দিনযাপন । ১৭০১২০১৬

নাহ! এইটা দেখা যাচ্ছে একটা রুটিনে পরিণত হচ্ছে যে একদিন দিনযাপন লিখবো, তারপর আবার দুইদিন লিখবো না … তারপর আবার একদিন লিখবো! … গত দুইদিনের মধ্যে যেমন গত পরশুদিন রাতে রাশার বিয়েতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে আর লিখতে বসতে ইচ্ছা হলো না।গতকালকে রবার্ট অ্যাডামস-এর বইটা নিয়ে বসলাম, আর তাতে এতই মশগুল হয়ে গেলাম যে দিনযাপন লিখতে আর বসা হলো না।

যাই হোক, আজকে তো বসলাম। গত দুইদিনের ফিরিস্তি একবারেই দিয়ে দেবো!

পরশুদিনের গল্প দিয়েই শুরু করি, নাকি? এর আগেরদিন দিনযাপন শেষ করেছিলাম উদ্দেশ্যমূলক দিন কাটাবো এই কথা বলে। তো, পরশুদিন আদতেই উদ্দেশ্যমূলক দিন হিসেবে সফল একটা দিন গেলো। সেটা কেমন?

উদ্দেশ্যটা কি ছিলো সেটার কথাই আগে বলি। ওইদিন প্রাচ্যনাটের অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইন স্কুলের ৩০ তম ব্যাচের উদ্বোধনী ক্লাস ছিলো। গেস্ট হিসেবে ছিলেন চিত্রা সুলতানা। তো, চিত্রা সুলতানা তো সম্পর্কে আমার ফুপি হন। আব্বুর চাচাতো বোন। কিন্তু এমনিতেই তাদের সাথে আমাদের খুব নিয়মিত যোগাযোগ নেই। সামহাও এই সামাজিক যোগাযোগ -এর অনুশীলন থেকে আমাদের অনেকটাই দূরে থাকা হয়। আমার কেবল এইটুকু মনে আছে যে ছোটোবেলায় একবার তরঙ্গ ললিতকলা অ্যাকাডেমি-তে গিয়েছিলাম তখন চিত্রা সুলতানার সাথে দেখা হয়েছিলো। আর সেই অনেক বছর আগে যখন উনাদের ছোটোভাই শওকত আলী ইমন এর সাথে বিজরী বরকতুল্লাহ’র বিয়ে হয়েছিলো, তখন আবিদা সুলতানা আমাদের বাসায় এসে সেই বিয়ের দাওয়াত দিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো অনেক ছোটো ছিলাম, ক্লাস টু কি থ্রি-তে পড়ি মনে হয়! সেই সময় আমার খুব মজা লেগেছিলো বিষয়টা যে আবিদা সুলতানা কত জনপ্রিয় একজন গায়িকা, নিয়মিত উনাকে টেলিভিশনে দেখি, আর উনি আমাদের বাসায় এসেছেন উনার ভাইয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে! আবার টেলিভিশন খুললেই তো বিজরী’র নাটক দেখা যায়! কত বড় বড় শিল্পীরা আমাদের আত্মীয় এইটা ভেবেই তখন খুব আপ্লুত ছিলাম। চিত্রা সুলতানার মেয়ের একটা গানের ক্যাসেট ছিলো আমাদের বাসায়। ‘নাতি-খাতি বেলা গেলো’ ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো’ টাইপের গান ছিলো সেখানে। প্রায় প্রায়ই গানগুলো শোনা হতো। তো, যাই হোক, মাঝখানে তো আমাদের দীর্ঘ একটা সময় আত্মীয়-স্বজনদের কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ ছিলো না। ফলে উনাদের মতো একটু দূরের আত্মীয়রা তো আরো অনেকই দূরে পড়ে গেছেন। তো, ওইদিন চিত্রা সুলতানা আসবেন শুনে আমার একটা ইচ্ছা জাগলো যে আমি উনার কাছে গিয়ে নিজের বাপ-দাদা’র পরিচয় দিয়ে উনার সাথে কথা বলবো। আর যাই হোক, অন্তত চিনতে তো পারবেন যে আমি কার মেয়ে বা কার নাতনি!তো, সেই উদ্দেশ্য আমার সফল হলো। স্কুলের প্রোগ্রাম শেষে উনি যখন একটু ফ্রি হয়ে বসেছেন, তখন বেশ অস্বস্তি নিয়েই উনার সামনে গিয়ে বললাম যে ‘ আপনাকে আসলে কিভাবে আমার পরিচয়টা দেবো জানি না। আমার দাদু আপনার চাচা হন। উনার নাম আবদার রশীদ …’ উনি খুব বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তার মানে … তুমি কার মেয়ে?’ বললাম, ‘ আমার আব্বু হচ্ছেন কাঁকন …’ … এরপর উনি বেশ আপ্লুত হয়েই আমার সাথে কথা বললেন। ‘আল্লাহ ! দ্যাখো অবস্থা!’ ‘ কেমন আছে সবাই?” ‘ তুমি প্রাচ্যনাটে আছো? কতদিন?’ ইত্যাদি ইত্যাদি … সামনে পাভেল ভাই বসা, উনাকে দাদুর অনুবাদ সম্পর্কে অনেক প্রশংসাসূচক কথা বললেন। আবদার রশীদ পাভেল ভাইয়ের কাছেও পরিচিত নাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাভেল ভাই পরে উলটা আমাকেই ফাঁপরে ফেলে দিলেন এই জিজ্ঞেস করে যে, ‘ তোমার দাদা আবদার রশীদ এইটা তুমি এতদিন বলো নাই কেন?’ কি অস্বস্তি যে লাগছিলো। তবে, এই অস্বস্তিবোধটা ভালো লাগা মাখানো অস্বস্তিবোধ! আমি তো একসময় ভাবতাম দাদুকে কেউ চিনেই না! কিন্তু পরে দেখেছি যে যারা দাদুর লেখার সাথে পরিচিত তারা খুব ভালোভাবেই দাদুকে রেকোগনাইজ করে। তখন নিজের কাছেই ভালো লাগে!

