দিনযাপন । ১৬০৩২০১৬

এই যে একেকটা দিন এমন ইন্টেরেস্টিং এন্ডিং নিয়ে আসে, তাতে করেই তো জীবনের প্রতি ভালোবাসা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায়! মনে হয় যে জীবন সুন্দর! … বেঁচে না থাকলে কি আর এসব এক্সপেরিয়েন্স হতো, আর মনে মনে কি ভাবতে পারতাম যে আজকের দিনযাপনটা হঠাৎ করেই ইন্টেরেস্টিং হয়ে গেলো? … পারতাম না তো!

আজকে দুপুরের পর থেকেই বাকি দিনটা বেশ ভালো অনুভূতি নিয়ে কেটেছে। সকাল থেকে বিবিসি’র কাজ নিয়ে মোটামুটি চুল ছিঁড়ি অবস্থা দাঁড়াচ্ছিল। কালকে যে রাতের বেলা প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম রাত ১২টা বাজার আগেই, সকালেও তো উঠেছি সেই মাথা ব্যথা নিয়েই। তো সেই অবস্থাতেই একটা স্ক্রিপ্ট শেষ করে সাড়ে ৮টার মধ্যে পাঠিয়ে দিলাম। আরেকটা স্ক্রিপ্ট ভাবছিলাম যে ১০টা পর্যন্ত বসে কাজ করে পাঠিয়ে তারপর বের হবো। ক্লাস তো ১২টা ২০-এ। আমি যদি বাসা থেকে ১১টাতেও রওয়ানা দেই তাও ১২টার আগেই পৌঁছে যাবো। কিন্তু দেখলাম যে আকাশ কালো করে মেঘ করছে, এমনকি মেঘ গুড়গুড় করে ডাকছেও! এখন যদি দেরি করতে গিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় তাহলে তো পুরাই ধরা খাবো! ওই চিন্তা করে বের হয়ে গেলাম। ভাবলাম স্কুলে গিয়ে শেষ করে পাঠিয়ে দেবো। তো যাই হোক, স্কুলে গিয়ে ক্লাস, কাজ এইসব এইসবের সাথে সাথে কাজটা করে পাঠাতে পাঠাতে মোটামুটি দেড়টা বেজে গেলো। তারপর রিলিভড!

এদিকে, দুপুরে টিউশনি-তে যাবো, সেখান থেকে সন্ধ্যায় টিএসসি – এরকমই প্ল্যান মনে মনে। টিএসসি-তে কলাম্বিয়ান দলটার, মানে শিল্পকলায় যেই দলটা ওয়ার্কশপ করালো তাদের পারফর্মেন্স হবে, সেটা দেখাটা উদ্দেশ্য। কথায় কথায় বৃতাকে বললাম যাবে কি না, জানা গেলো যে ওর-ও আগে থেকেই যাওয়ার প্ল্যান। তো ঠিক হলো যে প্রয়োজনে ও আমার সাথে স্টুডেন্ট-এর বাসায় গিয়ে বসে থাকবে, তারপর একসাথে টিএসসি যাবো। এর মধ্যে নায়ীমীর সন্ধ্যায় শিল্পকলায় রিহার্সাল। ও-ও ভাবলো যে একেবারে রিহার্সালেই চলে যাবে। তো তিনজন মিলে লাঞ্চ করবো বলে পান্থপথ গেলাম, ক্লাউড ব্রিস্তো বলে একটা খাবারের দোকানে। ওখানে যেতে যেতে অবশ্য একটা খুতখুতানি হচ্ছিলো যে ওইটার আশেপাশেই যেহেতু সোহেলের মেস, আর ও যেহেতু ক্লাউড ব্রিস্তোর নিচের চায়ের দোকান থেকেই চা-টা খায়, এই ভরদুপুরে কোনোভাবে যদি ওর সাথে আমার দেখা হয়ে যায় তাহলে কি হবে? দিনের বাকি অংশের জন্য মেজাজ খারাপ থাকার এই রিস্কটা নেয়া কি ঠিক হচ্ছে? যাই হোক, আমার ভাগ্য নিতান্তই সহায় ছিলো যে ক্লাউড ব্রিস্তো-তে ঢোকা বা বের হবার পথে একবারও ওর চেহারা আমার দেখতে হয়নি। তো, ক্লাউড ব্রিস্তো-তে লাঞ্চ সেরে আমি চলে গেলাম স্টুডেন্ট-এর বাসায় আর বৃতা আর নায়ীমী ওখানেই থাকলো। পরে আমি আবার টিউশনি শেষ করে ওইদিকে গিয়ে ওখান থেকে টিএসসি গেলাম…

