দিনযাপন । ১৮০৩২০১৬

আজকের সারাদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট বোধ করি ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোস্যাইটি’র রিইউনিয়নে না যাওয়া! … না যাওয়ার পেছনে যেহেতু সঙ্গত কারণ এবং ইতিহাস আছে, তাই বোধকরি আজকের দিনযাপনে ডিইউএফএস সংক্রান্ত স্মৃতিচর্চাও হতেই পারে!

ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি কি হইনাই, এইরকম একটা সময়ে একবার ডিইউএফএস-এর নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি হয়েছে টাইপ একটা নিউজ দেখিয়ে মা আমাকে বলেছিলো ‘ ভার্সিটিতে একটা ফিল্ম সোস্যাইটি আছে … সিনেমা দেখায় … এইখানে যেতে পারো তো! অনেক সিনেমা দেখতে পারবা’ … আমার সিনেমা দেখার প্রতি আগ্রহের কারণেই নিতান্তই কথার ছলে এটা বলেছিল মা, আর আমিও ভুলেও গেছিলাম সেই কথা …

তারপর ভার্সিটিতে ভর্তি হবার কিছুদিন পরেই দেখি বিভিন্ন গ্রুপ, কোর্স, অর্গানাইজেশনের লিফলেট হাতে আসতে শুরু করলো … আমি আর বর্ণা তখন একসাথে ঘুরতাম … তো আমরাও বেশ উৎসাহী হলাম কয়েকটা জায়গার ব্যাপারে … টুরিস্ট সোস্যাইটি, ফিল্ম সোস্যাইটি, গিটার ক্লাস এইরকম কিছু কিছু জায়গার ফর্ম-টর্ম নিলাম … ফিল্ম সোস্যাইটির ব্যাপারে মা’র ওই কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিলো তখন … আর ওই ‘সিনেমা দেখা যাবে’ চিন্তা থেকেই ফর্মও নিয়ে নিলাম …

এদিকে ফিল্ম সোস্যাইটিতে ইন্টারভিউ দিয়ে সিলেক্টেড হয়ে মেম্বার হয়ে যাওয়ার পর আবিষ্কার করলাম ইথার-ও এইটার মেম্বার হয়েছে। ইথার কলেজ লাইফের বান্ধবী – আর সে কারণেই ওকে দেখে ফিল্ম সোস্যাইটি যাওয়ার উৎসাহ আরো দ্বিগুণ হয়েছিলো … এর মধ্যে ইউনিভার্সিটির অনেক কিছুই তখনো বুঝেই উঠতে পারিনি, ডিপার্টমেন্টে ক্লাশ শুরু হতে না হতেই একরকম ‘একঘরে’ অবস্থা … ফলে ডিইউএফএস-এ গিয়েও আসলে ইন্টারঅ্যাকটিভ সম্পর্ক কারো সাথে তেমন তৈরি করার জন্য অ্যাপ্রোচ করিনি … সিনেমা দেখতে আসছি, সিনেমা দেখবো … শেষ! … অত কথা-বার্তার কি দরকার আছে সবার সাথে? …

এদিকে আমি বরাবরই রাজনীতি এড়িয়ে চলা মানুষ … আওয়ামী লীগ – বিএনপি রাজনীতি তো বটেই, ব্যক্তি বা দলের মধ্যকার রাজনীতিও … ফলে, আমার ব্যাচের মধ্যেই যারা ভার্সিটি শুরু করতে না করতেই নিজেদের ‘পলিটিক্যাল’ পরিচয়কে বড় করে ফেলেছিলো তাদের আমি বরাবরই এড়িয়ে চলেছি … মিনিমাম হাই-হ্যালোও করতে আগ্রহী হইনাই … কিন্তু তারাই আবার যেহেতু বন্ধুদল-এর ক্ষেত্রেও প্রভাবশালী ছিলো, তাই সেটার প্রভাবে সবাই ‘মিলেমিশে’ থাকতো, কিন্তু এড়িয়ে যাবার অভ্যাসের কারণে আমি মোটামুটি আরেকদিকেই থাকতাম … আবার কিছু কিছু বিষয় ছিলো যেটা কোনোভাবেই কারো সাথে মিলতো না … সেটার একটা বড় কারণ সম্ভবত ছিলো আমার স্কুলিং ব্যাকগ্রাউন্ড [এবং এটা এখনও আমি অনেক ক্রসিয়ানের সাথে আলোচনাতেই শুনি যে ‘ভার্সিটিতে কোনোভাবেই তারা মানাতে পারে নাই, কারণ হলিক্রসের স্কুলিং খুব বড় প্রভাব ফেলেছে] …

