দিনযাপন । ৩০০৩২০১৬

গত তিন/চার দিন যাবৎ-ই দিনযাপন লিখবো ইরাদা নিয়ে বসছি, আর কিছুক্ষণ পরেই অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। ব্যস্ততার উছিলা দুইটা – এক, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘কিশোর সমগ্র’র দ্বিতীয় খন্ড।  [ প্রথম খন্ডটা আমিই কিনেছিলাম কয়েক বছর আগে, কয়েকদিন আগে মা সিরিজ কমপ্লিট করার জন্য দ্বিতীয় খন্ডটা গিফট করলো।] আর দুই, জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে ঘাটাঘাটি। কোর্স টিচার যেই টেক্সট বই পড়তে বলেছেন সেটা তো আছেই, সাথে আবার ফৌজিয়া আপা’র বাসা থেকে ‘জাপানিজ ফর বিজি পিপল’ নামে একটা বই ধার করে নিয়ে এসেছি। [ প্রসঙ্গতঃ ফৌজিয়া আপা বহুদিন জাপানে ছিলেন, উনার হাজবেন্ড-এর পিএইচডি’র সূত্রে, ফলে উনার বাসায় জাপানিজ বইয়ের অভাব নাই। ] … তো, দিনযাপন লিখতে বসে এই দুই অ্যাটেনশন সুইং আমাকে আর দিনযাপন লেখার সুযোগ দেয় নাই! …

কিন্তু আজকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হতে হতেও হয়নাই দিনযাপনের কারণেই! … ফেসবুক ঘাটতে গিয়েই গতবছর এইদিনের দিনযাপন দেখে বেশ বিনোদিত হয়ে গেলাম। সেই দিনযাপনে সন্ধি আর রাব্বী’র সাথে কথায় কথায় ‘দিনযাপন সন্ত্রাসী’ প্রসঙ্গটা উঠেছিলো … কথা হচ্ছিলো এইসব বিষয় নিয়ে যে দিনযাপনে খুললাম খুল্লা মানুষজনের ব্যাপারে লিখতে থাকলে হয়তো অনেকেই আস্তে আস্তে আমার সাথে আর মিশবে না … আমাকে হয়তো এড়িয়ে চলবে এই চিন্তা করে যে তাদের অনেক ব্যক্তিগত কথা হয়তো আমি দিনযাপনে লিখে ফেলবো … কিংবা কারো ব্যাপারে নেতিবাচক কিছু লিখলেই সে হয়তো সেটা নিয়ে রিঅ্যাক্ট করবে … ইত্যাদি ইত্যাদি …

তা, ওইদিন কথায় কথায় খুব হাল্কা মনোভাব নিয়েই ওইসব কথাবার্তা হয়েছিলো, কিন্তু একটা সময় দেখা গেলো যে সেগুলাই সত্য হয়ে যাচ্ছে! … এবং, দিনযাপনে ওই কথাগুলো লেখার একবছর পরে এসে আমি মোটামুটি অনেকেরই অনেকরকমের রূপ দেখে ফেলেছি, যা দিনযাপন না লিখলে আমি কখনোই হয়তো এভাবে দেখার সুযোগ পেতাম না! …

যেমন ধরা যাক, ইন্টেরেস্টিংলি, যেই সন্ধির সাথে আমার গতবছর এইসব আলোচনা হয়েছিলো, সেই সন্ধির সাথেও কিন্তু আমার এখন কদাচিৎ কথা হয়। সন্ধির কিছু আচরণের প্রেক্ষিতেই আমি ওর প্রতি বিরক্ত হয়ে দূরত্ব মেপে চলতে শুরু করেছি … কিন্তু তাই বলে যে ওর মনের মধ্যে এই ভয় নাই যে ওর ব্যাপারে অনেক কিছুই আমি লিখে ফেলতে পারি, সেরকম তো কোনো গ্যারান্টি নাই! … দিনযাপনে কখন কি লিখে ফেলি চিন্তা করে নোবেল ভাই থেকে শুরু করে আশেপাশের, বিশেষ করে গ্রুপেরই অনেকেই কিন্তু তাদের মতো করে দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে … তাতে আমার খুব সমস্যা বোধ হচ্ছে টা কিন্তু না! বরং আমি তাদের অবস্থা ভেবেই খুব বিনোদন পাই মনে মনে! বোধ করি ওই মানুষগুলোর নিজেদের মনেই নিজেদের নিয়ে অনেক বেশি সঙ্কোচ আর দ্বিধা আছে … আমি দিনযাপনে সেসব মানুষদের নিয়ে একটা কিছু লিখে ফেললাম মানেই তো সেটা একপ্রকার ‘ডকুমেন্টেড’ হয়ে যায়, আর তাতেই হয়তো তারা নিজেরাই নিজেদের কাছে বিপদে পড়ে যায় !