কলাম্বিয়ান টিম-টার পারফর্মেন্স দেখে মুগ্ধ হলাম … ওরা স্তানিস্লাভস্কি, মাইকেল চেকভ এই মেথডগুলো ফলো করে … ফলে অ্যাক্টিং-এর মধ্যে ইম্পালস, মোমেন্টাম জাতীয় বিষয়গুলোই ছিলো। এবং দেখতে বেশ ভালো লাগবার একটা কারণ ছিলো সিঙ্ক্রোনাইজেশন। কো-অ্যাক্টরের সাথেই হোক, আর সাউন্ড আর লাইটের সাথেই হোক … প্রতিটা স্টেপই মনে হচ্ছিলো ভীষণরকমের সিঙ্ক্রোনাইজড। যেটা নাকি আমাদের অনেক নাটকেই ডিজাইনে আছে, কিন্তু এক্সিকিউশনে নাই … ট্র্যাজেডি পলাশবাড়িরই তো প্রায় ৬০% কম্পোজিশন ইম্পালসিভ অ্যাকটিং ডিমান্ড করে, সিঙ্ক্রোনাইজড জেসচার ডিমান্ড করে, কিন্তু পারফর্মাররা সেগুলো নিয়ে মাথা কম ঘামিয়ে ইন্ডিভিজুয়াল পারফরমেন্স-এর দিকেই বেশি মনোযোগী থাকে বলে স্টেজে একজনের সাথে আরেকজনের ইন্টারঅ্যাকশনগুলো অনেক বেশি মুখস্ত আর অযৌক্তিক মনে হয়। লাইট, সাউন্ড, প্রজেকশনের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজেশন তো বাদ-ই দিলাম! যাই হোক, ওদের পারফরমেন্স-এ সবকিছু সুন্দরভাবে সিঙ্ক করেছে বলেই দেখতে বোরিং লাগে নাই, বরং একেকজনের ক্যারেক্টারাইজেশনের ছোটো ছোটো ডিটেইলগুলোও অনেক মুগ্ধ করেছে।

IMG_5782 (2)

তো, টিএসসি থেকে বের হয়ে প্রদ্যুতদা’র সাথে দেখা। টিএসসি থেকে গ্রুপের দিকে রওয়ানা হলাম। অমিত-ও গিয়েছিলো নাটকটা দেখতে, ও বললো যে গতকাল নাকি গ্রুপে গিয়ে পাহারা দেয়ার মতো অবস্থা ছিলো, কেউ যায় নাই। আজকেও গ্রুপের কাছাকাছি গিয়ে বিপ্লব দা’র কাছে জানা গেলো যে কালকের মতোই অবস্থা। সো আমরা গ্রুপে না গিয়ে গফুর মামা’র দোকানে চা খেয়ে যার যার বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। প্রদ্যুত দা আর বৃতা একই দিকে যাবে, তো ওরা আবার আমি সিএনজি না পাওয়া পর্যন্ত দাঁড়াবে বললো। কাঁটাবন মোড়ে সিএনজি না পেয়ে শেষমেশ হেঁটে হেঁটে শাহবাগ গিয়ে সেখানে আরো ১৫/২০ মিনিট দাঁড়ানোর পরে সিএনজি পাওয়া গেলো একটা …

এইবার এই সিএনজি-তে উঠতে গিয়েই কাহিনীর শুরু। প্রাইভেট সিএনজি, ভাড়া চেয়েছে ২৫০ টাকা, তাই প্রথমে না করে দিয়েছি। তো পরে মনে হলো যে আর তো সিএনজি না-ও পেতে পারি, বরং চলেই যাই। উনাকে ডাকতে গিয়েই দেখি এক মেয়ে মিরপুরে যাবে বলেই ওই সিএনজি-কে ডাকছে। তো আমি যেহেতু আগেই ভাড়া নিয়ে কথা বলেছি, আমি যাবো বলাতে আমাকেই সিএনজিওয়ালা প্রায়োরিটি দিলো। এদিকে আমি ভাবলাম যে মেয়েটাও তো মিরপুরে যাবে, তাইলে সাথে নিয়েই যাই। তো মেয়েটাকে বললাম যে চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন, আমি ১০ নাম্বারে আপনাকে ড্রপ করে দেবো। মেয়েও সাথে সাথেই রাজি। সিএনজি-তে উঠেই প্রথমে একজনকে ফোনে বললো যে ‘আমি খামারবাড়ি জ্যামে আটকে আছি’ । তারপর ড্রাইভারকে ফোন করে জানালো যে ড্রাইভার যেন ওর বাবাকে কিছু না বলে, ও বললে যেন কাছাকাছি কোথাও গাড়ি নিয়ে ওয়েট করে, তাহলে ও গাড়িতে করে বাসায় ঢুকবে, অ্যাজ ইফ এতক্ষণ ড্রাইভার সাথেই ছিলো! মেয়ের বাড়ি সেগুনবাগিচা, মিরপুরে যাচ্ছে কোনো এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে! বাসায় জানলে অ্যালাও করবে না বলে এরকম কাহিনি করে যাচ্ছে। তো, ব্যাগ থেকে চকোলেট বের করলো, ক্যাডবেরি বার। সেইটা আবার নিজেও খেলো, আমাকেও অফার করলো। যেই মুহুর্তেই ভাবতে শুরু করছি যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তখন দেখি সে নিজে থেকেই বলে যে ‘আসলে রাস্তায় কাউকে কিছু সাধতেও অস্বস্তি লাগে। পেপার-টেপারে পড়ি না যে খাবার খাইয়ে অজ্ঞান করে ফেলে! আমাকে যদি আবার সেরকম ভাবে!’ … কথায় কথায় জানতে চাইলাম কি পড়ে, কি করে … জানলাম যে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, সিটি কলেজে। আগে পড়তো ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বাবা নাকি সেগুনবাগিচার সিকদার অ্যাপার্টমেন্টস-এর মালিক ইত্যাদি ইত্যাদি … মেয়েটার নামটাও বেশ সুন্দর – স্লোগান। তো, ১০ নাম্বার পর্যন্ত যেতে যেতে সে অবশ্য আমাকে কোনো প্রশ্ন করলো না, বা আমার নাম-ধাম সম্পর্কেও জানতে চাইলো না! খালি এইটুকু ছাড়া যে মিরপুর থাকি কি না, আর বিবাহিত কি না! সারা রাস্তা সে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে গেলো, আর যখনই কেউ জানতে চাইলো সে বললো যে ‘বাসার সামনে, সেগুনবাগিচা’ … আমি একেকবার আড়চোখে ওর ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালাম, বোঝার চেষ্টা করলাম ছেলের সাথে কথা বলছে না মেয়ের সাথে। দশ নাম্বারে নেমে যাওয়ার সময় সে ভাড়াটাও দিয়ে গেলো! আমি একবার-দুইবার না করলাম ঠিকই, কিন্তু শেষমেশ আর বাধা দিলাম না। দিলে দিক! আমার কাছে ১০০০টাকা, আর কোনো ভাংতি নাই, সো বাসায় গিয়ে ভাড়া দিতেও ঝামেলা হবে! ফলে ওর ভাড়া দেয়ার ব্যাপারটা নিজের স্বার্থেই মেনে নিলাম!

