দিনযাপন । ২২০২২০১৬

সকালটা শুরু হয়েছে খুব বিরক্তিকর মাথাব্যথা নিয়ে। সকালে ৮টার মধ্যে স্কুলে থাকবার তাড়া। আগেরবার বসন্ত উৎসবের ছবি তুলবো বলার পরও সময়মতো হাজির হতে পারিনি। আজকেও যদি ৮টার মধ্যে না পারি তাহলে বিষয়টা খুবই বাজে হয়ে যাবে – এই অবলিগেশন থেকে ভোরবেলা ৬টায় ঘুম থেকে উঠে কোনোমতে নাস্তা খেয়ে, চায়ে দুই চুমুক দিয়ে কোনোরকমে গায়ে দুই/তিন মগ পানি ঢেলে শাড়ি পড়ে একপ্রকার দৌড়ের ওপর ৭টার আগেই বাসা থেকে বের হয়েছি। ওইদিনের মতো আবার সিএনজি ক্রাইসিসে পড়ি যদি এই ভাবতে ভাবতে সিএনজি স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি একটাও সিএনজি নাই! মাথা খারাপ হবার যোগাড়! আজকেও লেট করবো নাকি? … এর মধ্যেই একটা সিএনজি রাজি হলো, কিন্তু তাকে ৩০০টাকা দিতে হবে, মিটারে যাবে না। অন্যদিন হলে দুইটা গালি দিয়ে বিদায় করে দিতাম, কিন্তু আজকে ‘আর যদি সিএনজি না পাই’ আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে ৩০০টাকাতেই রাজি হয়ে উঠে পড়লাম! এদিকে ক্যামেরা নেই নাই। ক্যামেরায় চার্জ দেয়া নেই, জায়গাও খালি করার সুযোগ পাইনি। শিলু আপার ক্যামেরাটা ইউজ করার ভরসায় আর ক্যামেরা সংক্রান্ত কাহিনিতে সকালে সময় নষ্ট করলাম না। তো স্কুলে পৌনে ৮টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম লাকিলি। অ্যাসেম্বলি’র সময় প্রোগ্রাম হলো একুশে ফেব্রুয়ারির। এরপর তো আমার দীর্ঘ ব্রেক! ক্লাস হচ্ছে বেলা ১১টায়। তার মধ্যে উথাল-পাথাল টাইপের মাথা ব্যথা আর ঘুমে জর্জরিত অবস্থা। আগের দিন তো গ্রুপে নাচানাচি লাফালাফি করে ঘেমেছি, কিন্তু বাসায় এসে আর গোসল করিনাই , সেটারই ফলাফল আর কি! টিচার্স রুমে টেবিলে মাথা রেখেই ৪০ মিনিটের মতো সময় একটা হাল্কা ন্যাপ নিয়ে নিলাম। তাতে বেশ উপকার হলো। মাথা ভার লাগার ভাবটা কিছুটা কমলো। তারপর ১১টা থেকে টানা ক্লাস করানোর পর স্কুল শেষে একটু এনার্জেটিক লাগতে শুরু করলো। তো। নায়ীমী আর বৃতার-ও একই অবস্থা। এনার্জি বাড়ানোর জন্য ৩ জন ঠিক করলাম কফি খেতে যাবো। প্রথমে বিটার-সুইট পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেলো সেটা বন্ধ! তখন চলে গেলাম সোজা ২৭ নাম্বারে ক্রিমসন কাপ কফি-তে …