যেমন ধরা যাক, কেউ হয়তো বছরে একটা করে গার্লফ্রেন্ড ধরে আর নতুন বছর আসলেই তাকে ছেড়ে আরেকজনকে ধরে। এখন আমি যদি এইবছরের দিনযাপনে তার বর্তমান গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে লিখে ফেলি, আগামী বছর সে যখন নতুন গার্লফ্রেন্ড ধরতে যাবে, তখন তো তার মনে মনে ভয় থাকবে যে নতুন গার্লফ্রেন্ড যদি এই দিনযাপন পড়ে ফেলে তাইলে তো তার আগের গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে জেনে যাবে! … এখন, আমার তো এসব নিয়ে মাথাব্যথা নাই … কারণ আমার যুক্তি সরল সোজা – যা করবা তা যদি কাউকে বলতেই না পারো তাহলে সেটা করো কেন? … সো, আমি তো দিনযাপনে ‘যা বলবো সত্য বলবো, সত্য বৈ মিথ্যা বলবো না’ ট্যাগ লাইন ঝুলিয়েই ফেলেছি! … আর তাই, দেখা যাবে, সেই ফি বছর নতুন জামা পাল্টানোর মতো নতুন গার্লফ্রেন্ড পাল্টানো টাইপ পাবলিকরা হয়তো আমার সাথে মিনিমাম ইন্টারঅ্যাকশনেই যাবে না!

ব্যাপারটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং! …

এবং, দেখা যায় যে, যারা নিজের কর্মকান্ডের ব্যাপারে নিজের কাছে সৎ, তাদের নিয়ে আমার লেখা হয় খুব কম। পারতপক্ষে তাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি লিখি না … কিন্তু যারা নিজের কাছেই সৎ না … যাদের জীবনের ২৪ ঘণ্টাই নিজের সাথে নিজের অনেক গোঁজামিল দিয়ে চলে, তাদের ব্যাপারেই আমার বেশি লেখা হয়! … এবং, দিনযাপনে তাদের নিয়ে কিছু লিখলেই যেহেতু তাদের গোঁজামিল দেয়ার কাজটা বেড়ে যায়, সেহেতু আমার দিনযাপনের প্রসঙ্গ হওয়াটা তারা আসলে নিতান্তই অপছন্দ করে!

যাই হোক, আজকের বয়ান দেই সংক্ষেপে … সারাদিনের গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট এইটাই যে আজকে স্কুলে গেছি প্রায় হেঁটে … রেসিডেন্সিয়াল মডেলের সামনে প্রচন্ড জ্যামে ৪০ মিনিট বসে থাকার পর সিএনজি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেছি … যখন স্কুলে পৌঁছেছি তখন প্রায় ১২টা … একটু বসে ঠাণ্ডা হতে হতেই ক্লাসের টাইম হয়ে গেলো … স্কুল শেষে মিরপুর ১৩ নাম্বারে এসে নিশাতের সাথে একটা কাজে দেখা করলাম … তারপর রাত ৯টা পর্যন্ত নিশাত আর ওর ভার্সিটির ফ্রেন্ড ইলা’র সাথেই কাটলো … খাওয়া-দাওয়া … মিরপুর আড়ং-এ উইন্ডো শপিং …