যাই হোক … আলটিমেটলি ডিইউএফএস যে আমার জায়গা না সেটার একটা বড় অনুধাবন হয়েছিলো আমাদের ওরিয়েন্টেশনে …যেই আমি কারো সাথে মিশতামই না, সেই আমার নামে স্লাইড শো-তে কমেন্ট গিয়েছিলো ‘ গাঁয়ে মানে না আপনি …’ ! বাক্যটা সম্পূর্ণ না করেও বুঝিয়ে দিয়েছিলো কি বলতে চায়, এবং সেটা আবার করেছিলো আমাদের ইমেডিয়েট সিনিয়ার ব্যাচ! … ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ছোটলোকামি মনে হয়েছিলো … আমি কি আমার জুনিয়ার ব্যাচের কাউকে এভাবে তার ব্যাচের কাছে, কিংবা সবার কাছেই এভাবে হিউমিলিয়েটেড করতে পারতাম? আমার তো নিজের আত্মসম্মানেই বাঁধতো! … যাই হোক, অনেক খারাপ লাগার পরেও কেন জানি পরের দিনই ডিইউএফএস যাওয়া বন্ধ করে দেই নাই! … ওই ঘটনার পরে একটা পক্ষ অন্তত তৈরি হয়েছিলো যারা বিষয়টা পছন্দ করেনি … এবং তাদের সাথে তখন ভালো খাতির জমতে শুরু করলো … ইন ফ্যাক্ট তারা আমাকে তাদের সার্কেলে, তাদের আড্ডায় সানন্দে জায়গা দিলো বলেই আমারও ভেতরের অস্বস্তি কাটতে লাগলো … তখন দেখলাম যে তাদের কারো কারো সাথে তো আমার চিন্তা-ভাবনা-পছন্দ-অপছন্দও মেলে … সিনেমার চয়েস, হুট-হাট খেতে চলে যাওয়ার ভাবনা, উরাধুরা ঘুরতে চলে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি …

IMG_5859 (2)

ডিইউএফএস-এর প্রতি বছরের কার্যনির্বাহী কমিটি চেঞ্জের সময় যখন হলো তখন আসলে দ্বিতীয় এবং শেষবারের মতো অনুধাবন হয়েছিলো যে এইটা তো আসলেই আমার জায়গা না! … ব্যাপারটা ছিলো এমন যে, ‘ এই জায়গাটা তো তোমার জন্য না, তাহলে কেন আছো?’ … যেমন যেমন শুনেছি, সেই অনুযায়ী বলতে গেলে ‘ আমি ব্যাচমেট-দের সাথে মিশতেই পারি না, একসাথে কাজ কিভাবে করবো’ টাইপ কারণের ওপর ভিত্তি করে আমাকে কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সদস্য হিসেবেও রাখা হয় নাই! … আমি কার্যনির্বাহী কমিটিতে নিজের নাম নাই শুনে খুব অপমানিত বোধ করে কেঁদে বের হয়ে গিয়েছিলাম … তিন্নি আপু আমাকে দৌড়ে এসে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তুমি কি এক্সিকিউটিভ কমিটিতে থাকার জন্য ডিইউএফএস-এ আসছো?’ আমি বলেছিলাম, ‘না’ ~ ‘তাহলে কাঁদতেসো কেন?’ … আমি আসলে আমার অপমান লাগার জায়গাটা বোঝাতে পারি নাই … সত্যি কথা বলতে, যে কোনোভাবেই কাজের ক্ষেত্রে অন্য অনেকের চাইতেই তো আমার যোগ্যতা অনেক বেশি-ই থাকে, কিন্তু তাই বলে ডিইউএফএস-এ আমি কাজের জন্য, কিংবা সাধারণ সম্পাদক টাইপ কিছু হয়ে যাবার জন্য আসি তা না … কিন্তু যেইটা আমার যোগ্যতা, এবং বিনা প্রশ্নে যেখানে থাকাটাই আমার জন্য স্বাভাবিক, সেখানে যখন আমি থাকি না, তারমানে সেখানে অনেক বড় রাজনীতি থাকে! কার সাথে কার ভালো সম্পর্কের রাজনীতি, কাকে রাখলে সবাই খুশি, কাকে বাদ দিলে সবাই খুশি স্ট্র্যাটেজির রাজনীতি কিংবা সলিড নোংরা দলাদলির রাজনীতি … নিজেকে এরকম একটা ইন্টারনাল রাজনীতির বলির পাঁঠা মনে হয়েছিলো সেদিন … আর এই বলির পাঁঠা হবার অপমানবোধ এমনভাবেই গায়ে লেগেছিলো যে এরপর থেকে আর কোনোদিন এক মূহূর্তের জন্যও নিজেকে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোস্যাইটির মেম্বার’ ভাবতে ভেতর থেকে কোনো আগ্রহ কাজ করেনি …

