দিনযাপন । ০৬০৩২০১৬

বাইরে বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাস…আর আমরা স্টেজ রিহার্সালের মাঝখানে ঝড় থেকে বাঁচতে তাবু খাটানো রেস্ট রুমে বসা। বাতাসের তোড়ে তাবুও প্রায় ওড়ে ওড়ে অবস্থা; কয়েকজন মিলে পা-চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেই মুহুর্তে ওখানকার একটা ছেলে এসে বলে গেলো যে ‘আপনারা তাবুর ভেতরে বসে আছেন কেন? গ্যালারিতে যান। তাবু তো উড়ে যাবে …’ – সাথে সাথেই সবাই হুড়মুড় করে বের হয়ে গ্যালারির দিকে দৌড়। আমার কাছে ছাতা আছে, বৃষ্টিতে ভিজে যাবার ভয় নেই, তাই আমি আস্তে আস্তে টুকটুক করে আগাচ্ছি আর ঝড়ের তোড়ে ধূলার কুন্ডলি, কাপড়, ট্রেপল, পলিথিন সবকিছু উড়ে যেতে দেখছি … এবং একেবারেই আচমকা স্টেজের পেছনের এলইডি মনিটরটা ভেঙ্গে পড়লো … ছোটো ছোটো মনিটরগুলো মনে হলো যেন লেগোর তৈরি বিল্ডিং এর মতো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে! … আর সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি আবার এতই আনমনা হয়ে গেছি যে কাছেই যে একটা পাতলা প্লাইবোর্ডের টুকরা বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ে আসছে সেটা খেয়াল করছি না … ঠিক যেই মুহুর্তে খেয়াল করলাম, তখন আবার আমি দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম যে আমার কোনদিকে যাওয়া উচিত! পেছনে সরে যাবো, না গ্যালারির দিকেই দৌড়াবো! এইসব ভাবতে ভাবতে প্লাইবোর্ডটা হয়তো গায়ের ওপর চলেই আসতো, যদি না গোপী পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করে হ্যাঁচকা টান মেরে ‘আপু আসেন’ বলে গ্যালারির দিকে না নিয়ে যেতো! … ঝড়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঝড় দেখাটা আসলে একটা নেশার মতো! আমার খালি মনে হচ্ছিলো, আচ্ছা ওই এলইডি স্ক্রিনটা যে পড়লো, যদি ওইটার অনেক কাছেই থাকতাম, তাহলে তো আরো মজা হতো, তাই না? … অথবা যেই মুহুর্তে আমরা স্টেজে রিহার্সাল করছি, তখন যদি হতো? …

এইটা কিন্তু কোনো ফাইনাল ডেস্টিনেশন টাইপের সিনেমার গল্প না! আজকে সন্ধ্যার সত্যি ঘটনা! ঘটনাস্থল আর্মি স্টেডিয়াম। ওখানে আগামীকাল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষ্যে ‘জয় বাংলা কন্সার্ট’ নামে একটা আয়োজন আছে। সেখানে আবার প্রাচ্যনাট-এর একটা থিয়েট্রিক্যাল পারফর্মেন্স আছে। তো লাস্ট ৩ দিনের রিহার্সালের পর আজকে সেটার স্টেজ রিহার্সাল ছিলো আর্মি স্টেডিয়ামে। রিহার্সাল শুরু হতে হতেই আকাশ কালো করে মেঘ ছেয়ে গেলো। গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড গরমের আফটারইফেক্ট-ই হয়তো এই বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। যখন আমাদের রিহার্সাল শুরু হলো, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও শুরু হলো। একবার রিহার্সাল থামিয়ে আমরা স্টেজের পেছনের তাবু খাটানো রেস্টরুমে গিয়ে বসলাম। আবার কিছুক্ষণ পর রিহার্সাল শুরু হলো। কিন্তু তখন প্রচণ্ড বাতাস বইছে। ঝড় আসি আসি ভাব … এক পর্যায়ে ধুলিঝড় শুরু হতেই আমরা নেমে আবার সেই তাবুর ভেতর গিয়ে বসলাম … আর তারপরের কাহিনি তো আগেই লিখলাম …

