দিনযাপন । ০৩০৩২০১৬

আজকের তারিখটা লিখতে গিয়েই মনে হলো যে ২৯ ফেব্রুয়ারি দিনটাতে ‘আজ মহান ২৯ ফেব্রুয়ারি’ জাতীয় একটা লাইন হলেও যদি লিখতাম, তাহলেও ব্লগের আর্কাইভে ২৯ ফেব্রুয়ায়ির একটা দিনযাপন এন্ট্রি থাকতো! ৪ বছরে একবার ফিরে আসা একটা দিন বলে কথা! যাই হোক, যা গেলো তো গেলোই … ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যদি এই দিনযাপন কন্টিনিউ হয় তাহলে তখন লিখে ফেলা যাবে কিছু একটা! …

যাই হোক, আজকে মনটা কেমন জানি অদ্ভুতরকমের বিষাদগ্রস্ত হয়ে আছ। ঘটনাচক্রে একটা কুকুরের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হয়েছে। এক্ষণ কেবলই মনে হচ্ছে একটা জীবহত্যার জন্য দায়ী থাকলাম না তো?

ঘটনা হচ্ছে যে, কাটাবন ঢালটার মুখে, আমাদের গ্রুপের বিল্ডিং-টার পাশেই গতকালকে একটা কুকুর আহত অবস্থায় পড়ে ছিলো। আশেপাশের দোকানের লোকজন বলছে যে ওর গায়ের ওপর দিয়ে মাইক্রোবাসের চাকা গেছে, আর তারপর থেকেই সে আর উঠতে পারছে না, শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ পর পর গোঙাচ্ছে। আমি সন্ধ্যায় গ্রুপে যাওয়ার পথে বাটা সিগন্যাল থেকে ভোজ্য তেলের গলি দিয়ে শর্টকাট নিয়ে বের হচ্ছি, তখন দেখি রবিন ওখানে দাঁড়ানো, সাথে একটা কাপল। ওই কাপলের মধ্যে মেয়েটা নাকি অনেকক্ষণ ধরেই কুকুরটার জন্য কি করা যায় সেটার জন্য এদিক ওদিক কথা বলছে। তার হাজবেন্ড কিংবা প্রেমিক অধৈর্য্য হয়ে বাইকে বসে আছে , কারণ তার অন্য তাড়া – বাসায় গিয়ে খেলা দেখবে। ফলে মেয়েটা কি করবে সেটাও বুঝতে পারছে না। তার হাজবেন্ড/প্রেমিক আবার বাইকে করে কুকুরটাকে বঙ্গবাজারে পশু হাসপাতালে দিয়ে আসতেও রাজি না! এদিকে রবিন নিজেও বুঝতে পারছে না ও কি করবে। ওপরে রিহার্সালের কল। এখান থেকে মুভ করাও সম্ভব না ওর যে ও গিয়ে বঙ্গবাজারে কুকুরটাকে রেখে আসবে। আবার কুকুরটা ধরতেও সে ভয় পাচ্ছে কারণ কাছে গেলেই সে মাথা তুলে গোঙানি দিয়ে উঠছে। আমার তখন এমিল-এর কথা মনে হলো। ওদের একটা অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন আছে ‘প’ [ PAW] নামে। কিন্তু এমিলের সাথে এম্নিতে আমার যোগাযোগ হয় না বহু বছর, ফলে ওর ফোন নাম্বার তো নাই! ফেসবুকেও নাম্বার পেলাম না। পরে ওকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠালাম এই ভরসায় যে অনলাইন থাকলে নিশ্চয়ই মেসেজটা পাবে। দেখলাম যে কিছুক্ষণ পরেই রেসপন্স করলো। পরে ওর সাথে কথা বলে কাঁটাবনেই এক পশু ডাক্তারের নাম্বার পেলাম। কিন্তু উনি আবার তখন চেম্বারে নাই। পরে এমিলের সাথে কথা হলো যে রাতে বাসায় ফেরার সময় কুকুরটাকে ওদের অ্যাসোসিয়েশনের একজনের কাছে দিয়ে আসবো, সে আজকে সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসবে কাঁটাবনে। এর মধ্যে প্রাইমারি টেক-কেয়ারটা করা হবে।