এতবছর পরে ডিইউএফএস-এর রিইউনিয়ন-ও সেকারণে আর তেমন আগ্রহ তৈরি করলো না … গিয়ে করবোটা কি? … সবাই মিলে স্মৃতিচারণ করবে … আমি কি স্মৃতিচারণ করবো? … বলবো যে ‘আমাকে সবাই ট্যাগ লাগিয়েছিল মাতবরি করি’, একেকসময় শুনেছি কেউ কেউ এটাও বলেছে যে ‘আমি ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাচ্ছি’ জাস্ট বিকজ যাদের সাথে আমার ভালো খাতির ছিলো তারা আমার সিনিয়ার ব্যাচ ছিলো বলে … অ্যাজ ইফ, আমি তাদের সাথে কোনো ডিইউএফএস কেন্দ্রিক স্বার্থের কারণে ভালো সম্পর্ক রেখে চলছি! … ইন ফ্যাক্ট, যা আমি ভাবতাম না, তা অনেকেই নিজের দায়িত্বে ভেবে নিয়েছে এবং আমার ভাবনা আসলে কি সেটা জানার তোয়াক্কা না করেই অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে …

মোদ্দা কথা … গিয়েছিলাম সিনেমা দেখবো বলে … তো সেখানে অনেক সিনেমাই আসলে দেখেছি … সেই সিনেমা দেখতে গিয়ে আর তাদের সাথে মিশে আসল ‘সিনেমা’ দেখার আগ্রহ থাকে নাই!

তিন্নি আপু এক-দুইদিন বেশ গুতিয়েছিলো যাতে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলি রিইউনিয়নের … মাঝখানে একদিন অনন্যার সাথে দেখা হলো, গতকালকে আবার প্রবাল ফোন দিলো … আমি যেহেতু মনে মনে ঠিক করেই রেখেছি যাবো না, তাই কোনো প্রকার আহ্বানেই সাড়া দেই নাই …

এবং পজিটিভলি, আমার ব্যাচমেটরা বোধকরি বুঝেই নিয়েছে আমি যাবো না, তাই ওরা কেউই আমাকে আজাইরা গুতায় নাই … ইথার যদি আমার ওপর বিলা না থাকতো, তাইলে ইথার হয়তো গুতাইতো … কিন্তু ও-ও যেহেতু ওর কাজের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলাম দেখে বিলা, তাই এমনিতেই তো কথা হয় না …

যাই হোক, ডিইউএফএস প্যাচাল অনেক পারলাম … সারাদিনে তো টিউশনি আর স্কলাস্টিকা যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করি নাই … তাই দিনটা আসলে আদারওয়াইজ ইভেন্টলেস-ই বলা যায় …

একটা কাজ করার কথা মাথায় ঘুরছে গত কয়েকদিন ধরে … বিগত এক বছরের দিনযাপনগুলো একসাথে একজায়গায় কম্পাইল করা … একমাত্র ব্লগের পোস্ট ছাড়া তো আর কোথাও এইগুলার কপি নাই … গুগল ডেট বাই ডেট ফাইল করে রাখা গেলে একটা আর্কাইভ থাকতো … দিনযাপন লিখতে শুরু করেছিলাম ২ মার্চ ২০১৫ … এক বছর কিভাবে কিভাবে পার করে ফেললাম … ইদানীং ফেসবুকের কল্যাণে গতবছরের পোস্টগুলোর লিঙ্ক আসে, সেগুলা পড়তে গিয়ে মজাই পাই! … গতবছরের এই দিনের লেখা আর আজকের লেখা পাশাপাশি পড়লেই নিজের মধ্যে কত চেঞ্জ মনে হয়! …

২০১৫’র এই সময়টায় আত্মহত্যা করতেও প্রস্তুত ছিলাম … আর এখন চিন্তা করি যে এখনো মরি নাই ভালোই হয়েছে … ২০১৭ তে গিয়ে হয়তো আরেকভাবে ভাব্বো …

মানুষ! মরে গেলে তো পচেই যায় … বেঁচে থাকলেই তো বদলায় … সকালে বিকালে বদলায় … কারণে অকারণে বদলায় … আমি মানুষ বলেই এবং বেঁচে আছি বলেই হয়তো বদলাচ্ছি … আরও বদলাবো … যেমনটা আগে বহুবার বদলেছি …

আজকে না হয় শেষ করি … অনেক তো বাজে বকলাম …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s