আর … গত এক সপ্তাহের বয়ান যদি দেয়া শুরু করি, তাহলে আজকের দিনযাপনটা একটা ছোটোখাটো উপন্যাস হয়ে যাবে …

২১ থেকে ২৯ পর্যন্ত এই ৮ দিনে দিনযাপনে লেখার মতো ইভেন্টের অভাব ছিলো না …

জাপান স্টাডিজ-এর ক্লাশ শুরু হলো ২২ তারিখ থেকে … এই পর্যন্ত দুইজন টিচারের ক্লাস হয়েছে এবং দু’জনেই তাদের কথাবার্তায় বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ক্লাসে হাসি-ঠাট্টা-গল্প যতই হোক না কেন, দিনশেষে পড়ালেখার পারফর্মেন্সটাই তাদের কাছে সব … জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ নিচ্ছেন লোপামুদ্রা মালেক … দুইদিন ক্লাস নিয়েই তিনি আমার পছন্দের তালিকায় চলে এসেছেন … প্রথম দিন সবার পরিচিতি পর্বের সময়ই তিনি আমাকে যথেষ্ট ইম্প্রেসড করে দিয়েছেন … রিটেন পরীক্ষায় সিলেকটেড-দের ভাইভা’র দিন উনি ভাইভা বোর্ডে ছিলেন, এবং ৫০ জনের মতো স্টুডেন্ট-এর প্রায় অর্ধেকের ব্যাপারেই তিনি অনেককিছু মনে রেখেছেন স্রেফ ওইদিনের অবজার্ভেশন থেকেই! … আমি নিজের পরিচয় দেয়ার আগেই উনি বলে বসলেন, ‘এক্সেল অ্যাকাডেমি?’ … আমি এক্সেল অ্যাকাডেমিতে চাকরি করি এইটা উনি কিভাবে জানলেন সেইটা উনাকে কিভাবে জিজ্ঞেস করি সেই ব্যাপারে পুরো ক্লাশ ভাবতে ভাবতে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তখন উনি বলেন, ‘ভাইভার দিন বলেছিলে না? তখনই তো শুনেছি!’ … এইরকম একজন স্ট্রং অবজারভেশনওয়ালা মানুষের ব্যাপারে ইম্প্রেসড না হয়ে পারা যায়?  … আরেকজন স্যার ক্লাস নিলেন … প্রফেসর সাই কুরাসাওয়া … নাম শুনে ভেবেই রাখলাম জাপানিজ হবেন … ক্লাস নিতে যেদিন আসলেন সেদিন জানলাম উনি বাঙালি, এবং ৪৬ বছর ধরে জাপানে থাকার সুবাদে উনি নিজের নামশুদ্ধা পালটে সাঈদ মুর্তাজা থেকে সাই কুরাসাওয়া হয়ে গেছেন! …

২৫ মার্চের রাতে গ্রুপের ইভেন্ট হলো মানিক মিয়া এভিনিউ-তে … ‘আলোর যাত্রা’ প্রোগ্রামে … যাচ্ছেতাই মার্কা ‘আলোর যাত্রা’ প্রোগ্রাম … দুনিয়ার লোকজন-এর ভীড় … যখন প্রোগ্রামের মেইন ইভেন্ট হিসেবে মোমবাতি জ্বালানো হলো, তখন ওইসব ভীড় করা মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে সেলফি-টেলফি তুলে অস্থির হয়ে তারপর মোমবাতি রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেলো! … প্রাচ্যনাট এই ইভেন্টে থিয়েট্রিক্যাল পারফর্মেন্স করেছে … টাকা পাবে … এই লাভ! … প্রাচ্যনাটের পারফর্মেন্স না থাকলে তো এই প্রোগ্রামে যেতামই না ! গিয়ে লাভের লাভ আমার এটাই হয়েছে যে কর্পোরেট লোকজনের কিছু যাত্রাপালা দেখতে পেয়েছি!