যাই হোক, অন্ধকারে, বৃষ্টিতে আজাইরাই বসে থেকে থেকে শেষমেশ বের হলাম সাড়ে ৮টার একটু পরে। আমি ভাবছিলাম যে প্রোগ্রামটা বোধহয় আর হবেই না! কম করে হলেও ৩/৪ কোটি টাকার লস হয়েছে অর্গানাজারদের। ওভারনাইট তো সেই ক্ষতি পূরণ করার উপায় নাই! … কিন্তু না! প্রোগ্রামটা হবে। আমাদের তো কোনোরকম স্টেজ রিহার্সাল হলো না। মিউজিকের টাইমিং কিভাবে কি হবে কালকে কে জানে! স্টেজ রিহার্সালটা হলে তো তাও বোঝা যেতো কীভাবে কী করবো, আদৌ কয় কাউন্ট মুভ করবো আর কি কি চেঞ্জ হচ্ছে … কালকে আবার সকালে রিহার্সাল … সেখানে তো আমি থাকতে পারবো না … আমার তো স্কুল আছে … সুতরাং দুপুরের আগে আসলে আমার জানার উপায় নাই আদৌ কি হচ্ছে পুরা বিষয়টা! …

IMG_5802 (2)

এদিকে আর্মি স্টেডিয়ামে রিহার্সাল কল সংক্রান্ত একটা ঘটনায় মেজাজ খিঁচে গেলো। আবার, আর্মি স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে আরেক দফা মেজাজ খারাপ হলো … আফসান এমনিতেই অসুস্থ, তার মধ্যে বৃষ্টি, তার মধ্যে হাতে কস্টিউমের ব্যাগ … তো আফসানকে ওর বাসার কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে আমি বাসায় যাবো এরকম চিন্তা থেকেই বের হলাম … ওর বাসা মিরপুর ১৪ নাম্বার, আর আমারটা ১২ নাম্বার। এম্নিতে বনানী থেকে আমার বাসায় আসতে হলে কালশি রোডটা সোজা। কিন্তু, সৈনিক ক্লাব দিয়ে বের হলে আফসানকে ১৪ নাম্বারে নামিয়ে দশ নাম্বার গোল চত্ত্বর ঘুরেও আমি বাসায় চলে আসতে পারবো … তো, সেভাবেই এক্টা-দুইটা সিএনজি দেখতে দেখতে একজন রাজি হলো … সিএনজিতে উঠলাম … দেখি যে আফসান ওঠেনা … উলটা সিএনজিওয়ালাকে বলছে ‘আপনি কোনদিক দিয়ে যাবেন? যদি সৈনিক ক্লাব দিয়ে যান তাহলে আমি উঠবো’ … আমার মহা বিরক্ত লাগলো! … প্রথমত, সৈনিক ক্লাব দিয়ে যেতে রাজি হয়েছে বলেই তো এই সিএনজি-তে উঠলাম। দ্বিতীয়ত, সিএনজি কোনদিক দিয়ে যাবে সে ব্যাপারে ওর কোনো কনফিউশন থাকলে সেটা আমাকে করুক, সিএনজিওয়ালাকে কেন? সিএনজি তো যেদিক দিয়ে বলবো সেদিক দিয়েই যাবে। ঘুরে গেলে বরং ওরই লাভ, ভাড়া বেশি উঠবে। তো আমি বিরক্ত হয়ে আফসানকে বললাম ‘ কথা না প্যাচায় উঠো তো!’ … এই কথা ঠাস করে তার গায়ে লেগে গেলো, এবং সে বললো যে ‘আমি তোমার সাথে যাবো না, তুমি যাও …’ … আমারও তখন বিরক্তি চরমে, তাই আমিও সিএনজি ঘুরিয়ে কালশি রোড দিয়ে সোজা ১২ নাম্বারে চলে আসলাম!

যাক গে … বাদ দেই …

আজকে আর লিখবো না … অনেক ক্লান্ত … এখন ঘুমিয়ে পড়বো … কালকে আবার ভোরবেলা উঠে আগে বিবিসি’র কাজ শেষ করবো, তারপর স্কুল, তারপর শিল্পকলা, তারপর আর্মি স্টেডিয়াম …

জীবনের এই তেজপাতা হয়ে যাওয়া ভাবটা কমাতে হবে … ব্যস্ততা কমাতে হবে একটা একটা করে …

যাই হোক, এখন আপাতত ঘুমাই …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s