ওখানে কফি খেয়ে আমার টিউশনিতে যাবার কথা, নায়ীমী আর বৃতার যে যার বাসায়। আমি ভাবছিলাম ৫টার দিকে যাবো। কিন্তু স্টুডেন্ট-এর মা ফোন করে জানালো ৫টার দিকে গেলে লাভ হবে না, কারণ স্টুডেন্ট-কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে বিকালে। সেকারণে স্টুডেন্ট-এর বাসায় যাওয়াও ক্যান্সেল হয়ে গেলো। অতঃপর আমরা ৩ জন এমনই আড্ডায় মজে গেলাম যে ক্রিমসন কাপে অনেকক্ষণ বসে, তারপর লাইভ কিচেন-এ গিয়ে আরো ঘন্টাখানেক বসে আড্ডা মেরে যখন ‘বের হওয়া দরকার’ সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠলাম, তখন বাজে রাত ১০টা! কি যে হলো আজকে! কথা যেন শেষই হয় না! … সেই বিকালে সাড়ে ৩টার দিকে বোধহয় ৩ জন একসাথে কথা বলতে বসেছিলাম! পারলে বোধহয় আজকে সারারাতই আমরা কথা বলতাম! তাও বোধহয় কথা শেষ হতো না! … অথচ, স্কুলের সময়টায় ৩ জনেরই মনে হচ্ছিলো পারলে স্কুল শেষ হবার সাথে সাথে বাসায় গিয়ে ঘুমায় থাকি!

আমার মনে মনে আজকে প্ল্যান ছিলো স্কুল শেষে টিউশনি করিয়ে বাসায় ফিরে আসবো ৭টার মধ্যে। তারপর একটু পড়াশোনা নিয়ে বসবো। ২৬ তারিখে মাস্টার্সের ভর্তি পরীক্ষা। জাপান স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টে। সেটার জন্য জাপান সম্পর্কে, জাপানের সাথে বাংলাদেশ আর অন্যান্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে পড়াশোনা করতে হবে একটু। রিটেন পরীক্ষা হবে। সেখানে টিকলে তারপর ভাইভা। গতকাল্কে পর্যন্ত তো ‘খোয়াবনামা’র ইনহাউজের কাজের ব্যস্ততায়ই ছিলাম, ফলে আর কিছুতে মনোযোগ দেয়া যায়নি। এখন এই বাকি ৩/৪ দিনে পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিতে হবে। তো, আজকের দিনটা তো এর মধ্যে চলেই গেলো! বাকী রইলো ৩ দিন! ধুর! কি যে হবে!

গতকাল্কের কথা একটু সংক্ষেপে লিখি। গতকাল্কে প্রাচ্যনাটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী-তে গ্রুপের রিহার্সাল ফ্লোরেই ছোটোখাটো একটা প্রোগ্রাম ছিলো। সেখানে আবার আমরা যারা গত ৩ মাস যাবত খোয়াবনামা’র স্ক্রিপ্ট পড়ছি তারা মিলে একটা প্রেজেন্টেশনের মতো করেছি। মানে, আমরা গত ৩ মাসে কতটুকু কি বুঝেছি না বুঝেছি সেইটা বোঝানোর জন্যই একটা ডেমো পারফরমেন্স করা আর কি! তাতে যারা একদম নতুন হিসেবে স্ক্রিপ্ট পড়ছে তাদেরও উৎসাহ বাড়লো, আবার এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট, না-সংশ্লিষ্ট সিনিয়র মেম্বাররাও বুঝলো যে আমরা গত ৩ মাসে খালি লাইন বাই লাইন ডায়ালগ পড়ে যাওয়া ছাড়াও একেকটা দৃশ্যের পেছনের গল্পগুলোও বোঝার কাজটা করেছি। এমনিতেই গত ৩ দিন যাবৎ গানের শো, গর্তের শো, পুতুলমানবের শো-এর রিহার্সাল আর পারফর্মেন্স মিলায় একটা ভীষণ রকমের এনগেজমেন্ট ছিলো সবার। আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা যায় ২০/২৫ টা মানুষই এই সমস্ত পারফরমেন্স-এর মধ্যে কমন। ফলে গত সপ্তাহে যখনই খোয়াবনামার দুইটা দৃশ্যের কম্পোজিশনের কাজ শুরু হলো তখনই দেখা গেলো এই পারফরমেন্স-এর রিহার্সালের জন্য সবাই এনগেজড হয়ে গেছে। এর মধ্যেই যতটুকু সময় পাওয়া গেছে ততটুকুর মধ্যেই রিহার্সাল করা হয়েছে।

