দিনযাপন । ১৪০১২০১৬

গতকালকে রাতে প্রমারা বাসায় এসেছে। আব্বু খুলনা গেছে পেনশনের কাজে। বাসা তো এমনিতেই খালি থাকে, অমিতও নিতান্তই ইচ্ছা না হলে আসে না। আমার আর মা’র একা একা থাকতে ভয়ই লাগে। এত বড় বাসা, কে কোনদিকে পাহারা দেবো? এমনিতেই তো মনে হয় যে বাসায় আরও মানুষজন থাকলে ভালো হত! গতকালকে লালাম আর প্রমা এসে থাকাতে বাসার খালি খালি ভাবটা আর থাকলো না। রাতে বাসায় ফিরে প্রমা’র সাথে দুষ্টামি-ফাজলামি করতে করতেই অনেকটা সময় পার হয়ে গেলো। ল্যাপটপ নিয়ে বসে আর দিনযাপন লিখতে ইচ্ছা করলো না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম।

কালকে এমনিতে একটু ক্লান্তও ছিলাম। দুপুরে ভায়োলিন ক্লাস ছিলো। অনেকদিন পর ভায়োলিন ক্লাসে যাওয়া হলো। তবে কালকে ভায়োলিন ক্লাসে আমি অনেক পজিটিভ রেসপন্স পেয়েছি,কারণ কালকে প্রথমবারের মতো আমি বো আপ-ডাউন এর ইন্সট্রাকশন দেখে দেখে বাজিয়েছি।বেশির ভাগ সময় দেখা যায় যে আমি টিউনটার দিকেই এত মনোযোগ দেই যে বোয়িং-এর প্যাটার্ন এর দিকে খেয়ালই রাখি না। কালকে স্যারের সামনে বাজানোর সময় কি জানি কি মনে হলো, খুব মনোযোগ দিলাম বোয়িং-এর ওপর! দেখি যে স্যারও মহাখুশি!

ভায়োলিন ক্লাসে অনেকদিন পর যাওয়ার সুবাদে ভায়োলিন বাজানোটাও অনেকদিন পরেই হয়েছে। সে কারণেই কি না জানি না, খুব মাথা ধরে গিয়েছিলো। মিউজিক স্কুল থেকে আবার শিল্পকলায় গেলাম। নর্দার্ন থিয়েটারের নাটক ‘জু স্টোরি’র শো। সজীব-এর ডিরেকশন দেয়া। এর আগেই মাস দু-এক আগে বুয়েটে এটার শো হয়েছিলো। তখন দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বোকার মতো সেদিন ক্যামেরা নিয়ে যাইনি! গতকালকের শো-তে সেকারণে ছবি তুলতেই গেলাম। আর শো হোক বা না হোক, ছবি তো অন্তত তোলা থাকুক। পরে আরও শো হলে তো কাজে লাগবেই। শিল্পকলায় নাটক শেষ হবার পর আবার গ্রুপে গেলাম। গতকালকে থেকে গ্রুপে ‘খোয়াবনামা’র কাজ শুরু হয়েছে। এতদিন তো এমনিতেই দৃশ্য ধরে ধরে স্ক্রিপ্ট রিডিং হচ্ছিলো, কালকে থেকে কিছুটা স্ক্রিপ্ট এনালাইসিস শুরু হয়েছে। ইমন ভাই নিজেও স্ক্রিপ্ট রিডিং-এর সেশনে থাকছেন। খোয়াবনামা’র নির্দেশকের সহকারী হিসেবে এখনো পর্যন্ত যেহেতু আছি, দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই গেলাম। এমনিতে একবার ভাবছিলাম যে শিল্পকলা থেকেই বাসার দিকে রওয়ানা দিয়ে দেই, যেহেতু প্রমারা বাসায় এসেছে। পরে ভাবলাম যে রাস্তার কি অবস্থা হয়, কতক্ষণে পৌঁছাই, তার চেয়ে গ্রুপে গিয়ে একটু দেরি করেই বের হই!

