দিনযাপন । ২৪০৫২০১৬

গত তিন/চারটা দিন যাবৎ খালি মানুষের মরার খবরই শুনলাম … ফেসবুকে, আশেপাশে, দূর সম্পর্কে … হুটহাট এত মানুষ মারা যাচ্ছে! … যাচিত কিংবা অযাচিতভাবে! …

পরিচিত মানুষদের মধ্যেই তো কয়েকটা মৃত্যুর খবর পেলাম … মা’র কলিগের শাশুড়ি … স্কুলে তাসলিমা আপা’র শাশুড়ি … গ্রুপে কয়েকদিন আগে মিতুল ভাইয়ের বাবা … আর এই মাত্রই দুইদিন আগে সন্ধি’র ভাই … আবার একই সময়েই বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম … বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর … মেগাডেথ-এর ড্রামার … কত মানুষ! …

এর মধ্যে সন্ধির ভাইয়ের মৃত্যুটা সবচেয়ে প্যাথটিক … ওর বয়স ছিলো মাত্র ১৩ … গ্রামের বাড়িতে নাকি পুকুরে ডুবে মারা গেছে … তাও আবার পুকুরের পানি নাকি বেশি ছিলো না … কাদামাটিতে স্লিপ কেটেছে হয়তো … সন্ধি’র সাথে বা নোবেল ভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা হয়নি আমার … জেনেছি তৃতীয়, চতুর্থ সোর্স থেকে … ফলে ডিটেইল কিছু জানি না … এমনিতে সন্ধি’র প্রতি কিছু বিষয় নিয়ে বিরক্তি আছে বলে ওর সাথে কথা বলা হয় নি … আর কাউকেও জিজ্ঞেস করা হয়নি … সরাসরি দেখা না হলে ফোনে বা ফেসবুকে আসলে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না আমার। আর এইরকম মৃত্যু নিয়ে আসলে ফোন করে কাকে কি জিজ্ঞেস করবো বুঝি না … আমার তো এমনিতেই খুব অস্বস্তি লাগে মরা বাড়িতে যেতে … কারো মৃত্যুতে স্বান্তনা দিতে … কিংবা ইভেন মৃত্যুর বিস্তারিত নিয়ে কথা বলতে …

যাই হোক … এটতুকু একটা বাচ্চা মানুষের মারা যাওয়া ব্যাপারটাই ভয়ঙ্কর! … তাও আবার এরকম আচমকা … আজিব টাইপের দুর্ঘটনার মৃত্যু তো আরো ভয়ঙ্কর! … কেমন ছ্যাৎ করে এসে বুকে লাগে! … কত বড় একটা ধাক্কা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এখন ওর স্বজনদের! …

মৃত্যু বিষয়টা আমাকে প্রায়ই খুব ভাবায় … হুট করে যদি একদিন আমি মরে যাই? … কিংবা বাবা-মা-ভাই-খালাদের কেউ মারা যায়? … তখন কীভাবে কি হবে সেটা নিয়ে মাঝে মাঝেই ভাবনারা খোঁচায় … নিজের মৃত্যুর কথা যখন ভাবি, তখন অনেক কিছু তালগোল পাকিয়ে যায় … মনে হয় যে হুট করে মারা যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত আমার কি কি কাজ সম্পন্ন থাকা উচিৎ? … খুব সিলি সিলি জিনিস নিয়েও ভাবি … যেমন, আমার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডের কি হবে? … মেইলের পাসওয়ার্ডের কি হবে? … তখন আমার যাবতীয় কাগজ-পত্র, ডাইরি সবকিছুই উন্মুক্ত হয়ে যাবে সবার জন্য … আচ্ছা, তখন আমার ডাইরি এন্ট্রিগুলা যদি কেউ পড়ে, সে আমার ব্যাপারে কি ভাববে?

