দিনযাপন । ২০০৩২০১৬

সকাল থেকে ভুলে ভুলেই দিনটা কাটলো!… কিংবা ভুলের মাশুল দিতে দিতে …

সকালে ঘুম থেকে উঠে দিব্যি বের হয়ে স্কুলে পৌঁছায় যাবার পর খেয়া আপুর ফোন পেয়ে মনে পড়লো যে বিবিসি’র একটা কাজ আজকে সকালে দেয়ার কথা, সেইটার কথা বেমালুম ভুলে গেছি! তাও ভালো যে আজকে সাথে নেটবুকটা ছিলো। ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করতে শুরু করলাম … পরে বিকালে স্টুডেন্ট-এর বাসায় গিয়ে কাজ শেষ করে পাঠায় তারপর শান্তি!

এরপর সন্ধ্যায় গ্রুপে গিয়ে শর্মীর সাথে এটা-ওটা কথা বলতে বলতে মনে পড়লো যে আজকে শিল্পকলায় সিএটি’র মেটামরফসিস নাটকটা দেখবো বলে ভেবে রেখেছিলাম। রানা’র সাথে কয়েকদিন আগে কথাও হয়েছিলো! বেমালুম ভুলে গেছি! তখন অলরেডি সাতটা বাজে। যদি সাড়ে ৬টার দিকেও মনে পড়তো তাইলেও দৌড়ের ওপর চলে যাওয়া যেতো! … কি আর করা! বসে বসে গ্রুপে টুটুলের সাথে যে ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ির স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজে বসার কথা, সেইটাই শুরু করলাম … সেখানেও কপাল খারাপ! ইলেক্ট্রিসিটি এমন প্রবলেম করা শুরু করলো যে কাজই করা গেলো না! … তখন মেজাজ বেশ খারাপই হলো! আমও গেলো, ছালাও গেলো টাইপের মেজাজ খারাপ!

পরে অবশ্য গ্রুপে কাজ-বাজের আলোচনা, পাভেল ভাই আসার পর আড্ডাবাজি এবং আরো অনেকের উপস্থিতির বদৌলতে মেজাজ খারাপটা চলে গেলো … ইন এনি ওয়ে, মেজাজ খারাপের কম্পেনসেশনটা হয়ে গেলো আর কি! যেন মেজাজ খারাপ হয়েছে বলেই মাদার নেচার ঘটনার আবহকে একটু পাল্টে দিয়ে মন ভালো করে দিলো! … এবং শুধু ভালো না, বেশ ফুরফুরা ভাবসাব নিয়ে বাসায় ফেরার বন্দোবস্তও করে দিলো! …

হিসাবে ধরলে আগামীকালই আমার শেষ ফ্রি সন্ধ্যা … অন্তত আগামী দুই বছরের জন্য … মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হওয়া মানে সান্ধ্যকালীন রুটিনের একটা নতুন ফেজ-এর শুরু হবে … কবে কবে ক্লাস তা এখনো জানি না … ক্লাসের পুরো রুটিন পাওয়ার পর আসলে বোঝা যাবে ইউনিভার্সিটি আর বাদবাকি ব্যস্ততার মধ্যে কতটুকু সমন্বয় করা যাবে … এই যে, আগামী ২৫ তারিখ নাকি একটা ইভেন্ট আছে … মনে হচ্ছে না সময় দিতে পারবো … পরশুদিন ক্লাসে গেলে বোঝা যাবে আর কি! …

IMG_5524 (2)

বেশ কয়েকদিন আগে পুরনো ডাইরি ঘাঁটতে গিয়ে একটা ঘটনা পড়ে বেশ ইন্টেরেস্টিং লেগেছিলো। ঘটনাটার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। ওই ডাইরি এন্ট্রি দেখে মনে পড়েছে, তাও আবছা আবছা … ওই ঘটনাটা আবার এই ২০ মার্চেরই, ২০০৯ সালের ঘটনা! ডাইরি এন্ট্রিটা অনেক বড়, কিন্তু আমার ইচ্ছা হচ্ছে যে ঘটনাটা দিনযাপনে শেয়ার করি …

“ মানুষের জীবনে মাঝে মাঝেই কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যেগুলোর কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না অন্য ঘটনাদের সাথে। কিন্তু সারাজীবনই কোনো না কোনোভাবে ঘটনাগুলো মনে থাকে। আমার জীবনেও ঘটে। প্রায়ই ঘটে। আমি কখনো ব্যাখ্যা খুঁজতে যাই না, কেন ঘটছে, এর নিগুঢ়তা কী ! কিন্তু এ ধরণের ঘটনাগুলো ঘটে গেলে মনে মনে ভাবি, জীবনটা আসলেই অনেক ইন্টেরেস্টিং!

