আমি মাঝপথে নেমে যাবো। কিসের কি! বের হয়ে দেখি দৃষ্টিসীমার মধ্যে কোনো সিএনজি নাই! এক্টা-দুইটা প্রাইভেট সিএনজি আছে, তাও আবার কাঁটাবন পর্যন্ত যাওয়ার পারমিট নাই, সর্বোচ্চ ২৭ নাম্বার পর্যন্ত যেতে পারবে। এদিকে সোবহানবাগ পর্যন্ত তারা ভাড়াই চায় ২০০-২৫০ টাকা, যেখানে মিটারে গেলে ১৫০ টাকাও ওঠেনা! রিকশা নিয়ে আগানো শুরু করলাম। সামনে গিয়ে যদি সিএনজি পাওয়া যায়! দেখা গেলো যে মিটারের সিএনজি’র কোনো অস্তিত্বই নাই চারপাশে।যা আছে সবই প্রাইভেট। শেষে ১০ নাম্বার গোল চত্বরের মাথায় এসে অমিত নেমে গিয়ে বাসে করে চলে গেলো, আর আমি সেই রিকশা নিয়েই সোবহানবাগ গেলাম।

২টার দিকে সোবহানবাগ থেকে বের হয়ে পড়লাম আরেক ক্যাচালে! আশেপাশে রাস্তা সব জ্যামে প্যাকড হয়ে আছে। হেঁটে হেঁটে কলাবাগান পর্যন্ত গিয়েও দেখি একই অবস্থা। সামনের গাড়ি প্রায় নড়ছেই না। রিকশা নেয়ার কথা চিন্তাও না করে হাঁটতে শুরু করলাম। হাতিরপুলের কাছে এসে রিকশা নিলাম, কিন্তু শাহবাগ মোড়ে এসে রিকশা ছেড়ে দিতে হলো! রাস্তা বন্ধ! রিকশা ঘুরিয়ে ইউনিভার্সিটির ভেতর দিয়ে যাওয়ার রিস্ক নিলাম না, কারণ ওইদিকে প্রচণ্ড জ্যাম থাকতে পারে। রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আবার। এমনিতেই পিরিয়ড হয়েছে বলে কোমর আর পেট ব্যথা। তার মধ্যে সকালে অতটা রাস্তা রিকশায় বসে থেকেছি, তারপর আবার অনেকটা রাস্তা হেঁটেছি। বারডেম থেকে শিল্পকলা পর্যন্ত রাস্তাটুকু মনে হচ্ছিলো যেন অনন্তকাল লেগে যাবে!খালি ভাবছিলাম যে গ্রুপের আর কেউ যদি তখন ওইদিক দিয়ে যেতো, তাহলে তো একটা সঙ্গ পাওয়া যেতো। একা একা চুপচাপ হাঁটার চেয়ে কারো সাথে বকবক করতে করতে গেলে তাও রাস্তার দূরত্বের দিকে মনোযোগ থাকে না। কি কপাল আমার! ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি যে নোবেল ভাই আর সন্ধি যাচ্ছে, তাও রিকশা করে! জান বাঁচানো ফরয – তাই কোনো সেকন্ড থট-কে অবকাশ না দিয়ে ‘ভাই আমাকে নিয়ে যান’ বলে আর্জি করে রিকশায় উঠে পড়লাম। মৎস ভবনের সামনে গিয়ে অবশ্য আবার নেমে যেতে হলো!রাস্তা বন্ধ!

শিল্পকলায় গিয়ে এরপরে বাসায় ফেরা অব্ধি আর বিশ্রাম পাই নাই। একপর্যায়ে হাত-পা কাঁপছিলো আমার। মনে হচ্ছিলো যেকোনো সময় দাঁড়ানো অবস্থা থেকেই ঠাস করে পড়ে যাবো। বাসায় ফিরেই তাই কোনোরকমে ফ্রেশ হয়ে অল্প একটু দুধ-বিস্কিট খেয়েই ঘুম!