তো, গ্রুপেও গতকাল আসলে রিহার্সাল নিয়ে কারো মনোযোগ ছিলো না। পাভেল ভাই শুদ্ধ সবাই মিলে কম্পিউটারে অনলাইন চ্যানেলে খেলা দেখছে। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের খেলা বলে কথা! বাংলাদেশ জিতলেই ফাইনালে ! কিছুক্ষণ পরে সবাই আবার শাহবাগের দিকে চলে গেলো। ওখানে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখাচ্ছে। যেহেতু কুকুর নিয়ে যেতে হবে, তাই আমি আর শাহবাগের দিকে গেলাম না। পরে ১০টার দিকে অমিত আর সাদি-কে নিয়ে বের হলাম। কুকুরকে কার্টনে ঢুকিয়ে নিতে নিতে কিছুটা সময় চলে গেলো। অলরেডি তখন সাড়ে দশটা, খেলাও প্রায় শেষের দিকে। এদিকে কোনো সিএনজি-ও নাই। এক সিএনজিওয়ালা রাজি হলো, কিন্তু সে ১০ নাম্বার পর্যন্ত যাবে। তার ধান্দা হচ্ছে যে কিছুক্ষণ পরেই যখন খেলা শেষে সবাই বের হবে স্টেডিয়াম থেকে, তখন সে ৪০০/৫০০ টাকার ট্রিপ নেবে। এর মধ্যে প-এর যার সাথে দেখা হবার কথা সে বললো টেকনিক্যাল চলে যেতে, তাহলে উনিও গাবতলী থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসতে পারবে। তো টেকনিক্যাল যেতে বলায় সিএনজিওয়ালা আবার হেভি খাপ্পা হয়ে গেলো! কারণ তার তো ধান্দাবাজির সুযোগ মিস হয়ে যাবে তাহলে! সে কোনোরকমে গজরাতে গজরাতে চলে গেলো আমাদের নামিয়ে দিয়ে।

তো, শেষমেশ ওই লোক আসলো। হাসান নাম। সে কুকুরটাকে নিয়ে গেলো। আজকে আবার ৮টার দিকে কুকুরটাকে নিয়ে আসলো কাঁটাবনে। ডাক্তারের কাছে চেক-আপের পর দেখা গেলো যে অবস্থা আসলে খুব ভালো না। লোয়ার পোরশন পুরাটাই ড্যামেজড। ইন্টারনাল ব্লিডিং-ও হচ্ছে। টেম্পারেচার-ও খুব লো। ডাক্তার অনুমান করলেন যে ভেতরে হয়তো লিভার-টিভার ফেটে গেছে। শুধু হাড় ভাঙলেও ঠিক করা যেতো, কিন্তু ভেতরের অর্গান যদি বার্স্ট হয়ে যায় তাহলে তো আর কিছু করা যাবে না। ডাক্তার বলেই দিলেন যে কুকুরটা আর টিকবে না। আস্তে আস্তে এই পেইন নিয়ে গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে মারা যাবে। তার চেয়ে বেটার, ওকে আর কষ্ট না দিয়ে অ্যানেসথেটিক ইঞ্জেকশন পুশ করে দেয়া, তাতে করে ঘুমের মধ্যে মারা যাবে। এইটা ভেটেরিনারি চিকিৎসার প্রসেসের মধ্যে আছে এটা জানতাম, কিন্তু আমাকেও কোনোদিন এইটার অভিজ্ঞতা করতে হবে সেটা কখনো ভাবি নাই! কিন্তু অনুমতিপত্রের ফর্মে সিগনেচারটা আমাকেই করতে হলো, যেহেতু আমি কাইন্ড অফ কুকুরটার অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে গেছি। কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিলো নিজের কাছেই। আমার একটা সিগনেচার-এর সাথে সাথেই ডাক্তার দুইটা ইঞ্জেকশন পুশ করে দিলো কুকুরটার শরীরে। কুকুরটা গোঙানি থামিয়ে কেমন নেতিয়ে পড়ছিলো। আমি আর থাকতে পারি নাই। চলে আসছি। কুকুরটার মৃত অবস্থা দেখার মতো দুঃসাহস আমার হয় নাই!