গতকাল ছবির হাট-এর উদ্যোগে একটা ঘুড়ি উৎসবে গিয়েছিলাম। এর আগে সেইন্ট মার্টিন যাওয়া হয়নি। এবার তাই একদিনের জন্য পদ্মার চরে হবে শুনে মিস করতে চাইনি। সারাদিন ঘুরে-ফিরে-ঘুড়ি ওড়ানো দেখে- ছবি টবি তুলে সাড়ে ৯টা কি ১০টার দিকে চারুকলার গেটে এসে পৌছালাম। সবাই জিনিসপত্র গুছাচ্ছে, এই ফাঁকে আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য চারুকলার ভেতরে ঢুকলাম। বাথরুমে গিয়ে দেখলাম দরজা বন্ধ, কেউ গিয়েছে। বাইরে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু যে ভেতরে আছে তার বের হবার কোনো লক্ষণ নাই। এদিকে আমারও বাথরুমে যাওয়া খুব দরকার। হাঁটতে লাগলাম। আবার কতক্ষণ দাঁড়ালাম। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে দরজা খুলে বের হলো। আমি ভাবছিলাম ছেলেটা এতক্ষণ কী করতে পারে? বড় বাথরুম? মাস্টারবেশন? নেশা? চেহারা দেখে অসুস্থ মনে হলো। আরো কিছুক্ষণ সময় নিলো সে বাথরুম থেকে বের হতে। দরজা খোলারও মিনিট পাঁচেক পর সে বের হলো। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো। আমিও বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ সে ডাক দিয়ে বললো, ‘আপু, এক্সকিউজ মি … যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলবো?’ আমি বুঝলাম না কি কথা বলবে। বাথরুম কি সে নোংরা করে এসেছে? এখন আমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে? তাই সরি বলবে? বললাম, ‘বলেন!’ … ‘আচ্ছা, আমাদের বাবা-মা’র পাপের জন্য আমরা কেন সাফার করবো বলতে পারেন?’ আমি পুরাই টাশকি খেলাম! এ হঠাৎ এসব কী বলে? চেনে না, জানে না, সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনকে এরকম প্রশ্ন! তারপর সে আরো কথা বলতে শুরু করলো। তার মা মারা গেছে অনেক ছোটোবেলায়। বাবা সৎ চাকরিজীবী ছিলেন। তার বাবার যে কেরানি [ কিংবা আরো নিম্নপদস্থ কেউ, যার কাজ ছিলো তার বাবার জিনিস/ব্যাগপত্র বহন করা] ছিলো, সে নাকি এখন গাড়ি দিয়ে চলে, ঢাকায় ৩/৪টা বাড়ি আছে। অথচ তার বাবা সততার কারণে কিছুই করতে পারলো না। তার বাবাও দেড় বছর হলো মারা গেছে … সে পড়াশোনা করে না … মাস্টার্স শেষ করেনি … তেজগাঁও কলেজের ছাত্র ছিলো …