তবে, এই যে আমি আবদার রশীদের নাতনি, এইটা নিয়ে মজা হয়েছিলো প্রাচ্যনাটে ঢোকার পরপরই। আমাদের পরের ব্যাচটাতেই, মানে ১৬ ব্যাচে নাটক ঠিক হলো ‘ইনহেরিট দ্য উইন্ড’; রবার্ট ই লি আর জেরোম লরেন্স-এর লেখা, আর আবদার রশীদের অনুবাদ। তো তখন তো আমি মাত্রই গ্রুপে ঢুকেছি, আর গ্রুপে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখি দাদুর অনুবাদের নাটক নিয়েই কাজ হচ্ছে! সেটার ডিরেকশনে আবার ছিলো জার্নাল ভাই। তো কথায় কথায় আমি একদিন বলে ফেললাম যে ‘এই আবদার রশীদ তো আমার দাদা!’ … তখন সবাই বেশ অবাক, ‘ আরে, তাই নাকি?’ ‘ জোশ তো’ এই টাইপের অবস্থা। মুহুর্তেই আমার প্রতি সবার ইম্প্রেশন চেঞ্জ হয়ে গেলো। আমার বেশ ‘ফিলিং স্পেশাল’ টাইপ অবস্থা! পুরাই সিনেমাটিক!

আরেকবার আরো মজা হয়েছিলো … অনিককে একবার কি কারণে ফোন করেছি … তো, ফোন করেই জিজ্ঞেস করলাম কি করছিলো … বললো ওর খুব প্রিয় একজন ছড়াকারের লেখা পড়ছিলো … স্বভাবতই জানতে চাইলাম যে কে … বলে ‘ আবদার রশীদ’! …। এইটা কোনো কথা? এত কাকতালীয়ও হয় নাকি ঘটনা? আমি খুব মজা পেয়ে হাসতে হাসতে বললাম, জানো, এই আবদার রশীদ কে হয়? আমার দাদা! আর অনিক তখন আরো বেশি টাশকি মেরে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়লো! ও-ও নিশ্চয়ই ভাবছিলো, এত কাকতালীয়ও হয় নাকি ঘটনা?

যাই হোক, চিত্রা সুলতানার কাছে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়ার যে উদ্দেশ্য ছিলো সেটা সফল হলো।

দিনের দ্বিতীয় অংশে গিয়েছিলাম রাশার বিয়েতে। রাশা হচ্ছে কামতা-বৌ-এর বোন রুশমা আন্টির মেয়ে। কামতার যখন বিয়ে হয়, সেসময় মনে হয় রাশার মাত্র জন্ম, নাকি এক বা দুই বছর এইরকম হবে … সেই রাশা’র বিয়েও হয়ে গেলো! তো, অনেকদিন যাবৎ-ই এইসব ফ্যামিলি দাওয়াত আমি অ্যাভয়েড করে চলেছি। কিন্তু ২০১৬ সালে ‘সোশ্যাল’ হবো বলে ঠিক করেছি, তাই এইসব দাওয়াত, গ্যাদারিং এইগুলাতে বেশ আগ্রহের সাথেই অ্যাটেন্ড করছি। তো, রাশা’র বিয়েতে গেলাম টিয়াম, খালু, প্রমা আর আমি। আব্বু ওইদিনই খুলনা থেকে ফিরছিলো বলে মা আর যায় নাই। রাশা’র বিয়েতে গিয়ে আরেক মজা! গিয়ে দেখি ভিডিওগ্রাফি’র কাজে ওইখানে আছে ইমতিয়াজ ভাই। উনি তো পাঠশালায় ভাস্করদের ব্যাচমেট ছিলেন, তাই একসময় আড্ডাবাজিও হয়েছে প্রচুর। আর ফটোগ্রাফার যিনি ছিলেন, ইকবাল ভাই, উনিও দেখা গেলো আমাকে চেনেন। উনি মিডিয়াকম-এ সাইমন ভাইয়ের কলিগ ছিলেন, সেই সূত্রেই বোধহয় আমার নাম-টাম শুনেছেন। এরপরে আড়েক মজা! তবে, এই মজাটা যে হবে, সেটা আমি আগেই জানতাম, ওইদিন খালি সম্পর্কের সুতা কোথায় বাঁধা সেটা শিওর হলাম। সেটা হলো যে, আমার সানিডেল-এর কলিগ সায়রা আপা আর তার মেয়ে আমিরা একদিন দেখি ইন্সটাগ্রামে পোস্ট দিয়েছে যে রাশা আপুর হলুদে যাচ্ছে দুইজন সাজগোজ করে। তখনই আমিরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কিভাবে চেনে রাশাকে। বলেছিলো কাজিন। তো, ধরেই নিলাম যে বিয়েতে গেলে দেখা তো হবেই, তখনি বোঝা যাবে কোন দিক দিয়ে কি সম্পর্ক। তো, দেখা গেলো যে সায়রা আপা হচ্ছে কামতা-বৌ এর মামাতো বোন! কি অদ্ভুত! দুনিয়া এতই গোল হয় নাকি? বলা নাই, কওয়া নাই, এভাবে সায়রা আপা কলিগ থেকে দুর-সম্পর্কের আত্মীয় হয়ে গেলো!