IMG_5508 (2)

শরীরের অবস্থাও আজকে খুব বেশি সুবিধার না। মুন্সিগঞ্জ –এর ট্যুর এর কল্যাণে প্রায় ভালো হয়ে যাওয়া ঠান্ডা আবার প্রবল বিক্রমে ফিরে এসেছে। এবার সাথে যোগ হয়েছে সর্দি আর গলায় জমে থাকা কফ, সাথে যক্ষ্মা রোগীর মতো কাশি তো আছেই। তার মধ্যে গ্রুপের একটা ইভেন্ট-এ কাজ করছি। সেটার শো ৭ তারিখ। আজকে থেকে রিহার্সাল শুরু হয়েছে। মোস্টলি কোরিওগ্রাফি বেসড। ফলে কালকে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ-ই হলো বেশি। তার বদৌলতে প্রচুর ঘেমেছি। ফলে ঠাণ্ডা আরো বসে গেছে মনে হচ্ছে। আবার শরীরের গাঁটে গাঁটেও ব্যথা, যেহেতু ফিজিক্যাল এক্সারসাইজের প্র্যাকটিস নাই রেগুলার।

গত তিন/চারদিনে তো অনেককিছুই ঘটে গেছে যেগুলা দিনযাপনে লেখা থাকা আবশ্যক। কিন্তু এত ঘটনা একসাথে লিখতে গেলে সেগুলার প্রাসঙ্গিকতায় মিলবে কি না সেটাও একটা বিষয়। যেমন, জাপান স্টাডিজ-এর ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে, কারণ সর্বশেষ দিনযাপনে সেটার পরীক্ষার প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। তো, রিটেন আর ভাইভা শেষে আমি মেরিট পজিশনে তৃতীয় হয়ে জাপান স্টাডিজ-এ চান্স পেয়েছি। রিটেন তো তাও পড়ালেখা করে উৎরায় গিয়েছিলাম। ভাইভার সময় বেশ টেনশন লাগছিলো যে কি জিজ্ঞেস করবে। এদিকে ১২টা সময় ভাইভা শুরু টাইম ছিলো। সাড়ে ১২টায় গিয়ে যে বাইরে বসেছি, আমার সিরিয়ালের ডাক পড়েছে সেই ৪টা সময়। ভাইভা রুমে গিয়ে খুব কনফিডেন্টলি ইংরেজিতে কথা বলেছি, সব প্রশ্নের উত্তরই ফটাফট বলে দিয়েছি, কিন্তু এক পর্যায়ে এক স্যার যখন সাইকোলজি নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলো যে ‘পারসেপশন কী?’ ‘থাইরয়েড কী?’ তখন কেমন দমে গেলাম। ‘কেন সাইকোলজি থেকে প্রশ্ন করতেই হবে?’ টাইপ একটা রিঅ্যাকশন এমনভাবে আমার মধ্যে একটা বিরক্তির অনুভূতি তৈরি করে দিলো যে উত্তরগুলো কি বলবো সেটাও ভাবতেই ইচ্ছা করলো না! বলে দিলাম যে আমার এগুলা নিয়ে ক্লিয়ার আইডিয়া নাই! পরে মনে হচ্ছিলো যে এই উত্তরগুলো না দেবার কারণেও হয়তো আমাকে নেবে না। ওই টেনশনটাও এমন তীব্র আকার ধারণ করলো যে পরদিন সকালে স্কুলেও গেলাম প্রচন্ড টেনশন নিয়েই। ওইদিন আবার স্কুলের স্টাডি ট্যুর, নভো থিয়েটারে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। আর আমিও ভেতরে ভেতরে যদি না নেয় টাইপের টেনশন নিয়ে বাইরে হাসি হাসি মুখ করে সবার সাথে ঘুরছি। এর মধ্যেই অবশ্য মা ফোন করে জানালো যে রেজাল্ট বের হয়েছে, আর আমি চান্স তো পেয়েছিই, মেরিট পজিশন হচ্ছে আবার থার্ড! তখনই আবার মনে হলো, নাহ! আমি প্রজ্ঞা তাহলে আবার আমার ট্র্যাকে ফিরছি!

নভো থিয়েটারের গল্প আর মুন্সিগঞ্জ ট্যুরের গল্প আরেকদিন লিখবো নে। আজকে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। এখানেই শেষ করি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s