২১ তারিখের আগের রাতে তৃষাদের বাসায় ছিলাম। নিশাত আর আমিই ছিলাম। সারারাত বেশ আড্ডাবাজি হলো, সিনেমা দেখা হলো। অনেকদিনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা আর জ্যাম-লাগা মাথার মধ্যে ওই আড্ডাবাজিটা অনেক রিলাক্সিং ছিলো। গতকাল্কের খোয়াবনামার পারফরমেন্স-এর চিন্তা, পারফর্মেন্স রিলেটেড আনুষঙ্গিক ঘটনাবলী নিয়ে বিরক্তি আর খচখচানি এইসব ওপরে কিছুটা হলেও একটা হাল্কা আস্তরণ পড়লো ভালো সময়ের। ওইদিন রাতে আবার শাহবাগে গ্রুপের শো ছিলো। সেখানে আবার প্রাচ্যনাটের মোটামুটি সবাই-ই গেছে। পারফর্মার তো গেছেই, সিনিয়াররাও অনেকেই গেছেন। আমি গেলাম না মূলত বাসায় কিভাবে ফিরবো সেটা ভেবে। অমিত তো পারফর্মেন্স শেষে ওর বুয়েটের হলে চলে যাবে, আর মিরপুর এলাকায় তো আর কেঊ আসবে না। সো, একা একা তো আর রাতে ১টা/২টা সময় বাসায় ফেরার রিস্ক নিবো না আমি! সেকারণে শাহবাগে ‘একুশের প্রথম প্রহর’ –এ থাকার তেলটা আর গায়ে মাখতে পারলাম না। বরং তৃষার বাসায় যাওয়াটাই বেশি ইন্টেরেস্টিং মনে হলো। পরের দিন যদি গ্রুপে কাজ না থাকতো তাহলে আরাম করেই শাহবাগে থেকে পরে কারো বাসায় চলে যাওয়া যেতো। কিন্তু কার বাসায় থাকবো, সকালে রাস্তার কি অবস্থা হয়, বাসায় কিভাবে ফিরি, তারপর আবার রেডি হয়ে বের হই! এত হ্যাসেল নেয়ার ইচ্ছা হলো না। তৃষার বাসা মিরপুরেই, এক নাম্বারে। ওইখানে রাতে থাকলেও তো সকালে বাসায় যেতে অসুবিধা হবে না। এইসব ভেবেচিন্তে তৃষার বাসাই গন্তব্য হলো।

একসাথে তিন/চারটা ইভেন্টফুল দিনের কথা একবারে লিখতে গেলে সবগুলাই ক্যামন জানি আধা-খ্যাচড়া টাইপের হয়ে যায়! গত ১৮ তারিখ থেকেই কত কত ঘটনা! প্রতিদিন দিনযাপন লিখতে পারলে একেবারে অভেন-ফ্রেশ লেখা যেতো সবকিছু নিয়ে। কিন্তু আজকে এই ২২ তারিখে এসে আগের ৪ দিনের ঘটনা লিখতে গিয়ে কেমন জানি খেই হারিয়ে ফেলছি! আশা করছি মার্চ মাস থেকে আস্তে আস্তে সবকিছুই আবার একটা সেটলড রুটিনে ফিরে আসবে। ফেব্রুয়ারির ২৯ পর্যন্ত তো আরো দৌড়াদৌড়ি আছে। জাপান স্টাডিজ-এ ভর্তি পরীক্ষা, স্কুলের পিকনিক, স্টাডি ট্যুর …

আজকে আর লিখবো না। আজকের লেখায় অনেক কিছুরই অনেক বিস্তারিত বাদ দিয়ে গেছি, অনেক প্রসঙ্গ তুলিই নাই। সেগুলো হয়তো পরবর্তী সময়ে সিমিলার প্রসঙ্গে দিনযাপন লিখতে গেলে লিখে ফেলা যাবে।

আপাতত শেষ করি …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s