এভাবে সে তার হতাশার কথা বলে চললো। এটাও বললো সে তখন বাথরুমে বসে ড্রাগ নিচ্ছিলো। আমার পায়ের [ কিংবা পায়ের নূপুরের] শব্দ শুনে বের হয়ে এসেছে। আমি তখন বুঝলাম ওই ছেলের অসুস্থ চেহারা আর অসংলগ্ন কথাবার্তার কারণটা কি! সেই সাথে হঠাৎ কেমন যেন ভয়ও পেলাম! আশেপাশে আমি আর ছেলেটা ছাড়া আর কেঊ নেই। এখন যদি কিছু করে বসে! এদিকে আমার বাথরুমেও যাওয়া হচ্ছে না। ব্লাডারেও চাপ বাড়ছে। আমি একই সাথে ভয়ও পাচ্ছি আবার বাথরুমেও যাওয়াটা খুব জরুরি হয়ে গেছে। সে হঠাৎ বললো, আপনাকে একটা কবিতা শুনাই?’ এই সুযোগে আমি তাকে বললাম, ‘আমি একটু বাথরুম থেকে আসি, তারপর শুনি?’ আমার ব্যাগটা কাঁধ থেকে খুলে রেখেছিলাম মাটিতে। ব্যাগটার দিকে একবার তাকালাম। যদি আমি বাথরুমে যাবার পর ছেলেটা ব্যাগটা খুলে দেখে? কিংবা এমনিই নিয়ে চলে যায়? অ্যাডিক্ট মানুষ, বলা তো যায় না কখন কি করে! আমি হেসিটেট করছি সেটা সে বুঝলো। বললো ব্যাগ সে পাহারা দেবে। আমাকে চিন্তা করতে না করলো। আমি যত দ্রুত সম্ভব বাথরুমের কাজ সেরে বের হলাম। বের হতে হতে ভাবছিলাম, গিয়ে দেখতেও পারি ব্যাগ নেই, ছেলেটা নেই। কিন্তু দেখলাম যে ছেলেটা আছে। একটা চশমা চোখে লাগিয়েছে ততক্ষণে। আমি ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে সামনে হাঁটা দিলাম। সে প্রশ্ন করলো, ‘কবিতা শুনবেন না?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, শুনবো তো, সামনের দিকে যাই চলেন!’ হাঁটতে হাঁটতে সে কবিতা শোনালো। দেশের কবিতা। গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সে তার প্রেমের কথা বললো। জীবনে কোনোদিন কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েনি সেই মেয়ে ছাড়া। তিন মাস হলো পরিচয়। ইন্টারনেটে। চ্যাট করতে গিয়ে। সেই মেয়ের আকদ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই মেয়ে রাজি না। সে-ও এই ছেলেকে চায়! তার ফ্যামিলি রাজি না! মেয়ের জামাই নাকি তাকে ফোন করে বলে ‘ভাইয়া, আমাকে আপনি বাঁচান!’ মেয়েকে নাকি তার বাবা কোরআন শরিফ ছুঁইয়ে শপথ করিয়েছে যে তার বিয়ে ভেঙ্গে গেলেও সে পাভেল [ মানে এই ছেলে] এর কাছে ফিরতে পারবে না। সিনেমাকেও নাকি তাদের প্রেম হার মানায়। আমি তাকে এবার মনোবিজ্ঞানীর মতো বললাম, ‘আপনি কাউকে আপনার সমস্যা, হতাশা, ক্ষোভ এর কথা বলুন। হাল্কা হন। … আর কি-ই বা বলবো??? সে কিছুক্ষণ পর ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে গেলো। কোনোদিন মেয়েদের সাথে এভাবে কথা বলেনি, কোনো মেয়ের গায়ে হাত-ও দেয়নি, অথচ আমি অপরিচিত একজন, আমাকে দেখেই কেন কথা বললো সে জানে না! যাওয়ার আগে আমাকে কবিতা শুনিয়ে গেলো – আকাশ অনেক বড়/ আপনি আকাশের মতো বড় হবেন/ বড় হয়ে আকাশ ছোঁবেন/ আর আমার কথা মনে রাখবেন! মনে মনে বললাম, ‘তা তো রাখবোই। আকাশের মতো বড় কেন, পিঁপড়ার মতো ছোটো হলেও মনে থাকবে!’

মজা পাচ্ছি। লাইফ ইজ ইনডিড ফুল অভ এক্সপেরিয়েন্স!

২০/০৩/২০০৯ “

ইন্টেরেস্টিংলি, তখন যেভাবে লিখেছিলাম যে এই ঘটনা সারাজীবন মনে থাকবে, আলটিমেটলি কিন্তু এই ঘটনা আমি একদমই ভুলে গিয়েছিলাম। এমনকি লং টার্ম মেমোরির মধ্যেও খুঁজে পেতে খালি আবছা আবছা এইটুকু রিকল করতে পারছি যে বাথরুমের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়ানো ছিলাম, তারপর ছেলেটা বের হয়ে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল! কিন্তু আর কিছুই মনে নাই আমার!

সময়ের সাথে সাথে আসলে মনে হয় ঘটনার গুরুত্ব কমে যায় আমাদের কাছে! কে জানে! …

আজকে আব্বুর জন্মদিন ছিলো … মনে থাকলেও কিছু বলি নাই … করি নাই … কয়েকদিন আগে ৬ তারিখ যখন মা’র জন্মদিন ছিলো তখনো কিছু করি নাই, বলি নাই … আগে তো আমিই এগুলা সব করতাম … কেক কিনে আনতাম … সবাইকে ডেকে ডেকে জন্মদিন পালন করতাম … কিন্তু এখন তো কথাই বলি না আব্বুর সাথে … মা’র সাথেও প্রয়োজনের বাইরে হু-হাটুকুও হয় না … যাই হোক, দিন শেষ, জন্মদিনও শেষ … তাহলে আর অত ভাবছি কেন?

বরং দিনযাপন লেখাটা শেষ করি … বিশাল বকবক করে ফেললাম আজকে …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s