আবার এরকমও মনে হয়, মরে যাওয়ার পর কি আমি আসলে যেভাবে আছি সেভাবেই ঘুরবো, ফিরবো ? … কিন্তু কেউ সেটা দেখতে পাবে না? … নাকি আমার আর বাস্তবতার মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হবে? … প্যারালাল ইউনিভার্স-এ থাকবো? …

একবার বান্দরবানে পানিতে ডুবে যেতে নিয়েছিলাম … ২০০৯ সালের কথা সেটা … অনিমেষ দা এবং তার তৎকালীন দলের সাথে বেড়াতে গিয়েছিলাম … ঘটনাস্থল সাঙ্গু নদীতে … জুলাই কি আগস্ট মাসের দিকে মনে হয় … ঠিক মনে পড়ছে না এখন … তো, তখন সেখানে কোমর পানি ছিলো … সবাই পানিতে নেমে সাঁতার কাটছিলো … কিন্তু আমি সাঁতার জানিনা দেখে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম … এক পর্যায়ে একজনের জোর ডাইভের সাথে সাথে উপচে পড়া পানির স্রোতের সাথে আমি ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে গেলাম, আর সাঁতার জানিনা দেখে ওইটুকু পানি থেকেই উঠতে পারছিলাম না … আর পানির স্রোতও আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো … আমি হাত তুলে কাউকে ডাকবো সেটাও করতে পারছিলাম না … প্রচণ্ড হাঁসফাঁস অবস্থায় বুঝতে পারছিলাম যে এখনো কেউ আমাকে খেয়াল করে নাই … ঠিক যেই মুহুর্তে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, নাকে-মুখে পানি ঢুকে যাচ্ছে, তখন শেখরদা আমাকে টেনে তুলেছিলো … নাকে-মুখে পানি ঢুকে গেলে মরে যেতাম কি না কে জানে! …

FB_20160511_01_36_54_Saved_Picture

জীবনে আর একবার আমার ‘মরে গেছি’ এমন অনুভূতি হয়েছিলো … ফুল অ্যানেস্থেশিয়া থেকে জেগে উঠছিলাম তখন … চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া আলো … আর কেমন অদ্ভুত ভোঁতা শব্দ … অন্ধকার থেকে বিন্দুর মতো আলো জট পাকাতে পাকাতে মুভ করছিলো … ইন্টেন্সিটি বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিলো … সবকিছু কেমন সাদা ! … আর কেমন নিঃশব্দ … ভোঁতা! … তখন আমি মুহুর্তের জন্য কিছু মনে করতে পারছিলাম না … অ্যানেস্থেশিয়ার প্রভাবে জ্ঞান হারানোর আগে কোথায় ছিলাম … কি হয়েছিলো … একবার খালি মনে হলো, ‘মরে গেছি?’ … তারপর কিছুটা সময় পরে আস্তে আস্তে মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে বুঝেছিলাম, মরে যাই নাই … একটা প্রচণ্ড ধাক্কার মতো সবকিছু মনে পড়ে গিয়েছিলো …

তখন মনে হয়েছিলো, মরে যাওয়াটাই হয়তো ঐ মুহুর্তের জন্য সবচেয়ে ভালো ছিলো … আমি বোধহয় তখন খুব চিৎকার করে কাঁদছিলাম … কারণ ওই খুব ঝাপসা, সাদা সবকিছুর মধ্যেও আমি কয়েকজন মানুষের ছুটে আসা টের পাচ্ছিলাম … অবশ্য একরকমের মৃত্যুই হয়েছিলো আমার … শরীরে না … মনে …

কিংবা অনাগত একটা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন বোধদয়ের আমার জন্ম হয়েছিলো … আর সেই জন্ম না হলে এই আজ-কাল-পরশুর কোনো এক তারিখে নতুক আরেক আমি হয়তো জন্ম নিতাম … গতবছরের এই সময়ে … কিন্তু এক জনমের সব পাপ মিলেমিশে একাকার হয়ে আমার এই নতুন জন্মের সকল সম্ভাবনাকে অনেক আগেই ধূলিসাৎ করে রেখেছিলো …

হায়রে মৃত্যু! … কেউ আজন্মই মৃত থাকে … কেউ মরেও বেঁচে থাকে … আর কেউ জন্মানোর আগেই মরে যায় …

তাও কিছু কিছু মানুষ মরে না … সবকিছুর পরে তারাই যুদ্ধজয়ীর বেশে বহাল তবিয়্যতে বেঁচে থাকে …

এটাই জীবন … ***র জীবন …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s