মেয়েটা নেমে যাবার পর মনে মনে বেশ হাসলাম। সারাদিনে না জানি কত রকমের মিথ্যা সিচুয়েশন বানিয়ে বানিয়ে ও চলে! মাত্রই স্কুল পার করে কলেজে উঠেছে, বাসায় রেস্ট্রিকশন, আর ও ড্রাইভারকে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে চলছে। যেমন আজকে ড্রাইভার নিজেও নাকি তার গার্লফ্রেন্ড-এর সাথে দেখা করতে গেছে, আর তার বিনিময়ে মেয়েটার এই লুকিয়ে লুকিয়ে মিরপুর আসার প্ল্যানে হেল্প করছে। আমি ভাবছিলাম যে ওকে যদি এখন আমার মতো দিনযাপন লিখতে হতো, তাহলে ও কি করতো? এই এক আজকের ঘটনা লিখলেই তো কতজনের  কাছে ওর কত মিথ্যা কথা বের হয়ে যাবে!

কি অদ্ভুত মানুষের সাইকোলজি! কেউ সারাক্ষণ সত্য থাকতে চায়, আবার কেউ মিথ্যার স্তরে স্তরে বাস করে। কি লাভ হয় নিজের কাছেই নিজেকে লুকিয়ে? …

যাই হোক, দিনশেষে এটাই অনুভূতি যে আমি যা আছি বেশ ভালোই আছি … যা বলি সত্য বলি, সত্য বৈ মিথ্যা বলি না! … আমার সত্যবচনের কারণে এখন বন্ধু ও বন্ধুস্থানীয়দের চাইতে বিরাগভাজনের সংখ্যাই বেশি … কিন্তু সেটা আসলে আমার কাছে খারাপ লাগে না … আমি অন্তত এইটুকু এখন জানি যে যারা আমার সাথে দ্বিধা না রেখে মেশে, তারা নিজেদের কাছে সত্য বলেই আমার সাথে মিশতেও ভয় পায় না! … যাদের মন আর মস্তিষ্কের যোগাযোগই অনেকগুলা মিথ্যার দেয়াল দিয়ে সাজানো, তারা অন্তত আমার সাথে সহজ হতে পারে না! কারণ তারা ভয় পায়! নিজের কাছেই নিজে ধরা পড়ে যাবার ভয় …

অনেক তত্ত্বকথা লিখে ফেলছি … এর চেয়ে বরং দিনযাপন লেখা শেষ করে খেতে যাই … প্রচন্ড ক্ষুধা লেগে গেছে আজকে … ভাবছি দুধ-বিস্কিট প্রজেক্ট থেকে ছুটি নিয়ে আজকে ভাত খাবো … কালকে স্কুল ছুটি … অতএব তাড়াতাড়ি ঘুমাবার তাড়া নেই, তাড়াতাড়ি উঠবারও তাড়া নেই …

বাই দ্য ওয়ে, ২২ তারিখ থেকে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হচ্ছে … সো, টেকনিক্যালি এই সপ্তাহটাই আগামী দুই বছরের মধ্যে আমার শেষ স্বাধীন সপ্তাহ! …

দেখা যাক … ক্লাস শুরু হলে টোট্যাল রুটিন-এর কি অবস্থা হয়! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s