গতকালকে প্রাচ্যনাটের স্কুল অভ্‌ অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইনের ২৯ ব্যাচের ফাইনাল প্রডাকশনের শো ছিলো – এস এম সোলায়মানের ‘ইঙ্গিত’। ডিরেকশন দিলো রুবেল ভাই। রুবেল ভাই-এর ডিরেকশন মেথড বরাবরই পছন্দ করি আমি। এই নাটক শুরু হওয়ার আগে রুবেল ভাই যখন উনার অ্যাসিসট্যান্ট খুঁজছিলেন তখন নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে বলেছিলাম আমাকে উনার সাথে কাজে রাখার জন্য। মুখে মুখে একবার ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, তাহলে নাটকটা পড়তে থাকো’ বলেছিলেন, পরে আবার বললেন ‘ আচ্ছা, পরে জানাচ্ছি’ … বুঝে নিলাম যে আমাকে দিয়ে উনার কাজ হবে না, তাই এটা নিয়ে আর কথাও বাড়ালাম না … পরে রফিক ভাই আর প্রদ্যুৎ দা অ্যাসিস্ট করলো উনাকে। প্রাচ্যনাট স্কুলে আমি ১৫ ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলাম। সেবারের ফাইনাল প্রডাকশন ছিলো সৈয়দ ওয়ালীঊল্লাহ’র ‘লালসালু’। সেই নাটকের ডিরেকশনও রুবেল ভাই দিয়েছিলেন।কয়েকদিন আগে পুরানো একটা ডাইরিতে ওই সময়কার কিছু এন্ট্রি পড়ছিলাম … ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি হয়েছিলো আমাদের শো-টা। কি যে এক মার্কামারা ব্যাচ ছিলো ওই ১৫ ব্যাচ! চুরি, এর সাথে ওর ক্যাচাল, হাবিজাবি একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকলো। আবারো বলি, কি কপাল আমার! প্রাচ্যনাটের লাল দাগ মারা ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলাম!ওই ১৫ ব্যাচের যাবতীয় কাহিনি নিয়েই একটা বিশাল দিনযাপন লিখে ফেলা যাবে!আমার নিজের কথাই যদি বলি! স্কুলিং শুরু হতে না হতেই ঘটনাচক্রে অনিমেষ আইচ-এর ‘মানুষ বদল’ নাটকে শিক্ষানবিশ সহকারী হিসেবে কাজে ডাক পড়লো। এক-দেড় মাস ওখানেই ব্যস্ত থাকলাম! তারপর আবার মাঝখানে স্বপ্নের বাবা’র অসুস্থতা, মৃত্যু এসবের কারণে ইরেগুলার থাকলাম ক্লাসে, আরেকবার দুই/চার মাসের বেতন বাকি পড়েছে বলে ফাঁপর দিতে গিয়ে একজন কো-অর্ডিনেটর আজাইরা কথা শোনালো, জিদের চোটে ‘আর যাবোই না’ বলে ঠিক করে আবার এক মাস ক্লাসে গেলাম না! একেবারে শেষের দেড় মাস যখন ফাইনাল প্রডাকশনের কাজ শুরু হলো তখন আবার ‘আপনার লাস্ট চান্স’ টাইপের একটা ফোন আসলো, তখন কি মনে করে গেলাম আর তারপর ফাইনাল প্রডাকশন পর্যন্ত পুরোটা সময়ই থাকলাম। সব মিলিয়ে মনে হয় ৬ মাসের মধ্যে ২ মাসও ক্লাস করি নাই! মজা হলো সার্টিফিকেট পেয়ে। আমি ধরে রেখেছিলাম যে নামকাওয়াস্তে একটা ‘সি’ গ্রেড পাবো, কারণ ক্লাস অ্যাটেন্ডেন্স নাই, কোনো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেই নাই, কোনো গ্রুপ ওয়ার্কে ছিলাম না। কাজের ইনভল্ভমেন্ট বলতে কেবল পথনাটক আর ফাইনাল প্রডাকশন! সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে দেখি ‘বি’ গ্রেড পেয়েছি! খুব কনফিডেন্স-এর সাথেই ধরে নিলাম যে এইটা আসলে ভুল হয়েছে! ভুল করে ‘বি’ লিখে ফেলেছে! পরে জানা গেলো যে সবাই ৬ মাস ক্লাস করে, অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে, পরীক্ষা দিয়ে যা পেয়েছে, আমি নাকি এক ফাইনাল পরীক্ষাতেই তার চাইতে বেশি নাম্বার পেয়েছি! অথচ ওই পরীক্ষাটাও আমি নিতান্তই হেলা-ফেলা করেই দিয়েছি! পড়ালেখা তো অবশ্যই না! যা লিখেছি নিজের আইডিয়া থেকেই লিখেছি! সে যাই হোক! এইরকম করে ১৫ ব্যাচের কাহিনি যদি লিখতে শুরু করি, তাহলে সবাইকে নিয়েই বিশাল বিশাল গল্প লিখে ফেলা যাবে!