যাই হোক, বাসায় ফিরে ক্লান্তির কারণেও কালকে আসলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছিলো …

আজকে পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসব ছিলো। যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু আজকে সার্বিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আর কারো সাথে যোগাযোগ করলাম না বা ওইদিকে যাওয়ার প্ল্যানও করলাম না। দেখা গেলো যে আমি যদি সাকরাইনে যাই, তাহলে তো ফিরতে ফিরতে সেই রাত ৯টা-১০টাই বাজবে। এদিকে আজকে মা’র কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে। তারমানে আমিও যদি সকাল সকাল বের হয়ে যাই, তাহলে লালাম আর প্রমা সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় একা একা থাকবে। আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে সারাদিন একা একাই থাকবে, এইটা কেমন দেখায়? সেকারণে আমি বাসায় থাকারই সিদ্ধান্ত নিলাম। সকালে কেবল বের হয়ে টিউশনি-তে গেলাম, আবার আড়াইটার দিকে বাসায় চলেও আসলাম। প্রমা তো আর রোজ রোজ বাসায় বেড়াতে আসবে না! সাকরাইনে তো যাওয়াই যায় প্রতিবছর।

তবে, এবার সাকরাইনে যাবো কি যাবো না সেটা নিয়ে আমার আরেকটা দ্বন্দ্বের জায়গা ছিলো। এবার দেখলাম সাকরাইনের ইভেন্টে ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। ঠিক যে কারণে হোলি উৎসবে গেলে এখন খালি ফটোগ্রাফার ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না, সাকরাইন উৎসবও তাহলে সেদিকেই টার্ন নিচ্ছে! কি যে বিরক্তিকর লাগে আমার কাছে এইগুলা! একটা উৎসবের নিজস্বতা বলে কিছুই থাকে না এখন। মনে হয় যেন ছবি তোলার জন্যই এখন এইসব উৎসব হচ্ছে! দশরকমের ফটোগ্রুপের একশ’ রকমের ফটোগ্রাফার গিয়ে হাজির হয়, আর ফেসবুক জুড়ে একই জায়গার একই ফ্রেমের হাজার হাজার ছবি ভর্তি হয়ে থাকে। আমি নিজে যেমন আজকে সাকরাইনে গেলে ক্যামেরা নিয়ে যেতাম না, একদম হাত-পা ছেড়ে ঘুরতেই যেতাম।