এই ধরণের হুট-হাট যোগাযোগের ঘটনাগুলো আমাকে বেশ বিনোদন দেয়। মনে হয় যে এইধরণের অভিজ্ঞতাগুলো হয় বলেও আসলে বেঁচে থাকাটা সময়ে সময়ে খুব চমকপ্রদ হয়ে ওঠে!

গতকালকে সেই অনুপাতে একদমই নিরামিষ দিন গেছে। আজকেও তাই। গতকালকে সকাল থেকে বাসাতেই ছিলাম, দুপুরে বের হয়ে টিয়ামের বাসায় গেছি, সেখান থেকে টিউশনি-তে। টিয়ামও একটা কাজে ধানমন্ডি যাবে, তাই টিয়ামের সাথে একসাথে বের হওয়া। সন্ধ্যায় গ্রুপে গিয়ে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির রিহার্সালে বসে টুটুলকে সব কিউগুলা বুঝায় দিলাম। ভিডিও’র কিউ আসলে আলাদা কিছু নাই। মিউজিক থেকেও একই সময়ে কিউ আছে। ফলে, ওর আসলে নতুন করে খুব বেশি কিছু বুঝতে হয় নাই। ইন ফ্যাক্ট, ভিডিও’র সাথে যেই সাউন্ডট্র্যাকগুলো বসার কথা, সেগুলো সামহাও জার্নাল ভাই আর বসাতে পারে নাই। ফলে, সেই যে প্রথম দিকে ব্যাক আপ দেয়ার জন্য মিউজিক প্যানেল থেকে সাউন্ডট্র্যাকগুলো বাজতো, এখনো তাই চলছে। তাতে করে মিউজিক আর ভিডিও প্যানেলকে সবসময়ই পরস্পরের প্রতি ইন্টারডিপেন্ডেন্ট হয়ে থাকতে হয়। তাতে করে উভয় প্যানেলেরই প্যানা বাড়ে। আজকে পাভেল ভাইয়ের সাথে এটা নিয়ে কথা বলে একরকম ক্লিয়ার হয়ে নিয়েছি যে ১৯ তারিখের শো-টা কোনোরকমে যাক, তারপর ভিডিও’র সাউন্ডট্র্যাকগুলো ভিডিও-তেই বসিয়ে নেবো, আর পুরোটা ভিডিও আরো সহজভাবে অপারেট করার মেকানিজমও বের করবো। আমি হয়তো জার্নাল ভাইয়ের কাজের প্যাটার্নের সাথে পরিচিত বলে আর ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির কাজের সাথে প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলাম বলে সামহাও ম্যানেজ করে চালাচ্ছি, কিন্তু আমার পরে আরেকজন কেউ যদি এই ভিডিও অপারেট করতে যায়, তার মোটামুটি চুল ছেঁড়ার অবস্থা হবে।

আজকে সারাদিন আমার মোটামুটি আলসেমি করতে করতেই গেছে। সকালে তবু বিবিসি’র একটা কাজ করেছি। তারপর বেশ অনেকটা সময় ফাঁকা পেয়ে খালি আলসেমিই করলাম। সাড়ে ৩টায় যেই টিউশনি-তে যাওয়ার কথা, সেখানে গেলাম সাড়ে ৪টায়! ৩টা বাজে যখন, তখনও আমি বাসায়, গোসলই করতে যাই নাই! পরে, গোসল করে রেডি হয়ে বের হলাম যখন তখন প্রায় পৌনে চারটা বাজে!

যাই হোক, আজকে আর কি-ই বা লিখবো? মাথার মধ্যে একগাদা দার্শনিক কথাবার্তা ঘুরঘুর করছে, কিন্তু সেগুলো বিনা প্রসঙ্গে লিখতে গেলে খাপছাড়া লাগবে। সো, সেসব কথা আপাতত মাথাতেই থাকুক। পরে কখনো প্রসঙ্গক্রমে বলে ফেলা যাবে।

অতএব, আজকের মতো দিনযাপনের এখানেই সমাপ্তি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s