যাই হোক, স্মৃতি রোমন্থন বাদ দিয়ে আবার বর্তমানে ফিরে আসি। আজকে সারাদিনের ঘটনাবহুলতা তেমন কিছু নাই। সকালে আজমাইন-কে পড়াতে গেছি, সেখান থেকে দুপুরে লালামের বাসায় এসেছি, সন্ধ্যায় আবার সেখান থেকে গ্রুপে গেছি! গ্রুপে আজকে গোছগাছ হয়েছে সবকিছু। সেট-এর জিনিসপত্র, রিহার্সাল রুম এইসব … গোছানোর প্রক্রিয়াটা অবশ্য এরকম হয় যে অগোছালো স্তুপগুলাকে একটু ঠেলে-ঠুলে এদিক-সেদিক করে একটা ভদ্রস্থ স্তুপের চেহারা দিয়ে রাখা! কিন্তু প্রপার গোছানো বলতে যা হওয়া উচিৎ তা হয় না। প্রতিটা নাটকের সব সেট/টুকিটাকি কস্টিউম আর প্রপস যদি এমনভাবে রাখা যায় যে একটা নাটকের সেট বের করতে হলে সবকিছু নাড়া দেয়া লাগে না, তাহলে সেটাকে গোছানো বলা যেতো। কিন্তু সেই ইনিশিয়েটিভটা কখনো নেয়া হয় না। চাইলেই একটু টাকা খরচ করে আলাদা পার্টিশন কিংবা শেলফ বানিয়ে নেয়া যায়, যেখানে সবকিছু আলাদা আলাদা করে গুছিয়ে রাখা সম্ভব! আমি যেহেতু কস্টিউম নিয়ে কিছু কাজ-টাজ করি, তাই আমার কস্টিউমের কথাই যদি বলি! গ্রুপে এমন অনেক কস্টিউম আছে, যেগুলো একটা আলাদা আলমারি করলেই একটু সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা যায় এবং মাঝে মাঝেই ইভেন্ট হলে বা স্কুলের শো-এর জন্য প্রয়োজন হলে সেই কস্টিউমটা ব্যবহার করা যায়। একটা ট্রাঙ্ক ভর্তি বিভিন্নরকমের কস্টিউম বছরের পর বছর পরে থাকে, অথচ দরকারের সময় ওইগুলার কথা কেউ মনেও করে না, কিংবা অনেকে জানেই না! এর চাইতে খুব সহজেই কিন্তু একটা আলমারি বানিয়ে সেখানে সব কস্টিউম আর টুকটাক প্রপস গুছিয়ে রেখে সেটাকে প্রয়োজনে তালা দিয়ে রাখা যায়! মাঝে মাঝে মনে হয় নিজেই ২/৩ হাজার টাকা খরচ করে একটা আরএফএল-এর প্লাস্টিকের আলমারি কিনে গ্রুপে নিয়ে যাই আর কস্টিউমগুলো গুছিয়ে দেই!

সে যাক গে! এসব কথা এখন বাদ দেই। আপাতত আর কিছু লেখার পাচ্ছি না। আজকের মতো দিনযাপন এখানেই শেষ করি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s