সাকরাইনের কথা বলতে বলতে গতবছরের কথা মনে পড়ে গেলো। গতবছর সাকরাইনে যাওয়ার অনেক ইচ্ছা ছিলো আমার। সবার সাথে আগে থেকেই প্ল্যানও ছিলো যাবো। আলামিন ভাইয়ের বাসায় তো ওপেন দাওয়াতই থাকে আমাদের। এর আগের বছর গিয়ে এত মজা পেয়েছিলাম আতশবাজি দেখে যে গতবছরও আতশবাজি দেখার জন্যই যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। আবার একই দিনে ফরহাদ ভাইয়ের গায়ে হলুদ। বেশ আয়োজনের গায়ে হলুদ। আমরা মেয়েরা যারা যাবো, তারা শাড়িও নিলাম। শাড়ির সাথে ব্লাউজ বানিয়ে রেডিও ছিলাম যে ১৪ তারিখ সারাদিন সাকরাইন উৎসবে কাটিয়ে তারপর দলবেঁধে আমরা সবাই ফরহাদ ভাইয়ের হলুদের প্রোগ্রামে যাবো। কিন্তু এমনই কপাল আমার! ওই সময় টানা ব্লিডিং বন্ধ হবার জন্য একটা ওষুধের কোর্স শেষ হয়েছিলো, আর ওই ওষুধের কোর্স শেষ হবার পর পর নাকি দুই-এক দিন একটু হেভি ব্লিডিং হয়। ৯/১০ তারিখের দিকে বোধহয় ওষুধের কোর্স শেষ হয়েছিলো। কপালের ফের আমার এমনই হলো যে ১৩ তারিখ রাত থেকে শুরু হলো হেভি ব্লিডিং। ব্লিডিং মানে এমন ব্লিডিং যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্যাড চেঞ্জ করতে হয়। সাকরাইনে যাওয়ার প্ল্যান তো তখনই বাদ! ফরহাদ ভাইয়ের প্রোগ্রামেও কীভাবে যাবো, কি করবো ভাবছি! প্রোগ্রাম সেই উত্তরায়। বাসা থেকে রওনা দিলেও তো এক ঘণ্টার বেশি লাগবে উত্তরা পৌঁছাতে। ততক্ষণে প্যাড চেঞ্জ করতে না পারলে কি কেলেংকারি হয়! এর মধ্যে ফরহাদ ভাইয়ের হলুদে নাচ করার জন্য গ্রুপের বেশ কয়েকজন স্নাতা আপুর বাসায় গিয়ে সকাল থেকে নাচ তুলছিলো। ভাষা প্রায় জোর করেই আমাকেও নিয়ে গেলো বাসা থেকে!তখন আসলে কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। যেতেও তো ইচ্ছা করছিলো ফরহাদ ভাইয়ের হলুদে। তাই ভাষার সাথে স্নাতা আপুর বাসা পর্যন্ত গেলাম। সারাদিনে কি অবস্থা হয় দেখা যাক – এরকম একটা চিন্তা। বারবার ভাবছিলাম কিভাবে না যাওয়ার একটা ছুতা বের করা যায়!টিউমার-এর কথাও তখন পর্যন্ত খুব বেশি মানুষকে বলি নাই, কারণ যে-ই শুনতো সে-ই জানতে চাইতো কিভাবে টিউমারের কথা জানলাম। তখন ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কিছু বানিয়ে বলতে হতো! আসল কথা তো আর বলতে পারতাম না! ফলে, এত প্ল্যান প্রোগ্রাম করে শেষে না গেলে বিষয়টা নিয়ে কি কথা হয় না হয় চিন্তা করে খুব অস্বস্তিতে ছিলাম। মাঝখানে আবার বসুন্ধরা সিটি গেলাম, সোহেলেরই কি কাজ ছিলো। ওর বোনের ফোন নষ্ট হয়ে গেছে না কি যেন, ওইটা দেখানোর জন্য স্যামসাং-এর সার্ভিস সেন্টারে যাবে। ওর সাথে দেখা করার ছুতায় আমি পালিয়ে যাবার একটা সুযোগ পেলাম। বসুন্ধরা সিটি থেকেই বাসায় ফিরে গিয়েছিলাম। কলি আপু তখন আমার টিউমারের কথা জানতো, ফলে তাকে একটা বিশাল মেসেজ পাঠিয়ে জানিয়েছিলাম যে হঠাৎ করে ব্লিডিং হচ্ছে, শরীর খারাপ লাগছে তাই যাবো না, বাসায় চলে যাচ্ছি, সবাইকে যেন বুঝায় বলে বা ম্যানেজ করে। …

ফরহাদ ভাই হয়তো আমার ওপর একটু রাগই হয়েছিলেন, কিংবা বিরক্ত হয়েছিলেন।শাড়ি নিলাম উনার কাছ থেকে, অথচ গেলাম না! ওইদিন আমারও খুব মন খারাপ হয়েছিলো। সবকিছু নিয়েই মন খারাপ হয়েছিলো। খুব মন খারাপ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম – “New episode of the continuous drama called ‘Life’ : missing all the long-awaited fun times for an unexpected occurrence right before…”। ওই সময়টাই খুব অসহ্যরকমের যাচ্ছিলো। জীবনের নতুন করে তৈরি হওয়া বাস্তবতাগুলো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না, মানিয়ে নিতে তো না-ই!

সোহেলের প্রসঙ্গ আসলোই যখন, তখন গতবছরের এই দিনের একটা ডাইরি এন্ট্রির একটু অংশ লিখেই দেই! গতবছর আমি সোহেলের উদ্দেশ্যে একটা ডাইরি লিখতে শুরু করেছিলাম। চিন্তাটা ছিলো এরকম যে ওকে আমি যেই কথাগুলো বলতে পারি না, সেগুলো ডাইরিতে লেখা। ওর সাথে আমার তখন কথা হওয়া মানেই ঝগড়া, আর দেখা হলেও সেটা কিছুক্ষণের জন্য … ফলে ওর সাথে মনের আসল কথাগুলো বলাই হতো না!