২৫ মার্চে দিনের বেলা আবার আমরা কয়েকজন ফৌজিয়া আপার বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম … ইনফ্যাক্ট দাওয়াতটা আমরা নিজেরাই কয়েকজন নিয়ে নিয়েছিলাম … ২৩ তারিখ উনার জন্মদিন ছিলো … তো সেদিন অরুনদ্যুতি আপুর বুদ্ধিতেই এই নিজেরা নিজেরা দাওয়াত চেয়ে ফৌজিয়া আপাকে রীতিমতো কার্ড দিয়ে উইশ করা … তো, ২৫ তারিখ বেশ ভালো একটা আড্ডা হলো কয়েকজন কলিগ মিলে …

২৫ মার্চে আবার লালযাত্রাও ছিলো … কিন্তু এবারের লালযাত্রায় কেন জানি আমার যেতেই ইচ্ছা করলো না! একেবারে মন থেকেই সায় পেলাম না যে যাই! আর মন থেকে সায় না পেলে কোনো কাজ আমি করতে পারি না … দেখা যায় সেটা নিয়ে একটা গন্ডগোল বাধেই … ফলে … লাল যত্রায় গেলাম না! … গতবারের লালযাত্রা সুন্দর হয়েছিলো … ওয়েল প্ল্যানড ছিলো … গতবারের আলোকে এবারের লালযাত্রা আরো জমজমাট, আরও ওয়েল প্ল্যানড হবার কথা…কিন্তু এবার কেমন জানি একটা ‘লালযাত্রা হবে কি হবে না’ টাইপ কনফিউশনের মধ্যে দুইদিনের নোটিশে লালযাত্রা হলো … আর আমারও শেষ মূহুর্তে আর যেতেই ইচ্ছা করলো না!

যাই হোক … ২৬ মার্চে নিশাতের বাসায় সন্ধ্যায় দাওয়াত খেয়েছি … আর রাতে থেকেছি ফৌজিয়া আপার বাসায় … পরদিন ভোরবেলা ৭টা সময় স্কুলে যেতে হবে বলেই রাতে ফৌজিয়া আপার বাসায় থেকে যাওয়া … আমার নিজের বাসা থেকে যেতে হলে সকালে সোয়া ৬টায় বাসা থেকে বের হতে হতো … ঘুম থেকে উঠতে হতো ৫টায়! আর ফৌজিয়া আপার বাসায় থাকার সুবাদে ঘুম থেকেই উঠেছি সোয়া ৬টায়! … তো ২৭ তারিখ স্কুলের প্রোগ্রাম ছিলো … স্বাধীনতা দিবসের … বৃতা ওর ড্রামা ক্লাসের বাচ্চাদের দিয়ে নাটক করালো একটা … সেই কাজে ওকে হেল্প করেছি কিছুটা … দুই – চারটা বাচ্চা ছাড়া আর কেউই অবশ্য বিষয়টাকে খুব সিরিয়াসলি নেয় নাই, এবং পারফর্মেন্সের মধ্যেই বেশ হাসাহাসি করেছে নিজেদের নিয়েই … কিন্তু যত যাই হোক, বাচ্চাদের দিয়ে যে দুইদিনের রিহার্সালে একটা কিছু করানো গেছে তাই তো অনেক! … সামনে আবার পহেলা বৈশাখের প্রোগ্রাম … ওইখানেও নাটকের প্ল্যানিং চলছে … আশা করছি ২৭ মার্চের প্রোগ্রামের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে পহেলা বৈশাখের প্রোগ্রাম আরো ভালো হবে! … অন্তত কোন কোন বাচ্চাকে মোটেই নেয়া যাবে না, সেটা বৃতা আর আমি বেশ বুঝে গেছি! …

উফ! টায়ার্ড হয়ে গেলাম। আর লিখবো না আজকে … ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি দিনযাপন লেখা শেষ করে কালকের জাপানিজ স্টাডিজ ক্লাসের পড়াশোনা নিয়ে একটু বসবো … ক্লাস লেকচারটা একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো … স্যার কালকে আবার স্কুলের বাচ্চাদের মতো করে পড়া ধরবে কি না তা তো জানি না! …

যাই হোক … আজকে সকাল থেকে অনেক ধকল গেছে … এখন বরং ঘুমিয়ে যাই … রেস্ট তো হবে কিছুটা! …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s