যাই হোক, ডাইরি এণ্ট্রির ছাড়া ছাড়া অংশগুলো আগে লিখি …

“ … তো আবারো সেই বসুন্ধরা সিটিতেই তোমার কাজের ছুতাতেই দেখা … এ বছর তোমার সাথে কি আমার বাজারে বাজারেই দেখা হবে কি না বুঝতে পারছি না!

যাই হোক, তবু আজকের সময়টার জন্য ধন্যবাদ … ব্লিডিং-এর বিপর্যস্ততায় আজকে আমার সাকরাইন যাওয়া হয় নাই, ফরহাদ ভাইয়ের হলুদেও যাওয়া হয় নাই। আমার সেজন্য কি প্রচণ্ড মন খারাপ তোমাকে বোঝাতে পারবো না। হলুদের জন্য শাড়ি পর্যন্ত নিলাম, ব্লাউজ বানালাম, অথচ! … যেটা নিয়েই অনেক উচ্চাশা থাকে, সেটাই হয় না!

… তবে আজকের সেরা জোকসটা কি ছিলো জানো? তুমি বললা, ‘ কখনো তো তোমার কাছ থেকে খাই না, আজকে তোমাকে একটু ছিল দেই!’ … আমার তখন হা হা করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করছিলো! বিশ্বাস করো, আমার মুড ভালো থাকলে হয়তো তা-ই করতাম। সবসময় তো তোমার খাওয়ার বিলটা আমিই দেই! … সত্যি! তোমার মতো করে যদি সবকিছু ভুলে থাকার ভান করতে পারতাম!… ”

যারা নিয়মিত দিনযাপন পড়ে, কিংবা সোহেলের কাহিনিগুলো জানে, তারা হয়তো ডাইরি এন্ট্রিটা বেশ ভালোই রিলেট করতে পারবে!

ওহ! প্রসঙ্গত এখানে লিখে রাখি, আমার জন্মদিনে একদম শেষ প্রহরে মুগ্ধ আমাকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে উইশ করেছে। আমি এই বিষয়ে কোনো জাজমেন্টাল এনালাইসিস করতে চাই না। হতে পারে এতকিছুর পরেও ও আমাকে এখনো বন্ধু ভাবে, আবার এটাও হতে পারে যে এতকিছুর পরে নিজেকে বন্ধু হিসেবে প্রমাণ করার জন্য দায়িত্ব পালন করেছে। আবার এগুলার কোনোটাই না-ও হতে পারে। ২০১৬ সালে আমি যতটা পারি একটা নন-জাজমেন্টাল বছর পার করতে চাই। সেকারণেই ওকেও রিপ্লাই-এ ‘ক্যামনে পারো?’ টাইপ উত্তর লিখতে গিয়েও লিখি নাই। ইন ফ্যাক্ট কোনো উত্তরই দেই নাই। কথার পিঠে কথা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছাই নাই আমার। তারপর দেখা যাবে যে কিছু একটা নিয়ে এমন মেজাজ খারাপ হইলো যে সামনে কয়েকদিন পরেই যখন ওর বিয়ের ডেটলাইনগুলো আসবে, তখন কথায় কথায় বিভিন্নরকমের গুমর ফাঁস করে দিয়েছি! কি দরকার!

যাই হোক, আজকে আর লিখবো না। ঘুমাতে যাই। কালকে অনেক কাজ। উদ্দেশ্যমূলক একটা দিন পার করার ইচ্ছা আছে। কি উদ্দেশ্য, এখনই বলবো না। কালকে যদি সেভাবে কাজটা হয়, তাহলে দিনযাপনে অবশ্যই সেটা লিখবো।

আজকের মতো এখানেই শেষ …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s